পুলিশ সপ্তাহে কেন কর্মকর্তাদের পদক দেওয়া হলো না?

পুলিশ সপ্তাহ শুরু হয়েছে ১০ই মে। প্রতিবছর পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনের দিনই কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) দেওয়া হয়। তবে এবছর পুলিশ সপ্তাহ শুরু হওয়ার আগের দিন জানা যায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দিন পদক ‘স্থগিত’ করা হয়েছে।

এদিকে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি বিদেশ যাওয়ায় পুলিশ পদকের জিও করা সম্ভব হয়নি। প্রকাশিত এ খবর প্রসঙ্গে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বিবৃতি দিয়ে এ সংবাদটিকে সঠিক নয় বলে জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ ধরনের বক্তব্য প্রদান করেননি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত বক্তব্য ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।"

তারা বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করে, পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পুলিশ পদক নিয়ে বিতর্ক

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা আলাপকে জানিয়েছেন, এ বছর পদকের জন্য মনোনীত ১০৯ জন ছিলেন। যার মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী লীগ আমলে পদক পেয়েছেন এবং আগের মতোই রাজনৈতিক বিবেচনায় পদকের তালিকায় নাম এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইন্সপেকটর আলাপ-কে জানিয়েছেন, এবারও আগের আমলের মতোই রাজনৈতিক বিবেচনায় পদকের তালিকা করা হয়েছিল। উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, একটি মামলার তদন্তের সফলতার জন্য দেখা যায় একজন এসপি পদক পাচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে সেই মামলার তদন্ত করেন একজন সাব-ইন্সপেক্টর বা ইনভেসটিগেশন অফিসার। অর্থাৎ যে কাজগুলো তারা করেননি, সেসব কাজের জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় বিপিএম কিংবা পিপিএম পদক নিয়ে যাচ্ছেন। এই বিষয়টি নিয়েই এবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সরকার এ বিষয়টি আমলে নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্কে জড়াতে চায়নি। আর এ কারণেই স্থগিত হয়েছে পদক আয়োজন।

পুলিশ সুপার পদমর্যাদার আরও একজন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) আলাপ-কে জানান, পদক স্থগিত হওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও আওয়ামী লীগ আমলে পদক পেয়েছেন, এমন অফিসারও ছিলেন তালিকায়। যা নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করেছেন। 

পদক স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে জিও আসেনি। যার কারণে পুলিশ সপ্তাহের ভেতর পদক দেয়া যায়নি। এটা যে কোনো সময়ই জিও হলে দেয়া যাবে।

পদক কমিটির সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম আলাপ-কে আরও বলেন, “আমাদের ১০ জনের কমিটি আছে। আমরা তালিকার নামগুলো স্ক্রুটিনাইজ করে কর্তপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি।"   

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকার বিষয়ে তিনি বলেন, "এগুলো সত্য নয়। নানান রকম কথা তো থাকেই। এটা জিও হয়নি দেখেই পদক দেয়া যায়নি। কেন ডিলে হলো এটা আমি জানি না।"

অন্তর্বর্তী সরকার আমলে পদক পেয়েছিলেন ৬২ জন

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে পুলিশ পদক বিপিএম ও পিপিএম প্রদান করে ৬২ জনকে। সে বছর মোট চারটি ক্যাটাগরিতে পুলিশ পদক দেওয়া হয়। এগুলো হলো—বিপিএম-সাহসিকতা, বিপিএম-সেবা, পিপিএম-সাহসিকতা ও পিপিএম-সেবা।  

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সারের ২৩এ ফেব্রুয়ারি পুলিশ-র‍্যাবের বিভিন্ন পদমর্যাদার ১০৩ কর্মকর্তার বিপিএম ও পিপিএম পদক প্রত্যাহার করে। যাদের মধ্যে ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ আরও অনেক কর্মকর্তা। পদক প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপনে তখন বলা হয়, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ১০৩ কর্মকর্তাকে ২০১৮ সালে দেওয়া বিপিএম ও পিপিএম পদক নির্দেশক্রমে প্রত্যাহার করা হলো।

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে পদক নিয়ে বিতর্ক

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে পুলিশ পদক নিয়েও ছিল নানামুখী বিতর্ক। একইসঙ্গে অধিক সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদক দেওয়া নিয়ে ছিল সমালোচনা। অভিযোগ আছে, বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ এই পদক পেত।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতেও ৪০০ জন কর্মকর্তাকে পদক দেওয়া হয়। এর মধ্যে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৩৫ জনকে বিপিএম, ৬০ জনকে পিপিএম পদক দেওয়া হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য ৯৫ জনকে বিপিএম-সেবা ও ২১০ জনকে পিপিএম-সেবা দেওয়া হয়েছিল।