নয় বছর শেষ হলো। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এখনও জানে না কবে তারা ফিরতে পারবে নিজ জন্মভিটায়।
বাংলাদেশতো বটেই, এমনকি জাতিসংঘ, বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র, জোট সবাই একমত যে রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের জন্মভূমিদতে ফিরে যেতে হবে।
সবাই একমত যে প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান। তবে শর্ত হচ্ছে প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।
কিন্তু এই ঐকমত্য বাস্তবায়নের জন্য কী করা হয়েছে এক দশকে। সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কম কিছু হয়নি।
তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা। ২০১৭ সালের ২৫এ অগাস্ট থেকে তিন মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।
২০২৩ সালে আরাকানে ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের’ হামলা শুরু হলে আরো দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢোকে।
এছাড়া প্রতি বছর ২৫ হাজার শিশু জন্ম নেয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। তাই সব মিলিয়ে এখন উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। কক্সবাজারের এই দুই উপজেলায় বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৫ লাখের বেশি।
এই বছরের ১৫ই অগাস্ট মিয়ানমার সরকারও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছে। তবে এ জন্য রাখাইনের ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল’ হতে হবে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ৩ লাখের বেশি ‘বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের’ মিয়ানমারের নাগরিক বলে স্বীকার করেছে দেশটি। তবে তাদের জাতিগত পরিচয় ‘রোহিঙ্গা’ উল্লেখ করা হয়নি ওই বিবৃতিতে। বরং তাদের উল্লেখ করা হয়েছে ‘বাঙালি’ হিসাবে।
এই দাবি মিয়ানমার সরকারের বেশ পুরোনো। যার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। অন্তত এই অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে লেখা অসংখ্য বই ও গবেষণা এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে।
২০১৭ সালের সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে ভিত্তি ধরলে এই সংকটকে নয় বছর বয়সী বলা যায়। কিন্তু কার্যত এই সংকট কয়েক শতকের।
রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান রূপ কোনো একক ঘটনা বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের নীতিকৌশলের ফল নয়। বরং এর পেছনে আছে প্রাক-ঔপনিবেশিক আরাকান, ব্রিটিশ উপনিবেশ, জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাম্প্রদায়িক সংঘাত, বর্মি জাতীয়তাবাদের উত্থান, ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থান, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন, ধারাবাহিক সামরিক অভিযান, ২০১৭ সালের জাতিগত নিধন এবং সর্বশেষ রাখাইনে ‘আরাকান আর্মির’ উত্থান।
যার পরিণতিতে বাংলাদেশের ওপর তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চাপ। বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূরাজনৈতিক স্বার্থনির্ভরতার কারণে আছে নীতির সীমাবদ্ধতাও।
আরাকানে মুসলিম উপস্থিতির ঐতিহাসিক শেকড়
ইসরায়েলি স্কলার ও কূটনীতিক মোশে ইয়েগারের তার ‘দ্য মুসলিমস অব বার্মা’ বই এবং গবেষণাপত্র ‘দ্য ক্রিসেন্ট ইন আরাকান’-এ দেখিয়েছেন আরাকানে মুসলিম উপস্থিতি কয়েকশ বছরের পুরোনো।
অষ্টম ও নবম শতাব্দীতেই আরব ব্যবসায়ীদের আরাকান উপকূলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে বাণিজ্যিক ও সামাজিক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়।
অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী আরাকানে স্থায়ী বসতি গড়েন। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈবাহিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
তাই আরাকানে মুসলিম উপস্থিতি কোনো একক সময়ে বাইরে থেকে এসে তৈরি হওয়া একটি বিচ্ছিন্ন জনবসতি নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণে তা বিকশিত হয়েছে।
ম্র উ রাজবংশের সময়কাল এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যা আনুমানিক ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
ইতিহাসবিদ মাইকেল ডব্লিউ চার্নি তার ‘হোয়্যার জামুদ্বিপা অ্যান্ড ইসলামডম কনভার্জড’ গবেষণায় দেখিয়েছেন কিভাবে আরাকান ও বাংলার ‘সালতানাতের’ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
