পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার বিকালে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়। এরপর সংবাদ সম্মেলনে এসে তা নিশ্চিত করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
শুক্রবার বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুরুতর স্বাস্থ্যগত কারণে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম)-এর নিকট পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
বিকাল ৪টার পর সংসদ সচিবালয়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র পৌঁছায়। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর সংবাদ সম্মেলন করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের দফা ৩ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষর সম্বলিত পদত্যাগপত্র ২৪ জুলাই তার কাছে জমা দেন।
স্পিকার জানিয়েছেন, অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে স্পিকার বলেন, “সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণ করেছি।”
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, “যেদিন আমি স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছি, সেদিনই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছি।”
“রাষ্ট্রপতি শারীরিক অসামর্থ্যের কারণে পদত্যাগ করেছেন। আমি তার সুস্থতা কামনা করি,” বলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, “আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় Autonomic Neuropathy নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন।”
তিনি আরও লিখেন “এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।”
পদত্যাগের আলাপ নতুন নয়
মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছেই ছিল চমকপ্রদ। আওয়ামী লীগের অনেকের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত সবাইকে পেছনে ফেলে রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন।
সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪এ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই তার পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলছিলো।
তার পদত্যাগের দাবি উঠলেও বিএনপি জানিয়েছিলো, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে। তাই তারা এই দাবিতে সমর্থন করেন না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন ও নিয়মিত রুটিন কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। সে সময়ে রাষ্ট্রীয় দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতেও তিনি প্রায় অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজেও অংশ নিতে দেখা যায়নি তাকে।
২০২৫ সালে ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমি সরে যেতে চাই। আমি চলে যেতে আগ্রহী।”
তিনি আরও বলেছিলেন, “নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া উচিত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।”
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গঠন করার পরও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তার পাঁচ মাস না পেরোতেই নতুন করে পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়।
সবশেষ বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স রাত ১০টা ২৩ মিনিটে প্রকাশ করা এক খবরে বলেছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার পদত্যাগ করবেন। তিনটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সূত্রগুলোর কেউই পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এরপর থেকে নতুন করে পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদ প্রকাশের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই পদত্যাগের ঘোষণা আসে সাহাবুদ্দিনের পক্ষ থেকে।
সংবিধান কী বলছে
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন বলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।
এরপর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্য পদে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়া প্রার্থী রাষ্ট্রপতি হবেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে। এ ছাড়া সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য সংবিধানে নির্ধারিত যোগ্যতাগুলোও পূরণ করতে হবে।
নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নেবেন। শপথ নেওয়ার পরই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।