এক ভুলেই ধসে যায় কোডাকের ১০০ বছরের রাজত্ব  

স্মার্টফোনের দুনিয়ায় ছবি তোলা এখন লাইফস্টাইলেরই অংশ। ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ধরে রাখা যায় প্রিয় মুহূর্তগুলো। অসংখ্য বন্ধুদের লাইক-কমেন্টে ভালো লাগার মাত্রাও বেড়ে যায়। অথচ দুই দশক আগেও বাজারে জনপ্রিয় ছিল নানান ধরনের অ্যানালগ ক্যামেরা। সেই ক্যামেরার জন্য কিনতে হতো ফিল্মরিল। সেই ফিল্ম ফটো স্টুডিওতে দিলে তারা ওয়াশ করে প্রিন্ট দিতো। এখনো অনেকেই ছবি ওয়াশ করে অ্যালবাম করে বাসায় স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে রেখে দেন। 

এক সময় এই অ্যালবাম ঘরে ঘরে ছিল। এখনো নিশ্চয়ই সবার ঘরে আশি কিংবা নব্বই দশকের ছবির অ্যালবাম পাওয়া যাবে। ওই যে ফিল্ম কিনতে হতো, সেখানে ৩৩ থেকে সর্বোচ্চ ৩৭টা ছবি তোলা যেত। অ্যানালগ ক্যামেরার যুগে ফিল্মরিলের জন্য জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল কোডাক। মানুষের মুখে মুখে, স্টুডিও’র বিজ্ঞাপনে কোডাকের হলুদ বাক্সটি এখন আর দেখা যায় না।

এক সময়ের জনপ্রিয় কোডাক কোথায় হারিয়ে গেলো? 

কোডাকের যাত্রা যেভাবে শুরু হলো 

কোডাকের গল্প শুরু করতে হলে জর্জ ইস্টম্যানকে দিয়েই শুরু করতে হবে। কারণ ইস্টম্যানই মানুষের ঘরে ঘরে ক্যামেরা আর ছবিকে অ্যালবাম করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যার মাথায় এই বুদ্ধি এলো সেই ইস্টম্যান ছিলেন স্কুল ড্রপআউট। ফটোগ্রাফি নিয়ে ছিল না কোনো শিক্ষাও। 

এক ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে মাত্র ৩ ডলার সাপ্তাহিক বেতনে অফিসবয়ের কাজ করতেন। পরে এক ব্যাংকে ক্লার্ক হিসেবে যোগ দেন। 

১৮৭৭ সালে তিনি বন্ধুদের নিয়ে এক দ্বীপে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখতে সহকর্মীরা ক্যামেরা কেনার পরামর্শ দেন। আর সেই ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনাই ইস্টম্যানের ভাবনার জগতে নাড়া দেয়।  

ইস্টম্যান যখন ক্যামেরা কিনতে গেলেন, তখন ক্যামেরা দেখে বিরক্ত হলেন। তখনকার ক্যামেরাগুলো ছিল বিশাল এক বাক্স। সাথে নিতে হতো বিশাল ট্রাইপড, কাচের প্লেট, তরল কেমিক্যালের বোতল এবং একটি ভারী ডার্ক-রুম টেন্ট অর্থাৎ কালো কাপড়ের তাবু। এই ঝক্কি পোহানো কি সম্ভব? 

আদি জমানার ক্যামেরা ও কালো টেন্ট

ঘুরতে যাবেন নাকি ক্যামেরা সেট বয়ে বেড়াবেন?

যদিও ওই ট্রিপ পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। কিন্তু ভাবনার জগতে বিশাল পরিবর্তন আনে। তিনি এই ক্যামেরা নিয়েই ভাবতে শুরু করে দিলেন।  

তখন ছবি তোলার জন্য "ওয়েট প্লেট" (Wet Plate) পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ কাঁচের প্লেটে কেমিক্যাল মাখিয়ে সেটি ভেজা থাকা অবস্থাতেই দ্রুত ছবি তুলতে হতো। 

না ছিলেন ক্যামিস্ট, না ছিলেন ফটোগ্রাফার। তারপরও এই সমস্যা সমাধানের ভূত তার মাথায় চেপে বসে। তার একটাই লক্ষ্য- যেভাবেই হোক ছবি তোলার পদ্ধতি সহজ করতে হবে। 

