উক্রেইন যুদ্ধ, বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তর এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্যতম বড় ও প্রাণঘাতী সামরিক সংঘাতের মুখে বিশ্ব। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২২ সালের ২৪এ ফেব্রুয়ারি যখন উক্রেইনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ ঘোষণা করলেন, তখনই বিশ্ব রাজনীতিতে সূচনা হলো এক নতুন, বিপজ্জনক অধ্যায়ের। পুতিনের শুরু করা সেই অভিযান চার বছর পেরিয়ে এখন এক দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত।

আপাতদৃষ্টিতে দেখলে রুশ-উক্রেইন সংঘাতকে ২০২২ সালে শুরু হওয়া কোনো যুদ্ধ মনে হলেও এর শেকড় প্রোথিত আরও গভীরে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ঐতিহাসিক টানাপোড়েনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত এ সংঘাত।

স্রেফ দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক লড়াইয়ে আবদ্ধ থাকেনি এ যুদ্ধ, বরং আমূল বদলে দিয়েছে সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা, নেটোর কৌশল, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং পরাশক্তিগুলোর সম্পর্কের সমীকরণ।

সংকটের শেকড় ও যুদ্ধের সূত্রপাত

উক্রেইন ও রাশিয়ার মধ্যকার টানাপোড়েন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার এক চরম পরিণতি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস' (সিএফআর) এর প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উক্রেইনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মস্কো ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলছিলো এক সূক্ষ্ম ও নিরন্তর প্রতিযোগিতা। 

উক্রেইন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই দেশটিকে নিজস্ব প্রভাব বলয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে রাশিয়া। তবে এই প্রভাব ঝুঁকিতে পড়ে ২০০৪ সালে। সেবার 'অরেঞ্জ রেভেল্যুশন’-এর পর উক্রেইনের ক্ষমতায় আসে পশ্চিমাপন্থী সরকার। পরবর্তীতে মস্কোপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতায় এলেও ২০১৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তিনি।

ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই উক্রেইনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে রাশিয়া। দখলে নেয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উক্রেইনের ক্রাইমিয়া উপদ্বীপ। একই সময়ে ডনবাস অঞ্চলে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন বাড়িয়ে দেয় মস্কো।

ঐতিহাসিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ব ইউরোপে নেটোর ধারাবাহিক সম্প্রসারণ ছিলো মস্কোর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তবে রাশিয়ার উদ্বেগকে উপেক্ষা করে সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে এ পরিধি ক্রমাগত বাড়াতে থাকে নেটো। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র এবং পরবর্তীকালে বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোকে সদস্যপদ দেয় নেটো।

বুখারেস্টে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে উক্রেইন এবং জর্জিয়াকেও ভবিষ্যতে নিজেদের সদস্য করার ঘোষণা দেয় নেটো। উক্রেইনও ক্রাইমিয়ার দখল হারানোর পর আরও স্পষ্টভাবে ঝুঁকে পড়ে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে। নেটোর সদস্য হওয়ার লক্ষ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের সংবিধানে। 

চলমান যুদ্ধ শুরুর আগে নেটোকে ১৯৯৭ সালের আগের অবস্থানে ফিরে নিতে আনুষ্ঠানিক দাবি জানায় রাশিয়া। একইসাথে উক্রেইনকে কখনোই নেটোর সদস্য করা যাবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেয় মস্কো। রাশিয়ার এহেন দাবি প্রত্যাখ্যান করে নেটো ও যুক্তরাষ্ট্র জানায়, নেটোর দরজা সব দেশের জন্য খোলা। 

নেটোর সম্প্রসারণকে একটি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ২০২২ সালের ২৪এ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করে রাশিয়া। এদিন উক্রেইনের উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ দিক থেকে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালায় রুশ বাহিনী। প্রেসিডেন্ট পুতিনের মূল লক্ষ্য ছিলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে কিয়িভের ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো। দেশটিকে নিরস্ত্রীকৃত করা এবং উক্রেইনকে একটি ‘বাফার জোনে’ পরিণত করে নেটোর সম্প্রসারণ ঠেকানো। কিন্তু উক্রেইনীয়দের প্রবল প্রতিরোধ ভুল প্রমাণিত হয় পুতিনের সেই সমীকরণ।

২০২২ সালের ২৪এ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করে রাশিয়া।

যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও সামরিক সমীকরণ

যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে কিয়িভ দখলে ব্যর্থ হয় রুশ বাহিনী। পরবর্তীতে উক্রেইন শুরু করে পাল্টা আক্রমণ। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণকে নিজেদের এক বিশ্লেষণে 'ওয়ার অব অ্যাট্রিশন' বলে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (সিএসআইএস)। 

