‘চেকোস্লোভাক রেডিও’ ছিল চেকোস্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রীয় বেতার সংস্থা। ১৯৩২ সালের ১২ই জুলাই ভেসে আসে গম্ভীর কণ্ঠের এক ঘোষণা।
ব্রডকাস্টার বলছিলেন, “আজ জাতি তার নায়ককে সমাহিত করলো। প্রতিটা জাতিরই একজন নায়ক থাকে। সে হতে পারে রাজা কিংবা সেনাপতি কিংবা অভিনেতা বা খেলোয়াড়। কিন্তু আজকে যেই নায়ককে সমাহিত করা হলো তিনি একজন মুচি বা শু-মেকার”।
মুচি শব্দটার সঙ্গে বাঙালির পরিচয় পুরোনো। আর তাই এই শব্দে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। কিন্তু যখন ইংরেজিতে বলা হয় ‘শু-মেকার’ তখন মনে হয় সত্যি সত্যিই বড় কোনো ব্যবসায়ী।
সত্যটা হলো ওই মুচি নিজস্ব প্লেনে সুইজারল্যান্ডে এক কারখানা উদ্বোধন করতে যাচ্ছিলেন। প্লেন রানওয়ে ছেড়ে ওড়ার কিছুক্ষণ পরই মাটিতে আছড়ে পড়ে। মারা যান বিশ্বের সবচেয়ে বড় জুতো তৈরি প্রতিষ্ঠানের মালিক টমাস বাটা।
মুচি পরিবারে জন্ম, নজর ছিল পুরো বিশ্বে
বাংলাদেশের সমাজের গভীরে যে নামটি মানুষের মনে গেঁথে গেছে তার নাম বাটা। বাটার প্রতিষ্ঠাতা হলেন টমাস বাটা।
টমাসের পূর্বপুরুষেরা ১৬৬৭ সাল থেকে শু-মেকার বা মুচির কাজ করে আসছিল। টমাস ১৮৯৪ সালে ভাইবোনদের সাথে নিয়ে তৎকালীন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের মুদ্রায় মাত্র ৬০০ গুলডেন দিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। সেই ব্যবসাই পরবর্তীতে গড়ে তোলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জুতো তৈরির কোম্পানি ‘বাটা’।
চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া এক সময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশ দুটি একসঙ্গে হয়ে ‘চেকোস্লোভাকিয়া’ নামে নতুন রাষ্ট্র গঠন করে।
সেই দেশটির জেলিন শহরে টমাসের জন্ম। ইতিহাসে শহরটি টমাস বাটার শহর হিসাবেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। অথচ আগে ছিল নীরব ও প্রান্তিক শহর। কয়েক হাজার মানুষের বসবাস, কৃষি নির্ভর অর্থনীতি।
এখানেই ২২৭ বছর ধরে টমাসের পূর্বপুরুষেরা জুতো বানিয়ে আসছিলেন। টমাস এই মুচি বংশের অষ্টম কিংবা নবম প্রজন্ম।
টমাস ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন, এভাবে আর কতদিন? জুতো সেলাই কিংবা মাঝে মাঝে জুতো তৈরি।
বছরের পর বছর এভাবে তো চলতে পারে না। এগিয়ে তো যেতে হবে।
সে লক্ষ্য নিয়েই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৮৯৪ সালে ভাই আন্তোনিন এবং বোন আন্নাকে নিয়ে শুরু করলেন ‘টি অ্যান্ড এ বাটা শু কোম্পানি’।
বিয়ের পর আন্না ব্যবসা থেকে সরে যান।
১৯০৮ সালে যক্ষ্মায় ভাই আন্তোনিন মারা যান। এরপর থেকেই কোম্পানির একক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে টমাসের হাতে।
