অর্থনৈতিক বিবেচনায় সরকার চাইলে যেকোনো টাকার নোট বাতিল করতে পারে। সচরাচর সরকার একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে নোট বাতিলের ঘোষণা দেয়।
বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে মানুষের কাছে থাকা বাতিল ঘোষিত নোটগুলো ব্যাংকে জমা দিয়ে সমপরিমাণ নতুন টাকা নেওয়া যায়। এমন সিদ্ধান্তকেই অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘ডিমনিটাইজেশন’ বা নোট বাতিল। এটি আধুনিক অর্থনীতির সবচেয়ে জটিল ও আলোচিত নীতিগুলোর একটি।
কারো কারো ধারণা নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে কালো টাকা, জাল নোট ও অর্থপাচারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব। একইসাথে মানুষের ঘরে থাকা অর্থকে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসা সহজ হয়। যদিও এ নিয়ে বিরুদ্ধমতও আছে অনেক। কারণ নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে।
নোট বাতিলের আলোচনা বাংলাদেশে বহু পুরোনো। সম্প্রতি বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে বিএনপির সংসদ সদস্য এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাবে।
মাহবুব উদ্দিন খোকন আলাপ-কে বলেন, “পুরোনো নোট বাতিল করলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ আবার ব্যাংকে ফিরে আসবে। বিশেষ করে আনট্যাক্সড মানি। এতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। অন্যদিকে যদি একটি নির্দিষ্ট ফি বা ট্যাক্স কেটে রেখে টাকাটা ব্যাংকে আনা হয় তাহলে রাজস্ব আয়ও বাড়বে।”
নোট বাতিলের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা হলেও, বিশ্বের অনেক দেশ এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের যেসব দেশে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছিলো, সেখানে আসলে কী ঘটেছিলো? অর্থনীতিতে কতোটা স্বস্তি এনেছিলো নোট বাতিলের ঘটনা? নাকি এটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কড়া মূল্য চোকাতে হয়েছিলো?
কেন নোট বাতিল বা ডিমনিটাইজেশন?
ডিমনিটাইজেশন হলো কোনো প্রচলিত নোট বা মুদ্রাকে আইনগতভাবে অচল ঘোষণা করা। সাধারণত সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরোনো নোট ব্যাংকে জমা দিয়ে নতুন নোট নেওয়ার সুযোগ দেয়।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত ‘পপুলিস্ট উদ্দেশ্যে’ নেওয়া হয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
“বিভিন্ন দেশের ডিমনিটাইজেশনের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, এটা করা হয় একটি পপুলিস্ট উদ্দেশ্য থেকে”, আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
দুর্নীতিগ্রস্ত ও সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও অধিকার আদায়ের কথা বলে জনতুষ্টির প্রক্রিয়াই পপুলিজম বা পপুলিস্ট উদ্দেশ্য।
২০১৬ সালে ভারতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল বা ডিমনিটাইজেশন করা হয়। ওই ঘটনার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন দেশটির আয়কর বিভাগের সাবেক প্রধান কমিশনার ড. প্রতাপ সিং।
কালো টাকা শনাক্ত করা, জাল নোট বন্ধ করা, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঠেকানো, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদ অর্থ ফিরিয়ে আনা, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে আরও আনুষ্ঠানিক করার লক্ষ্যেই ভারত সরকার নোট বাতিল করেছিলো বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
মাহবুব উদ্দিন খোকনও নোট বাতিলের প্রস্তাবের কারণ হিসাবে, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতির মাধ্যমে জমানো অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফেরানো, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং কালো টাকার উৎস বন্ধ করার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “অনেক মানুষ ব্যাংকে না রেখে ঘরে নগদ অর্থ সংরক্ষণ করছেন। যারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তারাও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ রেখে গেছেন। এ অবস্থায় ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট এক থেকে দুই মাসের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে সেই অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে।”
এমন সিদ্ধান্ত রাজস্ব বাড়াবে বলেও মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, “যাদের টাকার বৈধ উৎস দেখানোর সুযোগ নেই, তারা নির্দিষ্ট হারে, ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কর দিয়ে অর্থ বৈধ করতে পারবেন। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।”