বিশ্লেষণ বলছে, এই যুদ্ধ এখন আর ভূখণ্ড দখলের লড়াই নেই, এটি পরিণত হয়েছে অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রতিরক্ষামূলক সীমানা প্রাচীরের যুদ্ধে।

উক্রেইনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে শত শত কিলোমিটারজুড়ে দুর্ভেদ্য মাইনফিল্ড এবং ট্রেঞ্চ বানিয়েছে উভয় পক্ষই। রাশিয়া বানিয়েছে 'সুরোভিকিন লাইন' নামের ট্যাংক বিধ্বংসী পরিখা, ড্রাগনস টিথ এবং মাইনের এক বিশাল জাল।

এই ধরনের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে আগোনো যেকোনো সেনাবাহিনীর জন্যই প্রায় অসম্ভব। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে সামান্য ভূখণ্ড দখলেও উভয় পক্ষকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিপুল প্রাণহানি ও সামরিক ক্ষতির।

সিএসআইএস-এর তথ্য বলছে, রাশিয়া তাদের সামগ্রিক শিল্পখাতকে রূপান্তরিত করেছে একটি পূর্ণাঙ্গ 'যুদ্ধকালীন অর্থনীতিতে'। নিজেদের কারখানায় তিন শিফটে অস্ত্র ও গোলা উৎপাদনের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া ও ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ আর্টিলারি শেল, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন আমদানি করছে তারা।

অন্যদিকে, নিজেদের সামরিক শিল্প কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উক্রেইন মার্কিন ও ইউরোপীয় অস্ত্র সরবরাহের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, যা তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি। পশ্চিমা মিত্রদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অস্ত্র সরবরাহ প্রায়শই দেরি হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে উক্রেইনীয় সেনারাও এতে চরম বিপাকে পড়ে।

পশ্চিমা মিত্রদের ভূমিকা, নীতি ও কৌশল

যুদ্ধে উক্রেইনের টিকে থাকা এবং রাশিয়াকে মোকাবিলায় গোড়া থেকেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব।

যুদ্ধের শুরুতে উক্রেইনকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। তবে শুরুতে মার্কিন নীতিতে ছিলো একটি স্পষ্ট ও সতর্ক সীমারেখা। সংঘাত যেন কোনোভাবেই নেটোর সাথে রাশিয়ার সরাসরি এবং পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ না নেয়, এই বিষয়ে কৌশলী ছিলো ওয়াশিংটন।

সতর্কতার অংশ হিসেবে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এগোনোর নীতি গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে উক্রেইনকে কেবল প্রতিরোধমূলক অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে উক্রেইন নিজের প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রমাণ করার পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে হাইমার্স রকেট সিস্টেম,আব্রামস ট্যাংক, অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সর্বশেষে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহে রাজি হয়। 

তবে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মেরুকরণ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক টানাপোড়েনের কারণে সামরিক সহায়তার ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে বারবার।

ডনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মৌলিক পরিবর্তন আনেন উক্রেইন যুদ্ধ এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তার বিষয়ে। বাইডেন প্রশাসনের ‘অ্যাজ লং অ্যাজ ইট টেক’ নীতি থেকে সরে ট্রাম্প হাতে নেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। 

উক্রেইনকে বিনামূল্যে সামরিক সহায়তা দেওয়া ব্যাপকভাবে কমায় নতুন মার্কিন প্রশাসন। ইউরোপীয় দেশগুলোর যৌথ অর্থায়নে তৈরি তহবিল ব্যবহার করে মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো থেকে অস্ত্র কেনার ব্যবস্থা করেন ট্রাম্প। উক্রেইনে পাঠানো হয় ইউরোপের টাকায় কেনা মার্কিন কোম্পানির অস্ত্র। 

নতুন মার্কিন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল অনুযায়ী ইউরোপের নিরাপত্তার মূল দায়ভার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর। আমেরিকা এখন আর ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি না হয়ে কেবল পরোক্ষ সহযোগীর ভূমিকা পালন করবে বলে মত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার চেয়ে দ্রুত সংঘাত থামানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ওয়াশিংটন। একইসাথে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপকে বাধ্য করছে নিজেদের নিরাপত্তা এবং উক্রেইনের অর্থনৈতিক ও সামরিক পুনর্বাসনের বেশিরভাগ খরচ বহন করতে।  

অন্যদিকে, উক্রেইন যুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অবস্থান ছিলো ঐতিহাসিক। 'ইউরোপীয় কাউন্সিল’-এর নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইউরোপীয় দেশগুলো এ যুদ্ধে যে মাত্রায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংহতি দেখিয়েছে, তা বিগত কয়েক দশকে আর দেখা যায়নি।

