কোটিপতির ‘নিষ্ঠুর জেদ’ আর লাইভের প্রতিযোগিতা: বাঁচলো না ‘টিমি’ নামের তিমি

তাকে বাঁচাতে খরচ করা হলো লাখ লাখ ইউরো। বিশ্বজুড়ে জায়গা হলো অসংখ্য শিরোনামে আর লাইভ স্ট্রিমিংয়ে। এতোসব এলাহী কাণ্ডের পরও হার মানলো নিয়তির নিয়মে।

একটি তিমি’র গল্প। নাম ‘টিমি’।

ডেনমার্কের একটা দ্বীপের কাছে গত শনিবার বিশালাকায় এক মৃত তিমি ভেসে ওঠে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেলো, এই তিমিই গত দুই মাস ধরে সারা বিশ্বের খবরের শিরোনাম কাঁপানো সেই অপ্রাপ্তবয়স্ক হাম্পব্যাক হোয়েল ‘টিমি’।

তিমিটাকে বাঁচাতে গিয়ে কি আসলেই তার উপকার করা হয়েছে, নাকি মানুষের 'হিরোইজমের’ জেরে, তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে আরও বেশি কষ্টের মুখে? 

ভুল পথে আসাই কাল হলো

ঘটনার শুরু ২০২৬ সালের মার্চে। জার্মানির উইসমার বন্দরের কাছে অগভীর পানিতে হঠাৎ বিশাল এক তিমির দেখা পাওয়া যায়। প্রায় ৪০ ফুট লম্বা আর ১২ টন ওজনের এই কিশোর তিমি ছিল একটি ‘হাম্পব্যাক হোয়েল’। পরে যার নাম রাখা হয়েছিলো ‘টিমি’।

এদের আবাস আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে। কিন্তু ভুল করে ডেনমার্ক আর সুইডেনের মাঝের সরু জলপথ দিয়ে সে ঢুকে পড়েছিল বাল্টিক সাগরে। আর এই ভুলটাই তার জন্য কাল হলো।

বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, বাল্টিক সাগরের পানি মহাসাগরের মতো অতটা নোনা না। আর পানি নোনা না হলে, তিমির মতো এত বড় প্রাণির শরীর সহজে ভেসে থাকতে পারে না।

শুধু পানিতে ভেসে থাকার জন্যই টিমিকে তার শরীরের অর্ধেক শক্তি খরচ করে ফেলতে হচ্ছিলো। তার ওপর তিমিরা সরাসরি পানি পান করে না। খাবারের জন্য শিকার করা মাছ থেকেই পানির চাহিদা পূরণ হয়।

বাল্টিক সাগরের মতো অগভীর আর শত শত জাহাজ চলতে থাকা একটা জায়গায় এই বিশাল তিমির জন্য ভরপেট শিকার জোগাড় প্রায় অসম্ভব। সোজা কথায়, এখানে আটকে থাকা মানেই হলো ধীরে ধীরে না খেয়ে আর পানির অভাবে শুকিয়ে মারা যায়।

বাল্টিক সাগরে আসার পর থেকেই টিমির ওপর একের পর এক বিপদ আসতে থাকে। কখনো সে আটকে যায় মাছ ধরার জালে, কখনো দিক হারিয়ে থমকে যায় সমুদ্র সৈকতে। বারবার উদ্ধার করা হলেও শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল।

টিমির এই মৃত্যুর পর সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া আর লাইভ স্ট্রিমিং সার্কাস

অগভীর পানিতে বাঁচার জন্য প্রাণপন লড়াই করছিলো টিমি। সেই ছটফট করার দৃশ্যই হয়ে উঠলো গণমাধ্যম থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট। লাইভের পর লাইভে রাতারাতি টিমি হয়ে গেলো ইন্টারনেট স্টার।

টিভি চ্যানেলগুলো ক্যামেরা বসিয়ে ২৪ ঘণ্টা লাইভের প্রতিযোগিতা। টিমি কখন শ্বাস নিচ্ছে, কখন লেজ নাড়ছে, সবই লাইভ। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রামে হাজার হাজার পোস্ট, রিলস আর এআই দিয়ে তৈরি করা তিমির 'হাসিমুখের' ছবি শেয়ার হতে লাগল।

