নৃবিজ্ঞানী ও লেখক মার্গারেট মিডকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের সভ্যতার প্রথম চিহ্ন কোনটি? জবাবে মাটির পাত্র, মাছ ধরার বড়শি বা পাথরের কোনও অস্ত্রের কথা না বলে মার্গারেট উত্তর দিয়েছিলেন, সভ্যতার প্রথম চিহ্ন হলো ভেঙ্গে যাওয়ার পর জোড়া লাগা আদিম মানুষের একটি পায়ের হাড়।
কিন্তু কেন এই হাড়টি এত গুরুত্বপূর্ণ? ভাঙা হাড়টি ছিল এমন কোনও ব্যক্তির যিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। আদিম জগতে এই অবস্থায় টিকে থাকা ছিল প্রচণ্ড কঠিন। কোনো প্রাণী যদি তার পা ভেঙে ফেলে, তবে সে আর শিকার করতে, খাবারও সংগ্রহ করতে, এমনকি বিপদ থেকে বাঁচতে পারে না। বন্য পরিবেশে সেই প্রাণীর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত।
কিন্তু আদিম মানুষের সেই হাড়টি জোড়া লেগেছিলো। এর অর্থ আহত সেই মানুষটি বেঁচে ছিলো দীর্ঘদিন। সুস্থও হয়ে উঠেছিলো। দীর্ঘ এই সময় সেই ব্যক্তি নিজে খাবার সংগ্রহ করতে পারেননি। তাকে খাবার দিয়েছে অন্য কেউ, তাকে রক্ষা করেছে। সুস্থ হওয়া পর্যন্ত পাশে থেকে কেউ তার সেবা করেছে।
সাধারণত সভ্যতাকে মাপা হয় বড় বড় স্থাপত্য, প্রযুক্তি বা জ্ঞান দিয়ে । কিন্তু মার্গারেটের মতে, সভ্যতা শুরু হয়েছে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে। যখন কোনো গোষ্ঠী বা দল একজন অসহায় সদস্যকে ফেলে না গিয়ে তাকে সুস্থ করার দায়িত্ব নেয়, তখনই প্রকৃত অর্থে জন্ম হয় সমাজের। এটি ছিলো বিবর্তনের ইতিহাসে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামষ্টিক দায়িত্ববোধের প্রথম বড় প্রমাণ।
মার্গারেট মিডের বলা সভ্যতার এই মাপকাঠিতে বাংলাদেশ, সর্বোপরি বর্তমান পৃথিবীকে দেখলে সম্পূর্ণ বিপরীত এক ছবি ভেসে ওঠে।
সম্প্রতি ঢাকা শহরে এক সপ্তাহে উদ্ধার হয়েছে তিনটি অর্ধগলিত লাশ। নূর জাহান বেগমের সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত, সমাজে প্রতিষ্ঠিত। যুগ্ম সচিব, বুয়েটের শিক্ষক ও কানাডা প্রবাসী। তিন স্বচ্ছল সন্তান থাকার পরও তার শেষ যাত্রা ছিলো নিঃসঙ্গ, একাকী।
নূর জাহান বেগমের মতই একা থাকতেন সেলিনা আফরোজ। পল্লবীর ফাঁকা ফ্ল্যাটে অর্ধগলিত মায়ের কোন খোঁজই জানতেন না তার কানাডায় প্রবাসী দুই সন্তান।
সমাজের চোখে ‘সফল’ তানভীর হোসেইন শুভ দীর্ঘদিন একাকী জীবন যাপন করছিলেন। মৃত্যুর অনেকদিন পরে ফ্ল্যাট থেকে গন্ধ বের হলেই কেবল জানা যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত এই পরিচালকের মৃত্যুর কথা।
নূর জাহান বেগম বা সেলিনা আফরোজের সন্তান বা স্বজনরা উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। তাদের আর্থিক বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও আছে। কিন্তু হারিয়ে গেছে 'পারস্পরিক নির্ভরতা' বা 'দায়বদ্ধতা'র বোধ।
মার্গারেট মিডের উপাখ্যানে যে 'দল' বা 'কমিউনিটি'র কথা বলা হয়েছে, তানভীরের মতো একা ও মানসিক অবসাদে ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে সেই ‘কমিউনিটি’ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
‘কম্প্যাশনেট সোসাইটি’র ধারণা থেকে সমাজ আজ উল্টো পথে হাঁটছে। আধুনিক মানুষ এতটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক যে, এমনকি পরিবারের মানুষের জীবন বা মৃত্যুর খবরও অনেকেই রাখছে না।
এই ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয় যে, বিবর্তনের ধারায় প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও, মানবিক মূল্যবোধের বিচারে আধুনিক মানুষ হয়তো আদিম সমাজের চেয়েও অনেক অনেক পিছিয়ে।
সবাই মিলে ‘একা’
