১৯এ অগাস্ট। ঘড়ির কাঁটায় মধ্যরাত। তখনো পর্যন্ত তিনি কাগজে কলমের পরিচয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। তবে চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়ে সেই পরিচয় বদলে যাওয়ার পথে।
সোশাল মিডিয়ায় নিজের ফেইসবুক প্রোফাইলে এক আবেগঘন পোস্টে তিনি বিদায় জানালেন রাজনীতিকে…
প্রিয় নেতৃবৃন্দ,
আজ আপনাদের থেকে সর্বশেষ বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে। আজকে শেষবারের মতো 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ' বলে বিদায় নিচ্ছি।
আপনাদের বিশ্বস্ত
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ এক বদলের ঘটনা তিনি জানিয়েছেন রাত পেরিয়ে, আর তার জন্য মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—ফেইসবুক। এই পোস্টের পর বাংলাদেশের এমন কোনো মূলধারার গণমাধ্যমে নেই যারা এই পোস্টকে নিউজের মাধ্যমে ‘রি-পোস্ট’ করেনি। গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার জন্য প্রেস রিলিজ বা সংবাদ সম্মেলনের মতো প্রচলিত সংবাদ বিপণনের মাধ্যমের বদলে ফেইসবুককেই বেছে নিয়েছেন তিনি। তার ফেইসবুক পেইজে ফলোয়ারের সংখ্যাও নেহাত কম নয়, ১৭ লাখ। তার রাজনীতি থেকে বিদায়-সংক্রান্ত পোস্টটিতে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রিয়্যাকশন, প্রায় ১৮ হাজার কমেন্ট এবং ১২ হাজার শেয়ার হয়েছে।
পরদিন, ২০এ অগাস্ট বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখেই তিনি বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
সদ্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম ফেইসবুকে বেশ আগে থেকেই সরব। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময়ে তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ্য করে তৈরি তার একটি প্রচারণামূলক ভিডিও বেশ আলোচিত হয়, যেখানে তিনি ভোট দেওয়ার জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। বহুল বিতর্কিত সেই নির্বাচনের সময় তার সেই ভিডিওর বক্তব্য অনেক প্রশংসাও পায়।
এর আগে বাংলাদেশের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন একবার বেশ আলোচিত হয়েছিলেন একটি ফেইসবুক পোস্টে কমেন্ট করে। সাংবাদিক নবনীতা চৌধুরীর একটি ছবিতে তার ভেরিফায়েড প্রোফাইল থেকে করা একটি মন্তব্য নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় বেশ আলোচনা, ট্রল, হাসিঠাট্টা চলে। পরবর্তীতে তিনি মন্তব্যটি মুছে ফেলেন। বর্তমানে তার প্রোফাইলটি ‘লকড’। তার ফলোয়ারের সংখ্যা ৬৮ হাজার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামাজিক মাধ্যমে বেশ সক্রিয়। বিভিন্ন সময়ে তার পোস্ট, শেয়ার করা কনটেন্টে রাজনীতির বিষয়বস্তু ছাড়াও পরিবার, সচেতনতা, ব্যক্তিগত জীবনযাপন, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ই অগাস্ট তাকে নিয়ে কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের আঁকা একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন নিজের ভেরিফায়েড পেইজ থেকে শেয়ার করেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি কার্টুনিস্ট মেহেদীর ভক্ত, শিশির ভট্টাচার্যের কাজও উপভোগ করতাম। আন্তরিকভাবে আশা করি, তিনি দ্রুত ও নিয়মিত রাজনৈতিক কার্টুন আঁকবেন।’ তার এই পোস্ট শেয়ার করার বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। পরবর্তীতে আবারও তিনি ফেইসবুকে তাকে নিয়ে করা একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করেন। প্রায় ৮০ লাখ ব্যবহারকারী তার পেইজটি ফলো করেন।
ফেইসবুক যেভাবে রাজনীতির ময়দানে এলো