ইস্টম্যান ব্যাংকের চাকরি শেষ করে প্রতি রাতে মায়ের রান্নাঘরে শুরু করেন কেমিক্যাল নিয়ে পরীক্ষা। টানা তিন বছর কঠোর পরিশ্রমের পর, ১৮৮০ সালে ইস্টম্যান সফলভাবে একটি বাণিজ্যিক ড্রাই প্লেট তৈরির মেশিন বানিয়ে ফেলেন। 

ইস্টম্যানের তৈরি ড্রাই প্লেটের কার্যকারিতা দেখে রচেস্টারের এক ধনী ব্যবসায়ী এবং ফ্যামিলি ফ্রেন্ড হেনরি স্ট্রং মুগ্ধ হন। ১৮৮১ সালের জানুয়ারি মাসে হেনরি স্ট্রং ইস্টম্যানের আইডিয়ায় বিনিয়োগ করেন। ক্লার্কের চাকরি ছেড়ে নিউ ইয়র্কের রচেস্টারের একটি ভবনের তৃতীয় তলা ভাড়া নিয়ে প্রথম অফিশিয়াল ফ্যাক্টরি চালু করেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল “ইস্টম্যান ড্রাই প্লেট কোম্পানি”। 

ক্যামেরার জনক ইস্টম্যান

আবিষ্কার হলো কোডাক ক্যামেরা 

প্রথম বছর ব্যবসা খুব ভালো চলছিল। কিন্তু ১৮৮২ সালের শুরুতে এক মহাবিপর্যয় নেমে আসে। ডিলারদের কাছে পাঠানো হাজার হাজার ড্রাই প্লেট নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে। গ্রাহকরা অভিযোগ করেন প্লেটগুলোতে কোনো ছবি উঠছে না।

ইস্টম্যান বুঝতে পারেন, ফ্যাক্টরিতে তৈরি ড্রাই প্লেটের জেলাটিন ফর্মুলায় কোনো ত্রুটি আছে। এটা বোঝা মাত্রই মার্কেট থেকে সব নষ্ট প্লেট তুলে আনেন। শুরু করেন পরীক্ষা। গলদটা কোথায়? 

টানা এক মাস দিন-রাত পরিশ্রম করে আবার নিখুঁত ফর্মুলা তৈরি করেন ইস্টম্যান। 

এসবেও মন ভরছে না ইস্টম্যানের। কারণ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য তো ক্যামেরা। নতুন আবিষ্কারের নেশায় তখন তিনি বিভোর। ইস্টম্যানের মূল বাজিটাই হলো এমন এক ক্যামেরা তৈরি করা যা সাধারণ মানুষের হাতে চলে যাবে। 

১৮৮৪ সালে ইস্টম্যান এবং তার অফিসে কাজ করা ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম এইচ. ওয়াকার মিলে কাগজের ওপর কেমিক্যালের প্রলেপ দিয়ে তৈরি করেন ইতিহাসের প্রথম সফল “নেগেটিভ পেপার রোল”। একই সাথে তারা একটি “রোল হোল্ডার” আবিষ্কার করেন। ১৮৮৪ সালেই তিনি কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রাখেন “ইস্টম্যান ড্রাই প্লেট অ্যান্ড ফিল্ম কোম্পানি”। 

অবশেষে ১৮৮৮ সালে তিনি এমন এক নতুন ক্যামেরা ডিজাইন করলেন- যার ভেতর আগে থেকেই পেপার রোল ফিল্মটি বিল্ট ইন লোড করা থাকবে।  

পেপার রোল ফিল্ম বিল্ট ইন পদ্ধতি ও ক্যামেরা

ক্যামেরার নাম যেভাবে ঠিক হলো

এখন ভাবা শুরু হলো ক্যামেরার নাম কী দিবেন? 

