ঢাকার কর্মঘণ্টা গিলে খাচ্ছে তীব্র গরম, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি

মাত্র এক বছরের তীব্র গরমে শুধু ঢাকায় যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, সেই অর্থ দিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো একটি মেগা প্রকল্প করা সম্ভব। এরপরও থেকে যাবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তীব্র গরমে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় প্রায় ১৮০ কোটি ডলার বা ২২,৩২০ কোটি টাকা।

আর কয়েক দফায় বাড়ানোর পর তৃতীয় টার্মিনালের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২১,৩৯৯ কোটি টাকা।

শুধু ঢাকাতেই তীব্র গরমের কারণে বছরে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে, তা ৪ লাখ ৬৫ হাজার কর্মীর এক বছরের কাজের সমান। অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাজধানীতেই শুধু প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে প্রায় ২৬ লাখ কর্মঘণ্টা।

বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের একজন কৃষি বা নির্মাণশ্রমিক বছরে হারাবেন ২৪ কর্মদিবস।

এটা কিন্তু হলিউডি দুর্যোগচিত্রের কল্পকাহিনি নয়, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে যাওয়া এক নীরব অর্থনৈতিক সংকটের বাস্তব চিত্র।

একসময় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি বলতে বাংলাদেশের মানুষ বুঝতো বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা নদীভাঙন। এখন সেই তালিকায় দ্রুত জায়গা করে নিয়েছে তাপপ্রবাহ।

এর প্রভাব শুধু অস্বস্তিকর গরমে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যবিত্তের কাছে এর মানে, মাস শেষে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল। একজন রিক্সাওয়ালার কাছে তপ্ত রোদে বিশ্রামের ফাঁকে হারিয়ে যায় অতিপ্রয়োজনীয় উপার্জন।

আর রাষ্ট্রের কাছে এর অর্থ কমে যাওয়া উৎপাদনশীলতা, হারিয়ে যাওয়া কর্মঘণ্টা এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি।

এই বাস্তবতার প্রমাণ মিলেছে জুলাইয়ের শেষ দুই সপ্তাহে প্রকাশিত কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে।

১৯এ জুলাই ২০২৬ জার্মানির বার্লিনভিত্তিক জলবায়ু ও জননীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল প্রকাশ করে ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং – অ্যা কল ফর অ্যাকশন’ (উত্তাপ, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় - পদক্ষেপ নেওয়ার একটি আহ্বান) শীর্ষক প্রতিবেদন।

এর ১০ দিন পর ২৯এ জুলাই বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করে ‘অ্যা লিভেবল ফিউচার: প্রটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াজ সিটিজ’ (একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ: দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে তীব্র উত্তাপ থেকে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি রক্ষা) শীর্ষক প্রতিবেদন।

এর মাত্র দুই দিন পর ৩১এ জুলাই, জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে জানায়, আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর আরও প্রভাব ফেলবে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশ যে ভারতীয় উপমহাদেশের অংশ, সেই অঞ্চলকেই ডব্লিউএমও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী অগাস্ট  থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এবং স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

ডব্লিউএমও আরও বলেছে, শক্তিশালী এল নিনো এবং পজিটিভ ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল একসঙ্গে সক্রিয় হলে বাংলাদেশসহ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খরা, বন্যা ও দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

দুটি গবেষণা প্রতিবেদন ও ডব্লিউএমও’র সর্বশেষ পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু জলবায়ুর সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলছে। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনীতির ওপরও তৈরি করছে নতুন এক নীরব চাপ।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে এমন একটি সম্পদের, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে যে কোনো দেশের অর্থনীতি। আর সেটা হলো- মানুষের কর্মঘণ্টা।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বার্তা একটাই তাপপ্রবাহ আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়। এটি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। আর সামনে সেই চাপ আরও বাড়তে পারে। চলুন দেখে আসি তা কতটা?

কর্মঘণ্টার পেছনে অর্থনৈতিক ক্ষতি

তীব্র গরমের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে মানুষের কাজ করার সক্ষমতা কমে যাওয়া।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ধরে এর পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার ১২০ কোটি থেকে ২২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা।

এই ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০ দশমিক ৩ থেকে ০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের তীব্র গরমে দেশের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতিতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, এই ক্ষতির বড় অংশ এসেছে মানুষের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে। অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারেন না। বাড়ে ক্লান্তি, অসুস্থতা ও অনুপস্থিতি। ফলে কমে যায় মোট কর্মঘণ্টা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপজনিত চাপের কারণে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে।

শুধু রাজধানী ঢাকাতেই তীব্র গরমের কারণে হারিয়ে যাওয়া কর্মঘণ্টা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার। যা, একজন কর্মীর এক বছরের কাজের সমান। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৬ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে শুধু গরমের কারণে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক জিন পেসমে বলেন, “চরম গরম এখন আর মৌসুমি অসুবিধা নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও সমৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর অর্থনৈতিক মূল্য আরও অনেক বেশি হবে।”