এক সময় রাজনৈতিক প্রচারণা মানেই ছিলো- সভা-সমাবেশ, মিছিল, পোস্টার, দেয়াল লিখন আর ব্যানারের লড়াই; কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ধাক্কায় এক যুগ আগের সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। রাজনীতির বড় ক্ষেত্র দখল করেছে সোশাল মিডিয়া প্লাটফর্ম। ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্স (টুইটার) কিংবা অন্যান্য জায়গাতেই তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক বয়ান, গড়ে উঠছে জনমত। এমনকি আন্দোলনের ডাক, জরুরি কর্মসূচির ঘোষণাও আসছে সেখান থেকেই। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন- সোশাল মিডিয়ার শক্তিশালী ও অপরিহার্য ভূমিকার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটির মতো। সুতরাং প্রচারণার ক্ষেত্রেই বলুন আর মতামত প্রকাশের পরিসর হিসেবেই হোক, ফেইসবুক এদেশের রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির রেটোরিক বিভিন্ন, আর তাতে কখনোই শেষ কথা বলে কিছু থাকে না, নতুন কিছুও কাটতি পেতে সময় নেয় না। যে মাধ্যম মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য বেশ কার্যকর, তাতে রাজনীতিবদরা বেশ ঝুঁকবেন, সেটিই স্বাভাবিক। তবে অফলাইন জনপরিসরে এই রেটোরিকের প্রয়োগ আর সোশাল মিডিয়ায় এই রেটোরিকের ফুটপ্রিন্ট রেখে যাওয়ার প্রভাব নিশ্চয়ই এক নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা সোশাল মিডিয়ায় যে শুধু দলের বা নিজের প্রচারণা করেন, ব্যাপারটি এমন নয়। অনেকে নিজের মতো ফেইসবুকিংও করেন বটে! এখানে ‘ওল্ড স্কুল’ বনাম ‘নিউ স্কুলের’ ব্যবধান তো রয়েছেই, আর মাঝে একটি জেনারেশনও রয়েছে যারা এখনকার সময়ের পাশাপাশি আগেকার নন-ফেইসবুক সময়সীমার রাজনীতিটাও কিছুটা পেয়েছেন। ফেইসবুকে এই বিভিন্ন বয়সসীমার রাজনীতিবিদদের কার কেমন অ্যাকটিভিটি, ফলোয়ারের সংখ্যা, পোস্ট ইত্যাদি—সেগুলোও প্রায়ই সংবাদ তৈরি করে বা আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদেরা নিজ আগ্রহে হোক বা সময়ের প্রয়োজনে, ফেইসবুকে উপস্থিত হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আনুষ্ঠানিক বিষয়াষয়ের পোস্ট তাদের প্রোফাইল থেকে প্রচারিত হয়। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত তরুণ রাজনীতিবিদরা ফেইসবুকের ‘অ্যাক্টিভিটি’র কারণে প্রায়ই সংবাদ হয়ে ওঠেন। তারা বিভিন্ন সময়ে কেবল পোস্ট শেয়ার না—বরং নানাজনের মতামত শেয়ার, অন্যদের মতামতে প্রতিক্রিয়া, বিশ্লেষণ, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটি করেন। আবার বিভিন্ন পোস্ট প্রকাশের পর সেগুলো মুছে ফেলা বা ঢেকে ফেলার ঘটনাও ঘটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়মিতই তাদের ফেইসবুক পোস্ট বা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ’সংবাদ’ এবং বিতর্কের খোরাক হয়েছে। এর মধ্যে যে বিতর্কিত শব্দ-বাক্য-প্রেক্ষিতের উল্লেখও প্রায়শই থাকে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ৫ই অগাস্টের পর দেশের মূলধারার রাজনীতির ময়দানে যে তরুণরা এসেছেন, তাদের প্রায় সবাই ফেইসবুকে এখনো খুবই সক্রিয়। এখানে তুলনামূলকভাবে ‘আগেকার’ সময়ের রাজনীতিবিদরা ফেইসবুক ‘অ্যাক্টিভিজমে’ সেভাবে সরব নন।
ভোটের মাঠের খেলাটা এখনো আলাদা
