ইরান ইস‍্যুতে ‘সঠিক পথে নেই’ বাংলাদেশ

‘মিডলইস্ট মনিটর’-এ গত ১৭ই এপ্রিল একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে, যেখানে শিরোনাম লেখা- ‘ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব’। 

লন্ডনভিত্তিক এই সংবাদমাধ্যমটি প্যালেস্টাইন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশ করে। 

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে ‘খাবি’ খাচ্ছে–মিডলইস্ট মনিটর-এর নিবন্ধে সেই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। 

ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং দেশটির শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা, যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া, জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করা এবং সর্বোপরি বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরূকরণের আভাস মিলছে। 

বৈশ্বিক অবস্থা যখন নানা ঘনঘটার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব’ ঘটেছে বলে কেন মনে করছেন- লেখককে এই প্রশ্ন করা হলে, কারণ ব্যাখ্যা করেন তিনি। 

অধ্যাপক নুরুজ্জামান আলাপ-কে বলেন, “এই যে পররাষ্ট্রনীতি; ফিক্সড কোনো পজিশন নাই, আন্তর্জাতিক আইন বা ইন্সটিটিউশন্সের প্রতি শক্ত কোনো অবস্থান নাই, রং বদলানো হয়। এজন্যই বলা হয়েছে দেউলিয়াত্ব।” 

ইরান সংকট শুরুর পর থেকেই যুদ্ধের ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা হয়েছে চার হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশের।

জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরের ‘উপাদান’।

স্পট মার্কেট থেকে ‘উচ্চমূল্যে’ জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে রিজার্ভে টান পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শঙ্কা তৈরি হয়েছে অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত রেমিট্যান্স প্রবাহেও। অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাও ভাবিয়ে তুলছে নীতি নির্ধারকদের। 

এসব সংকট মোকাবিলায় যখন ‘গলদঘর্ম’ হচ্ছে সরকার, তখনই ঢাকায় নিযুক্ত তেহরানের রাষ্ট্রদূতের বিভিন্ন মন্তব্য সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ‘ভিন্নভাবে’ উপস্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে রীতিমতো ‘অসন্তোষ’ প্রকাশ করেছেন ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি।  

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি সঠিক পথে এগুচ্ছে? 

বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেওয়া বিভিন্ন বিবৃতিতে কি আন্তর্জাতিক মেরূকরণের মধ্যে অবস্থান পরিষ্কার করতে পেরেছে বাংলাদেশ?

“আমরা হয়ত ইন্টারনাল, এক্সটারনাল পাওয়ারের চাপে পড়ে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি,” আলাপ-কে বলেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম, যিনি এক সময় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ভারতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। 

তারিক এ করিম বলেন, “ভালো ডিপ্লোম্যাসি কিন্তু সেতু তৈরি করে, সেতুগুলোর ফটক বন্ধ করে না।” 

ইরান যুদ্ধ শুরুর পরই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে? 

তাহলে বাংলাদেশ কি ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে সরে আসছে? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি ব্যর্থ হয়েছে?

“হ্যাঁ, যদি আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আমাদের নিজস্ব যে মূল্যবোধ- এগুলো বিবেচনায় আনেন, তাহলে অবশ্যই আমরা সঠিক পথে নেই,” বলেন অধ্যাপক নুরুজ্জামান।  

“সঠিক পথে না থাকার কারণই হচ্ছে, এটা আসলে আমাদের এক ধরনের দুর্বলতা। আমরা এই দুর্বলতা কাটাতে কখনোই কোনো চেষ্টা করি নাই,” যোগ করেন তিনি।

 ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলা এবং যুদ্ধ শুরুর পর তিনটি বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক নীতি ভেঙে একাধিক দেশের সার্বভৌমত্ব আক্রান্ত হলেও ইরানের ঘটনার নিন্দা জানানোর বিষয়টি ‘সচেতনভাবে’ এড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের তিন বিবৃতি ও সংকট 

ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয় গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি। শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেইনিকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আরো কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডার। 

ইরান পালটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইসরায়েলে হামলা চালায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। 

এই অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় গত পহেলা মার্চ। বিবৃতিতে ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করে তাদের ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন’-এর ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে বাংলাদেশ। 

“বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনেরও নিন্দা জানায় বাংলাদেশ,” বলা হয় ওই বিবৃতিতে। 

