মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্ব রাজনীতির দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতাকে বেইজিংয়ে স্বাগত জানালেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং।
ইউএস প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সামরিক ব্যান্ড, গার্ড অব অনার আর দুই দেশের পতাকা উড়িয়ে, নাচে-সুরে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
একই রকম জমকালো আয়োজনে বেইজিংয়ের গ্রেইট হল অব দ্য পিপলে বরণ করে নেওয়া হয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে।
খোলা চোখে দেখলে স্বাগত জানানোর প্রোটোকল যেন সমানে সমান। কিন্তু বেইজিং খুব সূক্ষ্মভাবেই দুই দেশের জন্য তাদের বার্তার পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ওয়াশিংটন ও মস্কো, উভয়কেই সমান মহিমায় আতিথ্য দেওয়ার এই প্রদর্শনী মূলত বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের নতুন যুগের শক্তি হয়ে ওঠার ইঙ্গিত।
প্রোটোকলের কূটনীতি
দুই দেশের সাথে সম্পর্কের গভীরতার পার্থক্য চীন বিমানবন্দর থেকেই স্পষ্ট করেছিলো। ট্রাম্পকে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং। এটি দেশটির মূল ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে কার্যত একটি আনুষ্ঠানিক ও আলংকারিক পদ।
বিপরীতে পুতিনকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে হাজির ছিলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। যিনি কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর একজন সদস্য, যা চীনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম।
লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজের শিক্ষক সামির পুরী এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, “বিশ্ব রাজনীতির নতুন যুগ এখন আর পশ্চিমকেন্দ্রিক নয়। বেইজিং এখন মস্কোকে একটি উদীয়মান অপশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে দেখে।"
রাশিয়ান সরকারের মালিকানাধীন গণমাধ্যম ‘আর্গুমেন্টি ই ফাকতি’-এর ভাষ্যেও বিষয়টি স্পষ্ট। তারা লিখেছে, পুতিনকে বেইজিংয়ে গ্রহণ করা হয়েছে ‘মিত্র ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে। আর ট্রাম্পকে দেখা হয়েছে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিযোগী’ হিসেবে যার কাছ থেকে যেকোনো কিছু আশা করা যায়।
অর্জন কম, অংশীদারিত্ব অসম
বাহ্যিক এই জাঁকজমকের আড়ালে দুই সফর থেকেই কার্যত অর্জন সীমিত। ট্রাম্প-শি চিনপিং বৈঠকে মাইক্রোচিপ রপ্তানি ও শুল্কসংক্রান্ত মূল বিরোধগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান আসেনি।
অন্যদিকে, ইউক্রেন সংকটের পাঁচ বছর পেরিয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার অর্থনীতি এখন খানিকটা বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল।
চীন এখন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং তেল-গ্যাসের প্রধান ক্রেতা। তাই ক্রেমলিন একে ‘সমমর্যাদার অংশীদারিত্ব’ দাবি করলেও এটি ক্রমেই অসম সম্পর্কে পরিণত হচ্ছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ইউরোপমুখী ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া টু’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনেক বছর ধরে চেষ্টা করছে রাশিয়া। এই সম্মেলনেও তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি। বৈঠক শেষে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে ২০টিরও বেশি চুক্তি হলেও কোনো বড় কোনো ফলাফল নেই।
দুই দিকে দুই যুদ্ধ বনাম চীন
প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এমন এক সময়ে দুই নেতাকে হোস্ট করলেন, যখন ট্রাম্প ও পুতিন দুজনেই নিজ দেশে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে আছেন।
ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমিয়েছে। আর পুতিনের ইউক্রেন আগ্রাসন রাশিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলেছে করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বেইজিং নিজের সুবিধা অনুযায়ী বিশ্বমঞ্চের বয়ান ঠিক করছে। ট্রাম্পের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলাপে শি তার সুরক্ষিত রাজনৈতিক এলাকা ‘ঝোংনানহাই’-এ ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন যে রাশিয়ার মতো শক্তিশালী কৌশলগত মিত্র চীনের সাথে রয়েছে।
বিপরীতে পুতিনের সাথে যৌথ বিবৃতিতে শি ও পুতিন পশ্চিমা বিশ্বকে দায়ী করে ইউক্রেন সংঘাতের ‘মূল সংকট দূর করার’ আহ্বান জানান।
সাংহাইয়ের ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ঝেং রুনইউয়ের মতে, ইউক্রেন নিয়ে পুতিনের আসল চিন্তাভাবনা কী, তা চীন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ এই যুদ্ধ ইউরোপ ও পশ্চিমাদের সাথে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে।
শি’র ‘চাইনিজ ড্রিম’
বছর কয়েক আগেও যে চীন ‘উলফ ওয়ারিয়র’ কূটনীতি, শিনজিয়াং ও হংকংয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ট্রাম্পের ‘চাইনিজ ভাইরাস’ কটুক্তির কারণে বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিতে ছিল, সেই চীন আজ বিশ্ব কূটনীতির অপরিহার্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের অনিশ্চিত মার্কিন নীতির সুযোগ নিয়ে চীন এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো মার্কিন মিত্রদের সাথে সম্পর্ক ঝালাই করে নিয়েছে।
তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। চীন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সরব থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নীরব। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এবং ইরানের যুদ্ধ চীনের জ্বালানি স্বার্থে আঘাত করায় শি চিনপিং একে ‘অত্যন্ত জরুরি’ সংকট হিসাবে দেখছেন।
যদিও ইউক্রেনে লাখো মানুষের মৃত্যু নিয়ে খুব একটু বাক্যব্যয় করেননি। এই দ্বিচারিতা ইউরোপের কাছে চীনের ‘নিরপেক্ষ বিশ্বনেতা’ হয়ে ওঠার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
কূটনৈতিক কৌশলের মহোৎসবের পর বিশ্বের সামনে শি চিনপিং ওই চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছেন যা তিনি চেয়েছিলেন, ‘সবার সঙ্গে কথা বলা, কিন্তু কারও সঙ্গে বাঁধা না থাকা।’
তবে শি চিনপিংয়ের অধীনে চীনের এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা যে আরও শক্তিশালী হয়েছে, তা এখনও বিশ্বের বড় একটি অংশের কাছে বিতর্কিত এবং অবিশ্বাসের কারণ হয়েই রয়ে গেছে।
(দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি আল জাজিরা অবলম্বনে)