ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক দ্বৈরথ আছে, যেখানে লড়াইটা ট্রফি কিংবা গোল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনার লড়াই যেন সেসব হিসেবের বাইরে। এই দুই দেশের ম্যাচ স্রেফ ৯০ মিনিটের উত্তেজনা নয়, এর সাথে মিশে আছে যুদ্ধের ছায়া, জাতীয়তাবাদের উত্তাপ আর ইতিহাসের এমন কিছু ক্ষত যা আজও তাজা।
ফিফার বড় কোনো আসরে এই দুই দল মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেই যুক্তরাজ্য কিংবা আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমগুলো সেই পুরোনো প্রসঙ্গগুলো নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
ফুটবলপ্রেমীদের আড্ডায় ট্যাকটিকস বা ফরমেশনের চেয়েও তখন বড় হয়ে ওঠে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, ম্যারাডোনার সেই আলোচিত ‘হ্যান্ড অফ গড’ কিংবা সার্বভৌমত্ব নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক বিতর্ক।
ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের মতোই, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার জন্য এটি নিছক ফুটবল ম্যাচ হওয়া প্রায় অসম্ভব। আর এর পেছনের কারণটাও খুব সাধারণ, লড়াইটা আদতে মাঠের ভেতর শুরু হয়নি।
রাজনীতিও ম্যাচে হঠাৎ করেই অনুপ্রবেশ করেনি, কয়েক দশকের যুদ্ধ, কূটনৈতিক বিরোধ আর দুই দেশের রাজনীতিকদের ‘অতি-সক্রিয়তার’ কারণেই এই ‘ফুটবলীয় শত্রুতা’।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধের মূল কারণ হলো সার্বভৌমত্বের দাবি। দক্ষিণ আটলান্টিকের এই দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটেন বহু বছর ধরে শাসন করে আসছে, কিন্তু আর্জেন্টিনা এটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘লাস মালভিনা’ হিসেবে মনে করে। ১৯৮২ সালে এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়েই দুই দেশের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেধেছিল, যা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আর্জেন্টাইনদের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।
এই যুদ্ধের রেশ ফুটবল মাঠে প্রথমবার তীব্রভাবে আঘাত করে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। সেবার দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটি কেবল একটি গোল ছিল না; আর্জেন্টাইনদের কাছে এটি ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধের প্রতীক। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের কাছে সেই গোলটি ছিল চরম অবিচার—তারা আজও মনে করেন যে, ওই দিনের সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তাদের বিশ্বকাপ জয়ের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ম্যারাডোনার সেই মুহূর্তটি ফুটবলের ইতিহাসে যেমন আইকনিক, তেমনি ইংল্যান্ডের জন্য তা আজও এক দগদগে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।
সংবাদমাধ্যমগুলো কেবল সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে, যা ফুটবলের সীমানা পেরিয়ে বহু আগেই রাজনীতির আবর্তে আটকে গেছে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে ব্রিটিশ ও আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের কাভারেজ লক্ষ্য করলে এই পার্থক্যটা আরও পরিষ্কার বোঝা যায়।
ব্রিটিশ মিডিয়ার একটি বড় অংশ ফুটবলকে অনেক সময় বেশ গৌণ হিসেবে উপস্থাপন করে। গ্যারেথ সাউথগেটের রণকৌশল কিংবা লিওনেল স্কালোনির একাদশ নির্বাচনের চেয়েও তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায় সেইসব ঐতিহাসিক ঘটনা, যা ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা লড়াইকে বিশ্বের অন্যতম আবেগপ্রবণ ‘ডুয়েলে’ পরিণত করেছে।
