বাংলাদেশে দিল্লির সম্ভাব্য দূত কে এই আরিফ মোহাম্মদ খান 

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে ঢাকায় হাইকমিশনার নিয়োগ নিয়ে ভিন্ন একটি বিষয় সামনে এনেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। 

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে পেশাদার কূটনীতিক পাঠানো হলেও এবার সেই রেওয়াজ ভেঙে বের হতে চাইছে ভারত।

একজন ‘অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ’ বা ‘প্রশাসক’কে বাংলাদেশে হাই কমিশনার করে পাঠানো হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। 

বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মাকে ‘সম্ভবত’ ব্রাসেলস-এ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম টাইমস নাউ।

আর প্রণয়ের উত্তরসূরি খুঁজতে দিল্লির ‘অন্দরমহলে’ প্রতিনিধি বাছাইয়ের কাজ চলছে। 

বিহারের সদ্য সাবেক গভর্নর ও বিজেপি নেতা আরিফ মোহাম্মদ খানকে হাই কমিশনার হিসেবে ঢাকায় পাঠানো হতে পারে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ‘ইন্ডিয়ানমান্দারিনস’।

ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “আরিফ মোহাম্মদ খানকে যখন বিহারের গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তখন অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, তিনি এমন একজন গভর্নর ছিলেন, যিনি কেরালা ও বিহার দুই রাজ্যেই কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন।” 

“এখন ক্ষমতার অন্দরে গুঞ্জন চলছে যে, খানকে বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।” 

আরিফ খান চার দশকের ‘অভিজ্ঞ’ রাজনীতিবিদ। তরুণ নেতা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায়।

এরপর কংগ্রেস ছেড়ে জনতা দল, বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং শেষে বিজেপিতে যোগ দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় একাধিক সরকারে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কেরালা এবং এরপর বিহারের রাজ্য হিসেবে দায়িত্ব সামলান। 

স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় রাজনীতির ‘আলোচিত’ এই ব্যক্তিকে বাংলাদেশে কেন পাঠানো হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। 

কেন পেশাদার কূটনীতিকের বাইরে যেতে চাচ্ছে ভারত

ভারতের অন্যতম বড় মিডিয়া গোষ্ঠী টাইমস নেটওয়ার্কের টাইমস নাওয়ের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, কোনো দেশে রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার সাধারণত ক্যারিয়ার কূটনীতিক হন। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।

অনেক সময়ই ভারত গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ বা প্রশাসকদের দূত হিসেবে পাঠিয়েছে। 

১৯৮৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পাঁচজন রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যারা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না। এরা ছিলেন রাজনীতিবিদ, আমলা ও অর্থনীতিবিদ।

আবার ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন তিনজন আমলা, সাংবাদিক ও আইনপেশার পরিচিত ব্যক্তিত্ব। 

তাই ভারতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে অপেশাদার রাষ্ট্রদূত পাঠানোর নজির থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টান্ত নেই। 

তাই হঠাৎ করেই বাংলাদেশের জন্য কেন আরিফ মোহাম্মদ খানের মতো ‘অভিজ্ঞ’ রাজনীতিবিদকে বেছে নেওয়া হতে পারে, তা নিয়ে গুঞ্জন চলছে। 

ইন্ডিয়ানমান্দারিনস লিখেছে, “যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অনেকদিন পর এমনটা ঘটবে যে, একজন ক্যারিয়ার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।” 

২০২৪ সালে অগাস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ‘জটিল রসায়ন’-এর ভেতর দিয়ে আবর্তিত হয়েছে। 

ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর পারস্পরিক সম্পর্কের ‘উন্নতি’ হওয়ার আশা করছেন কেউ কেউ। 

ঠিক এমন সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অপেশাদার কুটনীতিকের নাম আলোচনায় আসছে।  

টাইমস নাউ লিখেছে, “একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও, বাংলাদেশ ও ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায়।” 

“যদিও সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে, তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এখনো সময় লাগবে। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচন পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক করেছে।” 

আরিফ মোহাম্মদ খানের পাশাপাশি এমন একজন দূতের কথাও আলোচনায় আছে, যিনি বাংলা ভাষায় দক্ষ এবং বাংলাদেশে ও এর সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত।

“তাই একজন রাজনৈতিক নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না,” লেখা হয়েছে টাইমস নাউয়ের বিশ্লেষণে। 

কে এই আরিফ মোহাম্মদ খান

উত্তর প্রদেশে জন্ম নেওয়া আরিফ মোহাম্মদ খান লেখাপড়া করেছেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্র রাজনীতির সময় থেকেই তুমুল জনপ্রিয়। 