তবে এসব ঘটনা ঘটার আগেই বাটা তার প্রথম বছরেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। টমাস ভাবছিলেন, প্রতিষ্ঠানটা হয়তো আর চালানো যাবে না। কিন্তু তিনি তো হার মানবেন না। বাটোভকা (Baťovka) নামে একটা জুতা বাজারে এনে ম্যাজিক দেখালেন।
এই জুতা হলো অনেকের স্কুল জুতোর আদি ভার্সন। নিচে সোল আর বাকি অংশ কাপড়ের। তেমন ছিল বাটোভকা। জুতোটির নিচের অংশ ছিল চামড়ার, ওপরের অংশটি সস্তা ও টেকসই ক্যানভাস কাপড় দিয়ে তৈরি।
বাটোভকা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রিয় হয়ে উঠল। কারণ একটাই, দাম কম। চামড়ার জুতোর চারভাগের একভাগ। এই প্রডাক্ট ছিল বাটার টার্নিং পয়েন্ট। বিশাল ঋণের বোঝা দ্রুত কাটিয়ে ওঠেন টমাস।
তবে টমাস বুঝতে পারছিলেন জেলিনের সীমানায় ব্যবসা টেকসই হবে না। বাজারটা ছোট। তার চোখ তখন পুরো বিশ্বে। সে চেষ্টাতেই বিভোর টমাস চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে প্রথমবারের মতো ১৯১৩ সালে জার্মানিতে নিজেদের তৈরি জুতো রপ্তানি শুরু করে। এরপরের বছরই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
বিশ্বে যুদ্ধ দুর্যোগ আনে। একইসাথে সুযোগও। থমাস পেলেন সুযোগ।
সামরিক বাহিনীর জন্য বুট তৈরির সরকারি আদেশ আসে। বুদ্ধি করে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য জুতোর দাম অর্ধেক করে দেন।
যুদ্ধের ভেতর তো মানুষের জীবন স্বাভাবিক নেই, আয়ও অনেকের বন্ধ। সীমিত আয়ের ভেতর জুতোকে কেউ যেন বিলাসিতা মনে না করেন। তার এ ভাবনা যুদ্ধের ভেতরও পেছনে তাকাতে দেয়নি। বরং ১৯১৮ সালে কোম্পানির কর্মী সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার।
শ্রমিক, শহর ও ব্যবসার নতুন দর্শন
প্রথম বিশ্বের যুদ্ধের আগের কিছু গল্প জানা জরুরি। কারণ বাটা যেখানে যায় সেখানেই শহর বানিয়ে ফেলে। এই শহর বানানোর ভাবনাটা কোথা থেকে এলো?
১৯০৬ সালে বাটায় হঠাৎ শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়।
এই ধর্মঘট টমাসের ভাবনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। তিনি অনেক ভেবে দুটো সিদ্ধান্ত নেন।
এক হলো, শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। দুই হলো, প্রতিষ্ঠানে কোনো রাজনীতি করতে দেওয়া যাবে না।
শুরু হলো নতুন নিয়ম, “কর্মক্ষেত্রে কোনো রাজনীতি করা যাবে না।”
১৯১০ সালে ক্যান্টিন শুরু হয়। উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
১৯১২ সালে দক্ষ ও যোগ্য কর্মীদের জন্য আবাসিক ভবন বানিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আট ঘণ্টার কর্মদিবস ঘোষণা হয়। কর্মীদের জন্য স্কুল, হাসপাতাল, লাইব্রেরি তৈরি হয়। দক্ষতা অর্জন ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।
লক্ষ্য একটাই, শ্রমিকদের জীবন যেন সহজ হয়। টমাস মনে করতেন, জীবন সহজ হলে শ্রমিকরা কাজে মনোযোগী হবেন।
