আবারও দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সেই শরীফ ওসমান বিন হাদি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার হত্যাকাণ্ড যে প্রবল কম্পন তৈরি করেছিল, যেন থেমে থেমে ফিরে আসছে তার ‘আফটারশক’।
জুলাই অভ্যুত্থান, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে হাদি ছিলেন ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ’ বিরোধী অন্যতম কট্টর কণ্ঠস্বর। তার সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মূল দর্শন হলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। সংগঠনের আহ্বায়ক হিসেবে ওসমান হাদি নিজেকে এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একজন “আপসহীন যোদ্ধা” হিসেবে পরিচয় দিতেন।
হত্যার শিকার হওয়ার আগে হাদি ফেইসবুকে একটি বৃহত্তর বাংলাদেশের মানচিত্র প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি রূপরেখা ছিল। এই ভাবাদর্শ ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের চোখে হাদিকে তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। আর বাংলাদেশে এই ভারতবিরোধী ভাবমূর্তিই তার হত্যাকাণ্ডকে একটি আদর্শিক রূপ দিয়েছে।
হাদিকে “ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অমর সৈনিক” দাবি করে তার সমর্থক ও স্বজনরা বলে আসছেন, ‘ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলতেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়েছে’। তারা বারবার বলেছেন, এটি ‘কেবল এক ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত’।
বাংলাদেশঘেঁষা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাদের সংবেদনশীলতাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিধানসভার নির্বাচনে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর গেল মঙ্গলবার (২ জুন) প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্যে সরাসরি নাম না নিলেও মমতা যে ঘটনাক্রম উল্লেখ করেছেন তা ইঙ্গিত করে তিনি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের কথাই বলেছেন।
কলকাতার ধর্মতলার সেই কর্মসূচিতে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি অভিযুক্ত করে বলেছেন, আসামিদের যখন পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ফোন করে তথ্য গোপন রাখার বা আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
“বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন জানি,” উল্লেখ করে মমতা বলেন, “বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে এসটিএফ (স্পেশাল টাস্ক ফোর্স) অ্যারেস্ট করেছিল জেনে রাখুন। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক ‘রেভল্যুশন’ হয়েছিলো। ...তারা মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। তখন আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। তারপরে হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেন...”
তিনি অমিত শাহের হিন্দি উক্তিটি উদ্ধৃত করেন, “আপনি বেঙ্গল পুলিশকে বলে দিন এই কথা যেন বাইরে না যায়। ইয়ে দেশ কে লিয়ে হ্যায় (এটা দেশের স্বার্থে)।”
মমতা সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ ‘গভর্নমেন্ট চেইঞ্জ’ হলেও মনে রাখবেন আমি তো সবটাই জানি।” তিনি আরও বলেন, “আমি এখনও নামটা বলছি না... বললেই বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে। আমি সেটা চাই না।”
মমতা এই অভিযোগগুলোর সপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও এ নিয়ে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে বুধবার (তেসরা জুন) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি সাইবার ক্রাইম থানায় কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের আইনজীবী রিঙ্কি চ্যাটার্জি সিং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মমতা তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ‘উসকানিমূলক’ মন্তব্য করেছেন এবং বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে যুক্ত করেছেন, যা ভারতের সার্বভৌমত্ব, জনশৃঙ্খলা এবং কূটনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রিঙ্কি সিং জানিয়েছেন যে, সোমবার (৮ই জুন) হাইকোর্ট খুললেই তিনি মমতাকে গ্রেপ্তারের জন্য আদালতে আবেদন করবেন।
এরইমধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে শুক্রবার (৫ই জুন) গৌতম বিহারী নামের এক সাংবাদিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাদি হত্যাকাণ্ড বিষয়ক মন্তব্য বিষয়ে জানতে চান। তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশ ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিনি নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু কথা বলেছেন যা বাংলাদেশের মানুষের মনে যথেষ্ট অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এমনকি সেখানকার ইসলামপন্থী কট্টরপন্থী দলগুলো ভারতের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? এ ধরণের মন্তব্য কি দুই দেশের এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?”
জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “বাংলাদেশ ইস্যুতে আমি সেই মন্তব্যটি দেখিনি গৌতমদা। তাই আসলে সেখানে কী বলা হয়েছে তা পর্যালোচনা করে আমি আপনার কাছে ফিরে আসব। তবে আমি আপনাকে বলতে চাই যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আমরা আরও শক্তিশালী করতে এবং একটি ইতিবাচক দিকে নিয়ে যেতে চাই।”
যে পরম্পরায় এই প্রেক্ষাপট
চীনের অদূরবর্তী মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র বাংলাদেশে চলতি দশকে প্রবল ভারতবিরোধী মতাদর্শের উত্থান, ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জনরোষের মুখে ভারতপন্থি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান, ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয়দান, বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির মদদপুষ্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠন; সেই সরকারের সঙ্গে ভারতকে তটস্থ রাখা চীন ও পাকিস্তানের খাতির; আওয়ামীপন্থি ও ভারতের দালাল ট্যাগ দিয়ে বাংলাদেশি হিন্দু, বাউল বা সাংবাদিক হত্যার জিগির, ঢাকায় ভারতবিরোধী জনপ্রিয় তরুণ নেতা হাদিকে গুলি করে হত্যা, দুই দেশের কূটনৈতিক স্থাপনায় মুসলিম ও হিন্দু উগ্রবাদীদের হামলা; এবং এসবের জেরে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হওয়া কূটনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে বিএনপি এবং মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করেছে।
এমনই প্রেক্ষাপটে মমতার সাম্প্রতিক বক্তব্যটি আক্ষরিক অর্থেই এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। যা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতকে একটি অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের মাঝে এখন এই ধারণা প্রবল যে, মমতার দাবি যদি সত্য হয়, তবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং এই অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্যবাদের অবসানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কীভাবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে, হাদি ইস্যুটি তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। যা এখন আর কেবল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন নয়, বরং এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থের সংঘাত এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের এক জটিল রসায়নে নিমজ্জিত।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে পরিবর্তনের হাওয়া নয়, রীতিমতো ‘সাইক্লোন’ বইছে। একাধিক ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার তথ্য উন্মোচন যতটা না ন্যায়বিচারের তাগিদ, তার চেয়ে অনেক বেশি বিজেপিকে পালটা চাপ দেওয়ার চেষ্টা। কারণ বিজেপির চাপে তিনি তখন দলীয় বিদ্রোহ এবং নেতৃত্ব সংকটের মুখোমুখি।
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসে যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, এতদিনে তা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে হাদি হত্যাকাণ্ডকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) প্রধান।
শুরুতে দলটি বিদ্রোহী দুই বিধায়ক, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করলেও বিধানসভার স্পিকার জানান, বহিষ্কারের ক্ষেত্রে দলের নিজস্ব সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় তিনি তা গ্রহণ করতে পারেননি।
মমতার হাদি-বিষয়ক বক্তব্যের পরদিনই (৩রা জুন) বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত দাবি করেন যে, তার পক্ষে ৫৮ জন বিধায়ক রয়েছেন, যা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মোট বিধায়কের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
এই পরিস্থিতি ‘হঠাৎ যদি উঠল কথা’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে বিশ্লেষক পৌলমী নাগ পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে বলছিলেন, “এর (পশ্চিমবঙ্গের) গেরুয়াকরণ, যেটা বিজেপি করতে শুরু করেছে, সেইটাকে নিশ্চিত করতে তারা এই মুহূর্তে বদ্ধ পরিকর।“ বিজেপি’র তৃণমূল কংগ্রেসকে ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে তিনি রাজনীতির এক ধরনের ‘বিকৃতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (৪ঠা জুন) কেন্দ্রীয়ভাবে সব কমিটি, সহযোগি ও অঙ্গসংগঠন এবং সাংগঠনিক পদ বিলুপ্ত করে পুনর্গঠনের ঘোষণা দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। যার ফলে কাগজে-কলমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলীয় পদও সাময়িকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