এতে আরও বলা হয়, “বাংলাদেশ আশা করে যে, যত দ্রুত সম্ভব শান্তি ফিরে আসবে এবং এই অঞ্চলজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অবিলম্বে পুনরুদ্ধার হবে।” 

ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলার কোনো নিন্দা না জানিয়ে, অন্য দেশগুলোর ওপর হামলার নিন্দা প্রকাশ করায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ‘একপেশে’ অবস্থান সামনে চলে আসে বলে কূটনৈতিক মহলে ‘সমালোচনা’ চলছে।   

“ইরানের ওপর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনোরকম নিন্দা নেই। বরং ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোতে যে আক্রমণ করেছে, সেটার আবার নিন্দা জানিয়েছে,” বলেন মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। 

“আমরা যদি সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি, ১৯৭১এ আমরা সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াই করেছি। এখন অন্যের সার্বভৌমত্ব আমাদের চোখের সামনে নষ্ট হয়, আমরা কিছু বলতে পারি না।” 

তারিক এ করিম যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ভারতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সমালোচনার শুরু হলে দোসরা মার্চ আরো দুইটি বিবৃতি দেয় বাংলাদেশ সরকার। একটিতে খামেইনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয় এবং আরেকটি বিবৃতির বিষয় ছিলো যুদ্ধের মধ্যে নিহত হওয়া দুই প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়ে। 

“সরকার অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছে যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনিকে একটি পরিকল্পিত হামলায় হত্যা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির লঙ্ঘন। সরকার ইরানের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে।” 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, সংঘাত কোনো সমাধান আনে না এবং কেবল সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার মাধ্যমেই বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব।” 

এই বিবৃতিতেও ইরানের ‘সার্বভৌমত্ব’-এর ওপর হামলার নিয়ে নিন্দা জানানোর বিষয়টি এড়িয়ে যায় বাংলাদেশ।  

তারিক এ করিম বলেন, “আমরা সম্ভবত কোনো প্রধান শক্তির চাপে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি। স্যাংশন হোক, আর যাই হোক না কেন।” 

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক নীতি ভেঙে একাধিক দেশের সার্বভৌমত্ব আক্রান্ত হলেও ইরানের ঘটনার নিন্দা জানানোর বিষয়টি ‘সচেতনভাবে’ এড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ।

“অনেক দেশ তাদের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্টভাবে সার্বভৌমত্বের বিষয়টি তুলে ধরলেও বাংলাদেশের প্রথম বিবৃতিতে এটি সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল,” ডেইলি স্টারের এক নিবন্ধে লিখেছেন বদরুল হাসান, যিনি জাতিসংঘের পেশাদার মানবিক সহায়তা কর্মী হিসেবে পরিচিত।

তিনি মনে করেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক–দুই ধরনের প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই পথ চলতে হচ্ছে ঢাকার নতুন সরকারকে। মুসলিমপ্রধান দেশের জনগণের আবেগ মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। আবার পশ্চিমা বাজার, উপসাগরীয় দেশগুলোর শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি। 

“মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্স অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অতিরিক্ত কঠোর বা সংঘাতমুখী কূটনৈতিক ভাষা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে,” লিখেছেন তিনি। 

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি, শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের মতো নির্ভরতাগুলোই পররাষ্ট্রনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে সুনির্দিষ্ট নীতি বা অবস্থান না থাকাটাও রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না বলেও মনে করেন তারা। 

“যদি নির্দিষ্ট নীতি না থাকে, নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান না থাকে, ইমেজ না থাকে-তাহলে আপনি কোথাও নাই। তার মানে সুবিধাবাদীর মতো নীতি অনুসরণ করেন। যেখানে আপনার স্বার্থ আছে, সেখানেই আপনি থাকছেন। যেখানে স্বার্থ নাই সেদিক থেকে দূরে সরে আছেন,” বলছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক নুরুজ্জামান। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় শূন্য। রপ্তানিও তেমন নাই, আমদানি করি না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো থেকে তেল, গ্যাস আমদানি করি। আমরা ওদের ওপর আমদানি নির্ভরশীল। 

“বাংলাদেশের পক্ষে এই জন্যই কে কী ভাবলো, কে কী মনে করলো, আমরা কোনদিকে যাবো- আমাদের এই নির্ভরতা। ওদিকে আমেরিকান মার্কেট। পোশাক রপ্তানি যদি বন্ধ হয়ে যায়! এইসব চিন্তাভাবনা করে আমাদের আসলে কোনো পজিশনই নাই।”  

