ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের লড়াই নয়, একইসঙ্গে এটি হলো দুনিয়ার অন্যতম বড় অর্থনৈতিক মহাযজ্ঞ। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই মহাযজ্ঞকে নিয়ে যাচ্ছে নতুন এক উচ্চতায়।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার কোনো আয়োজনে এবারই হতে যাচ্ছে এতোবড় অর্থনৈতিক মহাযজ্ঞ।
প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণ, ১০৪টি ম্যাচ, তিনটি স্বাগতিক দেশ এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আয়োজনের সাক্ষী হবে বিশ্ব।
ফিফা সভাপতি জায়ানি ইনফানতিনো এবারের বিশ্বকাপকে “মানবজাতির ইতিহাসে সর্বকালের সবচেয়ে বড় আয়োজন” বলে অভিহিত করেছেন।
এই মন্তব্যকে উচ্চাভিলাষী মনে হলেও আদৌ কিন্তু কাল্পনিক নয়। বরং সংখ্যার হিসাবে বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পদে পদে।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, পর্যটন ও ভোক্তা ব্যয় সৃষ্টি হয়েছে, তা আকারে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের বার্ষিক বাজেটের থেকেও বড়।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে ৩৯ দিনের এই আসর ঘিরে ইতোমধ্যেই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে খুচরা ব্যবসা, ফ্যাশন শিল্প, হোটেল ও পর্যটন খাত, বিমান পরিবহন, বিজ্ঞাপন, সম্প্রচার এবং রিয়েল এস্টেট বাজারসহ নানা খাত।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দেশের বাইরেও অর্থনৈতিক প্রভাবের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে আরও বহু দেশে।
কেউ জার্সি তৈরি করছে, কেউ সম্প্রচার স্বত্ব কিনছে, কেউ পর্যটক পাঠাচ্ছে, আবার কেউ বিশ্বকাপকেন্দ্রিক পণ্য ও সেবার বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
এবারই প্রথমবারের চালু হয়েছে টিকিট বিক্রির ‘ডায়নামিক প্রাইসিং সিস্টেম’। এতে চাহিদা বাড়ায় আকাশে উঠেছে টিকিটের মূল্য, ফিফার পকেটে ঢুঁকছে বিপুল অর্থ।
প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের বাইরে গিয়ে সরাসরি আংশিক খেলা দেখানোর সম্প্রচারস্বত্বের অধিকার পেয়েছে ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম, যার ফলে এই আয়োজনে দর্শক সম্পৃক্ততার বিস্তৃতি বহু বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফুটবলের এই মহোৎসবের আর্থিক আকার ঠিক কত বড়? কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে?
আর এক সময় লোকসানে থাকা ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন কীভাবে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হলো?
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আকার কত বড়
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নিয়ে এবারের বিশ্বকাপের আর্থসামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে ফিফা।
এতে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ ৮০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রভাব ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। আর কর্মসংস্থান হয়েছে ৮ লাখ ২৪ হাজার।
ফিফার এই বিশ্লেষণে ৪৫টি উৎপাদন খাত এবং ৭৬টি দেশের অর্থনৈতিক তথ্য ব্যবহার করে বলা হয়েছে, “প্রতিযোগিতার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬।”
বিপুল এই আয়োজনে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে রিয়েল এস্টেট এবং পাইকারি ও খুচরা খাতে। ফিফার হিসাবে, এই দুই খাতে অর্থপ্রবাহ হবে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এছাড়া হোটেল ও খাদ্য, আর্থিক ও ইন্সুরেন্স, প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা, নির্মাণ, কারিগরি কার্যক্রম, বিমান পরিবহন, কৃষি, আইসিটি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কার্যক্রমসহ বিভিন্নখাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রভাব পড়বে।
২০২৬ সালের জন্য শুরুতে ৩২ দলের টুর্নামেন্ট প্রস্তাবিত হলেও, ২০১৭ সালে ফিফা কাউন্সিল ৪৮ দলের ফরম্যাটে সম্প্রসারণ করে। এর পক্ষে ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার যুক্তি হলো- “সম্প্রসারিত এই সংস্করণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলের বৈশ্বিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চায় ফিফা।”
কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি শহরে ১১ই জুন থেকে ১৯এ জুলাই পর্যন্ত যৌথভাবে চলবে এই টুর্নামেন্ট। ভেন্যু হিসেবে আমেরিকা মহাদেশের এমন মহানগরগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে, যেসব জায়গায় রয়েছে শক্তিশালী ক্রীড়া পরিকাঠামো, বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সংযোগ, অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা এবং ফুটবলের উত্তেজনা দেওয়ার সক্ষমতা।
এসব মহানগরের মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি, নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটল এবং সান ফ্রান্সিসকো। মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা, মেক্সিকো সিটি ও মন্টেরে এবং কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙকুভার।
এবারের বিশ্বকাপ উত্তর আমেরিকায় আয়োজনের ফলে ফিফার ইতিহাসে আয়ের রেকর্ড হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফিফা আশা করছে, বিশ্বকাপ ঘিরে জমজমাট হবে পর্যটন ব্যবসা। দর্শকদের আগমন শত শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করবে। যা থেকে সরাসরি লাভবান হবে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং খুচরা খাত।
আয়োজক শহরের হোটেলগুলো রেকর্ড সংখ্যক অতিথির উপস্থিতি আশা করছে এবং পর্যটকদের আনাগোনা বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় ব্যবসাগুলোও লাভবান হবে।
এছাড়া দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আয়োজনের ভেন্যু হওয়ায় শহরগুলোর পরিচিতি বিশ্বব্যাপী বাড়িয়ে তুলবে। এতে শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
এবার শুধু টুর্নামেন্টের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে রয়েছে মূলধনি বিনিয়োগ, আয়োজক শহরের খরচ এবং ফিফা বাজেটসহ অন্যান্য ব্যয়। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যয়ের পরিমাণ ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক সফর করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই হবে নতুন, শুধু বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করেই প্রথমবার তারা আমেরিকায় যাবে।
লস অ্যাঞ্জেলেস আটটি ম্যাচ আয়োজন ঘিরে অর্থনৈতিক প্রভাব ধরা হয়েছে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ সালের সুপার বোলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ফিফা কতোটা আয় করবে
গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে আয়ের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে ফিফা। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার গ্রীষ্মের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে চার বছরের চক্রে (২০২৩-২০২৬) সংস্থাটির মোট আয় হতে পারে ১৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারই আসবে চলতি বছর, মানে বিশ্বকাপ আয়োজন বর্ষে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের আরেক বৃহৎ ক্রীড়া আসর ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকসে আয় হয়েছিলো ৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক কম।
এক সময় আর্থিক দিক দিয়ে অলিম্পিকসের তুলনায় পিছিয়ে ছিলো বিশ্বকাপ ফুটবল। তবে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। সেই বিশ্বকাপে আয় হয়েছিল ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকস আয় করে ৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার।
২০১৮ থেকে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের মধ্যবর্তী সময়ে ফিফার আয় বেড়েছিল ১৮ শতাংশ। ওই চার বছরে মোট আয় ছিল ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সেই আয় আরও ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদী ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় হওয়ায় ব্যয়ও বাড়াচ্ছে ফিফা। মে মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে পরবর্তী চার বছরের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
ফিফার আয়ের প্রধান প্রধান উৎস
বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে ফিফার সবচেয়ে বড় আয়ের খাত হলো দুনিয়াজুড়ে টেলিভিশন সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রি। এখান থেকে আয় ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের মতো। কাতার বিশ্বকাপে এই খাতে আয় ছিলো ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ দল ৪৮-এ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত। এতে ম্যাচ সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৪। বাড়তি ম্যাচের কারণে সম্প্রচারকারীদের কাছে বিক্রির জন্য ফিফার হাতে রয়েছে অনেক বেশি কনটেন্ট।