নাম নিয়ে নানান ধরনের মিথ প্রচলিত আছে। যেমন, একটা সূত্র বলছে, জর্জ ইস্টম্যান নিজেই কোনো নির্দিষ্ট উৎস থেকে নামটি নেননি। তিনি নিজের মতো করে ‘Kodak’ নামটি তৈরি করেছিলেন। 

ইস্টম্যান এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, “K” অক্ষরটি তার খুব পছন্দের। অক্ষরটি শক্তিশালী ও দৃঢ় মনে হতো তার কাছে। এরপর তিনি এমন অসংখ্য অক্ষরের সমন্বয় নিয়ে পরীক্ষা করতে থাকলেন। শেষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছান। যে শব্দ নিয়ে শুরু হবে, সেই শব্দ দিয়েই শেষ হবে। অর্থাৎ ‘K’ দিয়ে শুরু, ‘K’ দিয়ে শেষ। এভাবে জন্ম নিলো ‘কোডাক’ নাম। 

আরেকটা মিথ হলো, ইস্টম্যান একটা শব্দ খুঁজছিলেন যা উচ্চারণ করতে বেগ পেতে হবে না। সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। 

যাইহোক, ১৮৮৮ সালের ৪ই সেপ্টেম্বর তিনি এই ক্যামেরার শাটার এবং "KODAK" নামের পেটেন্ট ও ট্রেডমার্ক নিজের নামে রেজিস্টার্ড করেন। 

এভাবেই শুরু হয় কোডাকের বিশ্বজয়ের ইতিহাস।  

“ইউ প্রেস দ্য বাটন, উই ডু দ্য রেস্ট”—এই স্লোগানের মাধ্যমে ইস্টম্যান পৌঁছে গেলেন সাধারণের কাছে। 

ক্যামেরাতে ১০০টি ছবি তোলার উপযোগী ফিল্ম লাগানো থাকতো। ছবি তোলার পর ক্যামেরা কোডাকের কাছে ফেরত পাঠাতে হতো। ক্যামেরার ভেতরের পুরো অংশ।

তবে এর একটা পদ্ধতি ছিল। কেউ যদি ক্যামেরা কেনে তাহলে সেখানে ১০০টি ছবি তোলার উপযোগী ফিল্ম লাগানো থাকতো। ছবি তোলার পর ক্যামেরা কোডাকের কাছে ফেরত পাঠাতে হতো। যেন কোডাক ছবিগুলো প্রিন্ট করে এবং ক্যামেরায় নতুন ফিল্ম লাগিয়ে আবার গ্রাহকের কাছে পাঠাতে পারে।

এটাই ছিল ব্যবসার অভিনব কৌশল। ক্যামেরা বিক্রি করে তেমন লাভ হতো না, লাভ হতো ফিল্ম আর প্রিন্টিং থেকে। কোম্পানির ভেতরের একটা ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল। 

সেটা হলো- “যে যাই বলুক। আমরা আসলে ফিল্ম কোম্পানি। ক্যামেরা ততক্ষণ ঠিক আছে, যতক্ষণ সেখানে ফিল্ম আছে।” 

এই কৌশলে ভর করে কোডাক পুরো একটা শতাব্দী ধরে রাজত্ব করেছে। ছবি তোলা হয়ে উঠলো প্রতিদিনের জীবনের অংশ। স্মৃতি ধরে রাখার সেই মুহূর্তটার একটা নামই হয়ে গেলো- “কোডাক মোমেন্ট”। 

এমনকি যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনী তাদের মাইক্রোফিল্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর প্রথম ছবিও তোলা হয়েছিল কোডাকের ক্যামেরায়। ১৯৬০-এর দশকের শেষে গোটা ফটোগ্রাফি শিল্পের ওপর কোডাকের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়।

ইস্টম্যানের ট্র্যাজিক মৃত্যু যেন সিনেমার গল্প 

জর্জ ইস্টম্যান বিশ্বাস করতেন, কর্মীরাই কোম্পানির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কোডাক ছিল প্রথম কোম্পানিগুলোর একটি যারা কর্মীদের লাভের ভাগ দিতো। আজীবন চাকরির নিশ্চয়তাও ছিল।কর্মীদের বোঝানো হতো, কোডাক হলো একটি পরিবার। 

নেতৃত্বের এই গুণ নিয়ে দীর্ঘ ৪৪ বছর কোডাককে নেতৃত্ব দিয়েছেন জর্জ ইস্টম্যান। অবশেষে ১৯২৫ সালে ৭১ বছর বয়সে কোডাকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেন ইস্টম্যান। 

