স্যার ডেভিড অ্যাটেনবোরা, বিশ্বকে প্রকৃতির পাঠ শেখানো এই ব্রিটিশ নাগরিকের শততম জন্মদিন শুক্রবার। গত শতকের ৭০ বছরই যিনি প্রকৃতির কাছে থেকেছেন, মিশেছেন আর পৃথিবীবাসীকে এমন কিছু দেখিয়েছেন যা কেউ দেখাননি আগে।
টেলিভিশনের সাদাকালো পর্দায় তার অনুষ্ঠানের যাত্রা শুরু, রঙিন টেলিভিশন, স্মার্ট ডিভাইস হয়ে এখন মোবাইল স্ক্রিন। পর্দার ধরন বদলেছে, তবে থামেননি অ্যাটেনবোরা। শতবর্ষেও নিজের উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
১৯২৬ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া অ্যাটেনবারো ছোটবেলা থেকেই জীবাশ্ম সংগ্রহ করতেন। তার বাবা ফ্রেডেরিক অ্যাটেনবারো স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল ছিলেন এবং তার মা মেরি অ্যাটেনবারো ছিলেন একজন সমাজসেবী।
ছোটবেলা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়-পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ডেভিডের মধ্যে জ্ঞান, গবেষণা ও প্রকৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। শিশু বয়সে প্রকৃতির মাঝে ছুটে বেড়াতেন। সাইকেল চালিয়ে দূরের বনাঞ্চলে যেতেন এবং পাথরের নিচে জীবাশ্ম খুঁজতেন। সেই বয়সেই ডিমের খোলস এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক নমুনা সংগ্রহ করতেন ডেভিড।
পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি কিছুদিন রয়্যাল নেভিতে কাজ করেন এবং পরে শিক্ষাবিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন।
১৯৫২ সালে তিনি বিবিসিতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে তার বিখ্যাত অনুষ্ঠান জু কোয়েস্ট শুরু হয়। এই অনুষ্ঠানেই তিনি দর্শকদের সামনে বন্যপ্রাণীকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন
সেই থেকে যাত্রা শুরু। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের প্রায় সকল দিকই তুলে ধরেছেন তিনি।
শিম্পাঞ্জির সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, তীব্র শীতে আর্কটিক অঞ্চলে ছিলেন সাদা ভালুকের সঙ্গেও। টেলিভিশন পর্দায় তার শান্ত কণ্ঠ বারবারই ভরসা দিয়েছে যে এই প্রাণীগুলোও ভয়ংকর নয়, তারাও ভালোবাসা চায়।
১৯৬৫ সালে তিনি বিবিসি টু এর কন্ট্রোলার হন। এই পদে থেকে তিনি টেলিভিশনে নতুন ধরনের শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি শুধু প্রকৃতিবিষয়ক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং টেলিভিশনকে আরও সাহসী, সৃজনশীল ও জ্ঞানসমৃদ্ধ মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
ডেভিড অ্যাটেনবারোর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন বিখ্যাত লাইফ সিরিজ দিয়ে। ১৯৭৯ সালের Life on Earth থেকে শুরু করে The Living Planet, The Trials of Life, The Life of Birds, The Life of Mammals, Life in the Undergrowth এবং Life in Cold Blood-এই সব সিরিজে তিনি পৃথিবীর জীবনের বিবর্তন, আচরণ ও পরিবেশকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেন।
এ সব অনুষ্ঠানে উন্নত চিত্রগ্রহণ, ধীরগতির দৃশ্য, টাইম-ল্যাপস, পানির নিচের চিত্রগ্রহণ এবং রাতের প্রাণীদের ধারণ করার বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
এক বর্ণনায় তিনি দর্শকদের মনে করিয়ে দেন, “এটা সত্যিই খুব অন্যায় মনে হয় যে মানুষ গরিলাকে আক্রমণাত্মক ও সহিংস সব কিছুর প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে, অথচ গরিলার মধ্যে সেই জিনিসটাই নেই। তা আমাদের মধ্যেই তা আছে।”
সেই বক্তব্যটি নাড়া দেয় কোটি কোটি মানুষকে আর ঘরে ঘরে পরিচিত মানুষ হয়ে ওঠেন ডেভিড।
পরবর্তীতে তিনি The Blue Planet, Planet Earth, Planet Earth II, Blue Planet II, Our Planet, Planet Earth III এবং আরও অনেক বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্রে কাজ করেন। এসব কাজের মাধ্যমে তিনি শুধু প্রাণী ও প্রকৃতির সৌন্দর্যই দেখাননি, বরং পরিবেশ সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতাও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
তার পরিচয়ের আরেকটি বড় অংশ, তার কণ্ঠস্বর। শান্ত, ভরাট সেই কণ্ঠ মুহূর্তেই সবার আকর্ষণ কেড়ে নেয়।