আবার উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মতো লাভজনক বাজারগুলোর জন্য ম্যাচের সময়সূচিও আগের বিশ্বকাপের তুলনায় বেশি সুবিধাজনক হয়েছে।
আয় বাড়াতে আরও নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ফিফা। এবারই প্রথমবারের মতো ‘ফিফা উইমেন্স ওয়ার্ল্ড কাপ’-এর সম্প্রচারস্বত্ব আলাদা সম্পদ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে।
এছাড়া তরুণ দর্শকদের টেলিভিশন সম্প্রচারের দিকে আকৃষ্ট করতে ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট সরাসরি দেখানোর অধিকার ইউটিউব ও টিকটকের কাছে বিক্রি করে সামাজিক মাধ্যম থেকেও আয় করছে ফিফা।
ফিফার আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হলো টিকিট বিক্রি ও আতিথেয়তা। এখানে থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার আয় হওয়ার কথা, যা হতে পারে কাতার বিশ্বকাপের তিনগুণ। সবমিলিয়ে এই খাতই ফিফার আয় প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
একদিকে বিপুল সংখ্যক ম্যাচ, অন্যদিকে উত্তর আমেরিকার বিশাল ভোক্তা – এই দুই শক্তিই বাজারের চাহিদা বাড়ানোর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিপুল ভোক্তার কারণে এবারের বিশ্বকাপের টিকিটের দামে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। আর এই সুযোগে টিকিটের দাম বাড়ানোর সুযোগ এসেছে।
এবারই প্রথমবারের মতো চালু করা হয়েছে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি। এই কারণে গড় টিকিট মূল্য বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। টিকিটের দাম বৃদ্ধি নিয়ে দর্শক-সমর্থকরা করছেন নানা অভিযোগ।
দ্যা গার্ডিয়ানের প্রতিবদনে লেখা হয়েছে, মে মাসে ইউরোপীয় কমিশনে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ‘ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ’ দাবি করেছে, কোনো প্রতিবন্ধী সমর্থক যদি নিজের দলের প্রথম ম্যাচ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত সব খেলা দেখতে চান, তাহলে শুধু টিকিটের পেছনেই কমপক্ষে ৬ হাজার ৯০০ ডলার খরচ হবে তার। এই অর্থ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
আগামী ১৯এ জুলাই নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এবারের মহারণের ফাইনাল ম্যাচ। সেখানে সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ১০ হাজার ৯৯০ ডলার। এই মূল্য কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের প্রায় সাত গুণ বেশি।
যদিও বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর দেওয়া যৌথ বিডে ধারণা দেওয়া হয়েছিলো যে, ফাইনাল ম্যাচের টিকিটের গড় মূল্য হবে ১ হাজার ৪০৮ ডলার।
ফিফার পক্ষ থেকে অবশ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, ফাইনাল ম্যাচের এক হাজারেরও বেশি টিকিট বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ৬০ ডলার করে।
তবে ব্যাপক চাহিদার কাছে পাত্তাই পাচ্ছে না টিকিটের উচ্চমূল্যের বিষয়টি।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিফা সভাপতি জায়ানি ইনফানতিনো বলেন, এবারের বিশ্বকাপে মোট আসন সংখ্যা ৭০ লাখ। কিন্তু ফিফা টিকিটের আবেদন পেয়েছে ৫০ কোটিরও বেশি।
“চার সপ্তাহে আমরা যেন এক হাজার বছরের বিশ্বকাপের সমপরিমাণ আবেদন পেয়েছি। ২০০টিরও বেশি দেশ থেকে টিকিটের আবেদন এসেছে। সবাই এই বিশেষ আয়োজনের অংশ হতে চায়।”
ফিফা সভাপতি বলেন, “দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ নামে একটি ব্যবস্থা আছে। যেখানে চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। এটাই বাজারের বাস্তবতা। চাহিদা থাকায় এটি কোনো সমস্যা নয়।”
বাণিজ্যিক অংশীদার ও স্পনসরদের কাছ থেকেও বিপুল সাড়া পেয়েছে ফিফা। এ খাত থেকে সংস্থাটির আয় হবে রেকর্ড ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে লাইসেন্সিং চুক্তি থেকে আরও ৬৭০ মিলিয়ন ডলার আসবে।
ফিফার প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা রোমি গ্যাই সম্প্রতি ‘বিজনেস অব সকার’ সম্মেলনে বলেন, “বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে আমরা নজিরবিহীন আগ্রহ দেখেছি। এটি ইতোমধ্যেই ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বাণিজ্যিক কর্মসূচিতে রূপ নিয়েছে এবং আমরা এখনও এর গতি বাড়িয়ে চলেছি।”
