যে হাম একসময় নিয়ন্ত্রণে ছিল, কয়েকবছর ‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন’ বন্ধ থাকায় সেই হামই আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে সরাসরি হুমকি তৈরি করেছে শিশুদের জীবনের প্রতি।
দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগ। ইতোমধ্যে বেশ কিছু শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে শত শত।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হামের প্রকোপ ‘মহামারি’তে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন’ ও আরো দুটি টিকা কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটেছে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে ‘উদ্বেগজনক’ হারে সংক্রমণ বেড়ে থাকতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকাসহ জেলায় জেলায় হাসপাতাল প্রস্তুত করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বন্ধ এনআইসিইউ চালু এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, দ্রুত ব্যাপক টিকাদান শুরু করা এবং আক্রান্তদের আলাদা রেখে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের ওপর জোর দিতে হবে।
হাম পরিস্থিতি ‘আশঙ্কাজনক’
ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়ার খবর বের হচ্ছে গণমাধ্যমে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রাজশাহীতে।
দেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান আলাপ-কে বলেন, “এটা ছড়িয়েছে বেশকিছু জেলাতেই। রুটিন প্যানডেমিক (মহামারি) বলি আরকি। এটা রুটিন আউটব্রেক।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত বুধবার পর্যন্ত সারাদেশে দুই হাজারের ওপর ‘সন্দেহজনক’ হাম রোগী পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ২৩২ জন নিশ্চিতভাবে হাম-এ আক্রান্ত।
দৈনিক সমকাল রোববার এক প্রতিবেদনে ২১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে।
“দেশের অন্তত ১০টি জেলায় হাম রোগ উদ্বেগজনকভাবে সংক্রমিত হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ১২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শিশু এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহে মারা গেছে তিন শিশু।”
হামে দ্রুত ছড়িয়ে পড়াকে আশঙ্কাজনক হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ইপিআই) ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ।
“এটা আশঙ্কাজনক অবশ্যই। হাম হচ্ছে সবচেয়ে ছোঁয়াচে রোগ। এমনকি কোভিডের থেকেও এটা বেশি ছোঁয়াচে।”
“একজনের হাম হলে সে ১৩ থেকে ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। অতএব, যেটা দেখছি, সেটা অবশ্যই আশঙ্কার বিষয়,” বলেন শাহরিয়ার সাজ্জাদ।
এবার হামের ধরণ ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের। কারণ, হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়স থেকে।
ধরে নেওয়া হয়, যে শিশুরা মায়ের বুকের দুধ ‘ঠিকমতো’ পান করতে পারেন, তাদের ৯ মাসের আগে হাম হওয়ার কথা না।
কিন্তু এবার যারা হামে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ৩৩ শতাংশের বয়স নয়মাসের কম।
কেন এটা হচ্ছে- জানতে চাওয়া হলে উপপরিচালক (ইপিআই) শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, “এটাও আমাদের চিন্তা করতে হবে, এখানে কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না।”
কেন ছড়িয়ে পড়ছে হাম?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ শিশু যক্ষ্মার (বিসিজি) টিকা পেলেও দুই ডোজে হামের টিকা পান ৯০ শতাংশ মানুষ।
হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধের জন্য দেওয়া হয় এমআর টিকা। শিশুদের সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে দেওয়া হয় এমআরের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এমআরের প্রথম ডোজ পেয়ে থাকে ৯২ শতাংশ শিশু এবং দ্বিতীয় ডোজ পায় ৯০ শতাংশ।
দশ শতাংশ বাকি থেকে যায় এবং কয়েকবছর পরপরই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। আর এটা প্রতিরোধ করতে ‘জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন’ চালানো হয়। এ সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি সব শিশুকেই হামের টিকা দেওয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানে হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালে জানুয়ারি পর্যন্ত।
“২০২৪ সালে একটা ক্যাম্পেইন করার কথা ছিল। কিন্তু কোভিড পিরিয়ড এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা- সবকিছু মিলিয়ে করা সম্ভব হয়নি,” আলাপ-কে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল রবিবার বলেছেন, “আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভার্নমেন্ট দেয় নাই।”
টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকাকেই বর্তমানে হাম ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন।
“গত দুইবছর ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন হয়নি। কৃমিনাশকের ক্যাম্পেইন হয়নি। এটাও একটা ফ্যাক্টর কি না দেখতে হবে,” বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তা।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাংলাদেশের সংক্রামক রোগ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর-এর অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন ড. মুশতাক হোসেন। এর আগে তিনি সংস্থাটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন।
