যুদ্ধের জন্য সৈন্য খুঁজছে রাশিয়া

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তৃতীয় বছরে নতুন করে আলোচনায় রুশ বাহিনীর জনবল সংকট। ইউক্রেনের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রাশিয়ার সেনা ঘাটতি বাড়ছে, একই সঙ্গে দুর্বল হচ্ছে দেশটির অর্থনীতি ও জ্বালানি অবকাঠামো। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সৈন্য সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠেছে মস্কো।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি করেছেন, রাশিয়া অতিরিক্ত এক লাখ সেনা মোতায়েনের চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, “রাশিয়া এইভাবেই নতুন সৈন্য খুঁজছে।”

সৈন্য ঘাটতিতে রুশ বাহিনী, দাবি ইউক্রেনের

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল ওলেক্সান্দর সিরস্কি দাবি করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত উদ্যোগ এখন ইউক্রেনের হাতে চলে এসেছে। তিনি বলেন, রুশ অবস্থানের ওপর ইউক্রেনের পাল্টা হামলার সংখ্যা এখন ইউক্রেনীয় অবস্থানে রুশ হামলার চেয়েও বেশি।

সিরস্কির দাবি, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার মোট ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৮৩ হাজারের বেশি সেনার ক্ষতি “অপূরণীয়”।

ইউক্রেনের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া প্রতিদিন এক হাজারের বেশি নতুন সেনার ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। বর্তমানে দৈনিক ৮০০ থেকে ৯৩০ জন হারে নতুন সেনা নিয়োগ দেওয়া হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে মোট জনবল কমতেই থাকছে।

এই সংকট মোকাবিলায় রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনীতে যোগদানের বোনাস ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি মলদোভার ট্রান্সনিস্ত্রিয়া অঞ্চলের রুশভাষীদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

যুদ্ধের ছাপ রাশিয়ার অর্থনীতিতেও

ইউক্রেনের দাবি, যুদ্ধের চাপ এখন রাশিয়ার অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশটির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, পুরো বছরের জন্য ৫০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট ঘাটতির পরিকল্পনা থাকলেও মাত্র চার মাসেই সেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে।

তাদের মতে, সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে জ্বালানি খাত থেকে। তেল ও গ্যাস খাতের রাজস্ব ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গেছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে রাশিয়া এপ্রিল ২০২৫-এর তুলনায় এপ্রিল ২০২৬-এ দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।

রুশ তেল স্থাপনায় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা

এই বছর রাশিয়ার তেল শোধনাগার, পাইপলাইন ও সংরক্ষণাগারগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে ইউক্রেন। বারবার হামলায় ব্যাহত হয়েছে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা।

রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইউক্রেনীয় হামলায় প্রতিদিন প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আক্রান্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মস্কোর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ও সামরিক সরবরাহ কেন্দ্র।

ইউক্রেনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের লক্ষ্য এখন সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেওয়া।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক কমিটিকে সিরস্কি বলেন, “আমরা এখন ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের বদলে অপ্রতিসম কৌশল গ্রহণ করছি। শত্রুর অগ্রযাত্রা থামানো এবং তাদের ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত হানাই এখন প্রধান লক্ষ্য।”

শোক, ধ্বংস আর যুদ্ধের মানবিক মূল্য

যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। ১৪ই মে কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয় দুই বোন ১৭ বছর বয়সী ভিরা ও ১২ বছরের লিউবাভা। কয়েকদিন পর কিয়েভের সেন্ট মাইকেল গোল্ডেন-ডোমড ক্যাথেড্রালে তাদের শেষকৃত্যে অংশ নেন পরিবার ও বন্ধুরা।

অন্যদিকে দনিপ্রোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সামনে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি কুকুর কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন ভেঙে দিচ্ছে, সেই বাস্তবতাই যেন উঠে আসে এসব ঘটনায়।

বেলারুশকে নিয়ে নতুন আশঙ্কা

ইউক্রেন অভিযোগ করেছে, রাশিয়া এখন বেলারুশকে সরাসরি যুদ্ধে টানার চেষ্টা করছে। জেলেনস্কির দাবি, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে রাশিয়ার অতিরিক্ত যোগাযোগ হয়েছে নতুন সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে।

তার ভাষ্যমতে, “তাদের বুঝতে হবে, এর পরিণতি গুরুতর হবে।”

এই সপ্তাহে রাশিয়া ও বেলারুশ যৌথ পারমাণবিক মহড়া চালিয়েছে। এতে হাজার হাজার সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান ও সাবমেরিন অংশ নেয়। রাশিয়া জানিয়েছে, মহড়ায় ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হবে।

রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই রিয়াবকভ সতর্ক করে বলেছেন, ন্যাটোর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে “সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি” তৈরি হতে পারে, যার পরিণতি হবে “বিপর্যয়কর”।

একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়ছে সেনা সংকট, অন্যদিকে অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে চাপ—সব মিলিয়ে রাশিয়ার সামনে এখন দীর্ঘ ও কঠিন এক যুদ্ধের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর প্রতিদিনের হামলা, ধ্বংস আর শোক যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই যুদ্ধের শেষ এখনো অনেক দূরে।

[কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা অবলম্বনে]