দলটি এই পদক্ষেপকে ‘আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এরই মধ্যে দলের বিদ্রোহী শিবিরের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। একটি অংশ মমতাকে নেতৃত্ব থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে চায়, অন্য অংশ তাকে ‘প্রধান উপদেষ্টা’ ধরনের একটি ভূমিকায় রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে বলে শুক্রবার (৫ই জুন) জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া।
একইদিন আরেকটি প্রতিবেদনে তারা মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফিরহাদ হাকিমের কলকাতার মেয়র পদ থেকে পদত্যাগের খবর জানিয়ে লিখেছে, “যদিও তিনি সরাসরি বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেননি, তবু ঘটনাটি তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য নতুন চাপ ও অস্বস্তির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।”
অন্যদিকে, মমতার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল, অর্থাৎ তার খেলা ‘বাংলাদেশ কার্ড’ ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে ফের এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি করেছে। মমতার দাবি যদি সত্যি হয় এবং হাদি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি দিল্লির কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার যোগসাজশ প্রমাণিত হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে? আমরা কি এক নতুন এবং রক্তক্ষয়ী আঞ্চলিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি? রাজনীতির জটিল সমীকরণ এই মুহূর্তে এমন সব কঠিন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তবে এটা এখন স্পষ্ট যে ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে হাদি হত্যাকাণ্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ চাল; যার চূড়ান্ত ফল হয়তো এই অঞ্চলের অনেক সম্পর্কের সমীকরণ শুধু নয়, বহু ভাবনার গতিপথও বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশ-ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ অন্তত ঘটনাটিকে এভাবেই দেখছেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ অবশ্য মমতার বক্তব্যের পরদিন (৩রা জুন) বলেছেন, তারা বিষয়টিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই হিসেবেই দেখছেন।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, “যিনি হেরে গেছেন তিনি বলছেন উনাদের সরকারকে উদ্দেশ্য করে। সেটা নিয়ে এখানে, বাংলাদেশে, আমার কমেন্ট করা উচিত হবে বলে আমি মনে করি না।”
বিএনপি সরকার হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সেখানে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
“আমাদের যদি এই কালপ্রিটদেরকে ফেরত আনতে হয়, তাদেরকে কিন্তু ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমেই ফেরত আনতে হবে।…আমরা কাজ করছি, খুবই সিরিয়াসলি, এবং এটা কিন্তু এগিয়েছে, বেশ ভালো এগিয়েছে।”
তবে সেদিনই সংবাদ সম্মেলন ডেকে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের প্রশ্ন তোলেন, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যদি সেই খুনিদের তথ্য গোপন রাখতে বলেন, সেই সরকারের সাথে সমঝোতা করে খুনিদের ফিরিয়ে আনা কতটা বাস্তবসম্মত? তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক মাস আগে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিলেন এবং ভারত হাদির খুনিদের ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
“বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যেই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, খুনিদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে, এইটা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতাগামী জনগণকে এই খুনের বিচার থেকে, এই লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে রাখবার জন্যই,” উল্লেখ করে জাবের বলেন, “নয়তো যেই অমিত শাহের নাম একদম সরাসরি এই খুনের সাথে জড়িত হয়েছে তার সাথে বৈঠক করে খুনি ফিরিয়ে আনা হইতেছে এটা তো পাগলেও বিশ্বাস করবে না।
“আমরা স্পষ্ট তারিখ চাই যে আর কতদিনের মধ্যে সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই খুনিদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
