কাজল ফিরেছেন, মিরাজ কোথায় - প্রস্তাবিত নতুন আইন গুম ঠেকাতে পারবে কতটা?

সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল গুম হয়েছিলেন ২০২০ সালে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কাজল আজও মনে করতে পারেন না ঠিক কোন তারিখে তাকে তুলে নেয়া হয়েছিলো। “সম্ভবত ১৭ই মার্চ আমাকে নেওয়া হয়েছিল। নাকি ১০ বা ১১ই মার্চ,” আলাপ-কে বলছিলেন তিনি।  

গুম হওয়ার আগে কাজল নিজের ফেইসবুকে সরকারের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি করতেন। 

“ওয়েস্টিন হোটেল কেলেঙ্কারিতে পাপিয়া নামে একজন নারীকে গ্রেফতার করা হয়।  সরকারদলীয় অনেকেই তার সঙ্গে  নানান ধরনের অপকর্মের সাথে জড়িত ছিলো। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমি লেখালেখি করি এবং সাথে ছবিও প্রকাশ করি,” বলছিলেন তিনি।

এসব কারণেই টার্গেট হন কাজল। বিভিন্ন সময়ে হুমকিও পান। মানসিকভাবে কিছুটা আতংকে ছিলেন বলে জানান কাজল। এমনকি তার পরিবারও বিষয়টি নিয়ে ছিলো উদ্বিগ্ন। 

দশই মার্চ সন্ধ্যায় নিজের মোটরসাইকেল চালিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের অফিসের দিকে যাচ্ছিলেন কাজল। পথে ৮-১০ জন লোক তার বাইক আটকায়। প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় বাংলা একাডেমির ভেতরের অংশে। 

“আমি তখন অনেক চিৎকার করলাম। বললাম আমি সাংবাদিক। কাউকে চিনতে পারছিলাম না। সবাই হেলমেট পরা ছিলো। সেখানে ১৫ মিনিট রাখার পরই আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলো। মাথায় জম টুপি পরিয়ে দিলো,” বলেন কাজল। 

এরপর অপরিচিত এক জায়গায় প্রায় দুই মাস ধরে চলে অমানবিক নির্যাতন। খাবার দেওয়া হতো আর তখন পাঁচ মিনিটের জন্য হ্যান্ডকাফ আর জমটুপি খোলা হতো, কিন্তু বাঁধা থাকতো চোখ। টয়লেটে যাওয়ার জন্যও বরাদ্দ ছিল পাঁচ মিনিট, দিনে একবার। 

তেপ্পান্ন দিন পর বেনাপোল সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা থেকে তাকে 'আটকের' কথা জানায় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিনটি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে, বাদী ছিলেন  আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর ও যুব মহিলা লীগের দু'জন নেতা। হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে ২০২০ সালের ২৫এ ডিসেম্বর মুক্তি পান কাজল।

কাজল ফিরেছেন। কিন্তু মিরাজ শেখ এখনও ফেরেননি।

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট সরকার পতনের পর প্রথম গুমের অভিযোগ ওঠে ২০২৬ সালের এপ্রিলে।

জাতীয় প্রেসক্লাবে ২৪এ অগাস্ট মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (ছবি: সংগৃহীত)

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ই এপ্রিল সুন্দরবনের কাছে মোংলার জয়মণির ঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ড সদস্যরা জেলে মিরাজ শেখকে আটক করে স্পিডবোটে নিয়ে যায়।

মিরাজের বোন লিজা ইসলাম বলেছেন, সেদিন ভোর চারটায় মাছ ধরতে বের হন মিরাজ, দুপুরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমান, সন্ধ্যায় গোসল সেরে বাড়ির কাছে একটি চায়ের দোকানে যান। দোকানের উল্টো দিকে নদীতে পন্টুনে কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশন।

“ওই স্টেশন থেকে দুইজন কোস্টগার্ড ও আমাদের গ্রামের মাঝি মিজান, যে তাদের বোট চালায়, তারা নদীর পাড়ে চায়ের দোকানের সামনে এসে আমার ভাইকে ধরে মারধর শুরু করে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

সেখান থেকে নৌকায় করে কোস্টগার্ডের পন্টুনে নিয়ে যাওয়া হয় মিরাজকে।

"ওই মুহূর্তে আমার ভাবীসহ মা-বাবা সবাই উপস্থিত ছিল, সবাই নিজের চোখে দেখে এবং গ্রামবাসীও ছিল। [পন্টুনের রুমের কাঁচের জানালায়] কম্বল টানানোর পরে আমার ভাইয়ের অনেক চিৎকার শোনা যায়, আমার ভাইকে অনেক মারধর করে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন লিজা।

তিনি দাবি করেন, এর আধা ঘণ্টা পরে সেখানে কোস্টগার্ড লেখা একটি স্পিডবোট আসে, যেটিতে করে মিরাজ শেখকে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে কোথায় নেওয়া হয় তা জানানো হয়নি পরিবারকে।

