সংবাদমাধ্যমের কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বেশিরভাগ ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যায় বলে উঠে এসেছে নতুন এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ ভুক্তভোগী হয়রানির ঘটনা কোথাও জানান না। আর প্রতি তিনজন গণমাধ্যমকর্মীর মধ্যে একজন কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পুরুষদের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি যৌন হয়রানির শিকার হন। সমীক্ষা অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীরা গড়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি যৌন হয়রানির মুখোমুখি হন।
ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজ পাবলিশার্সের উইমেন ইন নিউজ, সিটি সেন্ট জর্জেস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন এবং বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন যৌথভাবে এই সমীক্ষা পরিচালনা করে।
এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশসহ সিয়েরা লিওন, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা গণমাধ্যমে যৌন হয়রানি নিয়ে বৈশ্বিক তথ্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশে ৩৩৯ জন সংবাদমাধ্যমকর্মীর ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, ১৭ শতাংশ পেশাজীবী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা এশিয়ার গড় ১৯ শতাংশের তুলনায় কিছুটা কম।
সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই ঘটনাগুলো রিপোর্ট করেন না, মূলত চাকরি হারানো বা ক্যারিয়ারের ক্ষতির ভয়ে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা, আরব অঞ্চল ও ইউক্রেনের ২১টি দেশের ২ হাজার ৮০০-এর বেশি সংবাদমাধ্যমে পেশাজীবীর ওপর এই জরিপ পরিচালনা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা গড়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি মৌখিক যৌন হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া নারীদের ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক যৌন হয়রানির ঝুঁকিও প্রায় দ্বিগুণ।
শারীরিক হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তা এখনো উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান।
সিটি সেন্ট জর্জেস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ড. লিন্ডসে ব্লুমেল বলেন, যারা যৌন হয়রানির শিকার হন তাদের ওপর এবং নিউজরুমের সামগ্রিক পরিবেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
রিপোর্ট করা ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রতি তিনটি ঘটনার মধ্যে প্রায় দুইটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই ব্যবস্থা ছিল সীমিত পর্যায়ে।
ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজ পাবলিশার্সের উইমেন ইন নিউজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুসান ম্যাকোরে বলেন, যৌন হয়রানির বেশিরভাগ ঘটনা রিপোর্ট না হওয়া কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জবাবদিহিতার বড় ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
তার মতে, এটি শুধু কর্মক্ষেত্রের সমস্যা নয়, বরং সাংবাদিকতায় কারা নিরাপদে কাজ করতে, টিকে থাকতে ও নেতৃত্ব দিতে পারবে, সেটিও নির্ধারণ করে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অঞ্চলভেদে যৌন হয়রানির হারেও পার্থক্য রয়েছে।
আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি, প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এরপর আরব অঞ্চলে প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় একজন এবং ইউক্রেনে প্রতি আট-নয়জনের মধ্যে একজনের মতো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, নারী সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকর্মীরা পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি যৌন হয়রানির শিকার হন।
প্রায় ৬০ শতাংশ নারী উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা মৌখিক যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৯ শতাংশ। এ ছাড়া ৪৮ শতাংশ নারী কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত অনলাইন যৌন হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে যা ১৫ শতাংশ।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার ভ্যালেরিয়া পেরাসো বলেন, যৌন হয়রানি শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয় নয়, এটি নিউজরুমের সুশাসন ও সাংবাদিকতার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তার মতে, এই গবেষণার ফলাফল বিভিন্ন নিউজরুম ও গণমাধ্যম খাতে নীতিমালা ও নেতৃত্বের চর্চা উন্নত করতে সহায়তা করবে।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম খাতে হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করছে। তারা নারী সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, সংবাদমাধ্যম নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে এবং হয়রানি প্রতিরোধে টিম গঠন করেছে।
এছাড়া দেশের প্রথমবারের মতো নিউজরুমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে, যা চলতি বছরের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।