মন্তব্য প্রতিবেদন

অনিরাপদ রাষ্ট্রে 'লক্ষ‍্যভেদী' বুলেট যেভাবে থেমে যায়

একটা তরুণ, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। কলেজ জীবন থেকেই দারুণ মেধাবী, সুশৃঙ্খল-পরিপাটি। আর পড়াশোনাতে খুবই সিরিয়াস। সফলতা তার চা-ই চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধের গণ্ডি পেরিয়ে ভালো একটি সরকারি চাকরি। ধাপে ধাপে সকল বাধা ডিঙিয়ে বিয়ে সংসার আর বৌ-বাচ্চা, বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে পরবর্তী জীবনটা উদযাপনের পালা।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলের মতোই স্বপ্ন ছোট কিন্তু গভীর, সাধারণ কিন্তু অর্জন করাটা ভীষণ কঠিন। সেই স্বপ্নের তরী ডুবে গেল একদম তীরে এসে।

পঁচিশে এপ্রিল ৩৫ বছর বয়সী বুলেট বৈরাগীর মরদেহ পাওয়া গেল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশে।

মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। প্রশিক্ষণ শেষে বাণিজ্যিক নগরীর অলঙ্কার মোড় থেকে বাসে উঠে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নামার কথা, তারপর রাজগঞ্জ পানপট্টির বাসা, নিজের মানুষদের কাছে ফেরা।

রাত ১১টার দিকে বাসে উঠেছিলেন। রাত ১টা ২৫ মিনিটেও স্ত্রী উর্মিলা হীরার সঙ্গে কথা হয়েছে। তারপর...

সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে উর্মিলার স্ট্যাটাস: “...আসতেছে বলে কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন খবর নাই। যদি কেউ উনার কোন প্রকার সন্ধান পেয়ে থাকেন তাহলে এই নাম্বারে যোগাযোগ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা গেল...”

ঘুম ভাঙার পর মোবাইলে প্রথমে ওর ছবিটা ভেসে উঠেছিল। কেউ শেয়ার করেছিল। অভ্যাসবশত পুরোটা না পড়ে স্ক্রল করে গিয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক মিনিট পর দেখি পরিচিত আরও কয়েকজন একই ছবি শেয়ার দিচ্ছে। তখন ‘See more’ এ ক্লিক করতেই বুঝলাম, বুলেট নিখোঁজ। কিছুক্ষণ পরই খবর এলো নিখোঁজ নয়, মৃত।

স্ত্রীর সাথে বুলেট বৈরাগী

গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেল, বেলা ১১টার দিকে তার বাবা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ করেন। এরইমধ্যে ৯৯৯-এ কল পেয়ে সকাল পৌনে ৮টার দিকে কোটবাড়ী এলাকায় চট্টগ্রামমুখী লেনের পাশে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ। পরে দুপুর একটা নাগাদ পরিবারের লোকজন থানায় গিয়ে লাশটি বুলেট বৈরাগীর বলে শনাক্ত করেন। 

পুলিশের ভাষ্য, মুখে কিছুটা রক্তের দাগ থাকলেও শরীরে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে প্রথম আলো পরবর্তীতে একটি প্রতিবেদনে লিখেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগী বলেন, শুক্রবার রাত আড়াইটার পর তার ছেলের ফোন থেকে কয়েকজন অচেনা মানুষ কথা বলেছিলেন। এরপর থেকেই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার কথায়, বুলেটের বাস থেকে পদুয়ার বাজারে নামার কথা ছিল, কিন্তু লাশ পাওয়া গেছে কোটবাড়ীতে, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল না। নীলিমা বৈরাগীর দাবি, এটি খুন, এবং পুরো বিষয়টি ঠিকমতো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ছবিতে বুলেটের মুখটা রক্তাক্ত ছিল। মুখে ফেনার মতো কিছু দেখা যাচ্ছিল। দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড, এই প্রশ্নের উত্তর আদৌ মিলবে কি-না, সেটাই কি আমরা জানি?

বাংলাদেশে এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু নতুন কিছু না। মহাসড়ক, নিখোঁজ, পরে লাশ উদ্ধার—এই শব্দগুলো যেন খুব পরিচিত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিটা ঘটনার পেছনে একটা করে সম্পূর্ণ জীবন থাকে, একটা পরিবার থাকে, একটা ভবিষ্যৎ থাকে—যেগুলো হঠাৎ থেমে যায়। তদন্ত শুরু হয়, সন্দেহ তৈরি হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে, তারপর অনেক সময়ই ফাইলের ভেতরে চাপা পড়ে যায় সত্য। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, কখনো অস্পষ্ট হয়ে যায়, কখনো হারিয়েও যায়।

কিন্তু আমার দেখা বুলেটের জীবনটা ছিল ধোঁয়াশাহীন, পরিষ্কার এবং লক্ষ্যভেদী।

কোচিংয়ের সুবাদে গোপালগঞ্জ শহরের গোহাটা এলাকার নিরালা নিবাসের নিরালা পরিবেশ থেকেই ওর সাথে আমার পরিচয়। তখন থেকেই একদম সুস্থির-পরিপাটি আর লেখাপড়া ও নিজের টার্গেটের প্রতি খুবই সিরিয়াস। কোচিংয়ের আগে-পরে ওর ছোট্ট রুমটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা।  

