আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের চিরন্তন ফুটবল লড়াই থেকে শুরু করে বিরিয়ানিতে আলু, প্রতিটি বিষয়েই মানুষ ভাগ হয়ে যায় দুটি অনড়, আপসহীন দলে। রাজনীতির জটিল সমীকরণ, ভূরাজনৈতিক সংকট কিংবা ইন্টারনেটের তুচ্ছ কোনো বিতর্ক, সব বিষয়কেই ফেলে দেয় ‘বাইনারির’ সহজ অথচ সংকীর্ণ ছাঁচে। অবস্থান নেয় ‘সাদা’ অথবা ‘কালো’র দলে। কিন্তু কেন? কেন মানুষের চিন্তার জগৎ থেকে হারিয়ে যায় ‘গ্রে এরিয়া’? কেন বিজ্ঞান, যুক্তি বা তথ্যের চেয়ে মানুষের কাছে বড় হয়ে ওঠে নিজের দল?
সমাজবিজ্ঞান ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গবেষকরা মানুষের এই দলগত আচরণের উৎস খোঁজার চেষ্টা করছেন দীর্ঘকাল ধরে। তারা বলছেন, আজকের এই মেরুকরণ কোনো আধুনিক প্রবণতা নয়। এর বীজ রোপিত হয়েছিল আজ থেকে লক্ষ বছর আগে, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে।
তৃণভূমির সেই আদিম বন্য পরিবেশে মানুষের একা বেঁচে থাকা ছিল অসম্ভব। বন্য পশু ও বৈরী প্রকৃতির হাত থেকে বাঁচতে মানুষকে হতে হয়েছিল দলবদ্ধ। আর এই দলবদ্ধতার মূলমন্ত্রই ছিল ‘আমরা বনাম তারা’। যেখানে নিজের দলের মানুষ পরম নির্ভরযোগ্য বন্ধু, আর অন্য দলের ‘তারা’ ছিল শিকার ও সম্পদের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু।
আদিম এই প্রবৃত্তি সমানভাবে কাজ করছে আধুনিক সভ্য মানুষের ভেতরেও। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে এক যুগান্তকারী পরীক্ষা চালান ব্রিটিশ সমাজ-মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল। একদল কিশোরকে অত্যন্ত হাস্যকর ও অর্থহীন বিষয়ের ভিত্তিতে ভাগ করেন তাজফেল। দল গঠনের পর কিশোরদের কিছু অর্থ দেওয়া হয় নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে।
তাজফেল লক্ষ্য করেন, অত্যন্ত তুচ্ছ কারণে বিভক্ত হওয়া দলগুলোর মানুষদের মধ্যে আগে থেকে কোনো পরিচয়, যোগাযোগ বা স্বার্থের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেকেই নিজের দলের মানুষদের বেশি অর্থ দেয়। বঞ্চিত করে অন্য দলের মানুষদের।
তাজফেলের গবেষণায় দেখা যায়, স্রেফ একটি কয়েন টস করে দুটি দল বানিয়ে দিলেও মানুষ নিজ দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং অন্য দলের প্রতি বিদ্বেষ দেখাতে শুরু করে। এর জন্য কোনো ঐতিহাসিক শত্রুতা বা স্বার্থের সংঘাতের প্রয়োজন হয় না। তাজফেলের এই গবেষণা বিজ্ঞানজগতে পরিচিত ‘মিনিমাল গ্রুপ প্যারাডাইম’ নামে।
মানুষের দল তৈরি করার এই সহজাত প্রবণতা তার প্রজাতির টিকে থাকার এক শক্তিশালী ও প্রাচীন বিবর্তনীয় হাতিয়ার। বিজ্ঞানীরা একে ব্যাখ্যা করেন ‘ইভোল্যুশনারি সোশ্যাল সাইকোলজি’ দিয়ে।
আদিম যুগে বড় কোনো শিকার ধরা, হিংস্র পশুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে একজন মানুষের পক্ষে একা বেঁচে থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব। প্রয়োজন ছিলো দলগত শক্তির। মানুষের মস্তিষ্কের সেই আদিম অংশটি আজও বিশ্বাস করে, ‘একতায় নিরাপত্তা, একাকীত্বে মৃত্যু।’
মানুষের চেতনার একটি অংশ সবসময় তার অস্তিত্বের অর্থ খোঁজে। একা থাকলে মানুষের মধ্যে তৈরি হয় অস্তিত্বের সংকট। একটি দলের সদস্য হওয়া মানুষের মধ্যে তৈরি করে ‘কালেক্টিভ আইডেন্টিটি’ বা সমষ্টিগত পরিচয়। যা মানুষকে দেয় এক ধরনের মানসিক শান্তি ও আত্মবিশ্বাস।