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্যারাডক্সগুলোর একটি হলো, মানুষ পরস্পরের সাথে ইতিহাসে যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি সংযুক্ত অথচ সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে তারা একটি বোতাম টিপেই পৃথিবীর অপর প্রান্তের মানুষের সাথে যুক্ত হতে পারছে। অথচ কথা বলার মানুষের অভাব মানুষকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এখন আর একাকীত্বকে ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা মানতে রাজি নয়। তারা এটিকে দেখছে একটি বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে।
মেটা-গ্যালপ এবং গ্লোবাল স্টাডিজ যৌথভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক সংযোগ বিষয়ক সমীক্ষা চালায়। বিশ্বের ১৪২টি দেশের ওপর পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রতি ৪ জনে ১ জন তীব্র একাকীত্বে ভুগছেন। সংখ্যার হিসাবে এটি ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ। ১৯ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এর হার ২৭ শতাংশ। যেখানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই মাত্র ১৭ শতাংশ।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইস এর অধীনে স্কুল অব পাবলিক হেলথ এক গবেষণা পরিচালনা করে। ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ ৮টি দেশে প্রায় ৮ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যারা একাকীত্বে ভোগেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩ গুণ এবং এনজাইটির ঝুঁকি প্রায় ৪ গুণ বেশি।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ‘সিগনা’র লোনলিনেস ইনডেক্সে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত বা প্রায়শই একাকীত্ব অনুভব করেন। তিন দশকে সেখানে মানুষের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা ৪ জন থেকে নেমে এসেছে ২ জনে। আমেরিকার প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের বাস্তব জীবনে কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই।
কদোকুশি: চূড়ান্ত একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতম মৃত্যু
জাপানের সমাজব্যবস্থায় এক গভীর সংকট ও উদ্বেগের নাম কদোকুশি। সেখানে কোনো কোনো ব্যক্তি সম্পূর্ণ একা, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবহীন অবস্থায় বসবাস করে। এক সময় তারা নিজ ঘরে একাকী মারা যায়। মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন, কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত কেউ জানতেও পারে না তাদের মৃত্যুর খবর। সাধারণত ঘর থেকে দুর্গন্ধ বের হলে বা ঘরের বাইরে চিঠিপত্রের স্তূপ জমলেই কেবল টের পান প্রতিবেশীরা।
জাপানের ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে পঁচাত্তর হাজারের বেশি মানুষ নিঃসঙ্গ অবস্থায়ত মৃত্যুবরণ করেছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ মরদেহ উদ্ধার হয়েছে মৃত্যুর আট দিন বা তার বেশি সময় পর। সাত হাজারের বেশি দেহ আবিষ্কার করতে সময় লেগেছে এক মাসেরও বেশি।
বাংলাদেশ কি পরবর্তী জাপান
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো কি জাপানের মতো হতে চলেছে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করতে হবে।
জাপানে গত কয়েক দশকে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বা 'নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি' তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও বড় শহরগুলোতে একক পরিবারের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে যা ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর 'স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস' রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা ছিল ৫.৬ জন। ২০২৪-২৫ সালের নাগাদ এই সংখ্যা কমে প্রায় ৪ এর নিচে নেমে এসেছে।
