সেলিম আল দীন: বাংলা নাটকের দেশজ রীতির স্বপ্নদ্রষ্টা 

একজন নিমগ্ন নাট্যকার ও লেখকের বাইরে আমি সেলিম আল দীনকে পেয়েছি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বজনীন শিক্ষক হিসেবে, শুধু নাটক নয়, ফিজিক্স কেমেস্ট্রি ম্যাথের মতো কাঠখোট্টা বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও দেখেছি তার বক্তব্য হা করে শুনতে। তাঁর সাথে আমরা যারা হেঁটেছি কিছু না কিছু পথ সে-ই সবই যেন ছিল এক শিক্ষাসফর।

সেলিম আল দীনের নাট্যচিন্তার কেন্দ্রে ছিল বাংলার মাটি ও মানুষের নিজস্ব জীবনবীক্ষণ। পাশ্চাত্য নাট্যধারার অন্ধ অনুকরণকে তিনি দেখতেন সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়ন হিসেবে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বাংলা নাটকের প্রাণ লুকিয়ে আছে এই জনপদের লোককথায়, পালাগানে, মঙ্গলকাব্যে, যাত্রাপালায় এবং গ্রামীণ জীবনের বহুমাত্রিক বর্ণনায়, প্রতিদিনের যাপনে। তাঁর ভাষায়, "বাংলার মাটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে নাটকের আত্মা।" এই উপলব্ধি থেকেই তিনি শুরু করেছিলেন এক নিবিড় অনুসন্ধান—প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শেকড়ের সন্ধান।

তাঁর নাট্যতত্ত্ব ছিল বৈপ্লবিক। পাশ্চাত্য শিল্পের সব বিভাজনকে বাঙালির সহস্র বছরের নন্দনতত্ত্বের আলোকে অস্বীকার করে তিনি প্রবর্তন করেন 'দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব'। এই রীতিতে লেখা তাঁর নাটকগুলোতে নিচুতলার মানুষের সামাজিক নৃতাত্ত্বিক পটে তাদের বহুস্তরিক বাস্তবতা উঠে আসে। "আমার নাটক যদি এই বাংলাদেশি জনপদের জীবনযুদ্ধ, বেদনা ও পতনকে গভীরভাবে ধারণ না করে থাকে, তবে তা অবশ্যই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে"—এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর নাট্যজগৎ।  'দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব'—একটি স্বতন্ত্র নন্দনতাত্ত্বিক ধারণা, যা পাশ্চাত্য শিল্পের সকল কৃত্রিম বিভাজনকে অস্বীকার করে বাঙালির হাজার বছরের নন্দনচেতনাকে নতুনভাবে পাঠ করার এবং দেখার প্রস্তাব করে। এই তত্ত্বের আলোকে তিনি নির্মাণ করেন 'নিউ এথনিক থিয়েটার' বা নৃতাত্ত্বিক নাট্যধারা, যেখানে আদিবাসী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ, বিশ্বাস ও সংঘাত হয়ে ওঠে নাটকের মূল উপজীব্য।

সেলিম আল দীনের নাটকগুলোতে বাঙালির নাট্য-সংস্কৃতির কথা (বর্ণনা ও সংলাপ)-নৃত্য-গীত ও আপাত চরিত্রাভিনয়ের রূপ সম্পূর্ণ নতুনভাবে বিকশিত হয়। বিশেষ করে, ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকে যেখানে গীতের প্রভাব মুখ্য হয়ে ওঠে, সেখানে তার নাটকে বর্ণনাকেই দেওয়া হয় প্রাধান্য, বর্ণনাই হয়ে ওঠে নাটকের প্রাণ। সেইসাথে ঐতিহ্যবাহী নাট্য-পরিবেশনায় ব্যবহৃত সংলাপাত্মক অভিনয়েরও বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি হয় তার নাটকে।

প্রয়াণের পর জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের শোকর‍্যালিতে লেখক। ১৪ জানুয়ারি ২০০৮