১৪৩০ সালে আরাকানের ক্ষমতাচ্যুত রাজা মিন সোয়া মোন বাংলার সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহের সামরিক সহায়তায় আরাকানের সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন।
ম্র উ রাজাদের শাসনব্যবস্থা ও রাজদরবারে বাংলার মুসলিম রাজনৈতিক সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য প্রভাবও দেখা যায়।
আরাকানের বৌদ্ধ রাজারা নিজেদের নামের সঙ্গে শাহ উপাধি ব্যবহার করতেন। রাজদরবারে ফার্সি ও বাংলা ভাষারও ব্যাপক চর্চা ছিল।
সাহিত্য ও প্রশাসনেও এর প্রতিফলন ছিলো। ম্র উ রাজদরবারে দৌলত কাজী ও আলাওলের মতো বাঙালি মুসলিম কবিরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’-এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আরাকানের রাজসভার মন্ত্রী মাগন ঠাকুর।
তাই আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেবল সাধারণ শ্রমজীবী অভিবাসী হিসাবে দেখা ইতিহাস সমর্থন করে না।
ম্র উ যুগে মুসলিমরা আরাকানের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক পরিসরের অংশ ছিল।
বাংলায় অনুপ্রবেশের শুরু যেভাবে
১৭৮৪ সালে বর্মি রাজা বোদাওপায়া আরাকান দখল করেন। সেখানে সহিংসতা ও নিপীড়ন শুরু হলে বহু মানুষ চট্টগ্রাম অঞ্চলে পালিয়ে আসে।
এতে আরাকানের জনকাঠামোতে বড় পরিবর্তন হয়। পরে ১৮২৬ সালের ইয়ান্দাবু চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা আরাকানের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে আকিয়াব যা এখন সিত্তওয়ে নামে পরিচিত, সেখানে কৃষি অর্থনীতি বাড়তে থাকে।
পতিত ও অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনতে ব্রিটিশ প্রশাসন চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে শ্রমিক নিয়ে আসে। এতে আরাকানে নতুন করে মানুষের চলাচল শুরু হয়।
ব্রিটিশ শাসনামলে বার্মা ও বাংলা একই সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। তাই চট্টগ্রাম থেকে আরাকানে মানুষের যাতায়াত আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অর্থে এক দেশ থেকে অন্য দেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন ছিল না।
পরবর্তী সময়ে এই বাস্তবতাই রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ব্রিটিশ প্রশাসনের জনশুমারি ব্যবস্থায় ধর্ম, ভাষা ও জাতিগত পরিচয়কে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
বার্মিজ বংশোদ্ভূত মার্কিন ইতিহাসবিদ থান্ট মিন্ট ইউ তার ‘দ্য মেকিং অব মডার্ন বার্মা’ বইয়ে বলেছেন ব্রিটিশ শাসনামলের জনগণনায় মানুষের পরিচয়কে প্রশাসনিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিলো।
আরাকানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করা মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে যাওয়া জনগোষ্ঠীকে অনেক ক্ষেত্রেই 'চিটাগনিয়ান' বা 'বাঙালি' হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসই পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে নতুন অর্থ পেতে শুরু করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর জাতিগত মেরুকরণ
১৯৯১ সালে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ মার্টিন স্মিথের ‘বার্মা: ইনসারজেন্সি অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব এথনিসিটি’ বইয়ে ১৯৪২ সালের আরাকান সংঘাতের বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বাহিনী বার্মা আক্রমণ করলে ব্রিটিশরা আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য অস্ত্র দেয়। এই বাহিনী ‘ভি-ফোর্স’ নামে পরিচিত ছিল।
অন্যদিকে আরাকানের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর অনেকে জাপান সমর্থিত ‘বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মির’ সঙ্গে যুক্ত হয়।
এতে আরাকানে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘাত শুরু হয়। হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞ ঘটে।
এই সংঘাত শুধু মানুষের প্রাণহানি ঘটায়নি, আরাকানের ভৌগোলিক ও সামাজিক কাঠামোকেও বদলে দেয়।
স্বাধীন মিয়ানমার: স্বীকৃতি থেকে বৈষম্য
১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর মিয়ানমারে সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব রাষ্ট্র বা সরকার অস্বীকার করেনি। তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিলো সংসদেও।
এম এ গাফফার, সুলতান মাহমুদ ও জোহরা বেগম ছিলেন সংসদ সদস্য। সুলতান মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী উ নু'র মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
সাংবাদিক ফ্রান্সিস ওয়েড তার ‘মিয়ানমার এনিমি উইদিন’ বইয়ে লিখেছেন, পঞ্চাশের দশকে মিয়ানমারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উ নু রাষ্ট্রীয় রেডিও সম্প্রচারে 'রোহিঙ্গা' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