জাপান বিশ্বের অন্যতম বয়স্ক মানুষের দেশ। বাংলাদেশেও জন্মহার কমে যাওয়া এবং গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জনমিতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে একটি 'বার্ধক্যনির্ভর' সমাজে পরিণত হবে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের 'ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস' অনুযায়ী, এই সংখ্যা হবে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ।
ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের 'গেটেড কমিউনিটি' বা ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। একইসাথে জাপানের মতো বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানদের একটি বড় অংশ বিদেশে স্থায়ী হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে একা থেকে যাচ্ছেন বাবা-মা।
তবে জাপানের সাথে বাংলাদেশের সমাজের আছে চোখে পড়ার মতো কিছু বৈসাদৃশ্য।
জাপানের সমাজ অনেকটা ধর্মনিরপেক্ষ। অন্যদিকে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে এখনো ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন টিকে আছে। পাড়ার মসজিদে বা পরিচিতদের মধ্যে এখনো একে-অপরের খবর নেওয়ার একটা ন্যূনতম সুযোগ থাকে, যা জাপানে অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।
জাপানিরা 'মেইওয়াকু' বা 'অন্যকে কষ্ট না দেওয়ার' সংস্কৃতি থেকে একা মরতে পছন্দ করে। বাঙালি সংস্কৃতিতে এখনো বয়স্করা সন্তানদের সাথে থাকার আশা করে এবং একা থাকতে ভয় পায়।
জাপান একটি উচ্চ আয়ের দেশ। সেখানে বয়স্কদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। বাংলাদেশে সেই সুরক্ষার অভাব প্রকট। এখানে বয়স্করা অনেকাংশে সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশে 'একাকী মৃত্যু'র ঘটনাগুলো যতটা না বয়স্কদের স্বনির্ভরতার চেয়ে সন্তানদের অনুপস্থিতি কারণে ঘটছে।
বাঙালি সমাজের ভাঙ্গন ও একাকীত্বের উত্থান
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের সমাজ একটি 'ট্রানজিশনাল পিরিয়ডয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে যৌথ পরিবারের ঐতিহ্য ভেঙে একক পরিবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা প্রশস্ত করছে একাকীত্ব ও 'কদোকুশি'র মতো ঘটনার পথ।
বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিদেশে বা রাজধানী শহরকেন্দ্রিক। ‘আর্থ-সামাজিক গতিশীলতা’ ও নগরায়ণ বদলে দিচ্ছে মানুষের সম্পর্কের ধরণ। যৌথ পরিবারের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পড়ায় বয়স্করা গণ্য হচ্ছেন ‘বাড়তি বোঝা’ হিসেবে।
তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজতর করেছে ঠিকই, কিন্তু এর বিপরীতে তৈরি করছে এক গভীর সামাজিক শূন্যতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান আলাপ-কে বলেন, ‘ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে আমরা যোগাযোগ সহজ করেছি ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি সম্পর্কের গভীরতা’। তার মতে, সশরীরে উপস্থিত হওয়ার যে আবেগ, বাবা-মায়ের সন্তানদের দেখার যে তৃষ্ণা, ভার্চুয়াল মাধ্যমে তা কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি ফ্ল্যাটে একা থাকা ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঘটনাকে ‘সামাজিক সম্পর্কের চরম দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন রাশেদা রওনক খান। সমাজকাঠামো এই অবস্থায় আসার পেছনে চরম পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রভাব দেখছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক চরম পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় বাস করছি, যেখানে ‘অর্থ’ই একমাত্র আইডেন্টিটি হয়ে দাঁড়িয়েছে’। অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্ট্যাটাস সিম্বলের লড়াই এবং সারাক্ষণ নিজেকে প্রমাণের চাপে মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছে যে, পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর বিপদে দাঁড়ানোর অবকাশটুকুও তারা হারিয়ে ফেলেছে। কোনো সমাজে অর্থনৈতিক আইডেন্টিটি মানবিকতার চেয়ে বড় হয়ে উঠলে সেই সমাজের সম্পর্কগুলো ‘ছিন্নভিন্ন হওয়া অনিবার্য’ বলে মত এই শিক্ষকের।
একইসাথে পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘পরিবারের ভেতরেই এখন বিচ্ছিন্নতার দেয়াল তৈরি হয়েছে’। মা-বাবা কর্মব্যস্ত থাকায় সন্তানেরা বেড়ে উঠছে ভিন্ন এক ডিজিটাল জগতে। যা তাদের দীর্ঘমেয়াদে চরম বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
একাকীত্বের সমাজতাত্ত্বিক কারণ
আধুনিক মানুষের এই একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বর্তমান সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির এক জটিল পরিণতি।
আধুনিক সমাজে একাকীত্ব বৃদ্ধির একটি বড় হলো সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন। সমাজ যখন খুব দ্রুত অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে যায়, তখন মানুষের পুরনো সামাজিক মূল্যবোধ ও ‘কালেকটিভ কনশাসনেস’ ভেঙে পড়ে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ইমিল ডুর্খেইম তার বই ‘সুইসাইড’য়ে এই অবস্থার নাম দেন 'অ্যানোমি'। অ্যানোমিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তি চরম হতাশার শিকার হয়। সমাজ তখন মানুষকে সঠিকভাবে দিক-নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে ব্যক্তি একা এবং সমাজের সাথে বন্ধনহীন অনুভব করে।
আধুনিক সমাজে কোনো কিছুই আর স্থায়ী নয়। চাকরি, সম্পর্ক, পরিচয় সবকিছুই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। এই 'তরল' অবস্থায় মানুষ কোনো দীর্ঘমেয়াদী বন্ধনে জড়াতে ভয় পায়। পোলিশ সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউম্যান তার ‘লিকুইড মর্ডানিটি’ বইয়ে লিখেছেন, সম্পর্কগুলো এখন হয়ে গেছে 'নেটওয়ার্কিং'। যা সহজেই যুক্ত করা ও ছিঁড়েও ফেলা যায়। ফলে মানুষ অন্য মানুষের সাথে সাময়িকভাবে যুক্ত থাকলেও মানসিকভাবে চরম একা।
সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম তার ‘বোলিং অ্যালোন: দ্য কলাপস এন্ড রিভাইভাল অব আমেরিকান কমিউনিটি’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে গত কয়েক দশকে মানুষের সামাজিক পুঁজি এবং নাগরিক সম্পৃক্ততা ধসে পড়েছে।
পুটনাম লক্ষ্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রে আশির দশকের তুলনায় নব্বইয়ের দশকে বোলিং খেলোয়াড়ের সংখ্যা ব্যাপক বাড়লেও দলগতভাবে খেলার প্রবণতা মারাত্মকভাবে কমেছিলো। মানুষ দলগতভাবে না খেলে একা একা বোলিং করতে শুরু করে।
পুটনামের মতে, এই ‘একা বোলিং করা’ আধুনিক সমাজের প্রতীক। মানুষ এখন ধর্মীয় সংগঠন, ক্লাব, পাড়া-মহল্লার সমিতি এবং স্বেচ্ছাসেবক দলগুলো থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ‘পারস্পরিক বিনিময়ের নিয়ম’ হারিয়ে যাচ্ছে, যা মানুষকে চরম একাকীত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
‘নব্য-উদারতাবাদ’ ও ‘একাকীত্বের অর্থনীতি’
একাকীত্ব কেবল সামাজিক পরিবর্তনের ফল নয়, এটি আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও একটি অবধারিত উপজাত। নব্য-উদারতাবাদী পুঁজিবাদ মানুষকে চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী করে তুলেছে।