অ্যাডিডাস, আরামকো, কোকো-কোলার মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ১৬টি অংশীদারিত্ব চুক্তি করেছে ফিফা। পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য আঞ্চলিক ও স্থানীয় স্পনসরশিপ।
স্পনসরশিপ বিশেষজ্ঞ রিকার্ডো ফোর্ট বলেন, উত্তর আমেরিকার সম্মৃদ্ধ বাজার বড় ভূমিকা রাখলেও ফিফার বাণিজ্যিক দল তাদের উদ্ভাবনী কৌশলের জন্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
“আগে সুনির্দিষ্ট কিছু স্বত্বের জন্য ফি ছিলো নির্দিষ্ট এবং সবকিছু ছিলো খুবই কাঠামোবদ্ধ। কিন্তু এবার ফিফা অনেক বেশি নমনীয়তা দেখিয়েছে।”
কেন ২০২৬ বিশ্বকাপ বিলিয়ন ডলারের খুচরা বাণিজ্যের উৎসব
অ্যাডিডাস থেকে অ্যামাজন – বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে নতুন নতুন পণ্য ও পোশাকসহ ভক্ত-সমর্থকদের জন্য বিশেষ ফ্যান এক্সপেরিয়েন্স বাজারে আনার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফিফা এই আয়োজনকে শুধু ফুটবল প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও উপস্থাপন করছে।
ফ্যাশন, খাবার, সংগীত, বিনোদন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার সঙ্গে বিশ্বকাপকে যুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।
ফাইনাল ম্যাচের ভেন্যু নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির প্রধান বিপণন ও যোগাযোগ কর্মকর্তা বেটিনা গ্যারিবালডি বলেছেন, “আসল সৃজনশীলতা হলো এমন মানুষদের কাছে পৌঁছানো, যারা হয়তো ফুটবলে আগ্রহীই নন। আর আমার কাজ হচ্ছে এমন মুহূর্ত ও অভিজ্ঞতা তৈরি করা, যার অংশ হওয়ার জন্য আগ্রহ বোধ করবে মানুষ।”
বাণিজ্যিক এই দৃষ্টিভঙ্গিই খুচরা বিক্রেতাদের জন্য নতুন সুযোগ সামনে নিয়ে এসেছে বলে ফিনান্সিয়াল ডিজিটাল মিডিয়া দ্য স্ট্রিট-এর এক মন্তব্য প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে।
“এখন বিশ্বকাপকে শুধু ফুটবলপ্রেমীদের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছে না ব্র্যান্ডগুলো। বরং এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর পরিচিতি বাড়ানো, নতুন গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং পণ্য বিক্রি বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ হিসেবে।”
আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বহুজাতিক পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড কোম্পানির-এর ‘স্টেইট অব ফ্যাশন ২০২৬’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক ফ্যাশন শিল্পে প্রবৃদ্ধির ধারা সীমিত থাকবে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শুল্কের চাপ এবং মূল্য সচেতন ক্রেতাদের কারণে ব্যবসার গতি মন্থর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আর এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় ব্র্যান্ড বিশ্বকাপ আয়োজনে পণ্যের বাজার ধরতে নেমে পড়েছে। টুর্নামেন্ট ঘিরে বাড়তে থাকা ফ্যাশন পণ্যের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে ব্র্যান্ডগুলো।
একটি জরিপের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক নিজেদের স্পোর্টস ফ্যান হিসেবে পরিচয় দেয়।
ব্যাংক অব আমেরিকার ২০২৪ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, স্পোর্টস-সম্পর্কিত পণ্য কিনতে একজন আমেরিকান বছরে গড়ে খরচ করেন ১ হাজার ১২২ ডলার। এর মধ্যে রয়েছে খেলার বিভিন্ন সরঞ্জাম, পোশাক, ম্যাচ দেখা এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতা।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলো ঐতিহ্যবাহী বিজ্ঞাপন বা সাধারণ মার্কেটিংয়ের বাইরে গিয়ে ’লাইফস্টাইল ভিত্তিক’ কৌশল নিচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্র্যান্ড লয়্যালটি গড়ে তোলা।
বিশ্বকাপের আয় কোথায় ব্যয় হবে
অলাভজনক সংস্থা ফিফা জানিয়েছে, ১৩ বিলিয়ন ডলারের আয়ের মধ্যে অন্তত ১১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার পুনর্বিনিয়োগ করা হবে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে। এটি আগের চার বছরের চক্রের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি।
তবে এই অর্থ বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে রয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ফিফার ২১১টি সদস্য ফেডারেশন এবং ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের জন্য সরাসরি বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