উদ্দেশ্য মহৎ হলেও বাস্তবে এসব লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বলে মনে করেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
“আমি যখন বিভিন্ন সময় সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্বে ছিলাম তখনও ডিমনিটাইজেশন নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এটা পপুলিস্ট সিদ্ধান্ত। এর উদ্দেশ্য মহৎ হলেও বাস্তবে এসব লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
ভারতের অভিজ্ঞতা
বিশ্বে প্রথমবারের মতো ডিমনিটাইজেশনের ঘটনা ঘটেছিলো ভারতে। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে এক হাজার, পাঁচ হাজার ও দশ হাজার টাকার নোট বাতিল করা হয়। লক্ষ্য ছিলো অঘোষিত সম্পদ শনাক্ত করা। কিন্তু অধিকাংশ পুরোনো নোটই ব্যাংক থেকে বিনিময় করে নতুন নোট নেওয়া হয়। ফলে প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। এরপর ১৯৭৮ সালে আরও একবার ভারত সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নোট বাতিলের ঘটনাটিও ঘটেছে ভারতেই, ২০১৬ সালের ৮ই নভেম্বর।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাতারাতি ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল ঘোষণা করেন। তখন দেশে প্রচলিত নগদ অর্থের প্রায় ৮৬ শতাংশই ছিলো এই দুই মূল্যমানের নোট।
সরকারের দাবি ছিলো, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কালো টাকা, জাল নোট ও সন্ত্রাসবাদ অর্থায়নে বড় ধরনের আঘাত হানা যাবে।
প্রথম কয়েক সপ্তাহে লাখ লাখ মানুষ ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান। নগদ অর্থের সংকটে পড়ে যায় ছোট ব্যবসা, কৃষি, পরিবহন ও অনানুষ্ঠানিক খাত।
ড. প্রতাপ সিং তার গবেষণায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাতে জানান, বাতিল হওয়া নোটের প্রায় ৯৯ শতাংশই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে এসেছিলো।
অর্থাৎ যাদের কাছে অবৈধ অর্থ ছিলো, তাদের বড় অংশও কোনো না কোনোভাবে সেই টাকা ব্যাংকে জমা দেয়। কিন্তু এটা যে কালো টাকা, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রমাণ করা যায়নি।
ফলে কালো টাকা উদ্ধারের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত কতটা সফল ছিলো, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
ভারতের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “মোদী যেটা চেয়েছিলেন, সেটা হয়নি। ভারতের অভিজ্ঞতা খুব একটা কার্যকর ছিলো না। তখন দেখা গেছে, মালিকের ড্রাইভার, বাবুর্চি, কাজের লোক সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা পরিবর্তন করে নিচ্ছে। এতে প্রায় পুরো টাকাই ফেরত এসেছিলো। বরং নতুন করে নোট ছাপানোতে বাড়তি টাকা খরচ হয়ে থাকতে পারে।”
অবশ্য ডিমনিটাইজেশনের পর থেকে ভারতে ডিজিটাল পেমেন্ট, করদাতার সংখ্যা এবং ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো বলে উল্লেখ করেছেন প্রতাপ সিং।
‘ডিমনিটােইজেশন ২০১৬ অ্যান্ড ইটস ইমপ্যাক্ট অন ইন্ডিয়ান ইকনমি অ্যান্ড ট্যাক্সেশন’ শীর্ষক গবেষণার সারকথা হলো, নোট বাতিলের ফলে ভারতে করদাতার সংখ্যা ও কর আদায় বৃদ্ধি, ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার, জাল নোট ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন কমানো এবং কালো টাকার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির মতো কিছু ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ছিলো অনেক বেশি।
পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, নতুন নোটের সংকট এবং নগদ অর্থের ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়ে। ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নোট বাতিলে ইতিহাসের পাঠ
শুধু ভারত নয়, বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকটি দেশ নোট বাতিল বা বড় ধরনের মুদ্রা সংস্কারের পথ বেছে নিয়েছে।
সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ে বিশ্বে এমন ঘটনা ঘটেছিলো নাইজেরিয়ায়। ২০২২ সালে নতুন নোট চালু করে পুরোনো নোট প্রত্যাহার করে দেশটি। লক্ষ্য ছিলো ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ফিরিয়ে আনা ও জাল নোট রোধ।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাপাতে না পারায় নাইজেরিয়ায় নগদ অর্থের সংকট দেখা দেয় এবং ব্যবসার আয় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এতে তৈরি হয় ব্যাপক জনঅসন্তোষ।