১৯২৫ সালে খোলা হলো ‘বাটা স্কুল অব ওয়ার্ক’। সামরিক নিয়মে গড়া এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখান থেকে ভবিষ্যতের ব্যবস্থাপকরা তৈরি হতেন। ভারত, মিশর, ইংল্যান্ড থেকে ছেলেরা এসে এখানে শিখার সুযোগ পেতো।
আরেকটা দিকও ছিল। সেটি হলো, নিয়ন্ত্রণ।
টমাস চাইতেন ‘আদর্শ শ্রমিক’। যে শ্রমিক হবেন পরিশ্রমী, বিনয়ী এবং মদ-জুয়া থেকে দূরে।
১৯২৩ সালে টমাস বাটা জেলিনের মেয়র নির্বাচিত হলেন। এখন তার হাতে শুধু কোম্পানি না, পুরো শহর। সুযোগ পেলেন পুরো শহর মেরামতের। সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ালেন।
বিশ শতকের শুরুতে ব্যবসা সম্পর্কে আরও জ্ঞান নিতে টমাস যান আমেরিকা। আর আমেরিকায় গিয়েই তার ভাবনা বদলে গেলো।
তিনি দেখলেন ফোর্ড মোটর কোম্পানির অ্যাসেম্বলি লাইন। কীভাবে একটা গাড়ি আলাদা আলাদা অংশে ভাগ হয়ে, আলাদা আলাদা বিভাগে তৈরি হয়ে, শেষে এক জায়গায় জোড়া লাগে।
জুতো তৈরির কথা এভাবেই ভাবলেন। কারণ তখনও পর্যন্ত একটি জুতো বানানো ছিল একজন মুচির একার কাজ। অর্থাৎ গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত একজন মানুষই জুতো বানাতেন।
টমাস বাটা সেই পুরনো নিয়ম ভেঙে দিলেন। তিনি জুতো বানানোকেও ফোর্ডের মতো ভাগ করে ফেললেন। একদল শ্রমিক শুধু সেলাই করবে, একদল কাটবে, একদল আঠা লাগাবে। উৎপাদন বেড়ে গেলো কয়েক গুণ।
আমেরিকা থেকে তিনি ফিরলেন একটা দর্শন নিয়েও।
“আওয়ার কাস্টোমার ইজ আওয়ার মাস্টার।”
বোঝাতে চাইলেন গ্রাহক যা চায় তার চেয়ে বেশি দিতে হবে, আর দাম রাখতে হবে গ্রাহকের প্রত্যাশার চেয়েও কম।
বিশ্ববাজারে বাটার লড়াই
টমাস তার কাস্টোমার ধরতে বিশ্বে সাম্রাজ্য বিস্তারে আরো মনোযোগী হলেন। জার্মানি, ব্রিটেন, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, যুগোস্লাভিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসার প্রসার করতে শুরু করে বাটা।
বিদেশি এক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশের বাজারে ঢুকে পড়ছে। দখলও করে নিচ্ছে দেশীয় বাজার। এখন দেশগুলোর লোকাল কোম্পানিগুলো কি মেনে নেবে? মেনে নেয়নি অনেক দেশ।
যেমন, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড। বাটার প্রসার ঠেকাতে তারা আলাদা আইন পাস করলো। ইতিহাসে ‘লেক্স বাটা’ নামেই বেশি পরিচিত।
‘লেক্স’ অর্থ আইন। সহজভাবে বললে ‘বাটা কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ আইন’।
বাটা কি থেমে গেছে? থামেনি। বরং বদলে ফেলেছিল কৌশল।
তারা দেশগুলোকে বললো, আমরা তো বিদেশি কোম্পানি না। আমরা লোকাল কোম্পানি। এখানে তো সবাই আপনাদেরই লোক। তাহলে বিদেশি হলো কীভাবে?
তাদের এই কৌশল কাজে দিলো।
যুদ্ধ, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব
টমাস বাটা প্লেন দুর্ঘটনায় ১৯৩২ সালের ১২ই জুলাই মারা যান।
ওই সময়ে বিশ্বের প্রায় ২৯টি দেশে বাটার জুতো বিক্রি হচ্ছে। টমাস মারা যাওয়ার পর নতুন প্রশ্ন সামনে আসে।
বাটার সাম্রাজ্য নেতৃত্ব দেবেন কে?