গার্ডিয়ান লিখেছে, “সমালোচকদের মতে, এই অর্থায়ন বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান শক্তিশালী রাখার একটি কার্যকর উপায়।”
আগামী বছর ফিফা সভাপতির পদে তৃতীয় পূর্ণ মেয়াদের জন্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইনফানতিনোর। ফিফার গঠনতন্ত্র সংশোধন করে তিনি পুনর্নির্বাচনের পথ তৈরি করেছেন বলে ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে।
২০১৬ সালে দুর্নীতির অভিযোগে বিদায়ী সভাপতি সেফ ব্লাটারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য সংস্কারপন্থি প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালান ইনফানতিনো। এরপর থেকে তিনি পদে আছেন। তবে আবার যদি ইনফানতিনো নতুন মেয়াদে নির্বাচিত হন, তাহলে তার মোট দায়িত্বকাল হবে প্রায় ১৫ বছর। যা হবে ব্লাটারের ১৭ বছরের শাসনামলের চেয়ে মাত্র দুই বছর কম।
ফিফার প্রতিটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা প্রতি চার বছর চক্রের পরিচালন ব্যয়ের জন্য ৫০ লাখ ডলার করে পেয়ে থাকেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য তারা আরও ৩০ লাখ ডলার পর্যন্ত আবেদন করতে পারে।
এ ছাড়া ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশন তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে ফুটবল উন্নয়নের জন্য প্রতি চক্রে ৬ কোটি ডলার করে পেয়ে থাকে।
তবে এই উন্নয়ন তহবিলের বাইরে, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
গত বছর ফিফা ঘোষণা দিয়েছিল, কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় পুরস্কার তহবিল ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৭২৭ মিলিয়ন ডলার করা হবে। সে অনুযায়ী ৪৮টি দলের প্রত্যেককে অন্তত ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং চ্যাম্পিয়ন দলকে ৫ কোটি ডলার পাওয়ার কথা ছিলো।
কিন্তু বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্থা অভিযোগ তোলে যে, প্রস্তাবিত অর্থ তাদের ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট না। বরং এতে ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে পুরস্কার ও অংশগ্রহণ তহবিল ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আয়োজক দেশের লাভ-লোকসান
গত এক বছরে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহরের সঙ্গে ফিফার টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চুক্তি অনুযায়ী সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এমনকি স্টেডিয়ামের পার্কিং ফিসহ বিভিন্ন সহায়ক সেবার আয়ও ফিফা নিয়ে যাবে। কিন্তু নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার ব্যয় বহন করতে হবে স্থানীয় শহরগুলোকে।
বোস্টন স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ব্যয় কে বহন করবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধ চলার পর সম্প্রতি মীমাংসা হয়েছে। তবে অনেক ভেন্যুতেই গণপরিবহণ ব্যবস্থা নিয়ে এখনো জটিলতা রয়েই গেছে।
তবে আয়োজক হিসেবে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএস সকার-এর প্রধান নির্বাহী জেটি বস্টন জানিয়েছেন, ফিফার মোট টুর্নামেন্ট আয়ের ১ শতাংশ রাজস্ব ভাগাভাগির চুক্তির আওতায় তারা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার পাবে।
তবে ফিফার মোট আয়ের তুলনায় এটি খুবই সামান্য। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে অনেক বেশি সুবিধা পেয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারের আসর সূচনা করতে যাচ্ছে একটি নতুন যুগের। মাঠের লড়াইয়ের বাইরে আধুনিক এই ক্রীড়া আয়োজন এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে রূপ নিয়েছে।
ফিফার আয় রেকর্ড গড়বে, বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো নতুন বাজার পাবে, কোটি কোটি দর্শক যুক্ত হবে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এবং আয়োজক দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
তবে এই বিপুল অর্থপ্রবাহের মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে, লাভের সবচেয়ে বড় অংশ কারা পাবে, আর ব্যয়ের বোঝা কতটা বহন করবে আয়োজক শহরগুলো?
বিশ্বকাপের অর্থনীতি যততো বড় হচ্ছে, ততোই বাড়ছে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায্য বণ্টনের দাবি।