এই যে মানুষকে স্মৃতি ধরে রাখার এক অভিনব যন্ত্র তৈরি করলেন, তার মৃত্যু যেন এক ট্র্যাজিক সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। নিজের বুকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি।

কোনো ব্যবসায়িক বা আর্থিক ক্ষতির জন্য নয়, শারীরিক অসুস্থতা ছিল মূল কারণ। তিনি এমন এক রোগে আক্রান্ত হন, যা নিরাময়যোগ্য ছিল না। সেই হতাশা থেকেই আত্মহত্যা করেন ফটোগ্রাফি বিশ্বে ইতিহাস গড়া জর্জ ইস্টম্যান। 

মৃত্যুর ঠিক আগে টেবিলের ওপর ছোট চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিলেন। চিরকুটে লেখা ছিল— “টু মাই ফ্রেন্ডস, মাই ওয়ার্ক ইজ ডান, হোয়াই ওয়েট?”

আত্মহত্যা করার আগে ইস্টম্যানের লিখে যাওয়া চিরকুট

 

ইস্টম্যানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিউ ইয়র্কের রচেস্টার শহরে শোকের ছায়া নেমে আসে। কোডাকের হাজার হাজার কর্মী এবং সাধারণ মানুষ কফিনে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ইস্টম্যান হাউজের সামনে ভিড় করেছিলেন। 

ইস্টম্যানের মারা যাওয়ার খবর প্রকাশ করেছিল পত্রিকাগুলো

ইস্টম্যানের অবসরের পর কোডাকের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী উইলিয়াম জি. স্টুবার। তিনি ছিলেন একজন ফটোগ্রাফার।  

কোডাকের দম্ভ ভেঙে চুরমার, দৃশ্যপটে ফুজি 

কোডাকের অন্যতম একটি দিক ছিল, সেখানে কোনো শ্রমিক ইউনিয়ন ছিল না। প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে কখনো কেউ সিইও হয়নি। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত কোনো বহিরাগত সিইও পায়নি কোডাক। আর এই সংস্কৃতিই যেন কাল হলো। অনেকেই বলতেন, কোডাকের ভেতর তৈরি হয়েছিল বদ্ধ পরিবেশ। নতুন চিন্তাকে খুব একটা গ্রহণও করা হতো না। ব্যবসায় ঝুঁকি নিতে ভয় পেতো। আর এই সংস্কৃতি কোডাকের ভেতর তৈরি করেছি স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো। 

কোডাকের প্রথম ডিজিটাল পোর্টেবল ক্যামেরা তৈরি করেছিলেন স্টিভ স্যাসন। ১৯৭৫ সালে তার বয়স ছিল ২৫ বছর।

এসব কারণেই ১৯৭৫ সালে জন্ম নেওয়া পৃথিবীর প্রথম পোর্টেবল ক্যামেরাকে তালাবদ্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। কোডাকের কর্তাদের বক্তব্য ছিল- বিশ্ব বাজারে সত্তর শতাংশ ফিল্ম বিক্রি হতো কোডাকের হাত ধরে। এমন একটা সোনার খনি কেন নিজ হাতে ধ্বংস করতে হবে? 

সত্তরের দশক জুড়ে কোডাক নিজের প্রতিযোগীদের নিয়ে প্রায় ভাবতই না। বিশ্বাস ছিল— তাদের প্রোডাক্টই সেরা।

কোডাকের দম্ভে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ১৯৮৪ সালে। ওই বছর লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে কোডাক অফিশিয়াল স্পনসরশিপ হারায়। ওই বছরই মাত্র বাজারে জনপ্রিয়তা পাওয়া আরেক কোম্পানি ফুজি ঢুকে পড়ে অলিম্পিক গেমসে।  

আর তখনই কোডাকের দম্ভ চুরমার করে দেয় ফুজি।  

ফুজি ফিল্মের সবুজ বাক্স জনপ্রিয় হয়ে ওঠে

১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক গেমস প্রথম অলিম্পিক যা সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে আয়োজিত হয়েছিল। আয়োজক কমিটি অফিশিয়াল স্পন্সরশিপের জন্য যে ফি নির্ধারণ করে সেটা মানতে নারাজ কোডাক। যেখানে ন্যূনতম ৪ মিলিয়ন ডলার বিড ধরা হয়, সেখানে কোডাক জানিয়ে দেয় ২ মিলিয়ন হলে আছি।  