তবে ফেইসবুকে প্রচারণা আর বিশাল সংখ্যক ফ্যান ফলোয়ার হয়তো রাজনীতির ক্ষেত্রে এখনো সবকিছু হয়ে উঠতে পারেনি। অন্তত, নির্বাচনের কাগজ-কলমের হিসেবের ক্ষেত্রে এটি এখনো চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করে দেওয়ার মতো প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। ঢাকার দুইটি আসনের কথা এখানে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। এ বছর জাতীয় নির্বাচনের সময় বিপুল আলোচনার খোরাক হয়ে উঠেছিল ঢাকা- ৮ আসন। প্রতিপক্ষের প্রতি বিভিন্ন মন্তব্য আর কর্মকাণ্ডের সচিত্র প্রচারণা দিয়ে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দিন পাটোয়ারী তুমুল আলোচনায় থেকেছেন সব সময়। এ সময় তার বিভিন্ন বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমের তো বটেই, ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের কাছেও ‘কনটেন্ট’ হয়ে ওঠে। এক অর্থে বলা যায়, এই আসনের নির্বাচনি লড়াইয়ের ‘ভিজিবিলিটি’র প্রায় পুরোটাই ছিলো ফেইসবুক-কেন্দ্রিক। অন্যদিকে, তার প্রতিপক্ষ, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেভাবে সরব কোনো ব্যক্তি নন। সুতরাং, প্রতিপক্ষের বিভিন্ন বক্তব্যের সেভাবে উত্তর দেওয়ার পরিসরই তার ছিলো না। তিনি কয়েকবার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমের কাছে। এই লড়াইয়ের ফলাফল যেমনই হোক, চূড়ান্ত নির্বাচনে ভোট গণনার ফলাফলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখালেও জিততে পারেননি। বর্তমানে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ফেইসবুক প্রোফাইলের ফলোয়ার ২৬ লাখ। মির্জা আব্বাসের নামে একটি ফেইসবুক পেইজ রয়েছে, যেটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ফলোয়ার রয়েছেন।
আবার, ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. তাসনিম জারা রাজনীতির পরিচয় সাইডে রেখেই ফেইসবুকে বিশাল ফ্যান-ফলোয়ারওয়ালা ব্যক্তি। ফেইসবুকে তার পরিচয় লেখা রয়েছে— স্বতন্ত্র রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, ও স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোক্তা। প্রায় সাড়ে ৭ লাখ ফলোয়ার। চিকিৎসা পেশা এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সমাধান, সচেতনতা বিষয়ক কনটেন্টের সুবাদ জনপ্রিয়তা তার অনেক আগে থেকেই। নির্বাচনের সময় প্রচারণায় তিনি ধারাবাহিকভাবে তার সংসদীয় আসনের বিভিন্ন এলাকায় কোন কোন ধরনের সমস্যা আছে এবং সেগুলোর সমাধানে তিনি কেমন পদক্ষেপ নিতে চান, সে বিষয়গুলো ফেইসবুকে তুলে ধরেছেন। শুধু সেটিই নয়, নামডাকওয়ালা বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও সে সময়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং নির্বাচনি এলাকাগুলোয় তার প্রচারণাকে প্রতিবেদনের মাধ্যমে তুলে ধরেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন হাবিবুর রশিদ হাবিব (বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী)। ঢাকা-৮ আসনের মতো এখানে সেভাবে কোনো প্রার্থীরই কারো প্রতি বিষোদগারের ঘটনা দেখা যায়নি। নির্বাচনি প্রচারণায় ওই আসনে মনোযোগ ও আলোচনার লাইমলাইট বলতে গেলে পুরোটাই ছিলো ড. তাসনিম জারার দিকে। চূড়ান্ত ফলাফলে ড. তাসনিম জারা তৃতীয় হন।
এ প্রেক্ষিতে আরেকটি উদাহরণ টানা যায়, যদিও সেটি বছর দশেক আগের ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্রিটেনের লেবার পার্টির তৎকালীন নেতা, রাজনীতিবিদ এড মিলিব্যান্ডের মাথায় ফুলের মুকুট দিয়ে ফটোশপ করা ছবি বেশ ‘ভাইরাল’ হয়ে ওঠে। সে সময়ে মিলিব্যান্ডকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রতিবাদে ‘মিলিফ্যানডম’ নামের এই মুভমেন্ট তখন বেশ সাড়া ফেলে দেয়। এই মুভমেন্টে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশই ছিলেন তরুণ, নারী। এই আইডিয়ার শুরুটা করেছিলেন অ্যাবি টমলিনসন নামের এক টিনেজার, যিনি মিলিব্যান্ডকে ‘মিলিবে’ নাম দিয়ে সম্বোধন করেছিলেন। সে সময়ে ‘হ্যাশট্যাগ মিলিফ্যানডম’ প্রচারণাটি তুমুল সাড়া ফেলে দেয়। তবে ২০১৫ সালের সেই নির্বাচনে কিন্তু লেবার পার্টি হেরে যায়। পরবর্তীতে বিজয়ী কনজারভেটিভ পার্টির প্রতিনিধি ডেভিড ক্যামেরন মন্তব্য করেন, ব্রিটেন আর টুইটার এক জিনিস নয়।’