বিচ্ছিন্নতার অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত ব্যাখ্যায় সবচেয়ে প্রভাবশালী তত্ত্বটি দিয়েছেন কার্ল মার্ক্স। তার ‘ইকোনমিক এন্ড ফিলোসফিক্যাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ বইয়ে তিনি মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধকে একটি গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন।
মার্ক্সের মতে, বিচ্ছিন্নতা কেবল কোনো মানসিক বা আধ্যাত্মিক অসন্তোষ নয়, এটি পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার একটি প্রত্যক্ষ ও অনিবার্য পরিণতি। এই ব্যবস্থা মানুষকে তার উৎপাদিত পণ্য, উৎপাদন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তার নিজস্ব প্রজাতিগত সত্তা থেকেও।
মার্ক্সের মতে, অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের মূল তফাত হলো, মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই স্বাধীন, সচেতন এবং সৃজনশীলভাবে উৎপাদন করতে ভালোবাসে। কিন্তু পুঁজিবাদ তার এই সহজাত সৃজনশীলতাকে কেড়ে নেয়। এই ব্যবস্থায় ‘কাজ’ করার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় কেবল টিকে থাকা বা টাকা উপার্জন করা। ফলে মানুষ হারিয়ে ফেলে তার প্রকৃত মানবিক সম্ভাবনা, কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা। নিজের ‘প্রজাতিগত সত্তা’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিণত হয় এক প্রকার যান্ত্রিক জীবে।
অর্থনীতিবিদ নোরিনা হার্টজ যুক্তি দেন যে, ১৯৮০ এর দশক থেকে শুরু হওয়া নব্য-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি মানুষকে শুধু 'ভোক্তা' হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই নীতি সমাজ বা সামষ্টিক কল্যাণের চেয়ে ‘ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা’ এবং ‘স্বার্থপরতাকে’ বেশি প্রাধান্য দেয়।
যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের একটি বিখ্যাত উক্তিকে আধুনিক সমাজ ও অর্থনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘ওম্যানস ওন’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজ বলে আসলে কিছু নেই। আছে কেবল একজন পুরুষ, নারী আর তাদের পরিবার’।
আধুনিক পুঁজিবাদী কাঠামো মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে আন্তরিক বা মানবিক হতে দেয় না। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সাথে থাকা সম্পর্কগুলোও শেষ পর্যন্ত টাকা-পয়সা, লাভ-ক্ষতির সম্পর্কে রূপ নেয়।
মানুষের এই চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতাকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ফ্রাঞ্জ কাফকা। তার ‘কাফকায়েস্ক’ পরিস্থিতি হলো আধুনিক যান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক সমাজের এক চরম বাস্তব রূপক।
দ্য মেটামরফোসিস গল্পের প্রধান চরিত্র গ্রেগর সামসার পোকায় রুপান্তরিত হওয়া আধুনিক মানুষের প্রতীক। গ্রেগর যতদিন পরিবারের জন্য টাকা আয় করছিল, ততদিনই সে মূল্যবান ছিল। পোকা হওয়া অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে ‘অকেজো’ হওয়ার পর পরিবার ও সমাজে চূড়ান্ত অবহেলিত হয় গ্রেগর। মারা যায় চরম একাকীত্বে।
পুঁজিবাদ এমনকি মানুষের এই চূড়ান্ত একাকীত্বকেও বাণিজ্যিকীকরণ করেছে। বাজারে গড়ে উঠেছে লোনলিনেস ইকোনমি বা 'একাকীত্বের অর্থনীতি'। অনেক দেশে একা একা খাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে বিশেষ রেস্তোরাঁ। চালু হয়েছে টাকার বিনিময়ে বন্ধু বা পরিবার ভাড়া করার পরিষেবা। জাপানের মতো দেশে প্রবীণদের একাকীত্ব দূর করতে তৈরি হচ্ছে রোবট। এভাবেই মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলছে পণ্য ও প্রযুক্তির সাথে সংযোগ খোঁজার চেষ্টা।