২০০৯ সালে উত্তর কোরিয়া মুদ্রা সংস্কারের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলো। সরকার মুদ্রা সংস্কারের মাধ্যমে পুরোনো নোট বদলে দেয় এবং নগদ ধারণের সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিলো।
যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান লিগ্যাল ক্লারিটি’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ায় সে সময় মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যসংকট আরও বেড়ে গিয়েছিলো।
২০০২ সালের ১লা জানুয়ারি ইউরোপের ১২টি দেশ ইউরো ব্যাংকনোট ও মুদ্রা চালু করে। ইউরো চালুর সময় ১২টি দেশের পুরোনো জাতীয় মুদ্রা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। যদিও এটি প্রচলিত অর্থে ডিমনিটাইজেশন নয়; বরং একটি পরিকল্পিত কারেন্সি রিপ্লেসমেন্ট ছিলো। যেখানে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইউরো এবং পুরোনো জাতীয় মুদ্রা, দুটিই বৈধভাবে লেনদেনে ব্যবহার করা যেত।
বহু দেশে বছরের পর বছর পুরোনো নোট বদলানোর সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি।
নোট বাতিলের সবচেয়ে বাজে উদাহরণ হিসাবে ধরা হয় মিয়ানমারের ঘটনাকে। ১৯৮৭ সালে মিয়ানমার কোনো ক্ষতিপূরণ বা নোটের বদল ছাড়াই বড় অঙ্কের নোট বাতিল করে। রাতারাতি মূল্যহীন হয়ে যায় লাখো মানুষের সঞ্চয়। অনেক গবেষক মনে করেন, এই সিদ্ধান্তই পরবর্তী গণবিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিলো।
শ্রীলঙ্কাও একবার এমন চেষ্টা হয়েছিলো। ১৯৭০ সালে দেশটির ৫০ ও ১০০ রুপির নোট বাতিল করে সরকার।
উদ্দেশ্য সেই কালো টাকা শনাক্তের চেষ্টা করা আর কর আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কিন্তু এতে অল্প সফলতা এলেও বড় কোনো সাফল্য আসেনি। বরং পুরো কার্যক্রমের প্রশাসনিক ব্যয় ছিলো অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রেও নোট সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা আছে। ১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সময়ে ৫০০, ১০০০, ৫০০০ ও ১০ হাজার ডলারের নোটের নতুন ইস্যু ও প্রচলন বন্ধ করা হয়। এর প্রধান কারণ ছিলো অপ্রয়োজনীয় উচ্চমূল্যের নোট তুলে নেওয়া এবং বড় অঙ্কের নগদনির্ভর অপরাধমূলক লেনদেন কমানো।
তবে সেটা ডিমনিটাইজেশন ছিলো না, কারণ এসব নোটের আইনি বৈধতা কখনো বাতিল করা হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় তখন যৌথ ঘোষণায় জানিয়েছিল এই নোটগুলোর ব্যবহার কমে যাওয়ায় আর ইস্যু করা হবে না। এতে তাই কোনো ঝামেলা হয়নি। বরং এই নোটগুলো আজও সংগ্রাহকরা রেখে দিয়েছেন।
ইতিবাচক প্রভাব কতটুকু
অর্থনীতিবিদদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ডিমনিটাইজেশনের কিছু ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।
প্রথমত: ব্যাংকের বাইরে থাকা বিপুল নগদ অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসতে পারে।
দ্বিতীয়ত: সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা সহজ হয়। কারণ, বড় অঙ্কের নগদ জমা দিতে গেলে অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে হয়।
তৃতীয়ত: ডিজিটাল পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার বাড়তে পারে।
চতুর্থত: জাল নোট দ্রুত বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
পঞ্চমত: স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকের তারল্য বাড়তে পারে, যা ঋণ বিতরণে সহায়ক হতে পারে।
ভারতে ২০১৬ সালে ভারতের ডিমনিটাইজেশন নিয়ে করা গবেষণায় উঠে আসে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক।
বলা হয়, নোট বাতিলের ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা দেয়, যার ফলে ব্যাংকের আমানত ও তারল্য বৃদ্ধি পায় এবং ঋণের সুদহার কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
একই সঙ্গে অনেক মানুষ প্রথমবারের মতো আয়কর ব্যবস্থার আওতায় আসে। কারণ বড় অঙ্কের নগদ জমা দেওয়ার পর তার উৎস যাচাই করার সুযোগ পায় কর কর্তৃপক্ষ। এর ফলে নতুন করদাতার সংখ্যা, আয়কর রিটার্ন জমা এবং কর আদায় সবই বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া নগদের সংকট মানুষকে দ্রুত ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করে। সে সময় ইউপিআই, মোবাইল ওয়ালেট, ডেবিট কার্ড ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যা ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে কাজ করেছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকে জমা হওয়া বড় অঙ্কের নগদ অর্থের তথ্যের ভিত্তিতে কর কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনক কিছু লেনদেন, কর ফাঁকি ও অঘোষিত আয়ের তদন্ত পরিচালনা করতে পেরেছিলো।
ব্যর্থতাই বেশি কেন?