অর্থাৎ একটি বিষয় স্পষ্ট। অনলাইনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা আর ভোটের মাঠে জয় নিয়ে আসা এক জিনিস নয়। অন্তত, এখনো না। তবে ভবিষ্যতে অনলাইন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। আর তখন তরুণ অপেক্ষাকৃত রাজনীতিবিদরা যে কৌশলগত দিক থেকে এগিয়ে থাকবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে রাজনীতিবিদদের অনলাইন উপস্থিতি এবং কার্যক্রম যখন প্রচারণা ছাপিয়ে আরও অনেক বিষয় নিয়ে ‘সরব’ হয়ে ওঠে, তখন কিছু বিষয় চিন্তা উদ্রেককারী। কারণটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে পক্ষ-বিপক্ষকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দেওয়া বক্তব্য আর সোশাল মিডিয়ায় বক্তব্য বা অ্যাক্টিভিটির ফুটপ্রিন্ট রেখে দেওয়া এক জিনিস নয়। বাংলাদেশে ডিজিটাল লিটারেসি এখনো যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে করে অনেক সময়ই দেখা যায় যে ফেইসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে বা অনুমান করে অনেক ধরনের সহিংস, অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে। সুতরাং, শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদরা ফেইসবুকে কী লিখছেন, বলছেন, করছেন—সেটি তাদের দলীয় প্রচারণা ছাপিয়েও অনেক কারণেই ভাবনার বিষয়।
সময়ের চাহিদায় তাল মেলাচ্ছেন রাজনীতিবিদরা
ইনস্টাগ্রাম, টিকটকের মতো কিছু প্ল্যাটফর্ম জেন-জি বা জেন-আলফা বয়সসীমার প্রজন্মের ক্ষেত্রে একমাত্র পছন্দনীয় না হলেও বাংলাদেশে ফেইসবুককে এখনো মোটাদাগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিশব্দ বলা যায়। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদদের অনেকেই হয়তো সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকার ফুরসত করতে না পারলেও বা অভ্যস্ত না হয়ে উঠলেও, সময়ের প্রয়োজনেই ফেইসবুক প্রোফাইলে সরব হয়েছেন। এ জন্য অনেকেরই নিজস্ব অ্যাডমিন বা অ্যাডমিন টিম রয়েছে। অনেক সময়ই এই পেইজ বা প্রোফাইলগুলো পোস্ট করা কনটেন্টের ক্ষেত্রে তাদের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ করা থাকে। আবার সেগুলোর বাইরেও কিছু কিছু পোস্ট করা হয়।
পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমিরের প্রোফাইলে ফলোয়ার ২ লক্ষ ১১ হাজার। ২০১৭ সালের ৮ই জুলাই এই প্রোফাইলটি খোলা হয়েছে। অ্যাডমিন-ভিত্তিক পোস্টের পাশাপাশি কিছু কিছু আলাদা পোস্টও এই প্রোফাইল থেকে হয়, অ্যাডমিন পোস্টগুলো আলাদা করে উল্লেখ করা হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখা পোস্টটিতে অ্যাডমিন পোস্টের উল্লেখ নেই। আবার রাষ্ট্রপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাত-বিষয়ক পোস্টটিতে ‘অ্যাডমিন পোস্ট’ উল্লেখ করা রয়েছে। সংরক্ষিত আসনের সাংসদ মানসুরা আলমের একটি ফেইসবুক পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে। আবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্তিতে অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভীকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে সরাসরি পোস্টে। মহিলা বাস সার্ভিসের উদ্বোধন, নিজ অঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ, অসুস্থ নেতার শারীরিক খোঁজখবর নেওয়া, দোয়া মাহফিল- এই বিষয়ক পোস্টগুলো অ্যাডমিন পোস্ট।