তবে বর্তমান ক্ষতির চিত্রই শেষ নয়। সামনে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঢাকায় তাপজনিত কর্মঘণ্টার ক্ষতি আগামী কয়েক দশকে আরও বাড়বে।

বর্তমানে যে ক্ষতি প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান, তা ২০৫০ সালে বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার চাকরির সমান হতে পারে।

আর ২০৮০ সালে তা পৌঁছাতে পারে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার চাকরির সমান।

শুধু ঢাকা নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এই সংকটের মুখে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, তীব্র গরমের কারণে দক্ষিণ এশিয়া প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে।

অ্যাডেলফি গ্লোবালের প্রতিবেদনও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের একজন কৃষি বা নির্মাণশ্রমিক বছরে গড়ে প্রায় ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন।

অর্থাৎ, একজন শ্রমিক বছরে প্রায় এক মাসের সমপরিমাণ কর্মদিবস হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

এই ক্ষতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ওপর। কারণ, এসব খাতে কাজ করা মানুষের বড় অংশই সরাসরি রোদ ও তাপের মধ্যে কাজ করেন। কাজ কমলে কমে যায় আয়ও।

বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, দ্বিমুখী চাপে পরিবার

তীব্র গরমের অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু হারিয়ে যাওয়া কর্মঘণ্টা বা কমে যাওয়া উৎপাদনশীলতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে সরাসরি পরিবারের আয় ও ব্যয়ের হিসাবেও।

একদিকে কমছে মানুষের আয়, অন্যদিকে বাড়ছে চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার খরচ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়ছে এক ধরনের ‘ডাবল শক’ বা দ্বিমুখী আর্থিক চাপের মধ্যে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ তাপমাত্রা শুধু হিট স্ট্রোক বা পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ায় না; এটি হৃদ্‌রোগ, কিডনি সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের অবস্থা আরও খারাপ করে দিতে পারে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের কর্মক্ষমতায়। একজন শ্রমিক অসুস্থ হলে একদিকে তার কাজের সময় কমে যায়, অন্যদিকে চিকিৎসা, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং গরম মোকাবিলার জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

অ্যাডেলফি গ্লোবালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের বড় সামাজিক প্রভাব হলো আয় কমে যাওয়া এবং একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া।

বিশেষ করে দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকদের জন্য একটি কর্মদিবস হারানো মানে শুধু এক দিনের মজুরি হারানো নয়। এর অর্থ পরিবারের খাবার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচে চাপ তৈরি হওয়া।

একই সময়ে গরমজনিত অসুস্থতায় চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধের খরচ, বিশুদ্ধ পানির জন্য বাড়তি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ বিলের চাপ পরিবারগুলোর ওপর নতুন বোঝা তৈরি করছে।

অ্যাডেলফি গ্লোবাল সতর্ক করেছে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার সেই পরিবারগুলো, যাদের সঞ্চয় সীমিত, স্বাস্থ্যবিমার সুযোগ নেই বা জরুরি খরচ সামলানোর সক্ষমতা কম।

ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয় ঋণ নিতে, সম্পদ বিক্রি করতে কিংবা প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিতে।

অর্থাৎ, তাপপ্রবাহের ক্ষতি শুধু শরীরে নয়। এটি ধীরে ধীরে আঘাত করছে পরিবারের আয়, সঞ্চয় এবং আর্থিক নিরাপত্তাকেও।

পোশাকশিল্পও নিরাপদ নয়

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও তীব্র গরমের ঝুঁকির বাইরে নয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত সময়মতো গরমের ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বড় ধরনের রপ্তানি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক খাত ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কারণ, কারখানার ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শ্রমিকদের কাজের গতি কমে যায়। বাড়ে ক্লান্তি, ভুলের হার এবং বিরতির প্রয়োজন। একই সঙ্গে অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিতিও বাড়ে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব বড় হতে পারে। কারণ, দেশের রপ্তানি সক্ষমতার বড় অংশই নির্ভর করে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার ওপর।

গরম আটকে রাখছে শহর

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বড় শহরের মতো ঢাকাও এখন ‘আরবান হিট আইসল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাবের শিকার।

সহজ ভাষায়, শহরের কংক্রিটের ভবন, অ্যাসফল্টের রাস্তা, কমে যাওয়া গাছপালা ও খোলা জায়গা এবং যানবাহন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে বের হওয়া তাপ শহরকে আরও উষ্ণ করে তুলছে।

ফলে আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ঢাকার তাপমাত্রা বেশি থাকে। বিশেষ করে রাতে তাপমাত্রা পর্যাপ্ত কমে না। মানুষের শরীর বিশ্রামের সুযোগ পায় না। পরদিন কাজের সক্ষমতাও কমে যায়।

বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে গরম এখন শুধু দিনের সমস্যা নয়। রাতের উচ্চ তাপমাত্রাও মানুষের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

ঢাকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। কারণ এখানে একই সঙ্গে রয়েছে ঘনবসতি, সীমিত খোলা জায়গা, যানজট এবং দ্রুত নগরায়ণের চাপ।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকায় তাপজনিত কর্মঘণ্টার ক্ষতি দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম বেশি।

তুলনামূলকভাবে, ২০৮০ সালে ঢাকায় তাপের কারণে হারানো কর্মঘণ্টা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান হতে পারে।

একই সময়ে কলকাতায় এই ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার এবং নয়াদিল্লিতে প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার চাকরির সমান।

অর্থাৎ, ভবিষ্যতের তাপঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার চাপ আরও গভীর হতে পারে।

এসির দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ, কিন্তু এটাই কি সমাধান?

তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির চাহিদা। কয়েক বছর আগেও যা ছিল মূলত উচ্চ আয়ের মানুষের পণ্য, এখন তা অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার এসি বিক্রি হয়েছে।

পাঁচ বছর আগের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি।

গরম থেকে স্বস্তি পেতে এসির ব্যবহার বাড়লেও এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। কারণ এসির সংখ্যা বাড়লে বাড়ে বিদ্যুতের চাহিদা। আর বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, শুধু এসি বাড়ানো তাপপ্রবাহ মোকাবিলার স্থায়ী সমাধান নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন শহরের পরিকল্পনায় পরিবর্তন, ভবনের নকশায় তাপ সহনশীলতা, প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের সুযোগ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী কুলিং প্রযুক্তির ব্যবহার।

কারণ, এসির সুবিধা সবাই সমানভাবে নিতে পারেন না। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর বড় অংশের জন্য এসি কেনা বা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল বহন করা কঠিন। ফলে শুধু কৃত্রিম শীতলীকরণের ওপর নির্ভর করলে তাপের ঝুঁকি আরও বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

অ্যাডেলফি গ্লোবালের প্রতিবেদনেও একই ধরনের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।

তাদের প্রতিবেদন বলছে, তাপ মোকাবিলায় শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে শীতলীকরণের ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন নগর পরিকল্পনা, যেখানে গাছপালা, খোলা জায়গা, ছায়া, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করবে।

অর্থাৎ, তাপপ্রবাহের সমাধান শুধু ঘরের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস তৈরি করা নয়। বরং পুরো শহর ও কর্মপরিবেশকে তাপ সহনশীল করে গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যারা

তীব্র গরমের প্রভাব সবার ওপর সমান নয়। বিশ্বব্যাংক ও অ্যাডেলফি গ্লোবালের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন সেই মানুষগুলো, যাদের কাজ সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

এর মধ্যে রয়েছে- নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিক, রাস্তার হকার, ডেলিভারি কর্মী, বর্জ্য সংগ্রহকারী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্যান্য শ্রমিক।

কারণ এসব পেশার বড় অংশের মানুষকে দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়। তাদের আয়ও নির্ভর করে দৈনিক কাজের ওপর। ফলে গরমে কাজের সময় কমে গেলে সরাসরি কমে যায় আয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে উৎপাদনশীলতা দ্রুত কমতে শুরু করে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে কাজ করলে শুধু ক্লান্তি নয়, তৈরি হয় গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

এই ঝুঁকি শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনিরাপদ ঘরে বসবাসকারী মানুষ, পর্যাপ্ত শীতলীকরণ সুবিধা নেই এমন পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার থাকা মানুষও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বিশ্বব্যাংকের মতে, তাপ মোকাবিলার নীতি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক সুরক্ষা ও বৈষম্য কমানোর বিষয়ও।

ইতিবাচক উদাহরণ

তীব্র গরমের ঝুঁকি বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্যোগকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের উদ্যোগ। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তহবিলের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরিতে অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এ ধরনের বিনিয়োগ শুধু কার্বন নিঃসরণ কমায় না; বরং কারখানার কর্মপরিবেশও উন্নত করে। ফলে তাপপ্রবাহের সময় শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সবুজ পোশাক কারখানার অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ২৭০টির বেশি পোশাক কারখানা ‘লিড সনদ’ পেয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এসব কারখানায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, শক্তি সাশ্রয়ী নকশা এবং উন্নত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে কর্মপরিবেশ তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক হয় এবং জ্বালানি ব্যবহারও কমে।

তবে সংস্থাটি বলছে, শুধু কিছু কারখানা বা প্রকল্প দিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। তাপপ্রবাহের ঝুঁকি কমাতে জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা, শহর ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

মোদ্দাকথা, প্রতিবেদনগুলোর ভাষা আলাদা হলেও বার্তা কিন্তু এক। বাংলাদেশে তীব্র গরম এখন আর শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়। এটি কর্মঘণ্টা কমাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে, স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়াচ্ছে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়াচ্ছে এবং অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

এ অবস্থায় আর এখনই ব্যবস্থা না নিলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে মানুষের কাজের সময়ের। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের শ্রম ও কর্মঘণ্টার ওপর।