ভেরিফিকেশন যখন সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

বেসরকারি একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন দিব্যেন্দু সিংহ সপ্ত। পাশাপাশি সরকারি চাকরির স্বপ্ন নিয়েও করছিলেন পড়াশোনা। অংশ নেন ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায়। সব ধাপ পেরিয়ে অবশেষে ২০২৪ সালের অক্টোবরে কাঙ্ক্ষিত প্রজ্ঞাপনে উঠে তার নাম। 

শেষ হয় দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর। যদিও তখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ওই বছরের ১৭ই নভেম্বর চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সপ্ত। এর মধ্যে বেসরকারি চাকরি থেকেও নেন অব্যাহতি। 

হঠাৎ ২৮এ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন স্থগিত করে অন্তর্বর্তী সরকার। জানানো হয়, নতুন করে গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে পুনরায় প্রজ্ঞাপন দেওয়া হবে। 

সেই প্রজ্ঞাপন ডিসেম্বরের শেষে প্রকাশ হয়। বিস্ময়করভাবে সপ্ত জানতে পারেন পুন প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে নেই তার নাম। সপ্তসহ আরও যাদের নাম বাদ পড়ে তারা যোগাযোগ করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। তখন তাদের দেওয়া হয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সারাংশ। 

“আমি দেখতে পাই দুইটা গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে। একটি সংস্থা আমাকে সুপারিশ করেছে কিন্তু দ্বিতীয় সংস্থা আমাকে সুপারিশ করেনি,” আলাপ-কে বলেন সপ্ত। 

বিষয়টিকে বিস্ময়কর মন্তব্য করে তিনি বলেন, “একই ব্যক্তি একটি রাষ্ট্রে দুইটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে দুইভাবে বিবেচিত হলো কীভাবে! অর্থাৎ বিষয়টা এমন যে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ক্রিমিনাল আরেকটার কাছে ইনোসেন্ট!”  

সপ্তের প্রশ্ন, “আমার যে রিপোর্টটি খারাপ এলো সেটা কেন আমলে নিলো? যে রিপোর্ট ভালো এলো সেটা কেন আমলে নেওয়া হলো না?” 

ঠিক কী কারণে একটি সংস্থার রিপোর্ট খারাপ এসেছে সে বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি দিব্যেন্দু সিংহ সপ্তকে। সারাংশে শুধু উল্লেখ ছিলো উত্তীর্ণ এবং অনুত্তীর্ণ।  মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সপ্তের জীবন ওলটপালট হয়ে যায়। 

নভেম্বরে যোগ দিতে হবে দেখে আগেই চাকরি ছাড়েন। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক পদে চাকরি পেয়েছিলেন। সেখানেও যোগ দেননি।  কারণ তার স্বপ্ন, প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করবেন। সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় এক গোয়েন্দা রিপোর্টে। 

“চুপচাপ বাসায় বসে ভেবেছি আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সব কিছুই ধ্বংস করে দেওয়া হলো। কেন এমন হলো আজও জানতে পারলাম না,” আলাপ-কে বলেছেন সপ্ত।    

সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষাই সাধারণত মেধা যাচাইয়ের প্রধান ধাপ। কিন্তু এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও একজন প্রার্থীর নিয়োগ নিশ্চিত হয় না। চূড়ান্ত নিয়োগের আগে তাকে মুখোমুখি হতে হয় আরেক পরীক্ষার—পুলিশ ভেরিফিকেশন। পুলিশ ভেরিফিকেশন কিংবা গোয়েন্দা রিপোর্টে কী কারণে প্রার্থীদের অনুত্তীর্ণ করা হয়, তার ব্যাখ্যা কখনই জানা যায় না। 

সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। 

দিব্যেন্দু সিংহ সপ্ত’র মতো এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়।  ২০০৭ সালে অনিয়মের অভিযোগ এনে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিল করে। আবার সিদ্ধান্ত হয় দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষার। তবে ২০০৮ সালে দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষার পর ১ হাজার ১১৪ জন প্রার্থী বাদ পড়েন।  এরপর ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীরা আদালতের দ্বারস্থ হন। চলে আইনি লড়াই। সেখানেও সুরাহা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাদ পড়া কয়েকশ প্রার্থী নতুন করে রিভিউ আবেদন করেন। অবশেষে প্রার্থীদের ২০২৫ সালে চাকরি পুনর্বহাল করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। 

পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় না দেখার সুপারিশও আসে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে। তাদের তৈরি প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন সুপারিশ করে, চাকরিতে নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রার্থী বা তার আত্মীয়-স্বজনের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দলীয় ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের প্রথা বাতিল করা উচিত। 

অথচ সেই সময়ও অনেকে অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন ২০২৪ সালের ৮ই অগাস্ট থেকে ৭ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যেসব কাজ করেছে তার একটি বিবরণ তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ৬৭ জন কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে (৭ই সেপ্টেম্বরের আগ পর্যন্ত)। বাতিলের ফলে শূন্যপদগুলোতে জুলাই চেতনার সঙ্গে সংগতি রেখে নতুনভাবে ২৪ জন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।  

অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সরকারি পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি।

এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার সময়ে ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল এবং দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে নাম থাকার পরও ঘটেছে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা। তাদের একজন অনুপ কুমার বিশ্বাস। 

অনুপ কুমার নিয়োগ পেয়ে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে ছিলেন। ছয় মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের আর মাত্র ২৮ দিন বাকি ছিল। এমন সময়ে হঠাৎ করে ২০২৫ সালের ১৯এ নভেম্বর একটি চিঠি আসে অনুপসহ আরও দুইজনের নামে। চিঠিটি ছিলো চাকরি থেকে অপসারণের। 

“অপসারণের কারণ হিসাবে বলা হয়, সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ এর বিধি নং ৬ এর ২এ। এই বিধিতে বলা আছে, সরকার যদি কাউকে অযোগ্য মনে করে তাহলে শিক্ষানবিশ অবস্থায় তাকে কোনো রকম নোটিস ছাড়াই চাকরি থেকে অপসারণ করা যাবে,” আলাপ-কে বলেছেন অনুপ।  

কেন অযোগ্য মনে করা হলো তা চিঠির কোথাও উল্লেখ ছিল না। একইসঙ্গে কেন তাকে অপসারণ করা হলো সে বিষয়েও কিছুই জানেন না তিনি। 

“আমার জানা মতে শিক্ষনবিশ অবস্থায় প্রশাসন ক্যাডারের কাউকে অপসারণের ঘটনা ইতিহাসে নেই। সম্ভবত আমরা তিনজনই প্রথম।” 

শুধু প্রশাসন নয় বিচার বিভাগেও এ ধরনের ঘটনার উদাহরণ আছে। ২০২৪ সালের ২৮এ অগাস্ট  এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানানো হয়, “১৩ই আগস্টের আগে নিয়োগপ্রাপ্ত সব ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং পূর্বের সব সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তার সংখ্যা ২৪০।”  

অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে অনেককে নিয়োগ দেয়। এ সময় নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিএনপি নেতা মো. আসাদুজ্জামান। 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর মো. আসাদুজ্জামান হন আইনমন্ত্রী। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে নিয়োগ পান আরেক বিএনপিপন্থি আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। 

ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত অ্যাসিসটেন্ট অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু যাদেরকে রাখা হয় তাদেরও নতুন করে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয় বলে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। সেই সূত্র আরও জানিয়েছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভেরিফিকেশনে দেখা হয় তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কী।   

চাকরির যাচাই-বাছাই নিয়ে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন শরিফুল ইসলাম। তিনি একইসঙ্গে কলামিস্ট ও বিশ্লেষক।  

তিনি আলাপ-কে বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে দেখা হয়েছে প্রার্থীদের কেউ বিএনপি-জামায়াতের কিনা। বিএনপি আমলে দেখা হয় কেউ আওয়ামী লীগের কিনা। এটা সম্পূর্ণ সংবিধানবিরোধী একটা কাজ।” 

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের এমন কোনো পরিবার নেই যার সঙ্গে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত নেই। তার মতে, একই গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সব রাজনৈতিক আদর্শের লোকই পাওয়া যাবে।  

নতুন করে পুলিশ ভেরিফিকেশন কেন আলোচনায় এলো 

সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদের চাকরির পরীক্ষার উত্তীর্ণ হয়েও চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হননি অনেকে। আর তখনই আলোচনায় আসে ‘রাজনৈতিক পরিচয়ের’ কারণে অনেকেই চূড়ান্ত নিয়োগ পাননি। সেখান থেকে শুরু হয় ক্ষোভ। এমনকি সামাজিক মাধ্যমেও অনেকে নিজেদের নিয়োগপত্র না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