মানুষের মস্তিষ্কে অ্যামিগডালা অংশটি নিয়ন্ত্রণ করে তার ভয় ও আবেগ। নতুন কাউকে দেখলেই মস্তিষ্ক যাচাই করে সে ‘ইন গ্রুপ’ নাকি ‘আউট গ্রুপ’। এটি একটি আদিম সতর্কতা ব্যবস্থা। নিজের দলের লোক দেখলে মস্তিষ্ক নিঃসরণ করে ‘অক্সিটোসিন’ নামক হরমোন। এই অক্সিটোসিন মানুষের মধ্যে তৈরি করে বিশ্বাস ও ভালোবাসা। আর বাইরের কাউকে দেখলে এটি মস্তিষ্কে সতর্কবার্তা পাঠায়। দল তৈরি মূলত এই নিরাপত্তা বলয় তৈরিরই আদিম প্রক্রিয়া।
বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তার ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইতে দেখিয়েছেন, মানুষের জিনের একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজেকে টিকিয়ে রাখা। একটি শক্তিশালী দলের সদস্য হলে ব্যক্তি তার নিজের জেনেটিক কোড বা আদর্শিক বংশধরদের রক্ষা করার সুযোগ বেশি পায়। জিনের এই আত্মরক্ষার তাগিদই মানুষের অবচেতন মনে তৈরি করে নিজের দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং অন্য দলের প্রতি চরম অবিশ্বাস। আদিম যুগে যা ছিল শিকারী-সংগ্রাহক মানুষের বেঁচে থাকার পরম হাতিয়ার।
অলস মস্তিষ্ক ও চিন্তার পক্ষপাত
মানুষ নিজেকে যুক্তিবাদী প্রাণী হিসেবে দাবি করলেও, তার মস্তিষ্ক আসলে অত্যন্ত অলস। এটি সবসময়ই সুযোগ খোঁজে জটিল ও পরিশ্রান্তিকর চিন্তা এড়িয়ে যাওয়ার। জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণার চেয়ে কোনও একটি পক্ষে আশ্রয় নেওয়া মস্তিষ্কের জন্য অনেক সহজ।
মনস্তাত্ত্বিক এই অলসতা এবং এর ফলে মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পান মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানম্যান। তার বই ‘থিংকিং ফাস্ট এন্ড স্লো’-তে মানুষের চিন্তার ধরনকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন কানম্যান। তিনি এর নাম দেন ‘সিস্টেম ওয়ান’ এবং ‘সিস্টেম টু’।
সিস্টেম ওয়ানে মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে, আবেগতাড়িত এবং অবচেতন সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের প্রতিদিনের নেওয়া সিদ্ধান্তের ৯৫ শতাংশ আসে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে। সিস্টেম টু হলো ধীরগতির, যৌক্তিক এবং কঠোর পরিশ্রমসাধ্য চিন্তন প্রক্রিয়া। কোনো গাণিতিক হিসাব বা জটিল সামাজিক সমস্যার গভীরে যেতে হলে এই সিস্টেমের প্রয়োজন হয়।
কানম্যান দেখিয়েছেন, যখন কোনো জটিল রাজনৈতিক বা সামাজিক বিতর্ক সামনে আসে, মস্তিষ্ক কষ্টকর সিস্টেম টু সক্রিয় না করে দ্রুত এবং আবেগতাড়িত সিস্টেম ওয়ান ব্যবহার করে একটি পক্ষ বেছে নেয়। এর ফলে মানুষের চিন্তায় জন্ম হয় ‘কগনেটিভ বায়াস’-এর।
মানুষ অবচেতনভাবে কেবলই সেই তথ্যগুলো পড়তে, শুনতে বা দেখতে পছন্দ করে যা তার আগের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। অন্যদিকে, নিজের বিশ্বাসের বিরোধী যেকোনো তথ্যকে সে শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করে। একে বলা হয় ‘কনফারমেশন বায়াস’।
এমনকি শিক্ষাও মানুষকে কনফারমেশন বায়াস থেকে বের করতে পারে না। সমাজবিজ্ঞানী ও ইয়েল ল স্কুলের অধ্যাপক ড্যান কাহান তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষ সত্য জানার চেয়ে নিজের সামাজিক পরিচয় ও দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে বেশি ভালোবাসে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক সত্যতা নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান ভোটারদের ওপর পরীক্ষা চালান অধ্যাপক কাহান। ফলাফলে দেখা যায়, বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত ভোটাররা নিজের রাজনৈতিক দলের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে বেশি পারদর্শী।