রাশিয়ার ওপরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে জ্বালানি খাতে। গত কয়েক দশক ধরে ইউরোপ নির্ভরশীল ছিলো রুশ তেল ও গ্যাসের ওপর। যুদ্ধের পর রাশিয়াকেন্দ্রিক এই জ্বালানী নির্ভরতা নামিয়ে আনে প্রায় শূন্যের কোঠায়। 

একইসাথে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। জার্মানির মতো সামরিক বাজেট বৃদ্ধিতে চরমভাবে অনিচ্ছুক দেশও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সামরিক ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার। জার্মানিতে এ সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে 'জাইটেনভেন্ডে' বা যুগের পরিবর্তন হিসেবে।

রাশিয়ার ওপরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

নেটোর অবস্থান এবং কৌশলগত রূপান্তর

উক্রেইন যুদ্ধের আগে নেটোর ভবিষ্যৎ এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন ও সংশয় ছিল খোদ পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেই। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্র‍ঁ নেটোকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘ব্রেইন ডেড’ জোট হিসেবে। তবে ভ্লাদিমির পুতিন উক্রেইন আক্রমণ করলে একটি নতুন লক্ষ্য পায় সামরিক জোটটি।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'বেলফার সেন্টার'-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উক্রেইন যুদ্ধ নেটোর স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী মানসিকতাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। গত কয়েক দশক জোটটি মনোযোগ দিচ্ছিলো ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমন’ বা আফগানিস্তানের মতো দেশের ‘স্থিতিশীলতা’র দিকে। উক্রেইন যুদ্ধের পর নেটো ফিরে গেছে তাদের মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ ইউরোপের মাটিতে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকানোর দিকে।

নিরপেক্ষতার নীতি ছেড়ে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনও যোগ দিয়েছে নেটোতে। ফলে রাশিয়ার সাথে নেটোর স্থলসীমানা দ্বিগুণ হয়েছে রাতারাতি। বাল্টিক সাগর পরিণত নেটোর ‘অভ্যন্তরীণ হ্রদে’। রাশিয়ার বাল্টিক নৌবহরের জন্য এটিকে ‘কৌশলগত বিপর্যয়’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বেলফার সেন্টারের বিশ্লেষণ বলছে, পোল্যান্ড, রোমানিয়া এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে নেটো তাদের 'ফরওয়ার্ড প্রেজেন্স' বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। 

স্পেনের মাদ্রিদে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নতুন 'স্ট্র্যাটেজিক কনসেপ্ট' হাতে নিয়েছে নেটো। নতুন এই 'স্ট্র্যাটেজিক কনসেপ্ট'-এ রাশিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে নেটোর শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ‘সবচেয়ে সরাসরি ও গুরুতর হুমকি’ হিসেবে। 

গ্লোবাল সাউথ, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ‘চীন ফ্যাক্টর’

উক্রেইন সংঘাত কেবল ইউরোপে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তিমূল। নতুন করে বিভক্ত করেছে ভূ-রাজনৈতিক অক্ষকে। যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কায় টালমাটাল হয়ে পড়ে বিশ্বের খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। 

বিশ্ব বাজারের গম, সূর্যমুখী তেল ও সার সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম যুদ্ধরত দেশদুটি। ফলে তীব্র খাদ্য সংকট ও চড়া মূল্যস্ফীতির মুখে পড়ে আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশ। 

এ যুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে বিভাজনটি স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো পশ্চিমা বিশ্ব এবং 'গ্লোবাল সাউথ' বা বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক দূরত্ব। ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো উক্রেইনে সামরিক আক্রমণের সমালোচনা করলেও অস্বীকৃতি জানায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় যোগ দিতে। গুরুত্ব দেয় নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে।

নিষেধাজ্ঞার সুযোগে রাশিয়া থেকে ব্যাপক ছাড়ে খনিজ তেল ও সার কেনে দেশগুলো। যা তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে মূল্যস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা করে। 

বিশ্ব ব্যবস্থার এই পালাবদলে রমরমা অবস্থা আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্য এবং সামরিক শিল্প খাতে। উক্রেইনকে অস্ত্র দিতে নিজেদের সামরিক গুদাম খালি করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। নিজেদের সামরিক মজুত পূর্ণ করতে তারা বিলিয়ন ডলারের ‘ডিল’ করছে লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান বা জেনারেল ডায়নামিক্স-এর মতো মার্কিন অস্ত্র বানানো প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ফলে যুদ্ধ থেকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মুনাফা নিশ্চিত করছে সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সগুলো।