ছেলে টমাস জুনিয়রের বয়স মাত্র ১৭ বছর। যদিও তখন তিনি বাটার জার্মানির বাজার সামলাতে কাজ করছেন। তখনই দৃশ্যপটে আসেন টমাস বাটার সৎ ভাই জান আন্তোনিন।
জান আন্তোনিন যখন সাম্রাজ্য সামলাতে এলেন তখন বিশ্বে সংকটকাল। হিটলার ক্ষমতায়। ওদিকে মুসোলিনি। বিশেষ করে জার্মানিতে বাটার সব কার্যক্রম হিটলার বন্ধ করে দিলো। ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়া দখল করলো হিটলার, তারপর মিউনিখ চুক্তি, শেষে চেকোস্লোভাকিয়াও নাৎসিদের দখলে।
বাটার নেতৃত্বে থাকা সবাই বুঝতে শুরু করলেন জেলিনে যদি থাকতে হয়, তাহলে তো সব হারাতে হবে। তাই প্রথমে সদর দপ্তর সরিয়ে নেওয়া হলো জুরিখে। জান আন্তোনিন গেলেন পোল্যান্ড। আর টমাসের ছেলে থমাস জুনিয়ার গেলেন কানাডা।
থমাসের টার্গেট কানাডায় সম্পূর্ণ নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করানো।
খুব বেশি না, ছয় মাসের মধ্যে, কোনো রোডম্যাপ ছাড়াই, থমাস জুনিয়র কানাডায় একটা কারখানা দাঁড় করিয়ে ফেললেন। চেকোস্লোভাকিয়া থেকে মেশিন আনা হলো।
থমাস জুনিয়র কারখানার মান ঠিক রাখতে ২৫০ জন দক্ষ জুতা প্রকৌশলীকে কানাডায় আনার চেষ্টা শুরু করলেন। কিন্তু তৎকালীন কানাডায় অভিবাসন নীতি ছিল কড়াকড়ি। তারপরও বাবার মতোই মরিয়া থমাস সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। শেষ পর্যন্ত ১০০ পরিবারকে কানাডায় উড়িয়ে আনেন থমাস।
কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের ট্রেন্ট নদীর তীরে একটি জায়গা বেছে নিলেন। সেখানে বাটা কোম্পানি তাদের নিজস্ব শিল্প শহর বা ‘কোম্পানি টাউন’ মডেলে শহর গড়ে তোলে। এই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছিল "বাটাওয়া"।
এসবের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
এই যুদ্ধ বাটা পরিবারকেও টালমাটাল করে দেয়। টমাস বাটার সৎ ভাই জান বাটা জার্মানিতে গিয়ে নাৎসি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকই জান আন্তোনিনের জন্য কাল হলো। সবাই তাকে নাৎসি পক্ষ নেওয়ার জন্য ব্ল্যাক লিস্ট করে দিলো।
ইতিহাস বলছে, জান আন্তোনিন চেকোস্লোভাকিয়ায় বাটার ব্যবসা বাঁচাতে ওই বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগের তীর তাকে কখনো ছাড়েনি।
উল্টো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। নাৎসিবিরোধী আন্দোলনে যোগ না দেওয়ায় দেশটির আদালত তাকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থমাস জুনিয়ার ঠিকই নাৎসিবিরোধী অবস্থান নেন। আর জান আন্তোনিনের বিরুদ্ধে গুজব তো আছেই। এসব ঘটনায় আন্তোনিন জনপ্রিয়তা হারান। বাটার অনেক স্টাফ মনে করতে থাকেন, মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে আন্তোনিনের ভেতর তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
আর তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জান আন্তোনিনের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই সমালোচনা যখন তুঙ্গে ঠিক তখন চাচার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয় থমাস জুনিয়র।
থমাস এবার দাবি করলেন গোটা বাটা সাম্রাজ্যের অধিকার।
শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। ১৯৬০ সালে থমাস নিজের পক্ষেই রায় পান। কিন্তু তারপরও চাচার সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন আদালতে মামলা নিয়ে চলে সমঝোতা। নানান জটিলতার অবসান ঘটে ১৯৬৬ সালে। পাকাপোক্তভাবে ব্রাজিল ছাড়া বিশ্বজুড়ে বাটা সাম্রাজ্যের দখল পান থমাস জুনিয়র। আর চাচা জান আন্তোনিন শুধুমাত্র ব্রাজিলের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পান। দুঃখের বিষয় হলো জান আন্তোনিন তখন আর বেঁচে নেই। ১৯৬৫ সালে ২৩এ অগাস্ট তিনি মারা যান। ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রণ যায় তার পরিবারের হাতে।