১৯৫০ সালে আরাকান সফরে গেলে স্থানীয়রা প্রধানমন্ত্রীকে রোহিঙ্গা হিসাবে স্মারকলিপি দেয়। ১৯৭৪ সালের এক রেডিও ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করে ওই জাতিগত পরিচয় স্বীকার করেন।
ওই সময় রাষ্ট্রীয় রেডিওতে রোহিঙ্গা ভাষায় অনুষ্ঠানও সম্প্রচারিত হতো।
১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি উল্টে যায়। জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করে।
জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায় এবং রোহিঙ্গাদের পরিচয়ও ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে।
অপারেশন নাগা মিন ও নতুন নাগরিকত্ব আইন
১৯৭৮ সালে নে উইন সরকারের অধীনে 'অপারেশন নাগা মিন' বা 'ড্রাগন কিং' নামে একটি সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়।
এর ‘ঘোষিত’ উদ্দেশ্য ছিলো আরাকানে অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত করা। কিন্তু এই অভিযানের সময় ব্যাপক নিপীড়ন, সহিংসতা ও ভয়ভীতির কারণে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এটি রোহিঙ্গা সংকটের প্রথম বড় অনুপ্রবেশ।
১৯৮২ সালে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব আইন পাস হওয়ার কয়েক বছর আগে থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের 'অবৈধ বিদেশি' হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো।
নাগরিকত্বের আইনি কাঠামো পরে এলেও তার সামাজিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিলো।
রোহিঙ্গাদের ইতিহাসে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. নিক চিজম্যানের 'ন্যাশনাল রেইসেস' গবেষণায় উঠে এসেছে, কীভাবে জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়ের কাঠামোতে কিভাবে রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া হয়েছিলো।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ওই আইনে ১৮২৪ সালের আগে থেকে মিয়ানমারে বসবাসের প্রমাণের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়।
রোহিঙ্গাদের বলা হয়, তারা ১৮২৪ সালের আগে থেকেই মিয়ানমার বা বার্মায় বাস করতো, এমন প্রমাণ দিতে হবে।
একটি প্রান্তিক কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে দেড় শতাব্দীর পুরোনো বংশপরম্পরার লিখিত নথি হাজির করা বাস্তবে ছিলো প্রায় অসম্ভব।
১৯৮২ সালের পর পরিচয়পত্র, চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিয়ে, সন্তান জন্মদান এবং জমির মালিকানার ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
তাদের পূর্ববর্তী পরিচয়পত্রের অবস্থানও পাল্টে যায়। রাষ্ট্রহীনতা শুধু পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বের কাগজ না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
গবেষক মং জার্নি ও এলিস কাউলি’র একটি গবেষণা এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াকে ধীরগতির গণহত্যার কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের আইন কার্যত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী কয়েক দশকের বৈষম্য ও নিপীড়নের জন্য একটি কাঠামো।
নিপীড়ন থামেনি কখনোই
১৯৯১-৯২ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী 'অপারেশন পাই থায়া' নামে আরেকটি সামরিক অভিযান চালায়।
নির্যাতন, জমি দখল ও অন্যান্য নিপীড়নের কারণে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
২০১২ সালের রাখাইনে ফের সাম্প্রদায়িক সংঘাত হয়। এতেও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়। প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ বিভিন্ন শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
সিত্তওয়েসহ বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়।
গবেষক পেনি গ্রিন একে ‘গেটোইজম’-এর সাথে তুলনা করেছেন।
‘গেটো’ শব্দটি ১৬শ শতকের ইতালিতে উদ্ভূত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা ইহুদিদের তাদের পেশা, সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রাখত, যা 'গেটো' নামে পরিচিত।
রোহিঙ্গাদেরও একইভাবে শুধু তাদের বাড়িঘর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক জীবনও একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে ফেলা হয়েছিলো।
‘ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং’
ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজের প্রফেসর আজিম ইব্রাহিম তার বই ‘দ্য রোহিঙ্গাস: ইনসাইড মিয়ারমারস হিডেন জেনোসাইড’-এ রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রোহিঙ্গাদের কোনো এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর তাদের জমি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং সেই জায়গায় নতুন বসতি তৈরি করার মাধ্যমে জনমিতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে তার গবেষণায় উঠে এসেছে।
২০১৭ সালের সহিংসতার পর এই প্রক্রিয়া আরও দৃশ্যমান হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্যাটেলাইট ইমেইজ বিশ্লেষণ করে বলেছে, প্রায় ৩৮০টি রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংসের পর সামরিক ঘাঁটি, প্রশাসনিক স্থাপনা এবং নতুন বসতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গাশূন্য এলাকায় অন্য জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য 'মডেল ভিলেজ' বা নমুনা গ্রাম প্রকল্পের কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
মংডু, বুথিডাং ও রাথিডাংসহ উত্তর রাখাইনের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোর জনমিতির ভারসাম্য পরিবর্তনই ছিলো এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য।
অতঃপর ২০১৭…
২০১৭ সালের ২৫এ অগাস্টের থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর 'অপারেশন ক্লিয়ারেন্স' রোহিঙ্গা সংকটকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।
তিন মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির অসংখ্য ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নথিভুক্ত করে।
২০১৭ সালের অভিযান স্রেফ একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টার সব উপাদানই স্পষ্ট ছিলো।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
পরে ২০১৯ সালে ওআইসির পক্ষে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করে।
আরাকান আর্মির উত্থান
একদিকে মিয়ানমার জান্তা অন্যদিকে রোহিঙ্গা, এই ছিলো সমীকরণ। কিন্তু রাখাইনে ‘আরাকান আর্মির’ উত্থান পরিস্থিতি জটিল করে তোলে।
তাদের রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান’ নিজেদের রাজনৈতিক দর্শনকে 'ওয়ে অব রাখাইতা' বা রাখাইনের নিজস্ব পথ হিসাবে তুলে ধরে।
এই মতাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাখাইন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি।
প্রথমদিকে রোহিঙ্গাদের স্বীকার করলেও পরে তারাও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের ব্যবহার থেকে সরে আসে।
আরাকান আর্মির নেতৃত্ব রাখাইনে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকারের কথা বললেও, রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিশ্বাস এবং বৈরিতার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালে অপারেশন ‘টু জিরো থ্রি ওয়ান’ দিয়ে আরাকান আর্মি রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে।
২০২৪ সালের শুরু থেকে রাখাইনে আরাকান আর্মির সামরিক অগ্রগতি দ্রুত বাড়তে থাকে। জান্তা বাহিনী একের পর এক সামরিক ঘাঁটি হারাতে শুরু করলে তারা রোহিঙ্গাদেরও সামরিক কাঠামোর মধ্যে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে।
ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন কার্যকর হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকেও তরুণদের নিয়োগের অভিযোগ সামনে আসে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন বলছে, জান্তা বাহিনী রোহিঙ্গা আইডিপি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে তরুণদের নিয়োগ করে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়।
যে জনগোষ্ঠী কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার, তার একটি অংশই আবার সেই রাষ্ট্রের পক্ষে সামরিক যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়।
এর রাজনৈতিক পরিণতি হয় ভয়াবহ। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের জান্তার সহযোগী হিসাবে দেখতে শুরু করে। দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।
২০২৪ সালে বুথিডাং ও মংডু আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর রোহিঙ্গা এলাকাগুলোতে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের অভিযোগ ওঠে।
হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং অসংখ্য মানুষ আবার বাস্তুচ্যুত হয়। আবারও বাংলাদেশে পালিয়ে আসে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট
মিয়ানমারের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব আছে, এবং তারা সশস্ত্র। শুধু রোহিঙ্গারা এখন পর্যন্ত নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে গড়ে তুলতে পারেনি।
