হঠাৎ বৃষ্টিতে জলমগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে প্রশ্ন

হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে নগরে জলাবদ্ধতা, জনজীবনে দুর্ভোগ এবং বানের তোড়ে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে পৌনে দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এমনকি চট্টগ্রামে তুমুল বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। 

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, মৌলভীবাজার ও নেত্রকোণা জেলায় বন্যা শুরু হয়েছে। হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা হতে পারে। 

কিন্তু বৈশাখের খরতাপের মধ্যে শ্রাবণের ভারী বর্ষণ নিয়ে দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি যেমন হয়েছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে, আবহাওয়া অফিসই বা আগে থেকে পূর্বাভাস দিতে পারলো না কেন? 

চলমান এই পরিস্থিতির বিস্তারিত সার্বিক পর্যালোচনা করে আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মোস্তফা কামাল পলাশ বলেছেন, ভারী বৃষ্টি চলতে পারে আরও কয়েকদিন। 

তিনি দেশের বর্তমান আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। 

এবারের অকাল বৃষ্টিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে কৃষিখাতের অন্যতম ‘বড় দুর্যোগ’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ। 

পূর্বাভাস, ভারী বৃষ্টি ও ক্ষয়ক্ষতি

আবহাওয়া অফিস বলছে, সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে মঙ্গলবার চারদিনের পূর্বাভাসে জানানো হয়, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। 

এসব এলাকার কোথাও কোথাও হতে পারে অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসও। 

আবহাওয়া অফিস বলছে, সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে বজ্রমেঘ। এর ফলে উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বজ্রপাত হচ্ছে, যা পরে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে।

পূর্বাভাসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে এবং বঙ্গোপসাগরে থাকা মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়।

মঙ্গলবার ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের প্রভাবে দেশের হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ কৃষি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ অন্তত সাত জেলায় বিস্তীর্ণ বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারী বর্ষণে ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির ধান ক্ষতির মুখে পড়েছে। 

হাওরবাসীর প্রধান ফসল বোরো ধান ঘরে তুলতে না পেরে কৃষকরা আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন, অনেকেই আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।

টানা বর্ষণে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনার কিছু নদীর পানি ৮২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়েছে। 

পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাঁধ উপচে ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় ধান তলিয়ে গেছে ১০ থেকে ১৫ ফুট পানির নিচে।

গবাদি পশুর খাদ্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোরবানির মৌসুমের আগেই কম দামে গরু-ছাগল পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারি ও গৃহস্তরা। 

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৮ এপ্রিল জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা থেকে ১৪ জন কৃষি কর্মকর্তাকে হাওরে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত ধান কাটতে কম্বাইন হারভেস্টার ও শ্রমিক বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চলতি মৌসুমে ১৯ লাখ ২৫ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বৃষ্টিপাতের রেকর্ড

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই বছরের তুলনায় এবারের বৃষ্টিপাত বেশি এবং মার্চ মাসেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এপ্রিল ও মে মাসে একটানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ ছিল, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন। ওই সময় পুরো এপ্রিল মাস জুড়ে মাত্র একবার বড় ধরনের কালবৈশাখী ঝড় হয়েছিলো এবং সারাদেশে বৃষ্টিপাত হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ২৭৮ মিলিমিটার। 

সেই খরা পরিস্থিতিতে আটদিন ধরে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছড়িয়ে গিয়েছিলো তাপমাত্রা। তীব্র তাপপ্রবাহ চলে ১২ দিন ধরে এবং যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিলো ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কিন্তু পরের বছর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের চিত্র ছিলো ভিন্ন। মাসের শুরুতেই ৩ ও ৪ তারিখ বাদ দিলে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে কোথাও না কোথাও বৃষ্টিপাত হয়েছে। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে ৪ হাজার ৮২৬ মিলিমিটার বৃষ্টি, যা ২৪ সালের তুলনায় ছিলো প্রায় চারগুণ বেশি।

আর ২০২৫ সালে ২৩এ এপ্রিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিলো যশোরে, ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পুরো মাসে তাপপ্রবাহ ছিলো ১৮ দিন। তবে কোথাও তীব্র বা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি।