কেন নিয়োগপত্র পায়নি? এমন প্রশ্নের উত্তর জানতেই যোগাযোগ করা হয় গেলো ২৭এ সেপ্টেম্বর অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শাখাওয়াত নামে এক ব্যক্তির সাথে। তিনি উত্তীর্ণ হলেও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে সেদিন বিকালেই জানতে পারেন তার নিয়োগপত্র এসেছে। 

“আমরা যারা প্রাথমিকভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলাম, তাদের মধ্যে আড়াই হাজার জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। যার জন্য ২৭এ সেপ্টেম্বর আমরা শাহবাগে জড়ো হয়েছিলাম। পরে ওখান থেকে আমরা দ্বিতীয় ধাপে ফলাফল পাওয়া শুরু করি,” আলাপ-কে বলেন তিনি।   

তবে যারা নিয়োগপত্র পাননি তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, “কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী মামলা বা স্থায়ী ঠিকানাজনিত সমস্যা বা সনদ নিয়ে সমস্যার অভিযোগ আছে।”

তাহলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেকের নিয়োগ আটকে গেছে; সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের অভিযোগ কীভাবে এলো?

“রাজনৈতিক কারণে দেওয়া হয়নি, সেটা কেউ যদি বলে থাকে সেটা ধারণা থেকে বলেছেন। কিন্তু আমাদের বলা হয়েছে, এনএসআই রিপোর্টের সমস্যাজনিত কারণে দেওয়া হয়নি,” বলেন শাখাওয়াত।

তবে তার মতে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার কালচার থেকে বের হয়ে আসছে।  

প্রাথমিকের নিয়োগবঞ্চিত ৮১৭ জনকে আগামী ১লা অক্টোবরের মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে সোমবার জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আনম এহছানুল হক মিলন।

সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সভায় তিনি বলেন, “যারা ওই সময়ের মধ্যে নিয়োগ পাবেন না, তাদের বিষয়েও কাজ করা হবে।”

‘গোপন’ ভেরিফিকেশন নিয়ে নেই লিখিত প্রমাণ, তবে আছে গবেষণা  

বাংলাদেশের সংবিধান সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সমতা রাখার কথা বলছে। ২৯ (১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে”।  

এছাড়াও কোনো ধরনের বৈষম্য না রাখার কথাও বলা হয়েছে সংবিধানে।

বিভিন্ন গবেষণা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ এসেছে, সরকারি চাকরির শেষ ধাপের পুলিশ ভেরিফিকেশনে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় এবং পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। 

ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে বা কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে কোনো প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য অযোগ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। 

‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) এক্সামিনেশন’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন গবেষক ফেরদৌস আরা। স্প্রিংগার থেকে প্রকাশিত বইটির নাম ‘গ্লোবাল এনসাইক্লোপেডিয়া অব পাবলিক, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, পাবলিক পলিসি, অ্যান্ড গর্ভন্যান্স’। 

সেই প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সুপারিশ থাকার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়মিতভাবেই কিছু প্রার্থী নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েন। পুলিশ ভেরিফিকেশনের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে ফেরদৌস উল্লেখ করেন, এ প্রক্রিয়ায় প্রার্থীর নিজের চরিত্রের পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের অতীতও খতিয়ে দেখা হয়, যা অন্যায্য। ৩২তম  থেকে ৩৯ তম বিসিএস পরীক্ষা পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জন মেধাবীদের বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সুপারিশ করার পরও পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ বঞ্চিত করা হয়। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক প্রবন্ধে আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীর বাবা-মা এমনকি আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকেও পুলিশ ভেরিফিকেশনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এমনও দেখা যায় যে কোনো সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সামান্য সংশ্লিষ্টতাও আমলে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ক গুজবও যদি থাকে তারপরও প্রার্থীর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়ার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।   

আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ নিয়ে ২০০৬ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর গর্ভন্যান্স স্টাডিজের ‘দ্য স্টেট অব গর্ভন্যান্স ইন বাংলাদেশ’ নামক এক গবেষণাপত্রে ফেরদৌস জাহান বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যুগে ব্যাপক রাজনীতিকরণ ঘটেছে। দক্ষতা ও যোগ্যতার বদলে ‘দলীয় আমলা’ নিয়োগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ১৯৯১ সালের পর থেকেই।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রথম পাঁচ বছরের বিষয় তুলে ধরে ফেরদৌস জাহান তার গবেষণাপত্রে বলেছেন, “১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি দেশ শাসন করেছে। এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে দলীয় অনুগতদের বসানো হয়।” 