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন এবং তার পরবর্তী কয়েক দশকের বৈষম্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে নাগরিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগকে সংকুচিত করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের গবেষণায় এই রাজনৈতিক শূন্যতার বিষয় উঠে এসেছে।
একটি দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে যদি শক্তিশালী নাগরিক সমাজ, শিক্ষিত নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো না থাকে, তাহলে সেই জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে নিজেদের স্বার্থ কার্যকরভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা হারায়।
মহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড
এই রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হতে না দেওয়াও যে কারো না কারো চাওয়া তা প্রমাণ হয়েছে ২০২১ সালের মহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।
‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর নেতা মুহিবুল্লাহ সাধারণ রোহিঙ্গাদের একটি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি রোহিঙ্গাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে ক্যাম্পেই গুলি করে হত্যা করা হয়।
ফলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বাইরে শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক এবং নাগরিক নেতৃত্বের জায়গা আরও সংকুচিত হয়।
এই শূন্যতার মধ্যেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আরসা, আরএসও, এআরএ’র মতো সংগঠনগুলো নিজেদের রোহিঙ্গাদের স্বার্থরক্ষার শক্তি হিসাবে তুলে ধরলেও, কক্সবাজারের ক্যাম্পে তারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব
মং জারনি ও এলিস কাউলির বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান একটি বড় বাস্তবতা।
রাশিয়া মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং চীন রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত।
চীনের জন্য রাখাইন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চ্যাকফু গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সেখান থেকে ইউনান পর্যন্ত তেল ও গ্যাস পাইপলাইন চীনের জন্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানের একমাত্র অবলম্বন।
চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের কাঠামোতে রাখাইনের অবস্থান কৌশলগত। তাই রোহিঙ্গা সংকটের চেয়ে নিজেদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের জন্যও রাখাইন গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির সঙ্গে যুক্ত কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট, সিত্তওয়ে বন্দরকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ রুট।
তাই চীন ও ভারত উভয়েই মিয়ানমারে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চায়। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট মানবাধিকার প্রশ্ন থেকে অনেক সময় ভূরাজনৈতিক স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে যায়।
চীনের মধ্যস্থতাও কাজে আসেনি
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর, ওই বছরই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রচেষ্টা শুরু হয়।
ওই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল প্রত্যাবাসনের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ছিলো যে, এটি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল।
প্রশ্ন হলো, রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হওয়ায় নেপিদোর জান্তা সরকার কীভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করবে, যেখানে তার নিজের নিয়ন্ত্রণই সীমিত।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে করা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিও তাই কাজে আসেনি।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি এখন একটি বাস্তবতা।
উখিয়া ও টেকনাফে বিশাল ক্যাম্প গড়ে ওঠার ফলে স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ি বনাঞ্চল কেটে ক্যাম্প তৈরি এবং জ্বালানির প্রয়োজনে গাছ কাটার ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়েছে।
স্থানীয় শ্রমবাজারেও পরিবর্তন এসেছে। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও রোহিঙ্গারা বাইরে কাজ করছে।
সস্তা শ্রমের সহজলভ্যতা স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া ও অবকাঠামোর ওপর চাপ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে।