অধ্যাপক নুরুজ্জামান বলেন, “আমরা শুধু একটাই বলব, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা চাচ্ছি, কূটনৈতিক সমাধান হোক। আমরা চাচ্ছি, সব পক্ষ ধৈর্য ধারণের পক্ষ নিন। এই ধরনের ভেইক কথাবার্তা চলে।”    

সম্প্রতি বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে ‘অসন্তুষ্ট’ হয়েছে ইরান। নিজেদের ‘অস্বস্তি’র কথা প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে তারা। 

গত পহেলা এপ্রিল ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি। এই বিবৃতি আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল।” 

“আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের কিছু বিবৃতিতে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু আগ্রাসনের স্পষ্ট নিন্দা করা হয়নি।”

তুরস্কে আনাতোলিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামের সাইডলাইনে ইরানের উপপরাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহর সাথে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, “বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র। আমাদের ভাই (বাংলাদেশ) হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সেটা হয়নি। এটা আমাদের জন্য কষ্টের।” 

“আমরা আশা করি, বাংলাদেশ আরও স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেবে। অন্যান্য দেশ যেমন- পাকিস্তান, তুরস্ক এই হামলার নিন্দা করেছে এবং সংলাপ ও শান্তির আহ্বান জানিয়েছে।”

ইরানের কষ্ট পাওয়ার প্রভাব টের পেয়েছে বাংলাদেশও। যুদ্ধ শুরুর পরই বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। 

তবে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর জন্য ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইরানের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক রয়েছে, এমন কয়েকটি দেশ অবরোধ চলাকালীন সময়েও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করাতে পেরেছে।

কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পরই আটকে যায় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। অনেক দেন-দরবারের পরও সেই জাহাজ বের করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।

এর মধ্যেই সোমবার তুরস্কে আনাতোলিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামের সাইডলাইনে ইরানের উপপরাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহর সাথে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংকট নিয়ে বাংলাদেশের ‘ধারাবাহিক ও ভারসাম্যপূর্ণ’  অবস্থান তিনি ‘পুনর্ব্যক্ত’ করেন বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’কে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে সহযোগিতা করতে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।

কিন্তু বাংলাদেশের জাহাজ কিংবা বাংলাদেশেমুখী অন্য দেশের জাহাজ অবরোধ চলাকালীন হরমুজ পাড়ি দিতে পারবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত না। 

টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেফ্রি ট্যালিয়াফেরো চারটি বিষয় তুলে ধরে দেখিয়েছেন, এই ঘটনাগুলোই ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিয়েছে।

বিশ্ব শক্তিগুলোর নতুন মেরূকরণ ও বাংলাদেশ 

ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার পরই বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরূকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের বারবার আহ্বানের পরও যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো মিত্ররা ‘ইরান’ যুদ্ধে জড়াতে রাজি হয়নি। 

ইরানে আমেরিকার সামরিক অভিযান শুরুর পর চীন ও রাশিয়া ‘সূক্ষ্ম ভারসাম্য’ বজায় রেখে চলছে। ইউরোপের ‘শক্তিধর’ দেশগুলো এমনকি আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও চীনের যোগাযোগ বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষণ হচ্ছে।   

আর এই ভারসাম্যই বিশ্ব রাজনীতিকে নতুন মেরূকরণের পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেফ্রি ট্যালিয়াফেরো চারটি বিষয় তুলে ধরে দেখিয়েছেন, এই ঘটনাগুলোই ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিয়েছে। 

অষ্ট্রেলিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কনভারসেশন’-এ জেফ্রি ট্যালিয়াফেরো একটি বিশ্লেষণী নিবন্ধ লিখেছেন, যার শিরোনাম হলো- “একুশ শতকের মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে, চারটি দিক”। 

ইরান যুদ্ধে মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করা সেই চারটি দিক হলো: 

১. মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারানো: যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও, এই যুদ্ধের ফলে অনির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশটিকে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প অংশীদার, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

২. অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্য থেকে মনোযোগ সরে যাওয়া: ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব ঘোষিত কৌশল ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ও ‘পশ্চিম গোলার্ধে ফোকাস’ থেকে সরে গেছে। এর ফলে চীন ও রাশিয়া অন্য অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হচ্ছে।