কোডাকের সঙ্গে অলিম্পিক গেমসের সম্পর্ক ৮৮ বছরের। ১৮৯৬ সাল থেকেই দুজনের পথচলা। এত বছরে কোডাক শুধু অর্থ দেয়নি প্রযুক্তিগত ও প্রচারণার কাজকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে। অথচ সম্পর্কটা যে শুধু ব্যবসায়িক ছিল, সেটা বুঝে ওঠার আগেই দৃশ্যপটে চলে আসে ফুজি। 

এ ঘটনার পর কোডাক মরিয়া হয়ে ওঠে। ক্ষতি পুশিয়ে নিতে অলিম্পিক গেমসেই বিপুল পরিমাণ অর্থ টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে ব্যয় করে। আমেরিকার টিভি চ্যানেলগুলোতে অলিম্পিক সম্প্রচারের সময় বিপুল অর্থ খরচ করে বিজ্ঞাপনের স্লট কিনে নেয়। এছাড়াও বুদ্ধি করে কোডাক আমেরিকার অফিশিয়াল অ্যাথলেটিকস দল এবং অলিম্পিক ট্রায়ালসের স্পন্সরশিপ কিনে নেয়। 

বাস্তবতা হলো ততক্ষণে ফুজির সবুজ রঙের বাক্সটি আমেরিকাসহ বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।  

বেপরোয়া কোডাক

অলিম্পিক গেমসের ধাক্কা সামলে ওঠার পাশাপাশি কোডাক তখন নতুন নতুন ব্যবসায় নাম লেখাতে শুরু করে। মূল ব্যবসার বাইরে গিয়ে আইবিএম থেকে কিনলো কপিয়ার সার্ভিস ব্যবসা, রক্তপরীক্ষার যন্ত্র বানানোর কোম্পানি কিনলো, এমনকি কিনে ফেললো স্টার্লিং ড্রাগ নামের একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি।

একটা ফিল্ম কোম্পানি হঠাৎ ওষুধ কোম্পানি কিনছে — এই সিদ্ধান্তগুলোর সাথে তাদের মূল ব্যবসার কোনো সম্পর্ক ছিল না।  

অন্যদিকে শুরু হলো কর্মী ছাটাইয়ের পরিকল্পনাও। ব্যবসা বড় করতে গিয়ে যে কোম্পানি নিজেদের পরিবার মনে করতো, সেই পরিবারও ভাঙতে শুরু করলো ১৯৮৮ সালের পর থেকে। 

নব্বই দশকের শুরুতে ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বাজারে আনলো ফটোসিডি সিস্টেম। অ্যানালগ ছবি সিডিতে কপি করে টিভিতে দেখা যাবে। এই হাইব্রিড উদ্যোগও ব্যর্থ। কারণ ততদিনে পারসোনাল কম্পিউটার ঘরে ঘরে পৌঁছানো শুরু। বিশ্ব আধুনিক হচ্ছে, এমনকি এশিয়াতেও লেগেছে পারসোনাল কম্পিউটারের হাওয়া। 

কোডাক ফটোসিডি

এছাড়া নব্বইয়ের শেষ দিকে এসে ডিজিটাল ক্যামেরাও বাজারে জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করে। জেপিইজি ফরম্যাট, ঘরে ঘরে ডিভিডি প্লেয়ার চলে আসায় ফটোসিডি হয়ে ওঠে অর্থহীন এক প্রডাক্ট। 

এমনই সব ব্যর্থ উদ্যোগে কোডাকের ভবিষ্যত চলে যাচ্ছিল খাদের কিনারায়।  

ব্যর্থতার দোষ চাপালো অন্যের ঘাড়ে

ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া কোডাক ১৯৯৩ সালে নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটাতে শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য ভেঙে ফেলে। কোম্পানির ভেতর থেকে সিইও না করে এবার তারা নিয়ে আসে জর্জ এমসি ফিশারকে। 