যে সমুদ্র সৈকতগুলোতে টিমি আটকা পড়ছিল সেখানে পরিবেশবাদীরাসহ হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমাল। পরিস্থিতি এত খারাপ হয়েছিলো যে, পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে অনেকে পানির কাছে চলে যাচ্ছিল সেলফি তোলার জন্য।

বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছিলেন, এই ভিড় থামানো দরকার। কারণ তিমিটা প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ছে । কেউ শোনেনি। মানুষের কাছে ‘টিমি’ হয়ে উঠেছিলো রিয়েলিটি শো। 

বিজ্ঞানীদের নিষেধ বনাম কোটিপতিদের জেদ

এপ্রিলের শেষের দিকে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, টিমিকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। কয়েক সপ্তাহ না খেয়ে থাকার কারণে তার ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। বাল্টিকের কম নোনা পানির কারণে চামড়ায় তৈরি হয়েছে বড় বড় ক্ষত।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিলেন, তিমিটাকে আর কোনো কষ্ট না দিয়ে একটা শান্ত পরিবেশ দেওয়া হোক, যাতে সে প্রাকৃতিকভাবে অন্তত শান্তিতে মরতে পারে।

কিন্তু ইন্টারনেটে ছড়িয়ে গেলো, ‘বিজ্ঞানীরা নিষ্ঠুর, তারা তিমিটাকে মেরে ফেলতে চায়’। তখনই জার্মানির দুই কোটিপতি ব্যবসায়ী এগিয়ে এলেন। তারা বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে, নিজেদের পকেট থেকে প্রায় ১৫ লাখ ইউরো খরচ করে এক বিশাল উদ্ধার অভিযানে নেমে পড়লেন।

পরিকল্পনাটা ছিল সিনেমাটিক। একটা বিশাল কাস্টম-মেইড বার্জে পানি ভরে তার ভেতর ১২ টনের টিমিকে ক্রেন দিয়ে তোলা হবে। তারপর ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে গভীর সাগরে।

আটাশে এপ্রিল অনেক ধকল সয়ে টিমিকে জাহাজে তোলা হলো। দোসরা মে তাকে সাগরে ছেড়েও দেওয়া হলো।

জাহাজ থেকে টিমি যখন সাঁতার কেটে চলে যাচ্ছিল, তখন ইন্টারনেটে কোটি কোটি মানুষ খুশিতে মেতে উঠল। সবার মনে হলো, “যাক, তিমিটাকে বাঁচানো গেল”। 

স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি

আনন্দ স্থায়ী হলো মাত্র দুই সপ্তাহ। বিজ্ঞানীরা যে ভয়টা পাচ্ছিলেন, সেটাই সত্যি হলো। একটা মারাত্মক অসুস্থ আর দুর্বল প্রাণিকে ক্রেন দিয়ে টানা, জাহাজের ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শব্দ আর কাঁপুনি—এতোসব ধকল সহ্য করতে পারেনি টিমি।

সাগরে ছাড়ার কিছুদিন পরেই তার পিঠের ট্র্যাকারটাও নষ্ট হয়ে যায়। দুই সপ্তাহ পর, ১৬ই মে, ডেনমার্কের একটা দ্বীপের কাছে তার মৃত শরীর ভেসে ওঠে।

টিমির এই মৃত্যুর পর সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। বড় বড় পরিবেশবাদী সংগঠন আর বিজ্ঞানীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

তারা বলেন, এই ১৫ লাখ ইউরোর উদ্ধার অভিযান আসলে তিমিটাকে বাঁচানোর জন্য ছিলো না, এটা ছিল মানুষের এক ধরনের ‘নিষ্ঠুর জেদ’। এর মাধ্যমে তিমিটার যন্ত্রণার সময়টাকে কেবল আরও কয়েকটা দিন টেনে লম্বা করা হয়েছে। মৃত্যুর ঠিক আগের দিনগুলো তাকে একটা অন্ধকার লোহার ট্যাংকের ভেতর অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে।

এমনকি টিমি মারা যাওয়ার পরও ড্যানিশ সরকারকে নোটিস জারি করে বলতে হয়েছে যে, কেউ যেন মরা তিমির ওপর চড়ে সেলফি না তোলে। কারণ পঁচে যাওয়ার কারণে যেকোনো সময় তিমির পেট ফেটে গ্যাস বের হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।