২০১৮ সালের পর আরও দুইটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে সাম্প্রতিক নির্বাচনটি সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণার প্রেক্ষিতে উদাহরণ হিসেবে সবচেয়ে টাটকা। প্রচারণার ক্ষেত্রে এই নির্বাচনে প্রায় সব প্রার্থীই সামাজিক মাধ্যমকে রাজপথের জনসংযোগের চেয়ে কম গুরুত্ব দেননি। অন্যভাবে বলা যায়, প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ থেকে শুরু করে যাবতীয় সব ধরনের কার্যক্রমই তারা সামাজিক মাধ্যমে উপস্থাপন করে তুলেছেন।
ফেইসবুকে কার কতো ফলোয়ার
বিরোধী দলীয় প্রধান ও জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমানের ফেইসবুক পেইজের অনুসারী ৪০ লাখ।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের প্রোফাইলের ফলোয়ার ১৬ লাখ। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের প্রোফাইল ফলো করে ৩৪ লাখ ব্যবহারকারী।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর ফলোয়ার ৬০ লাখ। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থর অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজ ফলোয়ারের সংখ্যা ৩৫ লাখ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা আক্তার মিতুর ফেইসবুকে ফলোয়ার ৯ লাখ।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির ফেসবুকে ফলোয়ার রয়েছেন সাড়ে চার লাখ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার ফেইসবুক প্রোফাইলের ফলোয়ার ১০ লাখ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের ফেইসবুক পেইজের ফলোয়ার ১ লাখ। সংরক্ষিত আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ ফেইসবুক পেইজের ফলোয়ার ২ লাখ ১৮ হাজার।
অ্যাক্টিভিজম–প্রচারণা ছাপিয়ে যখন বেশি প্রাসঙ্গিক
সংসদ সদস্যদের মধ্যে অনেকে ফেইসবুকে বেশ ‘সক্রিয়’, আবার অনেকেই আনুষ্ঠানিকতার জন্য প্রোফাইল বা পেইজ রেখেছেন। ফেইসবুকের পরিসরে সবাই সমানভাবে আলোচ্য নন, ফ্যান-ফলোয়ারের সংখ্যায় হোক বা অ্যাক্টিভিটিতে, সেখানে অপেক্ষাকৃত তরুণরাই মনোযোগ নিজেদের দিকে টানতে পেরেছেন বেশি। সচরাচর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, শুভেচ্ছা জ্ঞাপন, প্রচারণার বাইরে অনেক সময় তাদের ‘অ্যাক্টিভিজম’ বিতর্কের জন্ম দেয়। এর মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে কটাক্ষ, কোনো ঘটনাকে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা, প্রতিপক্ষ বা কোনো কোনো ব্যক্তিকে ট্যাগিং-এর মতো ঘটনাও ঘটেছে, ঘটছে। অনেক সময় পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে উঠলে তখন পোস্ট ডিলিট বা হাইড করার ঘটনাও বেশ ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদদের চেয়ে তরুণদের ক্ষেত্রেই বেশি দৃশ্যমান। এ রকম প্রেক্ষিতে সোশাল মিডিয়াতেই আবার দুঃখপ্রকাশও করা হয়েছে।
নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মূল দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াত জোরদারভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। এনসিপির শীর্ষস্থানীয় তরুণ নেতৃবৃন্দ আগে থেকেই সেখানে সরব ছিলেন। নির্বাচনের সময় নিজেদের লক্ষ্য, প্রস্তাবনা, প্রতিশ্রুতি ছাপিয়েও প্রতিপক্ষের ভুলভ্রান্তি, বিষোদগার, পূর্বতন কোনো কাজের প্রসঙ্গ টানার মতো কাজ বেশ আলোচনার খোরাক জাগায় সাধারণ মানুষের কাছে। পোস্টার-ব্যানার-মিছিল-লিফলেটের চেয়ে ফেইসবুকে কে কোন পোস্ট দিয়েছেন, কী বলছেন, কী করতে চাচ্ছেন—সেগুলোই সংবাদ মাধ্যম থেকে সাধারণ মানুষের নির্বাচনি খোরাক হয়ে ওঠে। আবার নির্বাচনের পরেও দেখা যায়, বিভিন্ন ঘটনা বা রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে সরাসরি