রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে?
সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান থাকায় সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে। বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা থেকে শুরু করে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ একাধিক নাম আছে আলোচনায়।
শুক্রবার বিকালে পদত্যাগ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দায়িত্বে নিয়েছিলেন তিনি। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মো. সাহাবুদ্দিন।
শনিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার বলেন, রাষ্ট্রপতি বলেছেন তিনি অসুস্থ, তার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। শারীরিক অসার্মথ্যের কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।
কবে নির্বাচিত হতে পারেন নতুন রাষ্ট্রপতি
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সাংবিধানিক নিয়মে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ নাম্বার অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। তিনি বলেন, “দেশে এমন কোনো পরিস্থিতি হয়নি যে জরুরি অধিবেশন ডেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।”
কারা আছেন আলোচনায়
গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের সময় থেকেই রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য অনেকের নাম আলোচনায় আসে। মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়া দলটির প্রবীণ নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নাম প্রথমেই আলোচনায় এসেছে।
আলোচনা হচ্ছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণিকে নিয়েও। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নামও উঠে এসেছে আলোচনায়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
শুক্রবার মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর থেকে নতুন করে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক ফেসবুক পোস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রস্তাব করেছেন।
শুক্রবার রাতে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, “আমার মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ পদে যোগ্য ব্যক্তি। শেখ হাসিনার দুঃশাসনকালে তিনি মহাসচিব হিসেবে দলের হাল ধরেছেন, বহুভাবে নির্যাতিত হয়েছেন এবং অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনি ব্যক্তিত্ববান, মডারেট, সদাচারী ও সুবক্তা হিসেবে অগ্রগণ্য।”
তিনি আরও লিখেছেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বোঝাপড়ার সম্পর্ক রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার কাছে তিনি ছিলেন সন্তানসম একজন।”
ব্র্যাক-এর নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ ফেইসবুক পোস্টে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন অন্যদের চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি তা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সাথে সাথে, একটি নাম যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তার চেয়ে বেশি মনোযোগের দাবি রাখে।
রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক আর ঠিক একারণেই কে এই পদে আসীন হচ্ছেন তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন আসিফ সালেহ।
তিনি বলেন, এটিই একমাত্র পদ যা কোনো দলের নয়, বরং সমগ্র দেশের হওয়ার কথা। এর জন্য এমন একজন ব্যক্তি প্রয়োজন যার বিশ্বাসযোগ্যতা সরকার পরিবর্তনের পরেও টিকে থাকে।
এরপর তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের তিনটি যোগ্যতার কথা তুলে ধরেন। প্রথম কারণ হিসেবে তিনি মির্জা ফখরুলের সততার কথা উল্লেখ করেন।
আসিফ সালেহ লিখেছেন, চার দশকের জনজীবনে শিক্ষা ক্যাডারের একজন কলেজ প্রভাষক থেকে শুরু করে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান, তারপর প্রতিমন্ত্রী এবং তার দলের মহাসচিব হিসেবে পনেরো বছর পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত মুনাফ করার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ব্যাপকতার কথা বলেন আসিফ সালেহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা, শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষকতা জীবন, জাতীয় ব্যক্তিত্ব হওয়ার আগে নির্বাচিত পৌরসভা চেয়ারম্যান, দুইবার প্রতিমন্ত্রী। তিনি রাষ্ট্রকে শুধু শীর্ষ পর্যায় থেকে নয়, একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকেও চেনেন।
তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আসিফ সালেহ বলেন, তিনি দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে সম্মানিত মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞাসা করুন বিএনপিতে কার সাথে তারা কথা বলতে পারেন, দেখবেন এক দশক ধরে উত্তর একই। একজন রাষ্ট্রপতিকে এমন একজন হতে হয় যাকে অপর পক্ষ ভয় পায় না। আমাদের খুব কম সিনিয়র রাজনীতিবিদই এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেন।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
নতুন রাষ্ট্রপতি পদে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। নিজ নির্বাচনি এলাকা কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
একাধিক গণমাধ্যমের রিপোর্টে এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষকের পদ ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। শুরুতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০২৬ সালের নির্বাচনে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নির্বাচিত হন তিনি।
বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হিসেবে দলের ভেতরেও তিনি সম্মানিত।
ড. আবদুল মঈন খান
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান নরসিংদী-২ আসন থেকে মোট চারবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তার বাবাও সাবেক এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন।
১৭ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পরই আবদুল মঈন খানের নাম এসেছিল। অনেকেই বলছিলেন, সিনিয়র এই নেতাকে কোনো মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রপতি বিবেচনার কারণে।
তার বাবা সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল মোমেন খান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের সাবেক এই অধ্যাপক সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত।
মঈন খান এর আগে বিএনপি সরকারে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার রাজপথের সক্রিয়তা এবং কূটনৈতিক মহলে যোগাযোগ তাকে বিএনপির একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এম নাসিমুল গণি
রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে হঠাৎ আলোচনায় বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম নাসিমুল গণি। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু থেকেই তার নাম এসেছে।
আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকার নাইন সায়ের প্রথম তার নামটি সামনে আনেন।
২২এ জুলাই এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিষ্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোন শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।”
নাসিমুল গণি বাংলাদেশের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ১৯৮২ ব্যাচের একজন সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরি শুরু করেন নাসিমুল গণি।
২০২৪ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপরই তাকে সিনিয়র সচিবের মর্যাদা দেওয়া হয় হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের উচ্চতম পদ বাংলাদেশের ২৬তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আলোচনায় আরো দুইজন
নতুন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আলোচনায় আছে কিছুদিন আগেই প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আইরিন খানের নাম।
এই নিয়োগের আগে আইরিন খান জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের দায়িত্বে ছিলেন।
এর আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
দেশের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসাবে আইরিন খানের নাম আলোচনায় আছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের চাচাতো বোন।
এছাড়া সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও লিখেছেন ফেইসবুকে অনেকে।
যেভাবে নির্বাচন হবেন রাষ্ট্রপতি
নব্বই দশকের আগে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। তবে ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়।
তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন সংসদ সদস্যদের ভোটে।
সংবিধানের ৫০ নাম্বার অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।
মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা অভিসংশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ৩৫ বছরের বেশি ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো যোগ্য হতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন।
তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।