রাশিয়া উক্রেইন সংঘাতে অন্যতম বড় খেলোয়াড় হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে চীন। যুদ্ধের শুরু থেকেই একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে বেইজিং। যুদ্ধের ঠিক কয়েকদিন আগে দুই দেশের মধ্যে 'সীমাহীন অংশীদারিত্বের' ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিন। চীন কার্যত তাতেই অটল রয়েছে। বেইজিং সরাসরি অস্ত্র না পাঠালেও ড্রোন পার্টস, মাইক্রোচিপস এবং নেভিগেশন সরঞ্জামের মতো ‘ডুয়েল ইউজ’ প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যা পরোক্ষভাবে সচল রেখেছে মস্কোর সামরিক যন্ত্রকে। 

রাশিয়ার অবরুদ্ধ অর্থনীতিকে সচল রাখতে লাইফলাইনের ভূমিকাও পালন করছে চীন। ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের তরফ থেকে বারবার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও, বেইজিং বুঝিয়ে দিয়েছে, রাশিয়াকে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে ভেঙে পড়তে দেবে না তারা। চীনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য মস্কো তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য মিত্র।

কূটনৈতিক সমাধান নাকি দীর্ঘমেয়াদী ‘স্থবির সংঘাত’?

উক্রেইন যুদ্ধের চার বছর পর এসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই, কীভাবে এবং কবে শেষ হবে এই যুদ্ধ? 

নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সিইএস ইন্টেলিজেন্স' এর ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সাল বা তার পরবর্তী সময়েও এই যুদ্ধ একটি দীর্ঘমেয়াদী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবেই বজায় থাকার সম্ভাবনা আছে।

বর্তমানের পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ সংঘাতের স্থায়ী কূটনৈতিক শান্তির সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিয়িভ এবং মস্কোর রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব এখনো বিস্তর। উক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রস্তাবিত ‘পিস ফর্মুলা’র অন্যতম শর্ত ছিলো, ক্রাইমিয়া ও ডনবাসসহ উক্রেইনের সমস্ত দখলকৃত ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিয়ে ১৯৯১ সালের মানচিত্রে ফিরে যাওয়া। 

অন্যদিকে, সাংবিধানিকভাবে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত ক্রাইমিয়াসহ চারটি উক্রেইনীয় অঞ্চল নিয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ক্রেমলিন। পাশাপাশি নেটোতে যোগ দেওয়ার আশা উক্রেইনকে চিরতরে ছাড়তে হবে বলেও জানিয়েছে তারা। এই দুই বিপরীতমুখী এবং অনড় অবস্থানের কারণে কার্যত বন্ধ কূটনৈতিক সমাধানের রাস্তা। 

আন্তর্জাতিক পরামর্শক ও গোয়েন্দা সংস্থা সিইএস ইন্টেলিজেন্স মনে করে, এ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রূপ নিতে পারে ১৯৫৩ সালের কোরিয়ান যুদ্ধের মতো একটি 'ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট' বা স্থবির সংঘাতে। যেখানে বর্তমান ফ্রন্টলাইন বরাবর তৈরি হতে পারে একটি 'যুদ্ধবিরতি রেখা'। যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ী শান্তি চুক্তি ছাড়াই বন্ধ থাকবে বড় আকারের সামরিক লড়াই। তবে সীমান্তজুড়ে বছরের পর বছর ধরে বজায় থাকবে বিক্ষিপ্ত গোলাবর্ষণ এবং তীব্র সামরিক উত্তেজনা।

ইউরোপীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ

স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউরোপে যে ‘পিস ডিভাইডেড’ যুগের শুরু হয়েছিল, উক্রেইন যুদ্ধ তা পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যেভাবেই শেষ হোক না কেন, রাশিয়ার সাথে ইউরোপের আগের সেই সহযোগিতামূলক এবং বাণিজ্য-নির্ভর সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

ইউরোপকে এখন বাধ্য হয়েই গড়ে তুলতে হচ্ছে একটি নতুন ‘সিকিউরিটি আর্কিটেকচার’। এই নতুন কাঠামো পরিচালিত হবে রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করা এবং মস্কোকে সামরিকভাবে প্রতিহত করার নীতিতে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রাশিয়া-উক্রেইন যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, এক চূড়ান্ত বিভাজক। যা ঠিক করে দেবে কেমন হবে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থা। আগামীর পৃথিবীতেও কী বজায় থাকবে পশ্চিমা জোটের একচ্ছত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব? নাকি একমেরু বিশ্ব ভেঙে সৃষ্টি হবে বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার? সবটাই চূড়ান্ত হবে এই রক্তক্ষয়ী ফয়সালার প্রাঙ্গণে। যার ফলাফল নির্ধারণ করে দেবে আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গতিপথ।