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইতিহাস কখনোই এই ম্যাচ থেকে বিদায় নেয়নি। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, মেক্সিকোতে ম্যারাডোনার সেই আলোচিত গোল আর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার অবিচল মালিকানা দাবির মতো বিষয়গুলো আজও জনমানসে যে গভীর দাগ কেটে আছে, তা নিয়ে তারা বিশদ আলোচনা করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্রিটিশ তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি কেবল আরেকটি হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ হলেও, আর্জেন্টাইনদের কাছে এটি ‘লাস মালভিনা’র (ফকল্যান্ডের আর্জেন্টাইন নাম) এক তীব্র আবেগের জায়গা।
একইভাবে রয়টার্স বিষয়টিকে দেখেছে ইতিহাসের লেন্সে। তাদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আন্তোনিও রাতিনের বিতর্কিত লাল কার্ড, ফকল্যান্ড সংকট, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার সেই জোড়া গোল, সব মিলিয়ে এই দ্বৈরথ যেন ফুটবলীয় নাটকীয়তা আর ভূ-রাজনীতির এক জটিল মিশ্রণ। তাদের বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্ব ফুটবলে খুব কম ম্যাচেই এমন গভীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখা যাায়।
আইটিভি নিউজ বিষয়টিকে আবার ফুটবলের চেয়েও বেশি কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে। খেলার কয়েকদিন আগেই যখন আর্জেন্টাইন রাজনীতিকরা দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে তাদের পুরনো দাবি নতুন করে জোরালো করেন এবং সমর্থকদের মধ্যে “লাস মালভিনা” নিয়ে স্লোগান দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তখন লন্ডনও সমান কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়। আইটিভি এই পুরো পরিস্থিতিকে ‘ফুটবলকে রাজনৈতিক খেলার মাঠ বানানোর চেষ্টা’ হিসেবেই দেখছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল দ্য টাইমস-এর কাভারেজ। তারা লন্ডনে বসে রিপোর্ট না লিখে সরাসরি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে নিজেদের প্রতিনিধি পাঠায়। সেখানকার বাসিন্দারা স্পষ্টতই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন যে, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ মানেই কেন আবার আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনা হয় তাদের ঘরবাড়িকে। দ্বীপবাসীদের কাছে ফুটবল কেবলই ফুটবল, কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে এটি সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিতর্কের আরেকটি মঞ্চ।
ব্রিটিশ পত্রিকাগুলোর এই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনো এজেন্ডা বা একপেশে প্রচারণার ফসল নয়, বরং এটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতিফলন। সাংবাদিকরা কেন এই ম্যাচকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করছেন, তার উত্তর ফুটবলের মাঠের বাইরেই লুকিয়ে আছে।
অন্যদিকে, আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের ভঙ্গি অনেকটাই ভিন্ন। তাদের পত্রিকাগুলো, যেমন ওলে, ক্লারিন বা লা নাসিওন - এই ইতিহাসকে কেবল অতীত মনে করে না। তাদের কাছে মালভিনা ইস্যু বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাঠ্যবই, কূটনৈতিক বিবৃতি এবং রাষ্ট্রীয় আয়োজনে মালভিনা নিয়মিত জায়গা করে নেয়। তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফুটবল ম্যাচ কেবল খেলার মাঠ থাকে না, এটি হয়ে ওঠে জাতীয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির একটি মঞ্চ।
