বৃষ্টি আছে, স্বস্তি নেই: বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির আচরণ

বর্ষায় বৃষ্টি নামছে, তবু মিলছে না স্বস্তি। উল্টো বৃষ্টির পর বেড়ে যাওয়া আর্দ্রতায় গরম যেন আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।

রাজধানীর কাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান। শাহবাগে যাওয়ার পথে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব রিকশায় পাড়ি দিয়েও ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যান। “ মনে হয় বৃষ্টির ভেতরেও আগুনের মধ্যে হাঁটছি," বলছিলেন তিনি।

এই আক্ষেপ মেহেদীর একার নয়। ঢাকার রাস্তা, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত কিংবা মেট্রো স্টেশনে বের হওয়া মানুষের মুখে এখন একই অভিযোগ। বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের দেখা মিলছে, কিন্তু তাতে স্বস্তি ফিরছে না। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা এতই বেশি যে সামান্য হাঁটলে কিংবা কোনো কাজ করলেই মানুষ ঘেমে একাকার হয়ে পড়ছেন।

বৃষ্টি হলেও গরম না কমার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো রবিউল আওয়াল আলাপ-কে বলেন, “এর পেছনে বড় কারণ বর্তমানের এল নিনো পর্যায়।”

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়া ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল পলাশও মনে করেন এল নিনোর প্রভাবেই বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দের পরিবর্তন এসেছে।

তিনি বলেন, “কখনো বৃষ্টি কমে যায়, আবার কখনো অনিয়মিত বা অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত দেখা দেয়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর।”

প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেই পরিস্থিতিকে বলা হয় এল নিনো। মূলত মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানি উষ্ণ হয়ে ওঠার মাধ্যমেই এ ঘটনার সূচনা হয়।

স্বাভাবিক সময়ে পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত বাতাস উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠের পানিকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল থেকে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এতে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানি জমা হয় এবং পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রের গভীর থেকে শীতল পানি ওপরে উঠে আসে। যা আবহাওয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপ আটকে যায়। সেই তাপের বড় অংশ শোষণ করে সমুদ্র।

পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পশ্চিমে জমে থাকা উষ্ণ পানি আবার মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুমণ্ডলেও তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

এর কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে দেখা যায়। সাধারণত এল নিনোর প্রভাব প্রায় এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ড. মো রবিউল আওয়ালের মতে বাতাস যত বেশি উত্তপ্ত হচ্ছে, তার আর্দ্রতা বা হিউমিডিটি ধরে রাখার ক্ষমতাও তত বেড়ে যাচ্ছে।  

“বাড়তি জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতাই আমাদের বর্তমানের এই অস্বস্তিকর গরমের প্রধান কারণ“, বলেন ড. রবিউল।

অন্যদিকে মোস্তফা কামাল পলাশ মনে করেন এল নিনো নতুন কোনো ঘটনা নয়। এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক সামুদ্রিক প্রক্রিয়া। যা হাজার বছর ধরেই বিদ্যমান। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর আচরণ বদলে যাচ্ছে। 

১৯৮৩, ১৯৯৭, ২০১৫-১৬ এবং সর্বশেষ ২০২২-২৩ সালের শক্তিশালী এল নিনোর উদাহরণ তুলে ধরে মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, “আগে যেখানে সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা যেতো। এখন প্রায় দুই থেকে চার বছর পরপরই এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

এর প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্ট হচ্ছে। বর্ষায় বৃষ্টির ছন্দ বদলে যাচ্ছে, দীর্ঘ সময় অনাবৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ এবং ভ্যাপসা গরমের মতো পরিস্থিতি ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে।

ড. মো রবিউল আওয়াল বলেন,  “একদিকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবতো আছেই, তার সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে এল নিনো।”

এই সব মিলিয়েই গরমের তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে বলেও জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক ।

বাংলাদেশের করণীয় প্রসঙ্গে মোস্তফা কামাল পলাশ  বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক, সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। 

“সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, সৌরশক্তির মতো বিকল্প জ্বালানির প্রতি আগ্রহ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।” আলাপ-কে বলেন তিনি।

বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমুদ্রও ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে। ফলে আগে যে শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ দীর্ঘ বিরতিতে দেখা যেত, এখন তা অনেক ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা দিচ্ছে। 