গবেষণাপত্রে তুলে ধরা হয়, ১৯৯২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি সরকার ৬৫৪ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে সরকার অন্তত ৫১ জন সরকারি কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর আদেশ দেয়। এদের অনেককেই কোনো কারণ জানানো হয়নি। 

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগও রাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে বলে জানান ফেরদৌস জাহান।

তিনি উল্লেখ করেন, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচিত সরকার অপসারণের আন্দোলনে সরাসরি জড়িত ছিলেন। যেই আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। যারা ওই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল তাদের পুরস্কৃত করা হয়। 

‘প্রবলেমস অব পালিক পারসোনেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইন বাংলাদেশ: আ কোয়ালিটেটিভ স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছেন সাহজাদা আহসান হাবিব ও শেফাত-ই-রুবি। তাদের গবেষণাটি ২০২৩ সালে এশিয়ান জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজে প্রকাশিত হয়। 

গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন সব রাজনৈতিক আমলেই রাজনীতিকরণের শিকার হয়েছে। সাধারণত সরকারগুলো নিজেদের সমর্থকদের সিভিল সার্ভিস ও অন্যান্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করাতে চায়।

গবেষণার উদ্ধৃত একটি সূত্রের মতে, যারা ক্ষমতাসীন দল বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে সমর্থন করে না, পুলিশ তখন নেতিবাচক রিপোর্ট দেয়। এর ফলে মেধাবী প্রার্থীরা সরকারি চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন।

রাজনৈতিক বিবেচনায় পদবঞ্চিত কিংবা চাকরি না হওয়ার প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসনের বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবউননেছা নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। 

“কর্মজীবনে প্রবেশের সময় আমিও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি। অথচ আমি কখনো রাজনীতি করিনি। শিক্ষক নিয়োগে কয়েকদফা ভাইভা বোর্ডে গিয়েও আমি বাদ পড়েছি,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ড. জেবউননেছা চেয়েছেন তার কোনো শিক্ষার্থী যেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত না হন। কিন্তু তার পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি যখন লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলাম তখন বোর্ড বসানোর পরও শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারিনি। তার একমাত্র কারণই ছিল রাজনীতিকরণ। আমি তখন স্ট্যান্ড নিয়েছিলাম যে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে, আমি তাকে নেবো। রাজনৈতিক পরিচয় এখানে মুখ্য নয়। এ বিষয়টি জেনে যাওয়ার পরই আমাকে বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আবার কখনো কখনো বোর্ড বাতিল করা হয়।” 

ড. জেবউননেছার মতে, যেই রাজনৈতিক পরিচয়েরই হোক না কেন, কোনো প্রার্থী যদি মেধাবী ও যোগ্য হয় তাকে অবশ্যই নিয়োগ দেওয়া উচিত। তা না হলে সমাজে বিভেদ বাড়বে।   

পুলিশ ভেরিফিকেশনে কী দেখে

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় একজন প্রার্থীর সাধারণত ১৬টি বিষয়ের তথ্য চাওয়া হয়। উল্লেখযোগ্য তথ্যের মধ্যে প্রার্থীর দেওয়া তথ্যের সত্যতা, নৈতিক স্খলন এবং আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রবিরোধী কোনো অপরাধের রেকর্ড আছে কিনা, তা নিশ্চিত করাই ভেরিফিকেশনের মূল উদ্দেশ্য। 

তদন্তের সময় জন্ম তারিখ, জন্মস্থান, প্রার্থীর নাম, ঠিকানা, বাবার নাম, স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা সঠিক কিনা সেসব যাচাই হয়। এছাড়াও দেখা হয় শিক্ষা জীবনে অর্জন করা সকল রেকর্ড। 

গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আছে কিনা। এছাড়াও রাষ্ট্রবিরোধী বা চরমপন্থি কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা। প্রার্থী সমাজবিরোধী কোনো কাজে অংশ নিয়েছিল কিনা সেসবও যাচাই করা হয়। 