সিলিকন ভ্যালি: ‘ঘৃণা’যেখানে লাভজনক পণ্য
মানব প্রজাতির লক্ষ বছরের টিকে থাকার এই ‘ইন-গ্রুপ বনাম আউট-গ্রুপ' মনস্তত্ত্বকে পুঁজি করে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে টেক জায়ান্টরা।
ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’য়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড পলিটিক্স সেন্টারের গবেষক উইলিয়াম ব্রেডি এবং তার গবেষক দল। এতে গবেষকরা দেখতে চেয়েছিলেন মানুষের আবেগ কীভাবে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে তথ্যের প্রসারে কাজ করে।
গবেষকরা কয়েক লাখ টুইট বিশ্লেষণ করে দেখেন, কোনো পোস্টে যদি অপরাধী, পাপী, যুদ্ধ, ঘৃণা বা চরমপন্থার মত ‘নৈতিক ও আবেগীয়’ শব্দ ব্যবহার করা হয় তবে সেই পোস্টটি শেয়ার বা রিটুইট হওয়ার সম্ভাবনা গড়ে ২০ শতাংশ বেড়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে একজন ব্যবহারকারী স্ক্রিনের সামনে সর্বোচ্চ সময় ব্যয় করেন। অ্যালগরিদম দ্রুত শিখে যায় যে, মানুষ শান্তিময় বা বিশ্লেষণধর্মী কন্টেন্টের চেয়ে রাগ, ক্ষোভ ও ভীতি সৃষ্টিকারী কন্টেন্টে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে নিউজফিডে ক্রমাগত এমন কন্টেন্ট পুশ করা হয় যা ব্যবহারকারীকে উত্তেজিত করে এবং একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য করে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আইন অনুষদের অধ্যাপক এবং ওবামা প্রশাসনের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা কাস সানস্টেইন তার 'রিপাবলিক: ডিভাইডেড ডেমোক্রেসি ইন দ্য এজ অব সোস্যাল মিডিয়া’ বইয়ে এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছেন 'ইকো-চেম্বার'।
সানস্টেইন দেখিয়েছেন, অ্যালগরিদম একজন ব্যবহারকারীর চারপাশে একটি অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল তুলে দেয়। এই দেয়ালের ভেতরে সে কেবল তার নিজেদের মতাদর্শের কথা এবং তার জোরালো প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। ভিন্নমতের কোনো যুক্তি এই দেয়াল ভেদ করে তার কাছে পৌঁছাতে পারে না। ফলে সমাজে সুস্থ আলোচনা বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার শেষ সুযোগটুকুও হারিয়ে যায়।
মানুষের এই বিভাজনের প্রবণতা যখন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে তার উদাহরণ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা।
জাতিসংঘ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক প্রচারণার প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছিল ফেইসবুককে। ফেইসবুক জানতো যে এই কন্টেন্টগুলোতে দাঙ্গার জন্য ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। অথচ সেই পোস্টগুলোতে ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে সেগুলোর রিচ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় ফেইসবুক অ্যালগরিদম। পরিণতিতে প্রাণ হারায় হাজার হাজার মানুষ। উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় কয়েক লাখ।
যুগে যুগে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’
