টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পাহাড়ধস। একের পর এক পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতঘর ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাঙামাটিতে শতাধিক স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে, কক্সবাজারে কয়েক দফা ধসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রে, খুলে দেওয়া হয়েছে শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার ও রাঙামাটি। কক্সবাজারে গত কয়েক দিনে একাধিক পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটেছে, অন্যদিকে রাঙামাটির ৯৭টি স্থানে পাহাড়ধসের খবর পাওয়া গেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং চলছে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম।
কক্সবাজার
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান ২০ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছেন। আলাপ-কে তিনি বলেন, ১০-১২টি জায়গায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২টি, সদরে ২টি, পেকুয়ায় একটি ও উখিয়ায় একটি পাহাড়ধসের কথা জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমরা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে অনুরোধ করছি, গত ৪-৫ দিন ধরে মাইকিং চলমান। জেলার সকল আশ্রয় কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে।”
সবশেষ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে আরও দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ের একটি অংশ ধসে বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়েন তিনজন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাদের বাইরে নিয়ে এলে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। আহত এক নারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মৃতরা হলেন- ১৪ বছর বয়সী তৌসিফ এবং ১৭ বছর বয়সী রুমি আক্তার। নিহতরা চাচাতো ভাইবোন।
এদিকে, টানা ভারী বর্ষণের কারণে কক্সবাজারে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। বুধবার উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একটি মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার দরিয়ানগরের বড়ছড়া এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারান একজন। আর সোমবার উখিয়া ও কক্সবাজার পৌরসভার সাত্তার ঘোনায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহত হন নয় জন।
সব মিলিয়ে ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাঙামাটি
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জেলার ৯৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ২০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রাঙামাটিতে, পাহাড়ধসের ঘটনাগুলোর মধ্যে কাপ্তাই উপজেলায় ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ৩টি, কাউখালীতে ৩০টি, রাঙামাটি সদরে ১১টি, নানিয়ারচরে ২টি এবং বিলাইছড়িতে ৩৭টিসহ মোট ৯৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় জেলার বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
বান্দরবান
বান্দরবানের লামা উপজেলার দুই স্থানে পাহাড়ধসে অন্তত ৬ জন নিহতের খবর মিলেছে। জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বুলবুল আক্তার সেতু আলাপকে জানান, বান্দরবানে একাধিক জায়গায় পাহাড়ধস হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় উদ্ধার করা গেছে।
তবে লামায় দুটি পাহাড়ধসে ৫ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন একজন।
তিনি বলেন, “ছোটখাটো একাধিক পাহাড় ধস হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণহানি এড়ানো গেছে। কোথাও কোথাও রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেটাও সেনাবাহিনীর সহায়তায় ঠিক করা হয়েছে।”
এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ১ জন মানুষ ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য ১ হাজার ১৫৮ প্যাকটে শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কতদিন বৃষ্টি চলবে
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় গত তিন দিনে বেশ কয়েকটি পাহাড় ধসের মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
পাহাড়ধসের সঙ্গে সঙ্গে নদনদীর পানি বেড়ে অনেক জায়গায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।
ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। জলাবদ্ধতা ও নদীর পানি প্লাবিত হয়ে অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস বলছে, বৃহস্পতিবারও চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভেতরে গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর বাংলাদেশের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে সব থেকে বেশি ২২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ছয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলেও জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এ ছাড়া দেশের উত্তর ও উত্তরপূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি রয়েছে বলেও জানানো হয়।
বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পাহাড়ি ও নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো প্রস্তুত রয়েছে।