সরকারি চাকরি প্রার্থীদের জন্য বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের প্রকাশিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরমেও রাজনৈতিক বিষয়টির উল্লেখ আছে। ফরমে প্রার্থীকে প্রশ্ন করা হয়েছে, তিনি কখনো ‘ফৌজদারি, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মামলায়’ গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হয়েছেন কি না।

তবে কোনো রাজনৈতিক মামলায় জড়িত থাকার তথ্য চাওয়া এবং কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলীয় পরিচয়ের কারণে তাকে নিয়োগে অযোগ্য বিবেচনা করা, দু’টি এক বিষয় কিনা, সেসব নিয়ে আছে প্রশ্ন। 

পুলিশ ভেরিফিকেশন কেন জরুরি  

এ ধরনের ভেরিফিকেশন পদ্ধতি ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হয়েছে বলে জানান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল। 

“ব্রিটিশরা দেখতো স্বরাজ আন্দোলনে কেউ যুক্ত আছে কিনা। সেসব দেখে তাদের আন্ডারে লোকজনকে চাকরি দিতো,” আলাপ-কে বলেন তিনি। 

মাসুদ কামালের মতে, স্বাধীন দেশে এসব ভেরিফিকেশনের কোনো অর্থ নেই। 

তবে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি আনসার উদ্দিন খান পাঠানের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য নয় বরং পুলিশ ভেরিফিকেশন হওয়া উচিত অতীত জীবনে তাদের আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের কোনো ইতিহাস আছে কিনা, সেটা দেখা।

“এটা পৃথিবীর সব দেশই দেখে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি। 

অন্যদিকে মাসুদ কামাল বলেন, “পুলিশ ভেরিফিকেশনে যদি মনে হয় কেউ রাষ্ট্রের জন্য হুমকি, তাহলে তো তার জেলখানায় থাকা উচিত। তাকে পরীক্ষা দিতে দিলেন কেন?” 

“পুলিশ ভেরিফিকেশনে যে লোকটা বাদ দিলেন তাকে কি জেলে ঢুকাচ্ছেন? আসল কথা হলো এসবের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্তি নিয়ে আসা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমরা ফার্স্ট ক্লাস সিটিজেন, তোমরা সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। এটা দীর্ঘদিন থেকে চলছে। এই লোকগুলো হিংসা প্রতিহিংসা নিয়ে সমাজে বাস করবে। এটা কোনো সভ্য সমাজের পদ্ধতি হতে পারে না।” 

সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি আনসার উদ্দিন এই বিষয়ে রাজনৈতিক ঐক্যমতের উপরে জোর দিয়েছেন। 

“এটা সরকারি এক্সিকিউটিভ অংশের কাজ। অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে করা হয়। এখানে কোনো রিটেন টেক্সট কিংবা কারও স্বাক্ষর থাকে না। যার কারণে কেউ চ্যালেঞ্জও করতে পারে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসে ঠিক করতে হবে তারা কীভাবে এটাকে দেখবেন,” তিনি বলেছেন। 

যদিও মাসুদ কামাল ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “চব্বিশের আন্দোলন হয়েছিল যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগের দাবিতে। সেখানে পুলিশ ভেরিফিকেশন যোগ্যতার কোনো মাপকাঠি হতে পারে না। কাজেই এটা বাদ দেওয়া উচিত।” 

তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের সংস্কৃতিকে ধারণ করে কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে শরিফুল ইসলাম বলেন, “কেউ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তারা নিজেদের লোক খুঁজতে চায়। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সব জায়গায় নিজেদের লোক বসাতে চায়। এই নিজের লোক খোঁজার নাম করে সার্ভিসটাকে কলুষিত করে।” 

তার মতে যদি এভাবেই “নিজের লোক” বসাতে হয়, তাহলে সেটা আইন করে করা হোক। “ক্ষমতায় যে আসবে সে তাদের লোক বসাবে আমেরিকার মতো। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সব জায়গায় রাজনৈতিক রঙ খোঁজা শুরু হবে, এটা ভয়ঙ্কর চর্চা।” 

শরিফুলের মতে, পুলিশ ভেরিফিকেশন “হয়রানি” ছাড়া আর কিছু না। 

সরকারি নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশন থাকবে কি না, সেটি নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছে। অপরাধের ইতিহাস বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেই যাচাইয়ের মানদণ্ডের ভেতর যদি ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ অঘোষিত থাকে তাহলে বৈষম্য তৈরি করবে। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, মেধা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নিয়োগের সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো কতটা কার্যকর থাকছে।