থমাস জুনিয়র কিন্তু চাচাকে ভুলে যাননি। কারণ জান আন্তোনিন বাটার সাম্রাজ্য সামলেছেন তখন হিটলার-মুসোলিনিরা দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পুরো সংকট সময় শক্ত হাতে বাটাকে তিনি পরিচালনা করেছেন। চাচার এই অবদান থমাস ভুলে যাননি।
‘দেশদ্রোহী’ তকমার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামে জান আন্তোনিনের পরিবার। ১৯৯৭ সালে বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের আদালতে ১৯৪৭ সালের ওই রায়ের পুনর্বিবেচনায় আবেদন করা হয়। এই লড়াইয়ে সামিল হন থমাস জুনিয়র।
থমাস জুনিয়র আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়ে নিশ্চিত করেন, তার চাচা নির্দোষ।
পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে প্রমাণ পেশ করে দাবি করা হয়, জান আন্তোনিন গোপনে চেকোস্লোভাকিয়ার নির্বাসিত সরকারকে আড়াই লাখ ডলার অর্থ সাহায্য করেছিলেন। শুধু তাই নয়, প্রায় ৮০টি ইহুদি পরিবারকে নাৎসিদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে সাহায্যও করেছিলেন।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০০৭ সালের জুন মাসে আদালত আগের দেওয়া রায়কে বাতিল ঘোষণা করেন। স্পষ্ট জানানো হয়, জান আন্তোনিন বাটা কোনো অপরাধ করেননি। তিনি দেশদ্রোহী ছিলেন না। আদালত রায় দেন, আন্তোনিন নির্দোষ।
চাচার সম্মান ফিরিয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন থমাস। তার পরের বছরই ২০০৮ সালে অনন্তলোকে পাড়ি জমান বিশ্বের অসাধারণ মুচি থমাস জুনিয়র।
থমাস জুনিয়রের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘শুমেকার টু দ্য ওয়ার্ল্ড’, গোটা দুনিয়ার মুচি। এমনকি তিনি নিজেকেও গোটা দুনিয়ার মুচি হিসাবে দাবি করতেন।
তার লেখা আত্মজীবনী বইয়ের শিরোনামও রেখেছিলেন ‘বাটা: শু-মেকার টু দ্য ওয়ার্ল্ড’।
ভারতীয় উপমহাদেশে বাটার বিস্তার
বাটা এই উপমহাদেশের সমাজের গভীরে ঢুকে পড়েছে। কীভাবে কিংবা কখন বাটার উত্থান হলো?
ইতিহাস বলছে, বাটার জুতো এ অঞ্চলে স্থানীয় ডিলারদের মাধ্যমে আসে ১৯২৫ সালে।
১৯৩১ সালে টমাস ভারত সফর করেন।
তখন অবিভক্ত ভারত। অর্থাৎ ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ একসঙ্গে। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। অথচ এখানে নিজস্ব কোনো বড় জুতো শিল্প নেই।
কোনো বড় ব্যবসায়ীর কি এই বিষয়টা চোখ এড়াবে?
টমাস সিদ্ধান্ত নিলেন এখানেই গড়ে তুলবেন তার পরবর্তী বড় কেন্দ্র।
১৯৩৩ সালে কলকাতার হাওড়া জেলার কোন্নগরে গড়ে উঠলো একটা শিল্প টাউনশিপ। আর ১৯৩৪ সালে শুরু হলো আরও বড় পরিকল্পনা। কলকাতার উপকণ্ঠে তৈরি হলো ‘বাটানগর’।
বাটানগর জেলিনের এশীয় সংস্করণ হয়ে উঠলো। গড়ে উঠলো হাসপাতাল, মসজিদ, গির্জা, মন্দির, ফুটবল স্টেডিয়াম, সাঁতারের পুল, বাটা স্কুল অব ওয়ার্কের একটা শাখা। পঞ্চাশের দশক নাগাদ প্রায় বারো হাজার মানুষের বসতি গড়ে উঠলো এই একটা শহরে।
মানুষের মনে সহজেই স্থান করে নেয় বাটা। এমনকি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ব্রিটিশ এবং বিদেশি পণ্য বয়কট করে এই দেশের জনগণ। অথচ বাটা ছিল না জনরোষের তালিকায়।
কেন?
