“ওই ফুল ফোঁটে বনে, যাই মধু আহরণে, দাঁড়াবার সময় তো নাই।”
মৌমাছিদের আসলেই এখন আর দাঁড়াবার সময় নাই। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে তাদের সংখ্যা দিনে দিনে কমেই চলছে। কেন কমছে, সেই আলোচনায় গ্লোবাল ওয়ার্মিং, মোবাইল টাওয়ার, জলবায়ু পরিবর্তনের পর এখন যোগ হয়েছে এআই ডেটা সেন্টার।
তবে মৌমাছি কেন কমছে এবং এই আলোচনায় এআই কীভাবে ঢুকলো, সেই সবের আগে জানা প্রয়োজন, মৌমাছি কমাটা আসলে কেন উদ্বেগের বিষয় এবং মৌমাছি বিলুপ্ত হলে আসলে ক্ষতি কী?
মধু সংগ্রহ ছাড়া আর কী কী করে মৌমাছি?
মৌমাছিদের কাছ থেকে মধু পাই, এটা আলাদাভাবে উল্লেখ করার কিছু নেই। তবে আরেকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ মৌমাছিরা করে থাকে, যার নাম পলিনেশন বা পরাগায়ন।
এই পলিনেশন কীভাবে কাজ করে? মৌমাছি মধু আহরণ করতে একটা ফুলের ওপর বসে। সেই ফুলের রেণু বা পলেন তার শরীরে লেগে যায়। এরপর সে আরেকটা ফুলে গিয়ে বসার পর আগের রেণুগুলো সেখানে লেগে যায়। এবং এভাবে উদ্ভিদদের বংশবিস্তার হয়। এই প্রক্রিয়াটাই পলিনেশন বা পরাগায়ন।
পলিনেশনের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর খাদ্য জোগানের বড় একটি অংশ। যদি হঠাৎ করেই পৃথিবীর বুক থেকে মৌমাছিরা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের টেবিল থেকে উধাও হয়ে যেতে পারে আপেল, পেপে, নাশপাতি, লিচু, শসা, পেয়াজ, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, মধু ও কফির মতো খাবার। তুলার গাছও বিলুপ্তির পথে যেতে পারে।
পৃথিবীর মোট খাদ্যের ফসল বা ফুড ক্রপের ৩৫ শতাংশ বা এক তৃতীয়াংশেরও বেশি নির্ভর করে পরাগায়নের ওপর। সুতরাং, মৌমাছি না থাকলে শুধু মধু খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে না, বরং আমাদের খাবারের প্লেটের তিন ভাগের এক ভাগের কিছু বেশি উধাও হয়ে যাবে।
আর ব্যাপারটা শুধু খাবারের না, অর্থনীতিরও ব্যাপক ক্ষতি হবে। মৌমাছি-নির্ভর কৃষি, বা যেই কৃষি পরাগায়নের ওপর নির্ভর করে, তা থেকে প্রতিবছর ২৩৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ফসল উৎপাদন হয়। বাংলা টাকায় যা দাঁড়ায় প্রায় ২৯ লক্ষ কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থনীতিও হুমকির মুখে পড়বে।
আবার মৌমাছিদের ওপর নির্ভর করা উদ্ভিদগুলো যেসব প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তাদেরও একটা বড় অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
বোঝাই যাচ্ছে, মৌমাছি না থাকলে পৃথিবীকে বিরাট সমস্যার মুখে পড়তে হবে। আর এই বিপদ যে খুব দূরে, তাও না। কারণ মৌমাছির সংখ্যা ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে।
মৌমাছিদের বিলুপ্তির পথে ঠেলছে কারা?
একটি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল - এই এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ মৌমাছির কলোনি হারিয়ে গেছে। মানে পুরো আমেরিকার অর্ধেকের বেশি মৌমাছির কলোনি এক বছরেই শেষ হয়ে গেছে। এটি মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশ - সবার জন্যই বেশ উদ্বেগজনক খবর।
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দ্রুতগতিতে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে অস্ট্রেলিয়ায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষি ঝুঁকিতে আছে।
কিন্তু এর পেছনে কারণগুলো কী কী?
মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটা কারণের কথা বলেছেন বিজ্ঞানীরা। গ্লোবাল ওয়ার্মিং, বন উজাড়, মোবাইল টাওয়ারের পর এখন আলোচনায় যুক্ত হয়েছে এআই ডেটা সেন্টার।
অনেকে বলছেন, চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা যেকোনো চ্যাটবটে করা আমাদের ছোট্ট একটি কোয়েরিও হতে পারে পরিবেশ, এবং মৌমাছিদের ক্ষতির কারণ।
মৌমাছিরা তাদের ন্যাভিগেশন করা বা পথ খোঁজার জন্য বিভিন্ন জিনিসের ওপর নির্ভর করে। সূর্য কোনদিকে আছে তা দেখে, বিভিন্ন ল্যান্ডমার্ক চিনে রাখে, বিভিন্ন গন্ধ অনুসরণ করে এবং বিশেষ করে পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ডকে তাদের একটা বিশেষ অঙ্গ দিয়ে ডিটেক্ট করে। এসবের মাধ্যমে তারা মূলত পথ বুঝে চলাফেরা করে।
মৌমাছিদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ, মানে চাক থেকে বের হয়ে খাবার সংগ্রহ করা হোক, পরাগায়ন করা, এবং এসব শেষে আবার চাকে ফিরে আসা, এগুলো সে করতে পারবে কিনা তা নির্ভর করে এসব ফ্যাক্টরের ওপর।
অনেক বিজ্ঞানী বলছেন, তাদের এই ন্যাভিগেশনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে মোবাইল টাওয়ার এবং ডেটা সেন্টার থেকে বের হওয়া ইএমএফ বা ইলেক্ট্রিক অ্যান্ড ম্যাগনেটিক ফিল্ডস। ইএমএফ এর কারণে তারা ঠিকমতো পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড বুঝতে পারে না, ফলে তাদের ন্যাভিগেশন বা পথ চেনার সক্ষমতা ব্যহত হয়, এবং তারা খাবার সংগ্রহ এবং পরাগায়নের মতো কাজগুলো করতে পারে না।
এই কথা বলছেন মৌমাছি পালকরাই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বড় আকারের ডেটা সেন্টারের আশেপাশে থাকা মৌমাছি পালকরা বলছেন, ইএমএফ-এর কারণে সেখানকার মৌমাছিগুলোর সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং কলোনিগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল টাওয়ার ও ডেটাসেন্টারের এই ইএমএফ এর কারণে মৌমাছিদের ‘ম্যাগ্নেটোরিসেপ্টরস’ ব্যাহত হয়। ম্যাগ্নেটোরিসেপ্টরই হলো মৌমাছির শরীরের একটি বিশেষ অংশ, যেটা দিয়ে তারা পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড বোঝে। এছাড়া ইএমএফ এর কারণে মৌমাছিদের যোগাযোগ, খাবার আহরণ এবং প্রজননের ক্ষমতা কমে যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
মৌমাছির ওপর ইএমএফ এর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা বিশ্লেষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা সায়েন্স অ্যাডভান্সেস। সংস্থাটি জানায়, প্রতি ১০টি গবেষণার মধ্যে ৬টিতেই দেখা গেছে, ইএমএফের কারণে মৌমাছির ব্যবহারে পরিবর্তন এসেছে, এবং প্রজননের হার কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিষয়ক সংবাদ সংস্থা ইনভাইরনমেন্টাল হেলথ নিউজ বলছে, ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন এবং পাওয়ার লাইনের কারণে প্রকৃতিতে ইএমএফ অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
তারা বলছে, এই ইএমএফ এর কারণে মৌমাছিরা ফুলের কাছে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া, সেসব এলাকার উদ্ভিদদের বীজ উৎপাদন যেমন কমে যাচ্ছে, এসব স্থাপনার আশেপাশে উদ্ভিদের বৈচিত্র্যও কমে যাচ্ছে।
ইএমএফ এর প্রভাবে শুধু মৌমাছিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অতিরিক্ত ইএমএফ এক্সপোজারের সাথে মানুষের মধ্যে চাইল্ডহুড লিউকিমিয়া, গর্ভপাত, ডিমেনশিয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সংযোগ থাকতে পারে।
এআই ডেটা সেন্টারের দোষ আসলে কতটা?