আর এই ফুটবল আর রাজনীতির সমীকরণের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ব্রিটিশদের কাছে তিনি হয়তো ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্র, কিন্তু আর্জেন্টিনার জাতীয় মানসলোকে তিনি এক ভিন্ন উচ্চতার মানুষ। তার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটি স্রেফ কারচুপি ছিল না; ম্যারাডোনা নিজেই এটিকে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এই ব্যাখ্যা ঠিক না ভুল, সেটা ব্যাপার নয়; তবে তার এই বক্তব্যের মাধ্যমেই ফুটবলের একটি মুহূর্ত স্থায়ীভাবে দক্ষিণ আমেরিকার একটি রাজনৈতিক সংকটের সাথে মিশে গেছে।
আজও এই রেশ বিদ্যমান। সেমিফাইনালের ঠিক আগে যখন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা মালভিনার স্লোগান তোলে কিংবা দেশটির রাজনীতিকরা সার্বভৌমত্বের দাবি নতুন করে উচ্চারণ করেন, তখন ব্রিটিশ সাংবাদিকদের পক্ষে সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জরুরি। ব্রিটিশ মিডিয়া যে সবসময় ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনাকে রাজনৈতিক রঙ দেয় তাও না। তারা সেই রাজনৈতিক আবহটাকে তুলে ধরে, যা তৈরি হয়েছে কূটনৈতিক বিবৃতি, সমর্থকদের স্লোগান এবং ফকল্যান্ডের অমীমাংসিত স্থিতাবস্থার মাধ্যমে।
এই বিতর্ক এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ব্রিটেন দ্বীপপুঞ্জটিকে নিজস্ব ‘ওভারসিজ টেরিটরি’ হিসেবে শাসন করছে, আর আর্জেন্টিনা এটিকে দাবি করে তাদের ‘অধিকৃত ভূখণ্ড’ বলে।
বুয়েনস আইরেসে সরকার বদলালেও এই দাবির পরিবর্তন হয়নি। আবার লন্ডনও দ্বীপবাসীর ব্রিটিশ হিসেবে বসবাসের ইচ্ছাকেই বড় করে দেখেছে। এই অবস্থান যতক্ষণ না বদলাচ্ছে, ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে মাঠের চেয়ে রাজনীতির আলোচনা বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
পাঠক-দর্শকের চাহিদাও এই ধারাকে টিকিয়ে রাখে। ব্রিটিশ সম্পাদকরা খুব ভালো করেই বোঝেন যে, তাদের পাঠকদের একটি বড় অংশ এখনো ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি বহন করেন; হয় সামরিক অভিজ্ঞতা থেকে, নয়তো মার্গারেট থ্যাচারের শাসনামলের সেই উত্তাল সময়ের সাক্ষী হিসেবে।
একইভাবে আর্জেন্টাইন পত্রিকাগুলো জানে তাদের পাঠক ফকল্যান্ডকে কেবল ‘মালভিনা’ হিসেবেই চেনে। কোনো সংবাদমাধ্যমই ‘হাওয়ার উপর’ লেখালেখি করে না, বরং তারা তাদের পাঠকদের ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। এছাড়া বাণিজ্যিক বাস্তবতা তো আছেই। ম্যারাডোনা, জাতীয়তাবাদ কিংবা ফকল্যান্ড নিয়ে লেখা সাধারণ ফুটবল প্রিভিউয়ের চেয়ে অনেক বেশি পাঠক টানে।
সম্ভবত এই কারণেই ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা লড়াই বিশ্ব ফুটবলের অন্যান্য যেকোনো ম্যাচের চেয়ে আলাদা। প্রতি প্রজন্মের কাছেই এই ম্যাচটি নতুন কোনো অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়, কিন্তু তার সাথে তারা বয়ে বেড়ায় আগের প্রজন্মের পাওয়া ইতিহাসের ভার।
সাংবাদিকদের নতুন করে রাজনীতি খুঁজে আনতে হয় না, কারণ মাঠের বাঁশি বাজার বহু আগে থেকেই রাজনীতি সেখানে উপস্থিত থাকে। তারা কেবল যুদ্ধের ক্ষত, কূটনৈতিক টানাপোড়েন, জাতীয় পরিচিতি আর ফুটবলের আইকনিক মুহূর্তের এক জটিল মিশ্রণের গল্পই লেখেন।
যতদিন পর্যন্ত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ ইতিহাস হয়ে কেবল বইয়ের পাতায় ঠাঁই না পাচ্ছে এবং সংকট হিসেবে রয়ে যাবে, ততদিন ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ কখনোই কেবল ফুটবল হবে না। আটলান্টিকের দুই প্রান্তের সংবাদমাধ্যমগুলো ৯০ মিনিটের ফুটবলের চেয়েও বড় কোনো গল্প বলবে। কারণ এই গল্পটি কখনোই কেবল ফুটবলের ছিল না।