ফিশার এসেছিলেন ওই সময়ের আরেক টেক জায়ান্ট মোটোরোলা থেকে। তার লক্ষ্য ছিল কোডাককে ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কীভাবে চালানো যায় সেই পরিকল্পনা করা।  

এক গবেষক বলেছিলেন, রাতারাতি কোডাকের সংস্কৃতি বদলানো যায় না। 

ফিশার উপরের দিকের কর্তাদের মাইন্ডসেট বদলাতে পারলেও বাগড়া বাধলো মিড লেভেলের কর্তাদের নিয়ে। মিড লেভেলের কেউ ডিজিটাল দুনিয়ার তাণ্ডব বুঝতে পারলেন না।  

উল্টো তারা অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজের দুর্বলতা ঢাকতেই ছিলেন ব্যস্ত। বিশেষ করে টুইন টাওয়ারের হামলাকে সামনে আনা হলো। কোডাকের কর্মীরা এক অদ্ভুত যুক্তি তুলে ধরে বলতে শুরু করলেন, “মানুষ যেহেতু ঘুরতে যাচ্ছে না, তাই কেউ আর নতুন ফিল্ম রোল কিনছে না। ছবিও তুলছে না।”

দ্বিতীয় আরেকটা কারণও তারা সামনে আনে। হামলার পর বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম কড়াকড়ি করা হয়। লাগেজ চেক করার জন্য ব্যবহার হয় অত্যন্ত শক্তিশালী নতুন এক্স-রে স্ক্যানার। 

কোডাকের কর্মীরা যুক্তি দেন, এই নতুন ও শক্তিশালী এক্স-রে রশ্মির কারণে যাত্রীদের ব্যাগে থাকা ফিল্ম রোলগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ফলে ট্রাভেলাররা ফিল্ম ক্যামেরা বহন করা বা ফিল্ম কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন।

একশো বছরের বেশি সময় ধরে তারা মনে করে আসছিলেন, ফিল্ম ব্যবসা কখনো মরতে পারে না। এই বিশ্বাস কেউ ভাঙতে পারেননি। 

ফেরার পথ বন্ধ, দেউলিয়া ঘোষণা 

ফুজি যখন বিশ্ববাজারে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন কোডাকের উজ্জ্বল বাতি নিভু নিভু করছে। এসব সামাল দিতে ২০০০ সালের সিইও হয়ে আসেন ড্যানিয়াল কার্প। তিনিও ব্যর্থ। বিদায় নিলেন কার্প। এরপর ২০০৫ সালে শেষ ভরসা হিসাবে যুক্ত হন অ্যান্টোনিও পেরেজ। 

পেরেজ এসেছিলেন এইচপি থেকে। তিনি ছিলেন এইচপি’র প্রিন্টার ব্যবসার প্রধান। 

হারিয়ে যাওয়া কোডাক

এইচপির অভিজ্ঞতা কোডাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন পেরেজ, তবে ভিন্নভাবে। এইচপি’তে ছিল প্রিন্টার সস্তায় বিক্রি করো আর লাভ করো কালির কার্টিজে। পেরেজ কোডাকে এসে খেললেন উল্টা। তিনি বললেন, কোডাকের প্রিন্টারের দাম থাকবে বেশি। আর কালির দাম থাকবে সস্তা। উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে কম্পিউটারে ছবি না রেখে বেশি বেশি প্রিন্ট করতে উৎসাহিত করা। 

তবে ততদিনে মানুষ ছবি প্রিন্ট করা প্রায় কমিয়েই দিয়েছে। ডিজিটাল ক্যামেরার ছবি প্রিন্ট কমে গেছে। কয়েক বছরের মধ্যে সোশাল মিডিয়াও চলে এসেছে। বাজার দখল করেছে স্মার্ট ফোন। সুতরাং এই স্ট্র্যাটেজিও ফেইল।  

পেরেজ একবার হতাশা থেকে বলেছিলেন, “কোডাক ডিজিটাল দুনিয়ায় দেরিতে এসেছে, কথাটা ঠিক। কিন্তু ডিজিটালে বিনিয়োগ করতে এক মুহূর্ত দেরি করেনি। প্রচুর অর্থ তারা ঢেলেছে। তারপরও কেন বাণিজ্যিক সফলতা পেলো না, আমি ঠিক জানি না।” 