৩. অসম অর্থনৈতিক প্রভাব: হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হলেও তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে লাভবান হয়েছে রাশিয়া। একইসঙ্গে জ্বালানি বৈচিত্র্য ও অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করায় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে চীন।

৪. বৈশ্বিক নেতৃত্বের ক্ষতি: বিভিন্ন ঘটনায় ‘নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভাবমূর্তি ছিলো, যুদ্ধের কারণে তা দুর্বল হয়েছে। আর বিপরীতে চীন কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় সক্রিয় হয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্বের জায়গা শক্ত করছে। একই সঙ্গে রাশিয়াও লাভবান হচ্ছে। কারণ, অন্য সংঘাত (যেমন-ইউক্রেইন) থেকে মনোযোগ সরে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এবং গ্যাস, সারসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়। এই প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভূরাজনীতিতে দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আরও পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে আমেরিকা। দেশটিতে ঋণের উচ্চ সুদের হার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। 

আমেরিকান প্রভাব কমে আসার এসব মূল্যায়নের মধ্যে বাংলাদেশ কোন অবস্থানে যাবে? পররাষ্ট্রনীতিতে কি নিজস্ব ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতে পারবে? 

তারিক এ করিম বলেন, “আমাদের ইন্টারেস্ট হবে, বিশেষ করে- আমাদের অবস্থান, আকার, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বিবেচনা করে। আমাদের সম্পর্ক হবে- সকলের সাথে, বিশেষ করে সব প্রধান পক্ষের সাথে। কোনো নির্দিষ্ট প্রধান শক্তির সাথে নয়।”

“বিশ্ব পুনর্বিন্যাস হচ্ছে, আগের ওয়ার্ল্ড অর্ডার নেই। শেষ। আমেরিকা নিজেকে নিজে শেষ করেছে,” মন্তব্য করেন তিনি। 

কিন্তু তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি অন্যান্য শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সহাবস্থান রাখতে হবে বলে মনে করেন তারিক এ করিম।  

“আমেরিকার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতেই হবে, অবশ্যই রাখতে হবে বিভিন্নভাবে। এর মানে এই নয় যে, আমরা অন্যান্য শক্তিগুলোকে পুরোপুরি বাদ দেবো। এটা করতে পারি না।” 

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ‘মোটামুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র’ এই নীতি কিছুটা হলেও বজায় রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয় দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য। 

অধ্যাপক নুরুজ্জামান বলেন, “দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক, সামরিক এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থাও খারাপ। এরা সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকে। এই নির্ভরতার জন্য এরা কোনো ধরনের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারে না। এরা দুইটা কথা বেশি বলে। একটা হলো- নিউট্রালিটি বা নিরপেক্ষতা। অন্যটি বলে- সংযম প্রদর্শন বা কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যার সমাধান।”

“কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রটি আরও ভিন্ন। আমরা সিলেকটিভলি নিউট্রল থাকি, সিলেকটিভলি পক্ষ নেয়।” 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই অধ্যাপক মনে করেন, ২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেইনে আক্রমণ করেছিল, তখন বাংলাদেশ সেই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিলো। এখন ইরানের ওপর আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু এখানে কোনোরকম নিন্দা নেই। 

তবে বিশ্বে এমন কিছু দেশ রয়েছে, যারা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধের ঘটনাও তাদের নীতি বদলাতে পারে না। 

সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেন, “তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের একটা অবস্থান সৃষ্টি করেছেন। নরওয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শান্তির পক্ষে কথা বলে। সুইডেন শান্তির পক্ষে কথা বলে। বাস্তবে তারা শান্তির পক্ষে অবস্থান নেয়।”  

“যদি শুরু থেকে আমাদের একটা নির্দিষ্ট অবস্থান থাকত যে, আমরা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যেকোনো মূল্যেই নিন্দা করবো। কিন্তু, সেই ধরনের পজিশন আমাদের নাই। যে কারণে বাংলাদেশ কোথাও নাই।” 

ইরাক-ইরান যুদ্ধ থামাতে বাংলাদেশের ভূমিকায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। কিন্তু পরে ইরাকের পক্ষ নিলে বাংলাদেশের ওপর ‘আস্থা’ হারিয়ে ফেলে ইরান।

বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্ক কেমন হতে পারে

বাংলাদেশের ওপর পারস্য সভ্যতার ঐতিহাসিক প্রভাব থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্ক খুব ‘মধুর’ হয়নি, আবার ‘তিক্ত’ও হয়নি। মানে সম্পর্কে অগ্রগতি কম।  