যে আলাপ প্রাসঙ্গিক
সেদিনই প্রবাসী সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং এই প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের বিষয়ে বলেছেন, “এটা ‘আনফরচুনেটলি’ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে।
“এটা একটা ‘লিগ্যাল ইস্যু’ এবং অন্তর্বর্তী সরকারও এ ব্যাপারে ‘ইনভেস্টিগেশন’ করছিল এবং ‘জুডিশিয়াল প্রসেস’ এগোচ্ছিল…আমি নিশ্চিত যে বর্তমান সরকারও তাই করবে।”
সাবেক কূটনীতিক তৌহিদ আরও বলেন, “এটা একটা ‘ইমোটিভ ইস্যু’ ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে…আমরা অবশ্যই চাই প্রকৃত অপরাধী যে, সে ‘আইডেন্টিফাইড’ হোক, ধরা পড়ুক, এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হোক জুডিশিয়াল প্রসেসের মাধ্যমে।”
তার আগে সেদিনই ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব জাবের হত্যা মামলাটির তদন্ত অগ্রগতি নিয়েও অসন্তোষ জানান।
প্রতিবেদন দাখিলের সময় ১৪ থেকে ১৫ বার বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা এই মামলাটিকে কোনোভাবেই ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়ের হওয়া সাংবাদিক সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার মতো ‘মিস্টিরিয়াস কেইস’ হতে দেবে না।
একইদিন সাগর-রুনি এবং হাদি—উভয় মামলার আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির স্টার নিউজ নামের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে বলেন, “সাগর-রুনি হত্যায় প্রথম যখন মামলাটা আমার কাছে আসলো, তখন ‘আই ওয়াজ সারপ্রাইজড টু সি’ যে কোথাও এক জায়গায় ঠেকে যায়...একই জিনিস হাদি হত্যার ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়।”
অ্যাডভোকেট শিশির মনির , যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতা, তিনি আরও বলেন, “এমন গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা পিছন থেকে এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত যে, নামগুলো পাবলিকলি আসুক তা অনেকেই চান না, অনেকেই ধামাচাপা দেন। ‘ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজমের’ (তদন্ত প্রক্রিয়ার) ভিতরে ‘ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি’ কিংবা কোন গোয়েন্দা সংস্থার লোক যদি এগুলোর সঙ্গে ‘ডাইরেক্টলি-ইনডাইরেক্টলি’ জড়িত থাকে তখন ‘প্রসেস অটোমেটিক্যালি স্লো’ হয়ে যায়।”
দৈনিক কালের কণ্ঠের একটি আয়োজনে আলোচনাকালে সাবেক সংসদ সদস্য ও লেখক গোলাম মাওলা রনি বলেছেন, “এই হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছে তারা এই পাপটা হজম করতে পারছে না। প্রকৃতি এটা প্রকাশ করে দিচ্ছে এবং খুব দ্রুত দেখবেন যে ‘ডে বাই ডে’ এই নামগুলো সামনে চলে আসবে।
“তাদের নামগুলো যদি সামনে চলে আসে বিশ্বাস করেন, আরেকটা গণঅভ্যুত্থান, আরেকটা গণরোষ, শুধু অনিবার্য নয়; ওই লোকগুলোকে আমাদের এই যুবক সমাজ, তারা দেখবেন রাস্তায় ফেলে গলার উপর পাড়া দিয়ে, তাদের জিহ্বা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলবে।”
ইনকিলাব মঞ্চের জাবেরের ভাষ্য, “এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট বিষয় যে শহীদ ওসমান হাদির খুনের সাথে ভারত এবং তার গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে ।”
মমতার ভাষ্য আলোচনায় এনেছে হামলার পর নিহতের বোন মাসুমা বেগমের এক আবেগঘন তীক্ষ্ণ উক্তিও।
হাদির উপর হামলার পরপরই তিনি বলেছিলেন, “দেশপ্রেমিকরা এই দেশে বেঁচে থাকতে পারে না। ভারত তাদের বাঁচতে দেবে না।
“হাদির শত্রু অনেক, কারণ এ দেশে অসংখ্য ’র’ এজেন্ট আর আওয়ামী লীগের দোসররা ঘোরে।”
জাবেরের দাবি, আওয়ামী লীগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আধিপত্যবাদ কায়েম করা ভারতের জন্যও একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শহীদ ওসমান হাদি।
“ভারতের সাথে সাথে যারা এই বাংলাদেশে বসে আমাদেরকে এই খুনের সাথে সম্পৃক্ত করে খুনিদেরকে ‘সেইফ এক্সিট’ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারাও এই খুনের সাথে জড়িত রয়েছে,“ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে মাত্র একদিন পরই শুক্রবার (৫ই জুন) সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে হাদির বোন মাসুমা প্রশ্ন তোলেন, “কার কাছে বলছে কে বলছে যে, আমরা (পরিবারের সদস্যরা) নিরাপত্তার জন্য বাদী হতে চাই না। কার অনুমতি নিয়ে জাবের মামলার বাদী হলো?”