২০১২ সালের জানুয়ারিতে, একশো চব্বিশ বছরের ইতিহাস নিয়ে, কোডাক নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করলো। যে কোম্পানি একসময় বিশ্বের সত্তর শতাংশ ফিল্ম বাজার নিয়ন্ত্রণ করতো, যে নাম হয়ে উঠেছিল স্মৃতির প্রতিশব্দ — সেই কোম্পানি ফাইল করলো চ্যাপ্টার ইলেভেন দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন।

‘চ্যাপ্টার ইলেভেন’ হলো আমেরিকার দেউলিয়া আইনের একটি বিশেষ ধারা। যা কোনো কোম্পানিকে ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ না করে আইনগত সুরক্ষার মাধ্যমে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়। 

সহজ ভাষায়, এটি কোনো কোম্পানির স্থায়ী মৃত্যু নয়, বরং ঋণ থেকে বাঁচতে ব্যবসা “রি-স্ট্রাকচার” বা পুনর্গঠন করার একটি আইনি প্রক্রিয়া।

দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করার পর, কোডাক নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় করপোরেট রদবদল ও সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করে। 

প্রায় ২০ মাস আদালতের অধীনে থাকার পর, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোডাক দেউলিয়া দশা থেকে মুক্ত হয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ছোট কোম্পানি হিসাবে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে।

নগদ অর্থের সংকট মেটাতে এবং ঋণের টাকা শোধ করতে কোডাক তাদের শত বছরের জমানো ডিজিটাল ইমেজিং সংক্রান্ত প্রায় ১ হাজার ১০০টি পেটেন্ট নিলামে তোলে। 

এখন কোডাক কী করছে

২০২৬ সালে ইস্টম্যানের কোডাক এখন আর কোনো ক্যামেরা বা কনজিউমার কোম্পানি নয়। চ্যাপ্টার ইলেভেন দেউলিয়া দশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর কোম্পানিটি নিজেদের সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করেছে। 

২০২৬ সালের সর্বশেষ আর্থিক ও ব্যবসায়িক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোডাক মূলত একটি লাভজনক বিটুবি কমার্শিয়াল প্রিন্টিং, উন্নত কেমিক্যাল এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

তবে ফিল্মের ব্যবসা সেটা টিকে আছে। হলিউড এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের জন্য সিনেমার অ্যানালগ রিল এবং শুটিং ফিল্ম এখনও কোডাকই তৈরি করে। অ্যানালগ ফিল্মের নতুন ট্রেন্ডের কারণে ২০২৬ সালে এই খাতের ব্যবসা দুই বছরে আগের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে।

কোডাকের ফিল্ম  রিল ব্যবসা টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান হলিউডের একদল প্রভাবশালী পরিচালকের। তারা স্পষ্ট করে জানায়, ডিজিটাল ক্যামেরায় সিনেমা বানাবেন না। এই জেদের বিষয়ে তারা জানিয়েছেন, ডিজিটাল ক্যামেরা বাস্তবতাকে হুবহু ফুটিয়ে তুলতে পারে না। কিন্তু কোডাকের ৩৫ মিমি বা ৭০ মিমি ফিল্ম রিল ছবিতে যে চমৎকার 'গ্রেইন', আলোর গভীরতা এবং মনস্তাত্ত্বিক আবেগ তৈরি করে, তা কোনো ডিজিটাল সেন্সর বা মেমোরি কার্ডে ধরা সম্ভব না। 

২০১২ সালে দেউলিয়া হওয়ার সময় কোডাক তাদের মোশন পিকচার ফিল্ম ফ্যাক্টরি প্রায় বন্ধ করে দিচ্ছিল। তখন হলিউডের বড় বড় স্টুডিওগুলো একসাথে বসে কোডাকের সাথে চুক্তি করে। তারা কোডাক ফ্যাক্টরি সচল রাখার অনুরোধ করে। চুক্তিতে বলা হয়,  স্টুডিওগুলো প্রতি বছর কোডাকের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের ফিল্ম রিল কিনতে বাধ্য থাকবে।