দুই দেশের মধ্যে দূতাবাস রয়েছে এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটে।

১৯৯৫ সালে ইরানের রাষ্ট্রপতি হাশেমি রাফসানজানি প্রথম ইরানি নেতা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ সফর করার পর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইরান সফরে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। 

ইরাক-ইরান যুদ্ধ থামাতে বাংলাদেশের ভূমিকা ইরানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দেয় বলে স্মরণ করেন সে সময়ে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করা তারিক এ করিম। 

“ইরানের সঙ্গে কিন্তু এককালে খুব ভালো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। যখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলো ১৯৮০তে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মিডিয়েটর ছিলেন (যুদ্ধ বন্ধে)।” 

“ইরানিরা বাংলাদেশের প্রতি ব্যাপক আস্থা গড়ে তুলেছিল, বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের ওপর। কারণ, ইরান তাকে একজন অত্যন্ত সৎ ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখত।” 

কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সেই অগ্রগতিতে ছেদ পড়ে এবং বাংলাদেশ ইরাকের পক্ষ নেওয়ায় ইরানের কাছে ভাবমূর্তি খারাপ হয়ে যায় বলে জানান তারিক এ করিম। 

“তারপরে যখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আর দৃশ্যপটে থাকলেন না, তার উত্তরসূরি পুরোপুরি সরে গেলেন ইরাকের দিকে এবং তখন ইরানিরা আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।” 

ইরাকের পক্ষ নেওয়ার পর ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আবার ‘মেরামত’ করতে কীভাবে বেগ পেতে হয়েছিলো, নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন তারিক এ করিম।

“আমি ১৯৯১ সালের শেষের দিকে (ইরানে) রাষ্ট্রদূত হয়ে গেলাম। আমি প্রথম ছয়/সাত মাস হাবুডুবু খেয়েছি। দরজা খোলে না। পরে জানতে পারলাম, এটা হলো কারণ (ইরাকের পক্ষ নেওয়া)।” 

“তখন আমাকে বলতে হয়েছিল, আমি একজন বাংলাদেশি। আমরা ভালো সম্পর্ক চাই। প্রায় ৮-১০ মাস লেগেছে মানুষের সাথে কথা বলতে এবং ইরানের কাছে প্রসঙ্গ তু্লে ধরতে।”

বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হলো- দেশটিতে বিপুল জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত রয়েছে ইরানে। দেশটিতে প্রমাণিত গ্যাস মজুতের পরিমাণ প্রায় ১২০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, যা বিশ্বের প্রায় ১৭ শতাংশ।

একুশ শতকে বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক তেমন কোনো গতি পায়নি। এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বৈরি সম্পর্ক এবং নানা ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 

কিন্তু ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ‘গভীর’ হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা। কারণ বিশ্বের নতুন মেরূকরণে ইরান ক্রমশই শক্তিশালী ‘খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। 

বাংলাদেশের জন্য দুইটা কারণে ইরান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অধ্যাপক নুরজ্জামান। 

“মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো ইরান সাধারণ কোনো রাষ্ট্র না। এইটা একটা সভ্যতা। ইরানের সাথে সম্পর্ক মানে একটা সভ্যতার সাথে সম্পর্ক। আরেকটা হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। তারা সহজেই এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ কারণে ইরানের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।” 

কিন্তু বাংলাদেশ কখনো ইরানের এই গুরুত্বকে ‘সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে নাই’ বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই বিশ্লেষক। 

“এখন যেমন তেলের জন্য সংকট হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে এই সমস্যা হওয়ার কথা ছিলো না,” বলেন তিনি।  

ইরান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেলসম্মৃদ্ধ দেশ। সেখানে ২০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ১২ শতাংশের মতো। 

খনিজ সম্পদে ভরপুর থাকার পরও বাংলাদেশের সরকারগুলো ইরানের সঙ্গে ‘কৌশলগত সম্পর্ক’ গড়তে ‘ব্যর্থ হয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক নুরুজ্জামান। 

“আমাদের সরকার কখনোই ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে পারেনি। আমরা সম্পর্ক করেছি কাতারের সঙ্গে, কুয়েতের সঙ্গে। তাদেরকে কে পরোয়া করে? তারা জ্বালানি রপ্তানি করে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। কিন্তু তারা তো সামরিক শক্তি না। তারা কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তিও না। আমি তাদেরকে গুরুত্বহীন বলছি না। কিন্তু ইরানের গুরুত্ব তাদের থেকে অনেক বেশি।” 