সেই পোস্টে তিনি আরও লিখেছেন, “আমি আমার ভাইয়ের মামলার বাদী নিয়ে কিছুই বলতে চাচ্ছিলাম না। কারণ এর চেয়েও অনেক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র চলছে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে।“
মমতার বক্তব্যের পর ওসমান হাদির ভাই ওমর বিন হাদির একাধিক ফেইসবুক পোস্ট নিয়ে চলমান বিতর্কে অংশ নিয়ে মাসুমা আরও লিখেছেন, “ওসমান গণির রক্তে ওমর ফারুক রক্তাক্ত ছিল। কারণ একই রিকশায় দুই ভাই। বুলেট যদি আর একটা বের হতো ওমর হাদিও ওখানেই আমার ওসমান গণির মতো হয়ে যেতো। ওমরের গায়ে, পোশাকে, এমনকি ওর হাতে যে ঘড়িটা ছিল, সেটিতেও ওসমান গণির রক্তের দাগ শুকিয়ে ছিল।“
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “প্রশাসনের লোক এভারকেয়ারে এসে জাবেরের কাছ থেকে সাইন নিল কেন? আর আমি উপস্থিত থাকাকালীন জাবের সাইন দিবে কেন? এ নিয়ে আমি বহুবার প্রশ্ন করেছি।“
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া ওমর বিন হাদি মমতার বক্তব্য চাউর হওয়ার পরপরই (২রা জুন) একটি পোস্টে লিখেছিলেন, “শহীদ ওসমান হাদির খুনের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি মন্ত্রী সরাসরি জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাদি হত্যার সাথে জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করুন। হাদি হত্যার বিচার না করলে আপনাকেও এরা হত্যা করবে।“
হাদি হত্যার বিচার বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য ‘রেড লাইন’ বলেও সেই পোস্টে মন্তব্য করেন ওমর।
তার কিছুক্ষণ পর ওমর আরেকটি পোস্টে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের একজন ব্যক্তিগত সহকারীকে হাদি হত্যার জন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, “শহীদ ওসমান হাদি হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরিতে আমিরে জামাতের একজন ‘পিএস’ জড়িত। হাদিকে ঢাকা-০৮ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রেসার দিছে আমাদের।”
পরদিনই (৪ঠা জুন) আরেকটি পোস্টে ওমর হাদি বলেন, “শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলা তদন্তাধীন থাকায় আমার পোস্ট প্রত্যাহার করে নিলাম। তবে হাদিকে হত্যার পূর্বে এবং পরে হাদির সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল এই বিষয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা এবং তদন্ত আবশ্যক। বিপ্লব-পরবর্তী একজন বিপ্লবীকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে এর দায় সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো এড়াতে পারে না।“
তিনি আরও লেখেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্টেটমেন্ট অনুযায়ী ভারত সরকার হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িত। তবে এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা। কারা শুটারকে জেল থেকে বের করল? কারা অর্থ দিল? এবং পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করল? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, হাদির খুনিরা যত শক্তিশালী হোক আপনি তাদের বিচারের মুখোমুখি করুন।”
ওমরের প্রথম দুটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়া ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব জাবের সাংবাদিকদের বলেন, “তিনি কেন এমন পোস্ট দিয়েছেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
“আমার জানা মতে, বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই তার সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে নেগোসিয়েশন করেছে।“
যে পথে গড়িয়েছে ঘটনা
২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর, শুক্রবার। ঘড়িতে তখন দুপুর ২টা ২৫ মিনিট। ঢাকার বিজয়নগর এলাকার বক্স কালভার্ট রোড সংলগ্ন ওয়াটার ট্যাংক এলাকায় এক সুপরিকল্পিত হামলার শিকার হন হাদি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই আততায়ী হাদিকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি ছুঁড়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকার হাসপাতাল থেকে পরে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ই ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