ডেভিড অ্যাটেনবোরা সারাজীবন বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার পক্ষে কথা বলেছেন। পরিবেশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগেই তিনি মানুষকে সতর্ক করেছিলেন যে প্রকৃতির ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার জন্যও বিপদ ডেকে আনবে।
তার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র অ্যা লাইফ অন আওয়ার প্ল্যানেট। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মাস্টারপিস হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই ডকুমেন্টারিকে। এ ছাড়া তার আরেক প্রামাণ্যচিত্র লাইফ অন আর্থ (Life On Earth) ৫০ কোটি মানুষ দেখেছে বলে ধারণা করা হয়।
তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে BAFTA, Emmy, Peabody Award এবং জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক Lifetime Achievement Award উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৫ সালে তিনি নাইট উপাধি লাভ করেন এবং ২০২২ সালে আরও উচ্চ মর্যাদার নাইটহুডে ভূষিত হন।
তার সম্মানে ৫০টিরও বেশি প্রাণী ও উদ্ভিদের নামকরণ করা হয়েছে।
শুক্রবার শততম জন্মদিনে শুভেচ্ছায় ভাসছেন এই কিংবদন্তী। তিনি বলেছিলেন, জন্মদিনটি শান্তভাবে পালন করার আশা করেছিলেন। তবে মাইলফলকটি রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে একটি সরাসরি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্যাপন করা হবে, এবং বিবিসি ওয়ানে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রকাশিত এক রেকর্ড করা অডিও বার্তায় অ্যাটেনবারো বলেন, “আমি ভেবেছিলাম আমার ১০০তম জন্মদিনটি শান্তভাবে উদ্যাপন করব, কিন্তু মনে হচ্ছে আপনাদের অনেকেরই অন্য পরিকল্পনা ছিল।
“প্রিস্কুলের শিশুদের দল থেকে শুরু করে কেয়ার হোমের বাসিন্দা এবং বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য ব্যক্তি ও পরিবার- সবাইয়ের জন্মদিনের শুভেচ্ছায় আমি সম্পূর্ণভাবে অভিভূত হয়েছি।”
তার জন্মদিন উপলক্ষে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম নতুন আবিষ্কৃত একটি পরজীবী বোলতার প্রজাতির নাম তার নামে রেখেছে—Attenboroughnculus tau। আর অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম ডেভিডকে শ্রদ্ধা জানাতে তাদের প্রদর্শনীতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেবে।
গুগলও তাদের সার্চ ইঞ্জিনে ডেভিডের জন্মদিনে জানিয়েছে বিশেষ শ্রদ্ধা।
হলিউড অভিনেতা ইয়ান ম্যাককেলেন বলেছেন, “ডেভিড উৎসাহ ও আগ্রহ অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তার ক্ষমতা অত্যন্ত মূল্যবান, এবং তিনি অসংখ্য মানুষের জীবনে আনন্দ এনে দিয়েছেন।”
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিলভারব্যাক ফিল্মস এর অ্যালাস্টেয়ার ফদারগিল বলেন, “হঠাৎ করেই বিশ্বের নানা জায়গার দর্শক এমন স্থান ও প্রাণীদের নিয়ে ভাবতে শুরু করল, যেগুলো তারা আগে কখনও দেখেনি। তিনি শুধু এই গল্পগুলোর মধ্যে এক অনন্য বিস্ময় ও আবেগ নিয়ে আসেননি, দর্শকদের মধ্যে গ্রহের প্রতি এক বিশাল দায়িত্ববোধও তৈরি করেছেন।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাটেনবারো প্রাকৃতিক জগতের ওপর মানুষের ক্ষতির বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় অ্যাটেনবারো মঞ্চে উঠে অস্তিত্বগত সংকট সম্পর্কে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা বৈশ্বিক মাত্রার মানবসৃষ্ট এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছি, হাজার হাজার বছরের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে বড় হুমকি: জলবায়ু পরিবর্তন। আমরা যদি পদক্ষেপ না নিই, তাহলে আমাদের সভ্যতার পতন এবং প্রাকৃতিক জগতের বড় অংশের বিলুপ্তি দিগন্তে অপেক্ষা করছে।”
তিন বছর পর, গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত Cop26 সম্মেলনে তিনি তরুণ প্রজন্মকে বলেন, “আমার জীবদ্দশায় আমি এক ভয়াবহ অবনতি দেখেছি। আপনাদের জীবদ্দশায় আপনারা এক অসাধারণ পুনরুদ্ধার দেখতে পারেন এবং দেখা উচিত।”