বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বিদ্যুৎচালিত গাড়িতে চীনের টার্গেট এশিয়া

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথযুদ্ধে আক্রান্ত পুরো বিশ্ব। যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি সরবরাহে। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ব্যারেলপ্রতি যেভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে তাতে সামনে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে।

বৈশ্বিক মন্দারও আশংকা আছে। এমন সংকটে চীনের ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগ খুঁজছে ব্যবসা বিস্তারের। তাদের চোখ এশিয়ায়।

ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদন ও রপ্তানিতে চীন অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেও নিজ দেশে ব্যাপক প্রতিযোগিতার ফলে তাদের প্রবৃদ্ধির গতি ধীর। তাই চীনের ব্র্যান্ডগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে খুঁজছে নতুন সুযোগ।

নিজস্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রতিষ্ঠানগুলো ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমাচ্ছে। ঠিক তখনই বিশ্বব্যাপী বাড়ছে পেট্রোলের দাম।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শিল্পটির বৈশ্বিক বিস্তারকে আরও বেগবান করবে। বিশেষ করে এশিয়ার যেসব দেশ জ্বালানি সংকটে রয়েছে, সেসব দেশই হতে পারে নতুন সম্ভাবনার জায়গা।

কার ফোকাসড কনসালটেন্সি ফার্ম সিনো অটো ইনসাইটস-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর টু লে সিএনএনকে বলেন, পেট্রোলের দাম বাড়ায় চীনের ব্র্যান্ডগুলোর এশিয়ার বড় বাজারে ঢুকে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আমরা আশা করছি প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাবে।

এশিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশ অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। যেখানে জাহাজ চলাচলে কঠোরভাবে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জ্বালানি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এমবার জানাচ্ছে, ইলেকট্রিক গাড়ি হলো ‘আমদানি খরচ কমানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার’।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ইলেকট্রিক গাড়ি ব্যবহারের ফলে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের ব্যবহার প্রতিদিন ১৭ লাখ ব্যারেল কমেছে, যা ২০২৫ সালে ইরানের মোট রফতানির প্রায় ৭০ শতাংশ।

ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে

একই ঘটনা ঘটেছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়েও। ইউরোপের দেশগুলো তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান তেল সংকটও এশিয়ায় ক্লিন এনার্জি শিল্পের জন্য আরেকটি মোড় ঘোরানো পরিস্থিতি হতে পারে।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিশ্লেষক লরি মাইলিভির্তা বলেন, “কম মূল্যস্ফীতির সময়ে যদি একবার জ্বালানির দাম বাড়ে, মানুষ তখন এড়িয়ে চলতে পারে। কিন্তু বারবার যদি এমন পরিস্থিতি সামনে আসে, তবে সেটি সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মানুষ যখন বুঝতে পারে জ্বালানির বাজার খুবই অস্থির, তখন সে জানে পেট্রোলচালিত গাড়ি ব্যবহার করলে তারাও অস্থিরতার ঝুঁকিতে থাকবেন।”

চীনেরও তেলের চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তারাও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে উল্লেখযোগ্য সুফল পেয়েছে অতীতে। ওয়ার্ল্ড মিটারের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের তেল মজুতে চীনের অবস্থান ১৩তম। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে শীর্ষে আছে চীন। এসব কারণেই এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন জ্বালানি সংকটের প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও সুরক্ষিত।

মাইলিভির্তার হিসাব অনুযায়ী, চীনের ইলেকট্রিক গাড়ির বিস্তার নতুন গাড়ির প্রায় ৫০ শতাংশ। যা গত বছর দেশটির তেল ব্যবহার কমিয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।

পিকিং ইউনিভার্সিটির এইচএসবিসি বিজনেস স্কুলের মিডেলইস্ট স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ঝু ঝো-ই বলেন, তেল সংকট চীনের বর্তমান ক্লিন এনার্জি লক্ষ্যগুলোকে আরও বেগবান করতে পারে। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে পিক-ইমিশন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিউট্রালিটি অর্জন করা।

ঝু বলেন, “চীনের নেতৃত্ব এই পরিস্থিতি আগেও দেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যতবার অস্থিরতা হয়- তা একই শিক্ষা দেয়। আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করা শুধু পরিবেশের জন্য খারাপই নয়, এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তার সমস্যা।”

ইলেকট্রিক গাড়ি শিল্পের সংকট

ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাণে চীনের সরকার সহায়তা করে থাকে। এই উদ্যোগের কারণেই সাশ্রয়ী মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ি ব্যবসায় বিশ্বে নেতৃত্বে রয়েছে চীন। কিন্তু একইসঙ্গে নিজ দেশে গাড়ি নির্মাতাদের কঠিন প্রতিযোগিতায় ফেলে দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে প্রত্যেকেরই নিজ বাজারে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্সপার্টনার্স-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাজারে থাকা ১২৯টি চীনা ইলেকট্রিক গাড়ি ব্র্যান্ডের মধ্যে কেবল ১৫টি ব্র্যান্ডই ২০৩০ সালে আর্থিকভাবে টিকে থাকতে পারবে।

সম্প্রতি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব চীনের গাড়ি নির্মাতাদের দেশীয় বাজারে কিছু সহায়ক হতে পারে। তবে অতিরিক্ত সরবরাহ সামাল দেয়া সম্ভব যদি তারা বিদেশি বাজারে বেশি করে নজর দেয়।

অ্যালিক্সপার্টনার্স-এর অটোমোটিভ পরামর্শক ইচাউ ঝাং বলেন, “তেলের দাম বাড়ার ফলে চীনে ইলেকট্রিক গাড়ির বাজার কিছুটা বড় হতে পারে, কিন্তু তা দ্বিগুণ হবে না। আমার মনে হয় না অতিরিক্ত উৎপাদনের সমস্যা এত দ্রুত সমাধান হবে।”

এই অতিরিক্ত উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেবে না। কারণ সেখানে চীনা ইলেকট্রিক গাড়িকে দূরে রাখার জন্য কঠোর শুল্ক আরোপ করেছে ডনাল্ড ট্রাম্প। যা যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় গাড়ি নির্মাতাদের ব্যবসাকে রক্ষা করার কৌশল।

তবে এশিয়ায় পরিস্থিতি আলাদা। জ্বালানি মজুত কমে যাওয়ায় দেশগুলো এখন শক্তির ব্যবহার কমানোর উপায় খুঁজছে। থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনস এবং ভিয়েতনামের মতো কিছু দেশ মানুষকে বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছে। এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারেও সচেতন থাকতে বলা হয়েছে।

এছাড়া, ভিয়েতনামের প্রধান ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিনফাস্ট ইরানের উপর হামলার পর ইলেকট্রিক গাড়ি এবং মোটরবাইকে ছাড় দেয়া শুরু করেছে।

এম্বার-এর এশিয়া জ্বালানি বিশ্লেষক লাম ফাম বলেন, চীনা ইলেকট্রিক গাড়িগুলো বেশিরভাগ এশীয় বাজারে এগিয়ে আছে, কারণ এগুলোর মূল্য সাশ্রয়ী, উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি নির্ভর।

তিনি বলেন, “জ্বালানির দামের অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী নীতিগত সমর্থনের কারণে এশিয়ায় ইলেকট্রিক গাড়ির বাজার দ্রুত বাড়বে।”

(সিএনএন অবলম্বনে)