বর্তমানে হাম ছড়িয়ে পড়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ দেশে মুশতাক হোসেন। আলাপ-কে তিনি বলেন, “এটা মহামারিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা আছে।”
কেন এভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ছে তাও ব্যাখ্যা করেছেন কেমব্রিজ থেকে পিএইচডি করা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।
“গত বছর বা তার আগের বছর থেকে টিকার প্রোগ্রামগুলো বাতিল করা হলো। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র টাকা পয়সা তুলে নিলো। টিকা কেনার অর্থ সংকট। উচিত ছিল সরকারের নিজের পয়সায় কেনা, বিদেশিদের আশায় না থেকে।”
“ইপিআইতে যে ভলান্টিয়াররা কাজ করে অস্থায়ীভাবে তাদের জন্য কোনো টাকা ছিল না। ফলে জনবলও পাওয়া যায়নি।”
মুশতাক হোসেন বলেন, “এই যে অসম্পূর্ণ টিকাদান, অসম্পূর্ণ কাভারেজ, এই কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। টিকা দীর্ঘদিন না দেওয়ার কারণেই এই অবস্থা। এটাই প্রধান কারণ।”
হাম ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে যা যা করতে হবে
হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিরোধে প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে প্রস্তুত করা হচ্ছে হাসপাতাল ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হোসেন মোঃ মঈনুল আহসান বলেন, “যেরকম ছড়িয়েছে, আমরা চিকিৎসাও সেরকম বাড়িয়েছি। যেগুলো বড় বড় হাসপাতাল আছে বা দেশের সবগুলো হাসপাতালেই হামের জন্য আমরা আলাদা ওয়ার্ড চালু করেছি।”
“ঢাকাতেও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ডিএমসি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড চালু করেছি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউগুলোকে চালু করেছি আলাদা করে, বন্ধ ছিল।
এই কর্মকর্তা বলেন, “যদি রোগী আরো বাড়ে, ব্যবস্থা আরো বাড়াবো। আমরা সেভাবেই প্রস্তুত হচ্ছি।”
দ্রুত হাম ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সেই পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন।
“এটা মহামারিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা আছে। যেখানে যেখানে আউটব্রেক হয়েছে সেখানে বাচ্চাদের দ্রুত টিকা দিতে হবে, আগে নিক বা না নিক।”
এছাড়া সারাদেশেই দ্রুত টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একইসঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করারও পরামর্শ দেন তিনি।
“প্রায় সবাই ঢাকা শহরে আসছে। আসার পথে নিউমোনিয়া বাড়ছে। এখানে তো এত এনআইসিইউ নাই। জেলা শহরে জনবল ও যন্ত্রপাতি বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।”
ড. মুশতাক বলেন, যেখানে আউটব্রেক হয়েছে, সেখানে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠিয়ে আক্রান্তদের আইসোলেট করে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে ছড়িয়ে পড়া কমে যাবে।
সরকারও টিকা হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। টিকাও প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন উপপরিচালক (ইপিআই) শাহরিয়ার সাজ্জাদ।
তিনি বলেন, “এপ্রিলের ১৯ তারিখে আমাদের ক্যাম্পেইন করার কথা ছিল। এটা অনুমোদন নেওয়া আছে। গাভী ভ্যাকসিন দিয়েছে।”
প্রায় দুই কোটি শিশুকে এবারের ক্যাম্পেইনে টিকার দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
টিকার জন্য ৬০৪ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
লম্বা ছুটির পর স্কুল খোলার মধ্যে হামের প্রকোপ নিয়ে নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করছেন অনেকেই।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডাঃ এমএবি ছিদ্দিক মজুমদার জাবের ফেইসবুকে লিখেছেন, “প্রায় ৪০দিন ছুটির পর আজ থেকে বাচ্চাদের স্কুল খুলে যাচ্ছে। আবার হাম ছড়িয়ে পড়ছে। হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। এতে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হ ওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাসকষ্ট এই সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে। তাই সাবধানতা অতি জরুরী।”
ডা. জাবের মেডিসিন, হৃদরোগ, বাতজ্বর ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ। এই ছোঁয়াচে রোগের প্রকোপ শিশু শিক্ষার্থীদের মুক্ত রাখতে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
শিক্ষার্থীদের জন্য:
জ্বর, কাশি, চোখ লাল বা শরীরে ফুসকুড়ি থাকলে স্কুলে না আসা
কাশি/হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা (টিস্যু/কনুই ব্যবহার)
নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
অন্যের পানির বোতল, খাবার, রুমাল ব্যবহার না করা
স্কুল কর্তৃপক্ষের জন্য:
প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ
অসুস্থ শিক্ষার্থীকে দ্রুত আলাদা রাখা
ক্লাসরুমে ভালো বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা (জানালা খোলা রাখা)
ভিড় কমানো ও প্রয়োজন হলে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট পরিবর্তন
ডেস্ক, দরজার হাতল, খেলনা নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা
স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা
অভিভাবকদের জন্য:
শিশুর টিকা সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা যাচাই করুন
অসুস্থ হলে শিশুকে স্কুলে পাঠাবেন না
পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করুন