একাকীত্ব ও ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান
একাকীত্বের প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা সমাজের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি প্রভাবিত করছে আধুনিক রাজনীতিকেও। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, চরম একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষকে ডানপন্থি, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পপুলিস্ট রাজনীতির দিকে ধাবিত করে।
জার্মান-আমেরিকান রাজনৈতিক দার্শনিক হানা আরেন্ট ‘দ্য অরিজিন অব টোটালিটারিয়ানিজম’ বইয়ে হিটলারের নাৎসিবাদ এবং স্টালিনের কমিউনিজমের উত্থান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘একনায়কতান্ত্রিক বা টোটালেটিরিয়ান শাসনের মূল মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো মানুষের একাকীত্ব এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার বোধ’।
আরেন্টের মতে, একজন মানুষ যখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে, তখন সে তার চিন্তাভাবনা ও যৌক্তিক ক্ষমতা হারাতে থাকে। এই চরম একাকী অবস্থায় মানুষ এমন একটি ‘কাল্পনিক সত্য’ খুঁজতে চায় যা তাকে একটি বৃহত্তর চাদরের নিচে আশ্রয় দেবে। পপুলিস্ট নেতারা ঠিক এই সুযোগটিই নেন।
তারা একাকী মানুষের মনস্তত্ত্বকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করেন। একাকী মানুষ সবসময় একজন ‘শত্রু’ খোঁজে, যার ওপর সে নিজের ব্যর্থতা বা একাকীত্বের দায় চাপাতে পারে। পপুলিস্ট নেতারা অভিবাসী, অন্য ধর্মের মানুষ অথবা অভিজাত সমাজকে শত্রু হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেন। এই সরলীকরণ একা মানুষের মনকে শান্ত করে। কারণ সে তখন তার কষ্টের একটি দৃশ্যমান কারণ খুঁজে পায়।
নোরিনা হার্টজ তার বইয়ে দেখিয়েছেন যে, মানুষ স্বভাবগতভাবেই দলবদ্ধ জীব। সমাজ যখন তাকে একা করে দেয়, তখন কট্টর রাজনৈতিক দলগুলো তাকে একটি ‘কাল্পনিক গোষ্ঠী’র সদস্য হওয়ার সুযোগ দেয়।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কট্টর ডানপন্থি পপুলিস্ট দলগুলোর ভোটারদের ওপর একটি বড় জরিপ পরিচালনা করে চ্যাথাম হাউস ও ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রভাবশালী এই দুই প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, পরিবার বা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগহীন ব্যক্তিদের পপুলিস্ট বা চরমপন্থি দলগুলোকে ভোট দেওয়ার প্রবণতা সাধারণ মানুষের তুলনায় ৩ গুণ বেশি।
গবেষণায় বলা হয়, অর্থনৈতিক মন্দা বা বেকারত্বের চেয়েও মানুষের সামাজিকভাবে ‘পরিত্যক্ত’ হওয়ার অনুভূতি তাদের উগ্র রাজনীতির দিকে বেশি ধাবিত করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের সমর্থকদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ড. কাইল অ্যালবার্ট। তার গবেষণায় দেখা যায়, ট্রাম্পের অনেক ভোটারের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো তারা আমেরিকার গ্রামীণ বা মফস্বল অঞ্চলের বাসিন্দা, যেখানে গত কয়েক দশকে বন্ধ হয়ে গেছে চার্চ, কমিউনিটি সেন্টার এবং স্থানীয় কলকারখানা। এই সামাজিক শূন্যতা বা একাকীত্বকে চমৎকারভাবে পূরণ করেছিল ট্রাম্পের র্যালিগুলো।
ড. অ্যালবার্ট দেখান, এই র্যালিগুলো কেবল রাজনৈতিক সমাবেশ ছিলো না, সেগুলো ছিলো একাকী মানুষের জন্য এক ধরনের সামাজিক উৎসব। যেখানে গিয়ে এই মানুষগুলো নিজেদের একটি বড় গোষ্ঠীর অংশ মনে করতে পেরেছিল।
‘ইলিউশন অব কানেক্টিভিটি’