মৌমাছি সংকটাপন্ন হওয়ার পেছনে এআই ডেটা সেন্টার আসলে কতটা দায়ী, তা নিয়ে কিছু সন্দেহ আছে।
বিভিন্ন গবেষকরা বলছেন, মৌমাছি কমে যাওয়ার দায় এককভাবে ডেটা সেন্টারের না। বরং মোবাইল টাওয়ার থেকে বের হওয়া ইএমএফ বেশি দায়ী। আবার কিছু গবেষকরা বলছেন, ল্যাবের ভেতর করা গবেষণা দিয়ে করে আসল দুনিয়ার প্রভাব পুরোপুরি সঠিকভাবে বোঝা কঠিন।
আবার অনেকে এটাও বলছেন, ডেটা সেন্টারের আশেপাশের মৌমাছির মধ্যে বিরূপ উপসর্গ দেখা গেলেও, এটা যে ইএমএফ এর সাথেই জড়িত, সেই বিষয়ে প্রমাণ নেই।
পাশাপাশি, ইএমএফ এর সাথে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে, এমন কথা বলা গবেষণার সংখ্যাও কম নয়। তবে মৌমাছির সাথে ডেটা সেন্টারের শত্রুতা শুধু ইএমএফ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য ফ্যাক্টরও আছে।
ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির গবেষণা বলছে, ডেটাসেন্টারের কারণে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ারও একটা ব্যাপার আছে এখানে।
কোনো একটা সার্চ ইঞ্জিনে যেকোনো সাধারণ সার্চ করতে যতখানি বিদ্যুৎ খরচ হয়, তার ১০ গুণ খরচ হয় এআই চ্যাটবটের কাছে করা প্রতিটি কোয়েরিতে। যত বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন, তত বাড়তি কার্বন নিঃসরণ।
ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির গবেষকরা বলছেন, ডেটা সেন্টার যত বাড়ছে, সেখানকার কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে ততোটাই, এবং সাথে বাড়ছে তাপমাত্রা।
গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা যদি অল্প একটুও বেড়ে যায়, তাতেই মৌমাছিদের ক্ষতি হতে পারে। তাদের মৃত্যুর হার বাড়ে, পুরুষ মৌমাছিদের শুক্রাণুর পরিমাণ কমে এবং এর ফলে প্রজননের হার কমে যায় এবং কলোনি কল্যাপ্স করার ঝুঁকি বাড়ে।
গবেষণায় বলা হচ্ছে, ডেটা সেন্টারগুলোর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এই তাপমাত্রা বাড়ার পরিমাণ খুবই কম - ০ দশমিক ০০০২৬ থেকে ০ দশমিক ০০০৮৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এইটুকু তাপমাত্রা বাড়লেই ৩৫ লাখ থেকে প্রায় দেড় কোটি মৌমাছি মারা যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।
এখন এর সমাধান কী হতে পারে? ডেটাসেন্টার আর মোবাইল টাওয়ার সরিয়ে দেওয়া বা প্রযুক্তির অগ্রগতি বন্ধ করে দেওয়া কি এর সমাধান?
উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে অ্যারিজোনায় গুগলের একটি ডেটা সেন্টারকে, যা পুরোপুরি সৌর বিদ্যুৎ এবং উইন্ড পাওয়ার দিয়ে চলে। অর্থাৎ কোনো কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই তা পরিচালিত হয়।
এভাবে ডেটা সেন্টারগুলো যদি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো যায়, তাহলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং পানির ব্যবহার যেমন কমানো যেতে পারে, তেমনি কমানো যেতে পারে মৌমাছির প্রতি ঝুঁকি।
এছাড়া, ব্যক্তি পর্যায়ে গাছ রোপণ, বিশেষ করে নেটিভ বা স্থানীয় জাতির ফুল গাছ রোপণের মাধ্যমে আমরা মৌমাছিদের সাহায্য করতে পারি।
মৌমাছির ন্যাভিগেশন ব্যাহত হওয়া এবং মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে কারণ যেটাই হোক, এতটুকু নিশ্চিত - মৌমাছিরা বিলুপ্তির মুখে গেলে, সংকটে পড়বে একাধিক ইকোসিস্টেম, তৈরি হবে খাদ্যসংকট, ধসে যেতে পারে অর্থনীতি।
তাই সমাধান দরকার। প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে থামানো হয়তো এর সমাধান না, বরং প্রযুক্তির বিকাশের প্রক্রিয়াটা পুনর্বিবেচনা করার মধ্যেই থাকতে পারে সমাধান।