গতবছর এপ্রিলে ১০ দিনের বেশি কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রসহ বৃষ্টি হয়। ৬ই এপ্রিল প্রথম কালবৈশাখী ঝড় হয়, এরপর ১০ থেকে ১৪ই এপ্রিল এবং ১৬ থেকে ২০এ এপ্রিল সময়ে প্রায় প্রতিদিনই বজ্রসহ বৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মোস্তফা কামাল পলাশ আলাপ-কে বলেন, “চলতি বছরের মার্চ মাসেই স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া এপ্রিলের বৃষ্টিপাতও গত ১০০ বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারে। 

“আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে পটুয়াখালীতে ১৫২ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ১৫১ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।” 

বুধবার ঢাকায় ৪৫ মিলিমিটার, ময়মনসিংহে ১০৪ মিলিমিটার এবং নেত্রকোনায় ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টির পরিমাণ রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, “এই অকাল বৃষ্টি দেশের ইতিহাসে কৃষিখাতে অন্যতম বড় দুর্যোগ। ধান কাটার মৌসুমে টানা বৃষ্টি ও সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ফলন কমে যেতে পারে।” 

এর ফলে আগামী ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। 

বুধবার আলাপ-কে তিনি বলেন, টানা ভারী বৃষ্টি তেসরা মে পর্যন্ত চলতে পারে এবং ৫ই মে পর্যন্ত হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে পরিস্থিতির বড় উন্নতির সম্ভাবনা কম। 

“চট্টগ্রাম বিভাগে গত কয়েকদিনের জলাবদ্ধতা আরও কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে। পাশাপাশি ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর ও মাদারীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

আবহাওয়া কর্মকর্তা পরিস্থিতির উন্নতির আশা করলেও হঠাৎ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাহাকার বাড়ছে।  

আবহাওয়ার ‘ত্রুটিপূর্ণ’ পূর্বাভাস

চলমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে দায়ী করেছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মোস্তফা কামাল পলাশ। 

তিনি মনে করেন আগে থেকেই কৃষি, মাছ ধরাসহ বিভিন্ন খাতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতো। 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মোমিনুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “লঘুচাপের প্রভাবে সৃষ্ট এই বৃষ্টিপাতের পূর্বেই আমরা দেশের সকল সমুদ্র বন্দরগুলোতে এলসি-৩ (তিন নম্বর) সংকেত দেওয়া হয়। 

“আবহাওয়া সংক্রান্ত সকল নির্দেশনা, স্ট্রিপ রেশিও গ্র্যাডিয়েন্ট পর্যালোচনার মাধ্যমে সরকার থেকে আগেই সংশ্লিষ্ট সকল জায়গায় জানিয়ে দেওয়া হয়।” 

তবে দেশের বর্তমান আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, “এটি যেন বিশ্ববিদ্যালয় হলের কমন লুঙ্গি, যা সবাই একইভাবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ একজন কৃষক থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সবার জন্য একই ধরনের-ওয়ান সাইজ ফিট ফর অল-পূর্বাভাস দেওয়া হয়, যা বাস্তব চাহিদা পূরণে কার্যকর নয়।”

“কৃষক, জেলে, লবণচাষি, শুঁটকি ব্যবসায়ী কিংবা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা আলাদা ও প্রয়োজনমাফিক পূর্বাভাস দরকার। অনেক জেলে ঋণ করে জ্বালানি ও বরফ নিয়ে ১০ দিনের জন্য গভীর সমুদ্রে যান। কিন্তু যাত্রার ২-৩ দিনের মাথায় বিপদ সংকেত এলে তারা ফিরতে চান না। কারণ এতে বড় আর্থিক ক্ষতি হয়। তাই সমুদ্রে যাওয়ার আগেই কয়েকদিনের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস প্রয়োজন।” 

তবে এবারের ভারী বর্ষণ ‘বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি’র আগেই শেষ বলে মনে করছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মোমিনুল ইসলাম। 

“আবহাওয়ার কয়েকদিনের প্রাথমিক আভাস পরিচালনা করে আশা করা হচ্ছে, উদ্ভূত পরিস্থিতি কোনো বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই দ্রুত শেষ হবে।”

আবহাওয়া কর্মকর্তা পরিস্থিতির উন্নতির আশা করলেও হঠাৎ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাহাকার বাড়ছে। 

আর অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আগাম বন্যা, জলাবদ্ধতা ও কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে থেকে বাংলাদেশ কি এখনো পুরোনো ধাঁচের পূর্বাভাস ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে, নাকি সময়োপযোগী ও পেশাভিত্তিক আবহাওয়া সতর্কবার্তার নতুন যুগে প্রবেশ করবে- এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন এখন অনেকেই।