সেলিম আল দীন প্রবর্তিত নতুন এই নাট্যকৌশল একটি স্বকীয় ধারার সৃষ্টি করে। ফলে আশির দশক থেকে বাংলা নাটকে দুটো ধারা শুরু হয়। একটি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতা ও পাশ্চাত্যমুখী শৃঙ্খলিত ধারা, অন্যটি দেশজ ধারায় প্রবর্তিত আধুনিক নাট্যধারা। যদিও স্বকীয় নাট্যধারার কথা-নৃত্য-গীত ত্রয়ীর বন্ধনে সৃষ্ট কথানাট্য, আখ্যান, পাঁচালিই একসময় তরুণদের নিকট নাট্যচর্চার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ঢাকা থিয়েটারের স্বাতন্ত্র হয়ে ওঠে বর্ণনাত্মক রীতির নাটক। এই দর্শনের প্রয়োগেই তিনি গড়ে তোলেন গল্পনাট্য ও গীতিনাট্যের অভিনব রূপ। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শেকড়ের সন্ধানে মগ্ন ছিলেন তিনি, আর এ থেকেই জন্ম নেয় তাঁর স্বতন্ত্র নাট্যধারা—দেশজ নাট্যদর্শন।

'জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন', 'মুনতাসির ফ্যান্টাসি', 'কীত্তনখোলা', 'যৈবতী কন্যার মন', 'চাকা', 'হরগজ', 'নিমজ্জন'সহ তাঁর রচিত নাটকগুলো একদিকে যেমন গ্রামীণ জীবন ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, তেমনি গভীর দার্শনিক প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। 'চাকা' নাটক ও চলচ্চিত্রখানি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতি। ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের মৃত্যু এই নাটক রচনায় প্রেরণা যুগিয়েছিল।
শিল্পের আন্তর্জাতিকতা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল তাত্ত্বিকভাবে ঋজু: "কোনো শিল্পেরই আন্তর্জাতিক ফর্ম হয় না। কারণ শিল্প দেশ-কাল, ধর্ম-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট ভূগোলের ওপর দাঁড়ানো। লাতিন আমেরিকান শিল্পরীতি আমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারে, তবে কাজ দেশ-কাজ ভূগোলের আশ্রয়ে সমূলিত।"

তিনি ছিলেন এক অদম্য শিক্ষাগুরু ও সংগঠক। ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদানের পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ—বাংলাদেশে প্রথম এমন বিভাগ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'বাংলা নাট্যকোষ' বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে পরে তিনি গড়ে তোলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, মানিকগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন 'তালুকনগর থিয়েটার'। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের শিক্ষার্থী শিষ্যদের গণমাধ্যমে, সৃজনশীল পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে উদ্বুদ্ধ করেছেন, চেয়েছেন তার শিক্ষার্থীরা হোক শিল্পীত মানুষ।

১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজীর সেনেরখীল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেলিম আল দীন। শৈশব থেকেই বইপড়ায় আসক্ত এই মানুষটি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর লেখক হওয়ার পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৮ সালে, কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় 'নিগ্রো সাহিত্য' শীর্ষক প্রবন্ধের মাধ্যমে। ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি মারা গেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অভূতপূর্ব শোকের দিন নেমে আসে। কে কাঁদেনি সেদিন, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ শুধু নয়, পুরো ক্যাম্পাস এক শোকসভায় পরিণত হয়েছিল সেদিন। মৃত্যু সম্পর্কে সেলিম স্যার নিজেই 'ধাবমান' নাটকে লিখেছিলেন: "সে মৃত্যু কষ্টজয়ী হোক, সে দুঃখ জয়ী হোক/ শোক পারায়ে যাক সবল পায়ে..."

এই লেখা লিখতে বসে কত যে স্মৃতি মনে পড়ছে, সব স্মৃতি বুঝি লিখতেও নেই। সেলিম স্যারের প্রয়াণের পর সেসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপত্র 'জাহাঙ্গীরনগর পত্রিকা'' একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। সেখানে কবি মোহাম্মদ রফিকের একটি লেখার পাশে স্থান পেয়েছিল স্যারকে নিয়ে লেখা আমার একটি কবিতা।

বাংলা নাটকের এ গৌড়জনকে তার প্রয়াণদিনে শ্রদ্ধায় স্মরণ করলাম।

(লেখক, কবি ও সাংবাদিক)