যদিও কলেজে বুলেট কর্মাস গ্রুপে; ওর টার্গেট বিবিএ। আর আমি মানবিকে, টার্গেট সামাজিক বিজ্ঞান বা আইন। তবু তখনকার আড্ডা মানেই বাংলা ব্যাকরণের বাগধারা-কারক-সমাস-সন্ধি-ধাতু, বা ইংরেজি ভোকাবুলারি, প্যাসেজ আর সেনটেন্স কারেকশন; কিংবা সাধারণ জ্ঞানের অসাধারণ নতুন নতুন তথ্য! আর মাঝেমাঝে জানালা দিয়ে পাশের বাগান আর পুকুরের দিকে তাকিয়ে, কখনো বা চোখ বন্ধ করে ওর দু-চার লাইন রবীন্দ্র সঙ্গীত — ওর ভেতরের মানুষটা ছিল নরম, সংবেদনশীল, অথচ ভীষণ ফোকাসড।

পরে সে ভর্তি হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্সে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজমে। পথ আলাদা হয়ে গেল, জীবন এগিয়ে গেল। নতুন নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষের ভিড়ে আমরাও ছিটকে পড়লাম। 

বছর দশেক পরে হঠাৎ ফেসবুকে ফ্রেন্ড সাজেশনে দেখি বুলেট বৈরাগী। সাথে সাথে অ্যাড, কানেক্ট আর টেক্সট। মনেই হয়নি দূরত্ব আসলে কখনো তৈরি হয়নি, বরং সেই আগের মতোই। তখন শরৎ চলছে।  বলেছিলাম, 'শোন, যে ওয়েদার...চল সেলিব্রেট করি।' ওর স্বভাবসুলভ 'হাহাহা'। নাম্বারটা দিয়ে বলেছিলাম, 'শেষ করে ফোন দে।' ও বলেছিল, দিবে। সেই ফোনটা আর আসেনি।

আর এরপর প্রায় চার-পাঁচটা শরৎ কেটেছে, দুর্দান্ত ওয়েদার এসেছে। কিন্তু একসাথে আর সেলিব্রেট করা হয়নি।

তবে ওর বিয়ে, বিয়ের অনুষ্ঠানে বা পরে ওর গান, কয়েকমাস আগে ওর বাচ্চা — সবই টাইমলাইনে আসতো।  আর দূর থেকেই মনের অজান্তেই ভালো লাগতো। মনে হয়েছে, হ্যাঁ, একজন মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকের স্বপ্নটা ঠিকঠাক পূরণ হচ্ছে। তবে সেই স্বপ্ন যখন পূরণ হলো, স্বপ্নে অবগাহনের সময় এলো, ঠিক সেই সময় বুলেটের এই অকাল প্রয়াণ যেন বন্ধুর বুকে বুলেট বিধঁলো। দেশের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তার স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টিও দিতে পারলো রাষ্ট্রযন্ত্র।

স্ত্রী উর্মিলা হীরার সঙ্গে শেষ কথা হয় রাত ১টা ২৫ মিনিটে

আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে একজন মেধাবী, সৎ, প্রতিষ্ঠিত মানুষও নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উঠতে পারে না। 

বুলেটের শেষ ফেইসবুক পোস্ট। সাদা জার্সি, হাতে ব্যাট নিয়ে ছবি শেয়ার দিয়ে, ক্যাপশন:

“খেলার চেয়ে ভাব বেশি হলে যা হয় আরকি। একাই দলকে হারায় দিয়া আসছি ”

অদ্ভুতভাবে, তীব্র হতাশার মধ্যেও এই লাইনটা দেখে হাসি পেল কেন জানি। একটা রাষ্ট্রকে হারাতে এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিপরীতে সেগুলো বন্ধের নিশ্চয়তা না দিয়ে, ব্যবস্থা না নিয়ে ফেসবুক-পত্রপত্রিকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক নামে সুন্দর সুন্দর পোজই যথেষ্ট। 

একটা রাষ্ট্র, একটা সিস্টেম, যেটা অন্তত এই নিশ্চয়তাটা দেওয়ার কথা সেটাই বারবার ব্যর্থ হয়। ‘রিসেট বাটন’ আর সংস্কারের আশা দেওয়ার পরেও প্রশিক্ষণ বিমান আছড়ে পড়ে কোমলমতি শিশুদের ক্লাসরুমে, ফেরিতে উঠতে গিয়ে যাত্রীবোঝাই বাস পড়ে পদ্মায়, মবের শিকার হতে হয় মতের ভিন্নতার কারণে।   

শুধু বুলেটের মৃত্যুতে বুলেটবিদ্ধ না, বরং এরকম অসংখ্য অস্বাভাবিক মৃত্যু একটা প্রশ্নবাণেই বিদ্ধ করে, আমরা কি সত্যিই নিরাপদ? আর যদি না হই, তাহলে এই স্বপ্নগুলো আমরা কী ভরসায় দেখি? 

শেষ পর্যন্ত, একটা জীবন থেমে যায়, একটা পরিবার ভেঙে যায়, একটা শিশুর বাবাহীন বড় হওয়ার গল্প শুরু হয়। আর আমরা?  কিছুদিন কথা বলি, শেয়ার করি, কাঁদি, তারপর ধীরে ধীরে ভুলে যাই। ব্যস্ত হয়ে পড়ি নিজেদের যাপিত জীবনে।