অন্যতম পুরনো রাজনৈতিক কৌশল হলো ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতি। ফরাসি দার্শনিক ও ‘পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট’ চিন্তক মিশেল ফুকো তার 'পাওয়ার/নলেজ' তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছিলেন কীভাবে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাতে প্রতিনিয়ত সমাজে শ্রেণীকরণ, বিভাজন এবং লেবেলিং তৈরি করে।
আধুনিক যুগে এই ক্ষমতার লড়াইয়ে মানুষের বিভাজন করতে কয়েকটি প্রধান কৌশল ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে প্রথমেই আছে ‘ফিয়ার মঙ্গারিং’ বা ভয়ের সংস্কৃতি। পপুলিস্ট নেতারা সাধারণ মানুষের ভয়কে পুঁজি করে নিজেদের ভোট ব্যাংক ভারী করেন।
হার্ভার্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিপা নরিস এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোনাল্ড ইংলেহার্ট তাদের যৌথভাবে লেখা বই ‘কালচারাল ব্যাকল্যাশ: ট্রাম্প, ব্রেক্সিট, অ্যান্ড অথরিটারিয়ান পপুলিজম'-এ এই প্রক্রিয়াটি নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন।
তারা বলেন, যখন কোনো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অর্থনৈতিক মন্দা বা দ্রুত সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তারা এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। পপুলিস্ট নেতারা তখন প্রচার করেন যে, অভিবাসী, ভিন্ন ধর্ম বা মতাদর্শের ‘অন্যরা’ চাকরি, ধর্ম ও সংস্কৃতি কেড়ে নিতে আসছে। কাল্পনিক এই ভয় মানুষের অবচেতন মনকে সজাগ করে তোলে। তারা কোনো যৌক্তিক বিচার ছাড়াই একতাবদ্ধ হয় সেই নেতার পেছনে।
যেকোনো বড় সংকটের সময় শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে একটি দুর্বল বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দেয়। ফরাসি দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী রেনে জিরার্ড বলেছনে, সমাজে যখন কোনো অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বা সংকট তৈরি হয়, তখন সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং সামাজিক ক্ষোভকে অন্যদিকে চালিত করতে একটি টার্গেট গ্রুপ দরকার হয়। শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত সচেতনভাবে একটি গোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখ সেদিকে ঘুরিয়ে দেয়।
চরম মেরুকরণের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি
মানুষের এই অবিরত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা যখন একটি সমাজে মহামারি আকার ধারণ করে, তখন তার ফল হয় অত্যন্ত ভয়াবহ।
সমাজবিজ্ঞানী ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুভার ইনস্টিটিউশনের ফেলো মরিস ফিওরিনা তার গবেষণায় দেখান, চরম মেরুকরণ সমাজের ‘মধ্যপন্থী’ বা ‘যুক্তিবাদী’ কণ্ঠস্বরগুলোকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়। চরমভাবে বিভক্ত সমাজে কোনও নিরপেক্ষ ব্যক্তি যদি দুই পক্ষের যৌক্তিক দিকগুলো মেলাতে চায়, তবে দুই দলই তাক চিহ্নিত করে ‘দালাল’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে। ফলে সমাজে আলোচনার মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করার পথ বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে।
