সরকারের জ্বালানি চ্যালেঞ্জ কি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে

মার্চের ৭ তারিখ, ঝিনাইদহে পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে গিয়ে সেখানকার কর্মচারীদের পিটুনিতে নিহত হন এক যুবক।

এরপর সবশেষ শনিবার রাতে নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার পর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপককেই ট্রাক চাপায় মেরে ফেলেন চালক।

এছাড়া দেশজুড়ে পাম্পগুলোতে চালকদের নিজেদের মধ্যে এবং পাম্পের মালিক ও কর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতি, কথা কাটাকাটির অসংখ্য ঘটনা উঠে আসছে প্রতিনিয়ত।

যুদ্ধ চলছে মধ্যপ্রাচ্যে আর ধীরে ধীরে এভাবেই প্রকট হচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট। যার হাত ধরে বাড়ছে সহিংস ঘটনা।

তেল না পেয়ে পাম্পের ব্যবস্থাপককে হত্যা কিংবা তেল কিনতে গিয়ে পাম্প কর্মচারীদের পিটুনিতে যুবকের নিহত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো জ্বালানি সংকটের স্থায়ী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি নিয়ে শুরু থেকে সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো সমস্যা না কমিয়ে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাবেক এই ডিন আলাপ-কে বলেন, “এর অন্যতম কারণ শুরু থেকে সরকার পুরো বিষয়টি সেভাবে ম্যানেজ করতে পারেনি। সংকট এখন যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে এটা অবশ্যই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি সমস্যা এখন জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।”

তবে একদিনে এই সমস্যা তৈরি হয়নি। এর পেছনে আগের সরকারগুলোর ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম।

“আগের সরকারগুলোর সময়ে জ্বালানি নিয়ে যে ধরনের ব্যবস্থাপনা দরকার ছিল তা নেওয়া হয়নি। তাই সরকার এই সমস্যা ‘ইনহেরেন্ট’ করেছে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

 নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার পর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপককেই ট্রাক চাপায় মেরে ফেলেন চালক

ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা কোথায়

রেশনিংয়ের মতো বিষয়গুলো এখন অনেক দেশই করছে। তবে বাংলাদেশ সরকার শুরুতে নেওয়া রেশনিং থেকে ঈদের আগে সরে আসলেও দেশের বিভিন্ন পাম্পে এখনও চলছে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি।

অন্যদিকে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। শনিবার পেট্রোল পাম্পে 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। যারা পাম্পের মজুত, বিক্রি থেকে সব কিছু সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবেন।

এর আগে বুধবার থেকে তেলের ডিপোগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। এছাড়া তেল পাচার রোধে সীমান্তে অতিরিক্ত টহলসহ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে শনিবার সংসদীয় দলের বৈঠকে- কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা ও চোরাচালান রোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, সরকার প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিরুনি অভিযান পরিচালনাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

“তেলের সংকট নেই” সরকারের পক্ষ থেকে বার বার এমন কথা বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ঈদের আগে যে সংকট ছিল শুধু নারীকেন্দ্রিক সেই সংকট ঈদের পর ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাংলাদেশজুড়ে।

সরকারের এমন ব্যবস্থাপনা সংকটের পেছনে ভোক্তা ব্যবস্থাপনায় আরও জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন ইজাজ হোসেন।

“সরকার কেন ভোক্তাদের কাছে জ্বালানির চিত্রটা স্পষ্ট করছে না? সরকার চুপ থেকে শুধু মজুত আছে না বলে পুরো চিত্র তুলে ধরে ভোক্তা ম্যানেজমেন্টে জোর দেওয়া উচিৎ ছিল,” বলেন তিনি।

অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল নিয়ে সরকার শুরুতে ভুল ব্যবস্থা নিয়েছে বলেই মনে করেন তিনি।

তার ভাষায়, “ডিজেলের রেশনিং করাই যায়। সরকার যেহেতু বলছে পেট্রোল আর অকটেনে সমস্যা নেই, তবে কেন সেখানে রেশনিং করা হলো? পরিবহনে রেশনিং না করলেই মনে হয় ভালো হতো।”

এর ফলে সরকার এক মাস সময় পেলেও এখনো জনগণের ‘প্যানিক বাই’ আচরণকে সংযত করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও মনে করেন তিনি।

শনিবার সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ কতটা?

ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর তারেক রহমানের সরকার যখন দায়িত্ব নিল তখন তাৎক্ষণিকভাবে তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রোজায় নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ। যেটাকে টেস্ট কেস হিসাবেই দেখছিলেন অর্থনীতিবিদরা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান চ্যালেঞ্জ উৎরানো নতুন সরকারের জন্য কঠিন হবে জানিয়ে তখন আলাপ-কে বলেছিলেন, ”গড ব্লেস দেম।”

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটে পুরো চিত্র পালটে যায়। রোজায় বাজার তেতে থাকলেও সব ঠান্ডা পড়ে যায় জ্বালানি সংকটের উত্তাপে।

এছাড়া রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বাড়তে থাকা ঋণচাপ, পে স্কেল ও সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকের অবাঞ্ছিত দায় এবং স্থবির ব্যবসা বাণিজ্যকে ফের সচল করার মতো বড় পরীক্ষাগুলো এখনো রয়ে গেলেও সব ছাপিয়ে নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম।

“মধ্যপ্রাচ্য সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য চাপ ততটাই বাড়বে,” আলাপ-কে বলেছেন তামিম, যিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য।

জ্বালানি সংকট নিয়ে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই সমস্যা অব্যাহত থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত।

যে খাতের ওপর দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই নির্ভরশীল।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, “জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হলে শিল্প খাতে ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

সংকটেই সুযোগ

চলমান সংকটকে বর্তমান সরকারের জন্য সুযোগ হিসাবে দেখছেন ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম।

তার ভাষায়, “যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাটিয়ে উঠতে পারলে ভালো কিছু হবে। আসলে এই চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য এক ধরনের সুযোগও এনে দিয়েছে।”

এজন্য শুধু সরকার নয়, জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন ইজাজ হোসেন।

“আমি মনে করি, যেহেতু আমরা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছি সেজন্য সাশ্রয়ী হওয়ার বিষয়টি আমাদের সংস্কৃতি হয়ে যাওয়া জরুরি,” বলেছেন তিনি।

সংকট মোকাবেলায় মাত্র ৪০ দিন বয়সি তারেক রহমানের সরকার এখন দুরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কতটা কাটিয়ে উঠতে পারে সেটা সময়ই বলে দেবে।