‘ডিজিটাল কানেক্টিভিটি’ মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার কথা। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিদরা বলছেন এর উল্টো কথা।
সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তি-সমালোচক শেরি টার্কল তার বই ‘অ্যালোন টুগেদার’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘ইলিউশন অব কানেক্টিভিটি’ বা সংযোগের বিভ্রম তৈরি করে।
টার্কল দেখিয়েছেন, স্মার্টফোন মানুষকে এমন এক অভ্যাসে অভ্যস্ত করেছে যেখানে তারা একে-অপরের শারীরিক উপস্থিতিকে গুরুত্বহীন মনে করে। ক্যাফেতে, ডিনার টেবিলে কিংবা আড্ডায় শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকেও তারা মানসিকভাবে অনুপস্থিত। টার্কল একে বলেছেন ‘টুগেদার অলসো অ্যালোন’।
আমেরিকান মনোবিদ জিন টোয়েনজি এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে,স্মার্টফোন এবং সামাজিক মাধ্যম তরুণদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মাঝে একাকীত্ব ও বিষণ্নতার হার জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে অন্য মানুষের জীবনের তথাকথিত ‘নিখুঁত মুহূর্ত’গুলো দেখে ব্যক্তি নিজের জীবনের সাথে তুলনা করে এবং তীব্র হীনম্মন্যতা ও একাকীত্বে ভোগে।
একাকীত্বের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
একাকীত্ব কেবল একটি মানসিক অনুভূতিই নয়, এর প্রভাব পড়ে মানুষের শরীরেও। চিকিৎসা বিজ্ঞান একাকীত্বকে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সার্জন জেনারেল ড. বিবেক মূর্তি তার টুগেদার: দ্য হিলিং পাওয়ার অব হিউম্যান কানেকশন ইন আ সামটাইমস লোনলি ওয়ার্ল্ড’ বইটিতে একাকীত্বকে একটি প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ড. মূর্তি তার গবেষণায় দাবি করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব মানুষের শরীরে যে পরিমাণ ক্ষতি করে, তা দৈনিক ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান। একইসাথে এটি স্থূলতা বা ব্যায়াম না করার চেয়েও মানুষের আয়ু বেশি কমিয়ে দেয়।
বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ দলবদ্ধ জীব। আদিম যুগে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে মানুষের মস্তিষ্ক একটি সারভাইভাল থ্রেট বা জীবন-মরণ হুমকি হিসেবে দেখত। আধুনিক যুগে এসেও মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তার ব্রেইন সার্বক্ষণিক 'ফ্লাইট অর ফাইট' মোডে থাকে। ফলে শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ বাড়ে। দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বাড়ায় রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও অ্যালঝেইমার্সের ঝুঁকি।
ভবিষ্যতের গতিপথ ও উত্তরণের উপায়
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান সমাজ ‘হাইপার-কানেক্টেড কিন্তু হাইপার-আইসোলেটেড’ অর্থাৎ অতিরিক্ত যুক্ত কিন্তু অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন। আধুনিক সমাজব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রযুক্তি মানুষের ভেতরের প্রকৃত গভীর আবেগের ক্ষুধা মেটাতে পারছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই একাকীত্বকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভবিষ্যতে এটি মানসিক রোগের পাশাপাশি বাড়াবে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো শারীরিক অসুস্থতা।
আধুনিক মানুষের এই গভীর একাকীত্ব এবং পদ্ধতিগত বিচ্ছিন্নতা থেকে উত্তরণের পথটি সহজ নয়। এই বিচ্ছিন্নতা কোনো ব্যক্তিগত উদাসীনতা নয়, বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামোর একটি সংকট।