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটা ব্যর্থতা যে, ইরানের প্রতি কোনোরকম গুরুত্ব দেয়নি, নজরও দেয়নি।”  

বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হলো- দেশটিতে বিপুল জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত। 

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত রয়েছে ইরানে। দেশটিতে প্রমাণিত গ্যাস মজুতের পরিমাণ প্রায় ১২০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, যা বিশ্বের প্রায় ১৭ শতাংশ। 

এছাড়া ইরান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল মজুতকারী দেশ। সেখানে ২০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ১২ শতাংশের মতো। 

বিপুল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার ইরানকে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। 

তাই আমেরিকার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধেও ‘বড় ধরনের যুদ্ধ’ চালিয়ে যেতে পিছপা  হচ্ছে না দেশটি। আর এই যুদ্ধের মাধ্যমেই ‘ভিন্ন’ এক ইরানের আবির্ভাব হবে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম। 

“এই যুদ্ধটা-প্রকৃতপক্ষে ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তি, এমনকি হয়ত একটি বিশ্বশক্তিতে পরিণত করছে,” বলেন তিনি।  

“আমি ঝুঁকি নিয়েই বলব, যদি যুদ্ধ আবার শুরু হয়, যদি আবার ইরানে বোমা মারা হয়- তাহলে পারস্য উপসাগরের পশ্চিমদিকের সভ্যতা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ যা কিছু আছে সব ধ্বংস করে দেবে ইরান।” 

তারিক এ করিম বলেন, “ইরান আয়তনে প্রায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমান। জনসংখ্যা ৯৩ মিলিয়ন। তারা তেলের তৃতীয় বৃহত্তম ভাণ্ডার। তারা গ্যাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাণ্ডার। আমি শুধু এটাই নিতে পারতাম, আর কিছু না।” 

“আমরা হয়ত ইন্টারনাল, এক্সটারনাল পাওয়ারের চাপে পড়ে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।” 

আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ শক্তি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকলেও, ঐক্যবদ্ধভাবে বাইরের শত্রু মোকাবিলায় তাদের রয়েছে ঐতিহ্যগত ঐক্য।

তারিক এ করিম বলেন, “ইরানি সভ্যতা পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। তাদের গভীর ইতিহাস রয়েছে। তাদের হৃদয় হলো টাইটানিয়ামের মতো এবং ইস্পাত-কঠিন মেরুদণ্ড রয়েছে। তারা রুখে দাঁড়াবে। ভয় দেখানোর চেষ্টাকারী কোনো ছোট বা বড় শক্তির কাছে তারা কখনো আত্মসমর্পণ করবে না।”  

“নিজে মার খেয়ে যাবে। কিন্তু দেশের প্রতিটি পুরুষ ও নারী শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাবে,” বলেন তিনি। 

তারিক এ করিম আরও বলেন, “ইরানিদের কিন্তু দীর্ঘ স্মৃতি আছে। এটা তাদের নিজস্ব লিগ্যাসি সম্পর্কে যেমন, তেমনি কারা আমাদের দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং কারা আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।” 

এ কারণেই হয়ত সম্প্রতি বেসরকারি গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ওয়ান’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেছেন, “যুদ্ধ একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু, বিভিন্ন দেশ আমাদের সাথে কেমন আচরণ করেছে, সেটা আমরা মনে রাখবো।”

“ইরান আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার চাইলে আমাদের ফোন করে সহানুভূতি জানাতে পারতো।”

ইরানের রাষ্ট্রদূতের কথাতেও পরিষ্কার যে, দেশটির সার্বভৌমত্বের ওপর হামলার ঘটনায় কোনো নিন্দা জানায়নি বাংলাদেশ। 

স্বাভাবিকভাবেই ইরান যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

একদিকে রপ্তানি নির্ভরতা, শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও বৈশ্বিক শক্তির চাপ। আর অন্যদিকে নীতিগত অবস্থান ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন। 

এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশ ‘অস্পষ্ট ও প্রতিক্রিয়াশীল’ অবস্থান নিয়েছে বলেও মনে করছেন তারা। 

এর ফলে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ যেমন হাতছাড়া হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থানও হচ্ছে দুর্বল।