"আট থেকে দশজন, সবাই ইউনিফর্ম পরে ছিল। তারা ওই স্টেশনে উঠে ওর সাথে ছবি ও ভিডিও করে। আমার ভাইকে ওরা ধাক্কা দিয়া বোটে ফেলায়। ওকে এতটা মারছিল যে ও হাঁটতে পারছিল না, খোঁড়ায় খোঁড়ায় হাঁটছিল," বলেন লিজা।

কোস্টগার্ড অবশ্য পুরো অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বিবৃতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক প্রতিবাদপত্রে তারা দাবি করেছে, মিরাজ শেখকে কখনো আটক বা হেফাজতে নেওয়া হয়নি; অভিযোগ পাওয়ার পর অপারেশনাল রেকর্ড ও টহল কার্যক্রম পর্যালোচনা করে বাহিনীর কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে নাই এবং ওই তারিখে জয়মণির ঘোল এলাকায় কোনো অভিযান চালানো হয় নাই।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর প্রথমবারের মতো গুমের অভিযোগ নিয়ে বিবৃতি দেয় এই ঘটনায়। 

আন্তর্জাতিক সংস্থাটি ২০২৬ সালের ১২ই জুলাই দেওয়া আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করে মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি আরও বলেছে গত দুই বছরে এটি বাংলাদেশে প্রথম গুমের ঘটনা বলে তাদের কাছে মনে হচ্ছে। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপ-এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি ১৯এ জুলাই দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। মিরাজের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত সংস্কার না হলে এসব ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। 

সংখ্যায় গুম: কমিশন অফ ইনকোয়ারি যা বলছে 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ঘটা গুমের তদন্তে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। 

এই কমিশনের দায়িত্ব ছিলো ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট পর্যন্ত সময়ের ঘটনাগুলোর অনুসন্ধান করা। ২০২৬ সালের ৪ঠা জানুয়ারি কমিশন তাদের অনুসন্ধানের ‘ভলিউম-১’ প্রকাশ করে।

সেখানে উল্লেখ করা হয়, কমিশনের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২২২ জন ব্যক্তিকে হাজির করা হয়। এছাড়া জোরপূর্বক গুমের ৭৬৫ জন ভুক্তভোগী এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে কমিশন। অনেকের সাক্ষাৎকার একাধিকবারও নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাইয়ের পর দেখা যায়, এর মধ্যে ২৩১টি অভিযোগ ছিলো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। অনেক ক্ষেত্রে একই অভিযোগ একাধিক মাধ্যমে—যেমন ইমেইল, কুরিয়ার এবং সরাসরি জমা হয়েছিল। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ঘটনার বিষয়ে একটি সংগঠন এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আলাদাভাবে অভিযোগ করেছিলেন। পুনরাবৃত্ত অভিযোগ (২৩১টি ফাইল) এবং যোগ্যতা পূরণ না করায় (১১৩টি ফাইল) বাদ দেওয়ার পর ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ পাওয়া যায়, যেগুলো সম্ভাব্য জোরপূর্বক গুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

ইনফোগ্রাফ (এআই-এর সহযোগিতায় তৈরি)

কমিশন দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রথমটি  ২০২৪ সালের ডিসেম্বর, আরেকটি ২০২৫ সালের জুনে। পাশাপাশি চূড়ান্ত প্রতিবেদনটিও সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিশন ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়নেও সহায়তা করেছে। যেগুলো পরে অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করেছিলো অন্তর্বর্তী সরকার। 

তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কাজল। 

তার মতে, অন্তবর্তী কিংবা বর্তমান সরকার, কেউই তার “আলোচিত” গুমের ঘটনা নিয়ে “ন্যূনতম সম্মান” দেখায়নি। “রাজনৈতিক দল যেমন গুমকে গায়েব করে ফেলতে চায়। গুমের বিচারের নামে প্রহসনের মধ্যে রেখেছে।” 

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কাজল দাবি করেছেন “প্রকৃত গুম ভিকটিমদের” সাথে  কমিশনের “ন্যূনতম” কোনো সম্পর্ক নেই।

“অথচ তারা নিজের মতো করে গুমের রিপোর্ট দিয়ে দিচ্ছে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস অবশ্য বলছেন কাজলের সাথে তাদের কথা হয়েছে।

“আমি সাংবাদিক কাজলের সঙ্গে নিজেই যোগাযোগ করেছি। তার ইন্টারভিউও আমিই করেছি,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

কমিশনটি গত জানুয়ারিতেই বিলুপ্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ড. নাবিলা।

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার’ বিল নিয়ে শংকা

বাংলাদেশে গুমের মতো ঘটনা ভবিষ্যতে ঠেকানো যাবে কি না, তা এখন নির্ভর করছে সংসদে ওঠা নতুন একটি বিলের উপর। 

অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বর্তমান সংসদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন না করায় সেগুলো কার্যকারিতা হারায়। আরও সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশও ছিলো এই তালিকায়। 