সমাজকে ‘মুনাফা ও যান্ত্রিকতা’র চেয়ে ‘মানুষ ও মানবিক বন্ধন’-এর ভিত্তিতে নতুন করে সাজাতে না পারলে এই বিচ্ছিন্নতার নীরব মহামারি চলতেই থাকবে।
সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিকদের মতে, এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে ব্যক্তিগত, সামাজিক, এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে।
অর্থনীতিবিদ নোরিনা হার্টজ তার ‘লোনলি সেঞ্চুরি’ বইয়ে বলেন, একাকীত্ব দূর করতে হলে বর্তমানের চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক মডেল থেকে সরে আসতে হবে।
রাষ্ট্রকে পার্ক, পাবলিক লাইব্রেরি, যুব ক্লাব এবং কমিউনিটি সেন্টারের মতো উন্মুক্ত স্থানগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং ‘অলওয়েজ অন’ সংস্কৃতি মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ধ্বংস করছে। হার্টজ তাগিদ দিয়েছেন কর্মঘণ্টা কমানো এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জোর দেওয়ার।
প্রযুক্তিবিদরা ‘অ্যালগরিদম চালিত’ জীবন থেকে মুক্তির জন্য জোর দিয়েছেন সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর। সোশ্যাল মিডিয়ার অলীক জগত থেকে বের হয়ে মানুষের সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সশরীরে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে উৎসব, আড্ডা ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে।
সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ এরিখ ফ্রম ‘দ্য আর্ট অব লাভিং’ বইয়ে বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপায় বাতলেছেন। তিনি বলেন, মানুষ নিজের একাকীত্ব ঢাকতে অন্যকে ব্যবহার করতে চায়, যা তার বিচ্ছিন্নতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এরিখ পরামর্শ দেন ভালোবাসাকে স্রেফ একটি অনুভূতি না ভেবে একটি ‘শিল্প’ বা সাধনা হিসেবে দেখতে। ফ্রমের মতে, যত্ন, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের সাথে একজন মানুষ স্বার্থহীনভাবে অন্য মানুষকে ভালোবাসতে শিখলেই কেটে যাবে অস্তিত্বের সংকট।
মার্ক্সীয় দৃষ্টিতে বিচ্ছিন্নতা থেকে পুরোপুরি মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন মানুষ কেবল টিকে থাকার এবং পুঁজিবাদীদের মুনাফা বাড়ানোর যন্ত্র হিসেবে কাজ করবে না।
কর্মক্ষেত্রকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেখানে কর্মীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে তার কাজের ওপর। যেখানে নিজের কাজ বিকশিত করবে কর্মীর ভেতরের সৃজনশীল সত্তাকে। সমাজকে প্রতিযোগিতার বদলে গড়তে হবে সহযোগিতার ভিত্তিতে। যেখানে একে অপরের সহযোগী হবে, প্রতিযোগী নয়।
অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, একাকীত্বের চরম সীমায় পৌঁছে মানুষ আবার স্বেচ্ছায় ছোট ছোট ‘ইকো-ভিলেজ’, কো-হাউজিং বা অফলাইন কমিউনিটি গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকবে। যেখানে সীমিত থাকবে প্রযুক্তির ব্যবহার।
আধুনিক মানুষের একাকীত্ব কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি আধুনিক সমাজব্যবস্থার একটি কাঠামোগত ত্রুটি। পুঁজিবাদ, প্রযুক্তি এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের যে রথ মানুষ ছুটিয়েছে, তার চাকাতেই আজ পিষ্ট হচ্ছে ভালোবাসা, সহমর্মিতা,সহযোগিতা ও যত্নের মতো আদিমতম সামাজিক চাহিদাগুলো। একবিংশ শতাব্দীকে ‘একাকীত্বের শতাব্দী’ হওয়া থেকে রক্ষা করতে চাইলে মানুষকে ফিরে যেতে হবে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’র দর্শনে। রবার্ট পুটনামের ভাষায়, মানুষকে আবার দল বেঁধে ‘বোলিং’ খেলা শুরু করতে হবে। কারণ মানুষের জন্য মানুষের চেয়ে বড় কোনো ওষুধ এই পৃথিবীতে আর তৈরি হয়নি।