তাই রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক বোঝা শুধু ক্যাম্পের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হচ্ছে।
একটি হারিয়ে যেতে বসা প্রজন্ম
বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া যে শিশুটির বয়স আজ ৯ বছর, তার জন্ম বাংলাদেশে।
তার শিক্ষা বেড়ে ওঠা এমন পরিবেশে যার সাথে তার পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ঐতিহ্যের কোন মিল নেই।
দীর্ঘদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজ ভাষায় কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার সুযোগও সীমিত ছিলো। পরে ইউনিসেফের সহায়তায় চালু হলেও এটি শুধু প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য।
তাই ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের সামনে ভবিষ্যতের প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে উঠছে। তারা মিয়ানমারে ফিরতে পারছে না, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ নেই এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগও সীমিত।
পুরো প্রজন্মই আছে ভবিষ্যতহীনতার ঝুঁকিতে।
প্রত্যাবাসন কিভাবে সম্ভব
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা। রাখাইনের ভৌগোলিক ও সামরিক বাস্তবতা পাল্টে গেছে।
যে রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি করেছে, রাখাইনের প্রায় পুরোটাতেই ওই রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
একই সঙ্গে যে ‘নন স্টেট অ্যাক্টর’ বা অরাষ্ট্রীয় শক্তি, তথা আরাকান আর্মি, তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন কাঠামো তৈরি করাও আপাত অসম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে অনানুষ্ঠানিক বা ‘ব্যাকচ্যানেল’ কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাখাইনে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, “এটাকে সাবন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি বলে। কিন্তু আমাদের সেই চর্চা নেই, খুব একটা আগ্রহও দেখিনি।
“বিশ্বের বহু দেশেই এই ব্যাকচ্যানেল কূটনীতি হয়। আমাদেরও তা ভাবার সময় এসেছে। আবার মিয়ানমার সরকারকেও এড়িয়ে নয়। কিভাবে হবে এজন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে নীতি ঠিক করতে হবে।”
কিছুদিন আগে অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশ সব মিয়ানমারের সব পক্ষের সাথেই আলোচনা করছে।
রবিবার ঢাকায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করে ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ।
ওই সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, “আশ্রয়কেন্দ্রে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জন্য ১০ বছর মানে তার শৈশব। একজন তরুণের জন্য এটি শিক্ষা হারানোর সময়। একটি পরিবারের জন্য এটি গৃহহীন এক দশক। আর একটি পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অনিশ্চয়তায় কাটানো একটি প্রজন্ম। ১০ বছরকে কোনোভাবেই ২০ বছরে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।”
চলতি বাস্তবতায় ১০ বছর কোনোভাবে যেন ২০ বছর না হয় সেই প্রত্যাশা সবারই। কিন্তু প্রত্যাশাকে কিভাবে বাস্তবে রূপ দিতে হবে তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিকৌশলের অভাবের কথা বলেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ১১ সদস্যের ‘রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করেছে।
এই কমিটির সদস্য সচিব প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই)-এর মহাপরিচালক।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি একটি পর্ষদ গঠন করবেন। এই পর্ষদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সুনির্দিষ্ট করণীয় নির্ধারণসহ রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ‘রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল’ প্রণয়ন করবে।
অক্টোবরে মাঝামাঝিতে কর্মকৌশল ঠিক করে কমিটিতে দাখিল করার কথা আছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে।
যাচাই বাছাই ও সংখ্যা নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সাম্প্রতিক বিবৃতি সংশোধনের তাগিদও দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সাথে তাদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চীন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশটির প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ওই আশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখতে চান বলেন প্রত্যাশা জানিয়েছেন তার বক্তব্যে।