এই বছরের ২৭এ অগাস্ট ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ সংসদে ওঠে। বিলগুলোর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই বিতর্ক চলছে। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খায়ের মাহমুদ বিলটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও বেশ কিছু অস্পষ্টতার কথা তুলে ধরেছেন।

তার মতে, ধারা ২-এ ‘সরকারি কর্মচারীর’ সংজ্ঞায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিরা পড়বেন কি না, তা পরিষ্কার নয়।

আরও উদ্বেগের জায়গা হিসেবে তিনি দেখছেন ধারা ৪(১)-কে। এই ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য গোপন রাখা যাবে, আর সেটা নতুন আইনে গুম হিসেবে গণ্য হবে না। 

গ্রেপ্তারকৃত যে কোনো ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা তার সাংবিধানিক অধিকার উল্লেখ করে খায়ের মাহমুদ বলেন, “এই ব্যতিক্রমটি আসলে অঘোষিত বা গোপন হেফাজতকে আইনি বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।” 

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলতে কী বোঝানো হবে বা কে এই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করবেন তাও এই আইনে স্পষ্ট নয়, তিনি বলেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী কাওসার আহ্‌মেদ আলাপ-কে বলেছেন, এই ধারা সরাসরি জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসন্স ফ্রম এনফোর্সড ডিজএপিয়ারেন্স'-এর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক, যে কনভেনশনে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ২৯এ অগাস্ট যুক্ত হয়। 

কনভেনশন কোনো অবস্থাতেই এমন ব্যতিক্রম রাখার অনুমোদন দেয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ত্রুটি অধ্যাদেশ ও নতুন বিল, দুই জায়গাতেই রয়ে গেছে। 

বিলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু খায়ের মাহমুদের মতে এখানেও ঝুঁকি রয়েছে। 

“ট্রাইব্যুনাল মূলত কমিশনের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই অপরাধ আমলে নিতে পারবে। অর্থাৎ কমিশন তদন্ত শুরু না করলে, তদন্তে বিলম্ব করলে বা প্রতিবেদন অনুমোদন না করলে একজন ভুক্তভোগী সরাসরি ট্রাইব্যুনালে বিচার চাইতে পারবেন না,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

কমিশন স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে এই ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের পথ সংকুচিত করতে পারে মনে করেন তিনি। 

তল্লাশি পরোয়ানা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খায়ের মাহমুদ। 

ধারা ১০ অনুযায়ী, পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্য দিয়ে তল্লাশি চালানো যাবে, কিন্তু অভিযোগ যদি সেই বাহিনী্র বিরুদ্ধে হয়, তাহলে তা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে। অভিযুক্তরা আগাম খবর পেয়ে প্রমাণ নষ্ট করার বা আটক ব্যক্তিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে বলে, তিনি বলেন।  

মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরও মনে করেন, বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

“প্রস্তাবিত বিলে বাহিনীর সদস্যের সংশ্লিষ্টতার ক্ষেত্রে অন্য বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের সুযোগ রাখা হলেও, এ ধরনের স্পর্শকাতর অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি পৃথক, স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত সংস্থা থাকলে সেটা ভালো হতো,” আলাপ-কে বলেন তিনি।  

তবে বিলের একটি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন খায়ের মাহমুদ। গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে একে সাধারণ অপহরণ বা নিখোঁজের ঘটনা বলে দায় এড়ানোর সুযোগ কমবে। শুধু সরাসরি অপহরণকারীকে না, বরং যিনি আদেশ দিয়েছেন, অনুমোদন করেছেন, সহায়তা বা প্ররোচনা দিয়েছেন, ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন কিংবা প্রমাণ নষ্ট করেছেন, তাকেও শাস্তির আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে।

তবে ফাঁক-ফোকর আছে বলেও মনে করেন খায়ের মাহমুদ। “প্রথম বড় লুপহোল হলো, মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক উপদেষ্টা, দলীয় নেতা বা অন্য কোনো বেসামরিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।”  

তার মতে, এমপি বা মন্ত্রীদের বিচারের আওতায় আনার আইনগত পথ থাকলেও তা মসৃণ নয়। বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন তুলনামূলকভাবে কার্যকর হলেও, সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও নির্দেশদাতাদের দায় প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গিয়েছে।   

আইনজীবী কাওসার আহ্‌মেদ পরামর্শ দিয়েছেন, এ ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সহযোগিতা ও বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া জরুরি ছিল। 

মিরাজ শেখ, ২০২৪ সাল-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম গুমের অভিযোগ, যার পরিবারের দাবি, তাকে তাদের চোখের সামনে তুলে নেওয়া হয়েছে আর কোস্টগার্ড যাকে চেনে না বলে দাবি করেছে, আজও ফেরেননি। প্রস্তাবিত নতুন আইন পাস হওয়ার আগেই মিরাজের নিখোঁজ হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব এখনো অনেক।