তার মৃত্যু জন্ম দেয় এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের। ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদপত্র, দৈনিক প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা এই দুইটি গণমাধ্যমকে ‘ভারতপন্থি’ হিসেবে অভিযুক্ত করে ভবনের কাঁচ ভাঙচুর করে, আসবাবপত্র রাস্তায় বের করে আগুন ধরিয়ে দেয়, আগুন দেওয়া হয় ভবনগুলোর ভেতরেও এবং কার্যালয়ে কর্মীদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। ডেইলি নিউ এইজ পত্রিকার সম্পাদক এবং সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরও হাদির সমর্থকদের ক্ষোভের মুখে পড়েন। বিক্ষোভকারীরা তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও ধাক্কাধাক্কি করে।
এই পুরো সংকটে পিনাকী ভট্টাচার্য এবং ইলিয়াস হোসেন নামে দুজন প্রবাসীস ইনফ্লুয়েন্সারদের ভূমিকাও ওই সময়ে নজর কাড়ে। ফ্রান্স এবং আমেরিকার মাটিতে বসে তাদের ‘ডিজিটাল ইনসাইটমেন্ট’ অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে উসকানিমূলক মন্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছিল।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) পরদিন ১৯এ ডিসেম্বরেই মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের ব্যাপারে একটি চিঠি পাঠানোর কথা জানায়। তবে পিনাকী ও ইলিয়াসের অনুসারীরা সেক্যুলার লেখক, সাংবাদিক ও শিল্পীদের ‘আওয়ামী লীগের এজেন্ট’ বা ‘ভারতীয় দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ওপর হামলার উসকানি দিয়ে আসছে। হাদির মৃত্যুর পর বিক্ষোভকারীরা ছায়ানট ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর লক্ষ্য করেও হামলা চালায়।
একই সময়ে চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনে একদল বিক্ষোভকারী হামলা চালায়। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা হাইকমিশনের কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ছে। এ ছাড়া রাজশাহী ও খুলনায় ভারতীয় মিশনের কাছেও বিক্ষোভ মিছিল হয়।
এর আগে ১৭ই ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করে এবং কড়া প্রতিবাদ জানায়। পরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা ঘটনায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কারণ দেখিয়ে ভারত তাদের নির্দিষ্ট কিছু ভিসা সেন্টারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। একই সময়ে দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক হাদি হত্যাকাণ্ডের একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানান। তার আগে যেদিন সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে হাদির মৃত্যু হয়, সেদিনই ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামের এক হিন্দু শ্রমিককে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনার সূত্র ধরে দিল্লির চাণক্যপুরী এলাকায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ২০–২২ ডিসেম্বর ধারাবাহিক বিক্ষোভ করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। তখন বাংলাদেশ হাইকমিশনগুলোও ভিসা আর কনস্যুলার সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে। কারণ দিল্লির ঘটনাটি ছিল বড় ঢেউয়ের অংশ। কলকাতা, শিলিগুড়ি ও ভারতের অন্যান্য শহরেও একই সময় বাংলাদেশ-বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল।
পরবর্তীতে পুলিশ দাবি করে যে হাদির ঘাতকরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। শুরু থেকেই গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে দিল্লির সংবাদমাধ্যমগুলো বলছিল, ভারত সরকার তাদের উপস্থিতির কথা স্বীকার করছে না।
পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রধানের দিল্লি সফরের সময় পেশ করা নিরেট তথ্যের চাপে তারা নতি স্বীকার করে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন মাস পর, চলতি বছরের ৯ই মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ শাখা এসটিএফ বনগাঁ সীমান্তে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হাদি হত্যাকাণ্ডে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছে। এর ফলে ভারতের সেই প্রাথমিক অস্বীকার কেবল অপ্রাসঙ্গিকই হয়নি, বরং তা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এক্ষেত্রে বিএনপি-বিজেপির কী কূটনৈতিক দরকষাকষি হয়েছে তা প্রকাশ্যে না এলেও এই ঘটনাটি যে দুই দেশের গোয়েন্দা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে একটি বিশাল টার্নিং পয়েন্ট।
যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আইনের তোয়াক্কা না করেই একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। তবে গণরোষে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পর ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাথে বাংলাদেশের প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সম্পর্কের দূরত্ব ক্রমশ বেড়েছে।
বিএনপিতে আগ্রহ, না ব্যবসায়
সাম্প্রতিক আলাপে পশ্চিমবঙ্গের বিজ্ঞাপন ব্যক্তিত্ব ও বিজেপি সমর্থক অংশুমান চ্যাটার্জি এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, “আমরা যেটা দেখেছি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের একটা খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ সুসম্পর্ক ছিল। যে কোনো কারণেই হোক ২০২৪-এর আগস্টের পরে বোঝাই গেছে যে খুব তাড়াতাড়ি আওয়ামী লীগ পাওয়ারে ফিরতে পারবে না; এবং যে ইন্টেরিম পিরিয়ড (অন্তর্বর্তী সরকার) ছিল, তাদের ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল না; সেটা ‘ডিপ স্টেট’ বা আমেরিকার ইনফ্লুয়েন্স, যে কারণেই হোক।“
তার মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের ক্ষমতাসীনরা যে বিএনপির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগী হচ্ছে, তা তারেক রহমানের প্রতি তাদের নমনীয় বা সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। অংশুমানের ধারণা, তারেক রহমানকে যদি বিজেপি বা ভারত কমপ্লিট সাপোর্ট না দিত, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এত সহজে অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হতো না।
তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতিবেশী কোনো দেশে একজন রাজনীতিককে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের পথে হেঁটেছে ভারত—জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী ।
এই নিয়োগের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাবেক কূটনীতিক ফয়সাল মাহমুদ এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ভারত সাধারণত অন্যান্য দেশে পেশাদার বা ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাটদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে বাংলাদেশে এবার একজন 'রাজনৈতিক হেভিওয়েট' ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে তৃণমূল ছেড়ে যোগ দেন বিজেপিতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ফয়সালের মতে, একজন ‘পলিটিক্যাল হেভিওয়েটকে’ হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর অর্থ হলো ভারত এখন আমলাতান্ত্রিক প্রটোকল ছাপিয়ে সরাসরি বিএনপি ও তারেক রহমানের সাথে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।
তবে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই পক্ষের সম্পর্কে একটি স্থায়ী কাঁটা হয়ে আছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি চাপ দিল্লির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা গত মাসেও যখন ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘মাথা উঁচু করে’ ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন, তখন বাংলাদেশের আইনি বাস্তবতায় তার সেই পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ। গত নভেম্বরে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে।