ফেইসবুকেই কেউ মতামত দিয়ে ফেলছেন, সেখানে আবার কেউ এসে মন্তব্য করছেন। তাতে সাড়াশব্দ বা প্রতিক্রিয়াও হচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই। আবার অনেক সময় সেই পোস্ট ডিলিটও করে দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ‘জাতীয় জাদুঘরে শাপলার শহীদচিত্র’ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা এবং আল্লাম আহমদ শফীর খোলা চিঠি প্রদর্শন বিষয়ক কর্তৃপক্ষের একটি ‘সিদ্ধান্ত’কে উল্লেখ করে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেই স্ট্যাটাসে এসে মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। পরে স্ট্যাটাসটি ডিলিট করে দেওয়া হয়। কোনো স্ট্যাটাসে এক বা একাধিক রাজনীতিবিদের অংশ নেওয়া, ডিলিট করে দেওয়ার ঘটনার আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।
ফেইসবুকে রাজনীতিবিদদের পদচারণা, চলে আসছে প্রশ্ন
ফেইসবুক যখন রাজনৈতিক প্রচারণা, নিজেদের সচরাচর কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে থাকছে—ততক্ষণ আসলে এ নিয়ে বাড়তি কোনো প্রশ্নও থাকার নেই। বাস্তবিক জীবনের যে সমাজ পরিসর, সোশাল মিডিয়াও আরেকটি সামাজিক পরিসর। রাজনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের কাছে বেশি বেশি পৌঁছোতে যাবেন, সেটিই স্বাভাবিক।
সাংবাদিক, গবেষক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ মিরাজ আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, পুরো পৃথিবীতেই রাজনীতিবিদরা সোশাল মিডিয়াকে এখন অনেক গুরুত্ব দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে আরও দেবেন। আমাদের দৈনন্দিন জনপরিসরের মতো সোশাল মিডিয়াও আরেকটি পরিসর। এটাও সমাজেরই একটা অংশ। কাজেই রাজনীতিবিদদের সোশাল মিডিয়াকে প্রচারণার মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহার করাকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন তিনি। তবে এর বাইরে তিনি কিছু প্রশ্ন রেখেছেন।
ফেইসবুকে রাজনীতিবিদদের অ্যাক্টিভিজমে বক্তব্যে কি কোনো ব্যক্তি, বা গোষ্ঠীর বিপদের মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে? তাদের ‘অ্যাক্টিভিজম’ কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়টিকে ছাপিয়ে ঘৃণা, উগ্রতা, বা সহিংসতার উসকানি দিতে পারে? তাদের কোনো ধরনের বক্তব্যে কি মার্জিনালাইজড কোনো কমিউনিটি আরও মার্জিনালাইজড হওয়ার আশংকায় পড়ছে?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ”মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাস করি। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে, তার মতামত প্রকাশ করার। তবে আমরা যদি সকলে এতটুকু সচেতন হই যে, আমি আমার মত প্রকাশ করলাম, কিন্তু এই মত প্রকাশের ফলে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলো কি-না? এই বিষয়টিকে যদি আমরা বিবেচনায় রাখি, একটি মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হলো কি-না, ক্ষতিগ্রস্ত হলো কি-না? এই বিষয়টিকে বোধহয় আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত।”
ডিজিটাল বিপ্লবের হাত ধরে বাংলাদেশে ফেইসবুক দিন দিন রাজনীতির ময়দানে বড় নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। এক হিসেবে একে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরেরও প্রতিচ্ছবি বলা যায়। আগামী দিনগুলোয় সোশাল মিডিয়া কি গণতন্ত্রের বা মত প্রকাশের আরও শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে, নাকি হয়ে উঠবে বিভাজনের নতুন দেয়াল; আর সেখানে রাজনীতিবিদদের ‘ফেইসবুকিং’ কোথায় গিয়ে ঠেকবে–তা দেখার রয়েছে।