সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে “হাতিয়ার” হিসেবে ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপার মুক্তি দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণ সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার দেখানোর পর শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ দাবি জানায় সংস্থাটি।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার বলেন, “কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়।”
তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের শাস্তি দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের কাঠামো ব্যবহার করা বাংলাদেশের সংবিধানে গণমাধ্যমের জন্য নিশ্চিত মৌলিক সুরক্ষাকে পাশ কাটানোর শামিল। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কনভেনশনেরও লঙ্ঘন।”
কুনাল মজুমদার আরও বলেন, “সাংবাদিকদের নিশানা বানাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করা উচিত। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুকে মুক্তি দেওয়া।”
গত ১৪ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল(আইসিটি) শাপলা চত্বরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রূপা ও বাবুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করেছেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০১৩ সালের ৫ই মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে পরিচালিত অভিযানের পর একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনে “বিভ্রান্তিকর তথ্য” উপস্থাপন করা হয় এবং ঘটনাটিতে হতাহতের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ফারজানা রূপা তার প্রতিবেদনে “বিতর্কিত ব্যক্তিদের” বক্তব্য ব্যবহার করেন, যা ওই অভিযানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেয়। আর মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ওই সম্প্রচারের তদারকি করেছিলেন এবং নিহতের সংখ্যা গোপনের একটি “পরিকল্পিত প্রচেষ্টার” অংশ ছিলেন।
তবে সিপিজে বলছে, শাপলা চত্বর অভিযানের আগে, চলাকালীন সময়ে ও পরে একাত্তর টেলিভিশনের সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। যদিও ২০১৩ সালে ফারজানা রূপার উপস্থাপনায় প্রচারিত একটি বহুল আলোচিত ইউটিউব তথ্যচিত্র তারা পর্যালোচনা করেছে।
সংস্থাটির ভাষ্য, ওই তথ্যচিত্রে শাপলা চত্বর অভিযানের পরবর্তী পরিস্থিতি অনুসন্ধান করা হয়েছিল এবং হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রচারিত বিভিন্ন দাবিও যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। এমনকি নিহতের তালিকায় থাকা কয়েকজন ব্যক্তিকে পরবর্তীতে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়ার তথ্যও সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল।
সাংবাদিক রূপা ও বাবু এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দায়ের হওয়া পৃথক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন। গত ১১ই মে হাইকোর্ট ছয়টি মামলায় ফারজানা রূপাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাসহ অন্যান্য অভিযোগ বিচারাধীন থাকায় তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সিপিজে আইন মন্ত্রণালয় ও আইসিটি`র প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে ইমেইল পাঠালেও, প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।