প্রকৃতিতে পড়ছে প্রভাব

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে কৃষি ও জনজীবনে। বর্ষাকালে টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ বৃষ্টিহীন পরিস্থিতি তৈরি হলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। তখন বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ব্যাহত হয় এবং কৃষকদের কৃত্রিম সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়। 

জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ ব্যয় বেড়ে যায়, অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না এবং ফসল উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় লোডশেডিং তীব্র হতে পারে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষমতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কৃষক, নির্মাণশ্রমিক ও খোলা আকাশের নিচে কর্মরত মানুষের জন্য হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিও এ সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, এই সংকটের কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। ১৭৭৬ সালের শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারে বায়ুমণ্ডলে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন জমা হয়েছে, তার প্রভাব রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তাই ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোতে হবে। 

বৈশ্বিকভাবে এই ধারাবাহিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এর ইতিবাচক ফল পেতে অন্তত আরও ৩০ বছর সময় লাগতে পারে। আর বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে ৫০ বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

পৃথিবীর মহাসাগরগুলো চলতি বছরের জুনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস মেরিন সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জুনে সমুদ্রপৃষ্ঠের বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ছিলো ২০ দশমিক ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কোপার্নিকাসের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসজুড়েই মহাসাগরে দীর্ঘস্থায়ী সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ (মেরিন হিটওয়েভ) ছিলো। এ সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিলো ২০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি গড়ে উঠলে ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং আগামী বছর পর্যন্ত সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এল নিনোর প্রভাবের পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে ক্রমাগত বাড়তে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্বও বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও তীব্র করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে আগামী মাসগুলোতে আরও নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হতে পারে।

জাতিসংঘের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এল নিনোর প্রভাব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশে এক রকম হয় না। এর শুরু হওয়ার সময়, তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (আইওডি)-এর মতো অন্যান্য জলবায়ুগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে একেকটি এল নিনোর প্রভাবও একেক রকম হতে পারে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিলেও, তা নির্ভুল পূর্বাভাস নয়।

সাধারণভাবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক অঞ্চলে এল নিনো কম বৃষ্টিপাত, অস্বাভাবিক গরম, খরার ঝুঁকি এবং কৃষি, পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে এল নিনো দুর্বল হতে শুরু করার পরও এর প্রভাব পরবর্তী বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, বিশেষ করে ফিলিপাইন ও মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।

তবে দক্ষিণ এশিয়া ও মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত শুধু এল নিনোর ওপর নির্ভর করে না। ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (আইওডি)-ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধনাত্মক আইওডি পরিস্থিতিতে মৌসুমি বৃষ্টি কমে যেতে বা দেরি হতে পারে। আবার ঋণাত্মক আইওডি তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তাই এই দুই জলবায়ুগত প্রক্রিয়ার যৌথ প্রভাবই অনেক সময় অঞ্চলের প্রকৃত আবহাওয়ার চিত্র নির্ধারণ করে।

উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো

জাতিসংঘের কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের যৌথ গবেষণার প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোকে জলবায়ু ঝুঁকির দিক থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, এসব অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব সব সময় একইভাবে দেখা যায় না।

একই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা জানান, দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়া শুধু এল নিনো নয়, ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (আইওডি)-এর মতো অন্যান্য জলবায়ুগত প্রক্রিয়ারও প্রভাব বহন করে। ফলে কোথাও তাপমাত্রা বাড়লেও বৃষ্টিপাতের ধরন বা খরার পরিস্থিতি এক অঞ্চলের সঙ্গে আরেক অঞ্চলের মিল নাও থাকতে পারে।

বর্তমানে আইওডি নিরপেক্ষ অবস্থায় রয়েছে। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারতের চলতি বছরের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি গড়ের প্রায় ৯০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, জাতীয়ভাবে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকলেও অনেক এলাকায় কৃষি ও পানিসম্পদের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে জুন থেকে অগাস্ট সময়ের পূর্বাভাসে এখনো বিস্তৃত খরার কোনো সুস্পষ্ট সংকেত পাওয়া যায়নি।

গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনো একাই মৌসুমি আবহাওয়ার নির্ভরযোগ্য নির্দেশক নয়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর পাশাপাশি আইওডি এবং চলমান মৌসুমি পূর্বাভাসের ওপরও সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।