যে হত্যাটি ছিলো শেখ হাসিনার ক্ষমতার কফিনের শেষ পেরেক

দুই বছর আগের এক দুপুর। আকাশ খানিক মেঘলা ছিলো সেদিনও। ১৬ই জুলাই, ২০২৪।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাটি কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। একদিকে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং শটগানের গুলি, অন্যদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ইট-পাটকেল।

এর মাঝখানে এসেই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার ডান হাতে ছিল একটি লাঠিমাত্র।

দুই হাত প্রসারিত করে একদল পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। সামাজিক মাধ্যমে ও পরে সম্প্রচার মাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদ যখন নিরস্ত্র অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন ১৫ থেকে ২০ ফিট দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে পুলিশ।

প্রথম দফার গুলির পরও আবু সাঈদ নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে ছিলেন। পর পর কয়েক রাউন্ড গুলি তার শরীরে লাগলে তিনি বসে পড়েন, পরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপরই ঘুরে যায় আন্দোলনের গতি প্রকৃতি।

আন্দোলন আর কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশজুড়ে সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশ নেয়।

ওই বছরের ১৪ই জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

১৫ই জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সাথে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে কয়েক’শ শিক্ষার্থী আহত হন। এর পরদিনই ১৬ই জুলাই আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে মারা যান।

এই অঞ্চলের স্মরণকালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র-তরুণ হত্যা করে কোনো শাসক টিকে থাকতে পারেনি। ইতিহাসের সেই গতিধারা আবু সাঈদের মৃত্যু আরও একবার নিশ্চিত করেছে।

এই ভূখণ্ডে প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে আছে শিক্ষার্থীদের প্রাণ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নজির।

১৯৫২ সালের ২১এ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করে। সেখানে গুলি চালায় পুলিশ। শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ আরো অনেকে।

এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে।

১৯৬৯ সালের ২০এ জানুয়ারি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকার রাস্তায় পুলিশের গুলিতে আন্দোলনরত ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান নিহত হন।

আসাদ নিহত হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপর ১৫ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এর তিন দিন পর, ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান। এর ধারাবাহিকতায় আইয়ুব খানের পতন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৬৯ সালের ২৫এ মার্চ তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছিলো একই চিত্র। ১৯৮৩ সালের ১৪ই ও ১৫ই ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সামরিক শাসক লে. জেনারেল এইচ এম এরশাদের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে গুলি চালানো হলে জাফর, জয়নাল, মোজাম্মেল, কাঞ্চনসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র নিহত হন।

১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর বুকে-পিঠে স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান লিখে রাজপথে নামা নূর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তীব্র হয় আন্দোলন।

১৯৯০ সালের ২৭এ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম মিলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রিকশায় থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

ডা. মিলনের এই হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন পেশাজীবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ একযোগে রাজপথে নেমে আসে। এর ঠিক ৯ দিনের মাথায়, ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আবু সাঈদের মৃত্যুর পরই অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায় শেখ হাসিনার পতন। তার মৃত্যুর পরদিন ১৭ই জুলাই সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। হল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

১৮ই জুলাই ঢাকাসহ সারা দেশে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন। ওই দিন সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে ঢাকার বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক নিহত হন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। ১৯এ জুলাই মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারি করে সেনা মোতায়েন করা হয়।

কারফিউর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের গুলিতে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অগাস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতায় শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকসহ কয়েকশ মানুষ নিহত হন।

হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন, যা পরে ৩রা অগাস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জনসমাবেশে এক দফা, ‘শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ’ দাবিতে রূপ নেয়।

৪ঠা অগাস্টও সারা দেশে পুনরায় সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। ৫ই অগাস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

সকাল থেকেই ঢাকা এবং আশেপাশের জেলাগুলো থেকে লাখো মানুষের মিছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড ভেঙে ঢাকায় ঢুকতে শুরু করে।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে যখন ছাত্রজনতার স্রোত যখন গণভবন অভিমুখে, তখনই প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।

সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত করা হয়। দুপুরেই তিনি একটি সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

রংপুরের রাজপথে ১৬ই জুলাইয়ের আবু সাঈদের ঝরে যাওয়া প্রাণ ২০ দিনের মাথায় একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামোর অবসান ঘটিয়েছিলো।

ওইদিন শুধু আবু সাঈদ নয়। প্রাণ ঝরেছিলো চট্টগ্রামে ছাত্রদলের ওয়াসিমসহ ছয় জনের।

আবু সাঈদের প্রসারিত দুই বাহু এবং বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য শুধু একটি সরকারের বিদায় নিশ্চিত করেনি।

হয়তো ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ভবিষ্যতের যেকোনো শাসকের জন্যই এক সতর্কবার্তা হিসাবে ইতিহাসের পাতায় খোদাই হয়ে রইলো। তবে, ইতিহাসের এই অমোঘ শিক্ষা কি পরবর্তী অধ্যায়ের শাসকেরা মনে রাখবেন?