১৯৭৭ সালে ২৬ বছর বয়সে বিধায়ক নির্বাচিত হন। এরপর যোগ দেন কংগ্রেসে। ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী হন। 

ভারতে তরুণ বয়সে যে কয়জন ব্যক্তি মন্ত্রী হয়েছেন, আরিফ মোহাম্মদ খান তাদের অন্যতম। অত্যন্ত প্রভাবশালী এই ব্যক্তি রাজীব গান্ধীর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

রাজীব গান্ধীর শাসনামলে ভারত কাঁপিয়ে দিয়েছিল শাহ বানুর মামলা। একজন মুসলিম নারীর খোরপোশ দাবির একটি সাধারণ মামলা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল উপমহাদেশের রাজনীতির। ভারত হয়ে যায় দুইভাগ। 

এই মামলার রায় ঘিরে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বাবরি মসজিদ ভাঙার রাজনীতিতে রূপ নেয়। 

শাহ বানুর পক্ষে সংসদে দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন আরিফ খান। তার বক্তব্য এতটাই শানিত ছিল যে, খোদ প্রধানমন্ত্রীও তাকে প্রশংসা করতেন প্রকাশ্যে।

আরিফ খানের অবস্থানের কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন, ভারতে পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের পক্ষ নেবে সরকার। কিন্তু শাহ বানুর মামলা ঘিরেই রাজীব গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কের ফাটল ধরে আরিফ খানের।   

শাহ বানুর মামলার রায় ঘোষণার কয়েকমাসের মধ্যেই ঘোলাটে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিবেশ। রাজীব গান্ধীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারা। 

১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে কয়েকটি উপনির্বাচন হয়। সেখানে ভরাডুবি ঘটে কংগ্রেস প্রার্থীদের। ভয় পেয়ে যান রাজীব গান্ধী। মুসলিম ভোট ব্যাংক হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা পেয়ে বসে তাকে।

এরপর রাজীবের সরকার মুসলিম তোষণের নীতি গ্রহণ করে। এ কাজ করতে গিয়ে আরিফ খানকে এড়িয়ে চলা শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী।

আরিফ খানকে কিছু না জানিয়েই রক্ষণশীল আলেমদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু করে সরকারের শীর্ষ মহল। রাজীব গান্ধী সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, মুসলিম ভোট ধরে রাখতে হলে ওলামাদের সঙ্গে আপস করতেই হবে।

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আসন নিয়ে ভারতে ক্ষমতায় এসেছিলেন রাজীব গান্ধী। তরুণ প্রধানমন্ত্রীকে সবাই আধুনিক ও প্রগতিশীল নেতা হিসেবে দেখতেন। 

আশা করা হয়েছিল, তার হাত ধরে ভারতে বড় ধরনের সামাজিক সংস্কার আসবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ওপর জল ঢেলে দিয়ে রাজীব গান্ধী শেষ পর্যন্ত ওলামাদের পক্ষেই দাঁড়ালেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সুপ্রিম কোর্টের শাহ বানু রায়কে কার্যত অকার্যকর করে দিতে নতুন আইন পাস করা হবে সংসদে।

১৯৮৬ সালে সংসদে ‘মুসলিম মহিলা (বিবাহবিচ্ছেদে অধিকার সুরক্ষা) বিল’ আনার ঘোষণা দেয় সরকার। এর বিরোধিতা করেন আরিফ মোহাম্মদ খান। ক্ষোভ ও হতাশায় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে পরে বিলটি পাসও করে নেয় কংগ্রেস। 

ইতিহাসে এই ঘটনাই পরিচিত হয়ে যায় ‘শাহ বানু রায়কে উল্টে দেওয়া’ হিসেবে। কার্যত, সুপ্রিম কোর্টের মানবিক ও প্রগতিশীল রায় অকার্যকর হয়ে যায় সংসদের এক ভোটে।

আর ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সেই সময়ের প্রভাবশালী তরুণ প্রতিমন্ত্রী আরিফ মোহাম্মদ খান রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভা, এমনকি কংগ্রেস থেকেও পদত্যাগ করেন।

কংগ্রেস ত্যাগ করে অন্যদলে যোগ দেন জনতা দলে। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি ঘটে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের।

জনতা দল ছেড়ে বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং পরে যোগ দেন বিজেপিতে। যে দলেই গেছেন সেখানেই মন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছেন আরিফ মোহাম্মদ খান। 

এবার ‘অভিজ্ঞ’ সেই রাজনীতিবিদকেই ঢাকায় হাই কমিশনার করে পাঠানোর আলোচনা শুরু হয়েছে ভারতে।