অক্সফোর্ড ডিকশনারি ২০১৬ সালে বছরের সেরা শব্দ হিসেবে বেছে নেয় ‘পোস্ট ট্রুথ’ শব্দটিকে। এটি এমন একটি সামাজিক পরিস্থিতিকে বোঝায়,যেখানে কোনও নীতিনির্ধারণ বা বিতর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব সত্য ও তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং আবেগ।
নোবেলজয়ী ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী এবং রয়্যাল সোসাইটির সাবেক সভাপতি স্যার পল নার্স বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সেমিনারে বারবার সতর্ক করে বলেছেন, “যখন একটি সভ্যতা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, যুক্তি এবং বস্তুনিষ্ঠ সত্যকে অস্বীকার করে সিদ্ধান্ত নেয় কেবল দলীয় অন্ধবিশ্বাসের ভিত্তিতে, তখন ত্বরান্বিত হয় সেই সভ্যতার পতন।”
ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ডেভিড লিভিংস্টোন স্মিথ তার ‘লেস দেন হিউম্যান’ বইয়ে দেখিয়েছেন, ইতিহাসে সংঘটিত যেকোনো বড় গণহত্যা বা জাতিগত সহিংসতার প্রথম ধাপই হলো প্রতিপক্ষকে ‘ডিহিউম্যানাইজ’ করা।
চরমভাবে মেরুকৃত সমাজে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে মানুষ হিসেবে না দেখে ‘পোকামাকড়’, ‘পরজীবী’ বা ‘জাতীয় শত্রু’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। স্মিথ দেখিয়েছেন, ভাষাগত এই অপব্যবহার মানুষের মস্তিষ্কের সহানুভূতিশীল অংশকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। প্রতিপক্ষের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা অত্যাচারকে তখন যৌক্তিক বলে মনে হয়।
নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের 'ইঁদুর' বা 'পরজীবী' হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। রুয়ান্ডায় তুতসিদের 'তেলাপোকা' বলে সম্বোধন করা হয়েছিল, যাতে হুতু মিলিশিয়ারা তাদের হত্যা করার সময় নিজের বিবেকের কাছে নৈতিক বাধা না পায়।
উত্তরণের উপায়
মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। গবেষক ও অধ্যাপক ডগলাস কেলনার বলেন, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অঙ্গ হওয়া উচিত মিডিয়া লিটারেসি। মানুষকে বুঝতে শেখাতে হবে কীভাবে মস্তিষ্কের ‘কনফার্মেশন বায়াস’ কাজ করে। কীভাবে মানুষ তথ্যের ফাঁদে পা দেয় তা সাধারণ মানুষকে সচেতনভাবে অনুধাবন করতে শেখাতে হবে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্ষতিকারক ডেটা ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের প্রফেসর শোশানা জুবফ। ‘সারভেইলেন্স ক্যাপিটালিজম’ এর প্রবক্তা এই প্রফেসর তার বইয়ে বলেন, মানুষের মনোযোগ ও আবেগকে বিক্রি করে বিলিয়ন ডলার আয়ের এই ব্যবসা যদি আইন করে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এটি মানব সভ্যতার গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।
স্ট্যানফোর্ড এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ভিন্নমতের দুজন মানুষ একে অপরের সাথে অন্তত ১০-১৫ মিনিট গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং সহানুভূতিশীল আলোচনা করলে তাদের ভেতরের পারস্পরিক বিদ্বেষ কমে যায় নাটকীয়ভাবে। সমাজবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ডিপ ক্যানভাসিং’ বা গভীর সংলাপ।
বিতর্কের উদ্দেশ্য যেখানে প্রতিপক্ষকে তর্কে হারিয়ে জেতা, সেখানে সংলাপের উদ্দেশ্য ভিন্নমতের পেছনের কারণ ও মানুষের গল্পটা বোঝার চেষ্টা করা। কারণ মানুষের মুক্তির চাবিকাঠি কোনো দলের অন্ধ আনুগত্যে নেই, আছে ভিন্নমতের মানুষের কথা শোনার ধৈর্য এবং নিজস্ব চিন্তার স্বাধীনতার মধ্যে।