এপ্রিলে পাস হওয়া অ্যান্টি-টেররিজম (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট অনুযায়ী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম কেবল নিষিদ্ধই হয়নি, বরং অনলাইনে তাদের প্রচারণাও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। দৃশ্যত এই মুহূর্তে ভারতে বসে শেখ হাসিনা বা যেকোনো আওয়ামী লীগ নেতার করা প্রতিটি অনুশোচনাহীন মন্তব্য বাংলাদেশে নতুন নতুন ভারত-বিদ্বেষী ন্যারেটিভ জন্ম দিচ্ছে। এমন মুহূর্তে হাদি হত্যায় ভারত সরকারের জড়িত থাকার ‘আভাস’ আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক শক’ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব যেভাবে বাড়ছে তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে এখন হাদির হত্যাকারীদের শুধু বিচার করাই নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জাগাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বাড়ানোর গুরুত্বও নতুন করে তৈরি হয়েছে।
যদিও ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী নয়, বরং আদানি-আম্বানি গোষ্ঠীর মতো করপোরেট জায়ান্টদের জন্য এটি একটি ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’। মূলত শেখ হাসিনা শাসনের অবসায়নের পর ভারত যে পরিমাণ আর্থিক ও রাজনৈতিক পুঁজি হারিয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে দিল্লি এখন মরিয়া।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বন্ধুস্থানীয় ব্যবসায়ী গৌতম আদানিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি বড় ‘ফ্যাক্টর’ উল্লেখ করে গত বছরের নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাংবাদিক অতনু সিংহ এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, “দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমান বা শেখ হাসিনার প্রতি কোনো আবেগীয় টান নেই। তাদের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা।“
তার মতে, বাংলাদেশের কোনো সরকার যদি তাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব দিল্লির করপোরেট বা রাজনৈতিক আধিপত্যের কাছে বিকিয়ে দিতে রাজি হয়, তবে দিল্লি সেই সরকারকেই সমর্থন দেবে; সেটা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াত—যে দলই হোক না কেন।
“যদি ভবিষ্যতে কোনো সরকার দিল্লির সাথে এমন আপস করে, তবে ভারত এমনকি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করে দিতেও দ্বিধা করবে না।”
আদানির ১৬০০ মেগাওয়াট গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে বছরে অতিরিক্ত ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার গুনতে হচ্ছে। শেখ হাসিনার পতনের পর আদানি গ্রুপ ডক্টর ইউনূসের কাছে তাদের ৮০০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য চিঠি লিখেছিল।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে সেখানকার গবেষক ও লেখক নজরুল আহমেদ জমাদার বলেন, ভারত বর্তমানে একটি ‘ডিপ স্টেটে’ পরিণত হয়েছে, যার নেপথ্যে রয়েছে চার-পাঁচটি বিশাল করপোরেট হাউস। সেগুলোর অনেক মালিক এখন এশিয়া, এমনকি দুনিয়ার অন্যতম ধনী। তাদের স্বার্থ, বিশেষ করে আদানির মতো বিজেপি-ঘেঁষা ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক লক্ষ্যই বর্তমানে ভারতের বাংলাদেশ নীতি নির্ধারণ করছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে আমেরিকার সাথে অস্বাভাবিক তড়িঘড়ি করে করা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য চুক্তিটি ভারতের সংকটে অন্য একটি মাত্রা যোগ করে। যদিও ইউনূস সরকারের এই চুক্তিটিকে বর্তমান সরকারের জন্য একটি নীতিগত ভিত্তি বা উত্তরাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সেই সরকারের উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের মতে, শেষ মুহূর্তে এই চুক্তি সই করা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কেবিনেটে কিছুটা দ্বিমত ছিল, তবুও ড. ইউনূস এটি সম্পন্ন করেছিলেন।
তৌহিদের দৃষ্টিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এবং পূর্ববর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য—উভয় দিকই বিদ্যমান। ইউনূস সরকার চীন, পাকিস্তান, তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্টতা বৃদ্ধি ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ভারসাম্য রক্ষার যে নীতি শুরু করেছিল, বর্তমান সরকারও সেই পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। তবে তারেক রহমানের প্রতি ভারতের বিজেপি সরকারের নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্ক ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।