কালো টাকার দোহাই দিয়ে ডিমনিটাইজেশন করা হলেও এখানে প্রায় সব দেশই ব্যর্থ। কিন্তু কারণ কী?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কালো টাকার বড় অংশ নগদে থাকে না। তা জমি, স্বর্ণ, বৈদেশিক সম্পদ, শেয়ার বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাখা হয়। ফলে শুধু নোট বাতিল করলেই কালো অর্থ পুরোপুরি নির্মূল হয় না, ভারতের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নই সামনে আনছে।
ভারতীয় গবেষণায় দাবি করা হয়, কালো অর্থের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ নগদে থাকে; তাই শুধু নোট বাতিল করে কালো অর্থ নির্মূল করা সম্ভব নয়।
কালো টাকা নির্মূলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। বলা হয়, বেনামি সম্পত্তি, স্বর্ণে বিনিয়োগ, কর ফাঁকি ও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিলেই এ ধরনের উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
অন্যদিকে বড় ধরনের ঝুঁকির কথাও বলছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
“সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় নগদনির্ভর অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, পরিবহন ও অনানুষ্ঠানিক খাত এখনো অনেকাংশে নগদের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ নোট বাতিল হলে এসব খাতে লেনদেন কমে যেতে পারে।”
টাকা বদলানের প্রক্রিয়া ও সরকারের খরচ নিয়ে তিনি বলেন, “অনেক মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকায় তারা সময়মতো টাকা বদলাতে না পারার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ব্যাংকে দীর্ঘ লাইন, এটিএম সংকট, নতুন নোটের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।”
এ দিকে গবেষণার হিসাবে, নোট বাতিলের কারণে ভারতে উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ ছিলো প্রায় ১ দশমিক ১ লাখ কোটি রুপি।
নতুন নোট ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য বাস্তবায়ন ব্যয়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও প্রায় ১৭ হাজার কোটি রুপি খরচ হয়েছিলো।
ড. প্রতাপ সিং তার গবেষণায় দেখান, ২০১৬ সালে ভারতে নোট বাতিলের মোট অর্থনৈতিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক ২৭ লাখ কোটি রুপি।
নোট বাতিল: প্রস্তাব থেকে বাস্তবায়নের বাস্তবতা
বাংলাদেশে নোট বাতিলে মাহবুব উদ্দিন খোকনের প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আলাপ-কে বলেন, “৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট জমা দেওয়ার জন্য এক থেকে দুই মাস সময় দেওয়া যেতে পারে। এতে এক সঙ্গে ব্যাংকগুলোতে চাপ পড়বে না। আর যারা আয়ের বৈধ উৎস দেখাতে পারবে না তারা কর দিয়ে সেই অর্থ বৈধ করতে পারবে। এতে যেটা হবে ঘুষ, চাঁদাবাজি, মাদক ও গোল্ডের অবৈধ টাকাগুলো ইকোনমিতে আসবে। অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়বে। বিনিয়োগে গতি আসবে।”
তবে বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, ডিমনিটাইজেশন কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। এটি একদিকে কালো টাকা শনাক্ত, জাল নোট নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদ অর্থ ফেরাতে সহায়ক হতে পারে।
আবার অন্যদিকে প্রস্তুতি দুর্বল হলে একই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে বুমেরাং হয়ে ফিরে বড় ধরনের অস্থিরতা, ব্যবসায় স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বিবেচনায় এলে আগে প্রশ্ন উঠবে, নোট বাতিলের সুফল কি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় এবং ভোগান্তির মূল্যের তুলনায় বেশি হবে?
বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, সেই উত্তর এতটা সহজ নয়।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ই ডিমনিটাইজেশনের কথা ভেবেছিলোেন বলে জানান আহসান এইচ মনসুর।
তখনও বড় নোট ডিমনিটাইজেশনের কথা উঠেছিলো। তাহলে কেন সরে আসে সরকার?
“অন্য অনেক সমস্যার সঙ্গে ডিমনিটাইজেশনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় ব্যবসায়িক সেক্টরে। এতে ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়তে পারে। তখন সব দিক বিবেচনা করেই আমরা সরে এসেছিলাম,” আলাপ-কে বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট প্রচলিত মুদ্রার প্রায় ৯২ শতাংশ ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট।
তাই বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্নটি ৫০০ বা ১,০০০ টাকার নোট বাতিল করা উচিত কি না সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, যদি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তার সম্ভাব্য সুফল কি অর্থনীতির সম্ভাব্য ব্যয়ের চেয়ে বেশি হবে?