ইউরোপে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন শত শত তরুণ। গন্তব্য ছিল যুক্তরাজ্য। কিন্তু ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার আগেই তারা আটকা পড়েন লিবিয়ার এক সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীর হাতে। এরপর শুরু হয় নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় এবং মানবদেহের অঙ্গ কেটে নেওয়ার ভয়াবহ হুমকি।
গত বছরের গ্রীষ্মে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পথে অন্তত ৩০০ অভিবাসীকে লিবিয়ায় অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা প্রত্যেকের পরিবারের কাছে ৫ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ না পেলে জিম্মিদের কিডনি অপসারণ করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মুক্তি পাওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাদের গাদাগাদি করে ছোট ছোট কক্ষে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছিল। কোনো কোনো কক্ষে প্রায় ১৮০ জন মানুষকে একসঙ্গে বন্দি রাখা হয়। দিনের পর দিন সূর্যের আলো না দেখে, পর্যাপ্ত খাবার ছাড়াই মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে তাদের।
একজন ১৬ বছর বয়সী কিশোর জানান, ছয় মাস ধরে তিনি এমন একটি কক্ষে বন্দি ছিলেন যেখানে সবাইকে বসে ঘুমাতে হতো। একটি মাত্র শৌচাগার ব্যবহার করতেন শতাধিক মানুষ। কেউ বেশি সময় নিলে তাকে মারধর করা হতো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিবাসীদের ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের বিরোধের জেরে তাদের জিম্মি করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ইরাকি-কুর্দি মানবপাচারকারী নোয়া অ্যারন, যিনি বর্তমানে ফ্রান্সে অর্থপাচার ও মানবপাচারের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোর দাবি, অপহরণকারীরা নিয়মিত নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে অর্থ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করতো। কয়েকটি ছবিতে অস্ত্রোপচারের মতো বড় দাগও দেখা গেছে, যা দেখে পরিবারের সদস্যরা জোরপূর্বক কিডনি অপসারণের আশঙ্কা করছেন।
বিবিসি জানায়, যুক্তরাজ্যের এক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ছবিগুলো পর্যালোচনা করে বলেছেন, দাগগুলো কিডনি অপারেশনের সময় ব্যবহৃত চিরার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে অঙ্গ অপসারণের ঘটনা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের মানবপাচার বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যান্থনি ডাঙ্কারলির ভাষ্যমতে, লিবিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। দুর্বল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে সেখানে মানবপাচার ও মুক্তিপণের জন্য অপহরণের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
এদিকে কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যেসব জিম্মি মুক্তি পেয়েছেন তাদের কেউ কেউ হয়তো মুক্তিপণের পরিবর্তে নিজেদের শরীরের অঙ্গ হারিয়ে ফিরেছেন।
অন্তত একজন জিম্মির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেলেও এখনো কতজন নিখোঁজ বা বন্দি রয়েছেন, তা জানা যায়নি।
তবে ভয়াবহ এসব ঘটনার পরও ইউরোপমুখী অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা থামছে না। কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হেমন মেরানি বলেন, “সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না।”