প্রথমত বাটা ছিল চেকোস্লোভাকিয়ার প্রতিষ্ঠান। আর ভারতে বাটা পরিচালিত হতো ভারতীয়দের মাধ্যমেই। অধিকাংশ শ্রমিক ছিল স্থানীয়।
আরেকটা বয়ানও ছিল বাজারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ভারতের বাজারে সস্তা জাপানি জুতোর আধিপত্য ছিল। বাটা এই দেশে নতুনভাবে বিপণন ভাষা তৈরি করে।
বাটা কোম্পানি প্রচার করেছিল এই পণ্যটি ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’।
এই জুতো ভারতেই তৈরি হচ্ছে। এই জুতো কিনলে এই দেশের মানুষরই কর্মসংস্থান হবে। এই যুক্তি স্বদেশি আন্দোলনের জাতীয়তাবাদী চেতনার সাথে মিলে যায়। আর বাটা টিকে যায় তার নিজ আধিপত্য নিয়েই।
১৯৪৭ সালের পর ভারতের প্রথম সরকারের অধীনে নেহরুর সমাজতান্ত্রিক নীতি, উচ্চ কর, মূল শিল্পের জাতীয়করণ, কড়া শ্রম আইন, ইউরোপীয় ব্যবস্থাপনার বদলে স্থানীয় নেতৃত্ব বসানোর নির্দেশ, এসব কিছু সঙ্গে বাটা মানিয়ে নেয়।
এর প্রায় দুই দশক পর, ১৯৭৩ সালে, ভারতে তৈরি হয় ফরেন এক্সচেইঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট বা এফইআরএ।
বিদেশি মালিকানা ৪০ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হলো। এই নীতিকে ব্যবসাবিরোধী মনে করে আইবিএম কোকাকোলার মতো বড় কোম্পানি। তারা ভারত ছেড়ে চলেও যায়। কিন্তু বাটা যায়নি। তারা শেয়ারের ৬০ শতাংশ জনসাধারণের কাছে বিক্রি করে দেয়।
বাংলাদেশে বাটার আগমন
এবার প্রশ্ন আসতে পারে বাংলাদেশে বাটা কীভাবে ও কবে এলো?
বাটা প্রথম বাংলাদেশে শুরু হয় ১৯৬২ সালে।
“কপালে চুল ছাঁটা
জামার হাতা কাটা।
খুকুর পায়ে আঁটা
জুতোর রাজা বাটা।”
কিংবা
“ধনুষ্টঙ্কার হইতে সাবধান
সামান্য ক্ষত হইতে মৃত্যু ঘটিতে পারে
জুতা পরুন।”
এমনই সব বিজ্ঞাপনি ভাষা নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাটা প্রথম তার কারখানা স্থাপন করে গাজীপুরের টঙ্গীতে। বাংলাদেশের আধুনিক জুতো শিল্পের যাত্রা শুরুই হয় এখান থেকে। পরে ১৯৭২ সালে, স্বাধীন বাংলাদেশে, প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড’।
এই গল্পে একটা বিশেষ নাম না বললেই নয়। উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওউডারল্যান্ড।
১৯৭০ সালের শেষ দিকে তিনি ঢাকায় আসেন বাটা শু কোম্পানির শীর্ষ পদে। এসেই পড়লেন উত্তাল একাত্তরের মুখে। মার্চের গণআন্দোলন, ২৫এ মার্চের রাতে অপারেশন সার্চলাইট, তারপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ, সবই তিনি নিজের চোখে দেখলেন। আর দেখে চুপ থাকলেন না।
যুক্ত হলেন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনিই একমাত্র বিদেশি নাগরিক, যাকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাব দিয়ে সম্মান জানানো হয়েছিল।
পুরো গল্প না জানলে কি মনে হবে, চেকোস্লোভাকিয়ার কোনো এক ছোট্ট গ্রাম থেকে আমাদের দেশে হাজির হয়েছে বাটা?
বাটা এই দেশেরই মাটি ও মানুষের ভেতর থেকেই উঠে আসা একটা নাম। যার শুরু ১৩২ বছর আগে, এক মুচির ছেলের হাত ধরে।