সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন এমনিতেই নানা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য চাপ, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। আর ঠিক এই সময়েই সেই দমবন্ধ করা পরিবেশে নতুন আঘাত হয়ে এলো এক আইনি নোটিশ।
গত ২৭এ অগাস্ট উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবী জনস্বার্থের অজুহাত তুলে সুনির্দিষ্টভাবে ‘প্রেম ও রোমান্স নির্ভর’ সিনেমা এবং নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে সরকারকে এই নোটিশ পাঠিয়েছেন।
তার অভিযোগ- এ ধরনের কনটেন্ট নাকি দেশের যুবসমাজকে চরমভাবে পথভ্রষ্ট করছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত করছে এবং সমাজে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
নোটিশে দাবি জানানো হয়েছে, প্রেম-ভালোবাসার কনটেন্ট বন্ধ করে দিয়ে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক নাটক-সিনেমা বানানোর সরকারি নির্দেশনা দিতে হবে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই দাবি পূরণ না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বার্থে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
একজন সুস্থ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে এই নোটিশের ভাষা এবং দাবি পাঠ করলে প্রথমে কেবল বিস্ময়ই জাগে।
আমাদের দেশের নাটক কিংবা মূলধারার চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপের কড়াকড়ি এবং সামাজিক অনুশাসনের কারণে পাশ্চাত্যের মতো খোলামেলা যৌনতা বা অনভিপ্রেত দৃশ্য এমনিতেই থাকে না।
যে শিল্পে মানুষের সুস্থ আবেগ, বিরহ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের উপস্থাপন তৈরি হয়, তাকে সরাসরি পরকীয়া কিংবা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা কতটা অসংলগ্ন ও অবিশ্বাস্য যুক্তি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অবশ্য আইনি দিক থেকে বিচার করলে এই নোটিশটি হয়তো খুব বেশি তাৎপর্য বহন করে না।
কোনো আইনজীবী নোটিশ পাঠালেই রাতারাতি দেশের সমস্ত রোমান্টিক নাটক বা সিনেমা বন্ধ হয়ে যাবে না।
আর ভবিষ্যতে যদি এটি নিয়ে আদালতে রিট করাও হয়, বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেখানে চূড়ান্ত কোনো রায় বা নিষেধাজ্ঞা আসা বহু সময়ের ব্যাপার। কিংবা আদালত এই আবেদনটি হয়তো গ্রহনই করবেন না।
কিন্তু আসল সংকট এই নোটিশের আইনি কার্যকারিতায় নয়; আসল ভয়ংকর সংকট লুকিয়ে আছে সেই মনস্তত্বের গভীরে, যার উপর দাঁড়িয়ে একজন আইনজীবী দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনি কাঠামোকে ব্যবহার করে ভালোবাসার গল্প বলাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার দুঃসাহস দেখান।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমাজের একাংশের মধ্যে এক অদ্ভুত স্বৈরাচারী ও চরমপন্থী ভাবাদর্শ জেঁকে বসছে।
এই মানসিকতার প্রধান লক্ষণই হলো- নিজের ব্যক্তিক নৈতিকতার মাপকাঠি, রাজনৈতিক ধারণা বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাইরে থাকা অন্য যেকোনো চিন্তা, আবেগ ও সৌন্দর্যকে সমাজ থেকে একেবারে উপড়ে ফেলা।
শিল্পের বহুমাত্রিকতা, মানুষের মনের নানা অনুভূতির বিকাশ এবং মুক্ত বিনোদনের স্বাধীন রূপগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে সমাজকে একঘেয়ে ও একমুখী নীতিশিক্ষার খাঁচায় বন্দী করার এক উগ্র প্রচেষ্টা এখানে স্পষ্ট।
এরা চান সমাজ কেবল তাদের নির্দেশিত ছাঁচেই ভাববে, কথা বলবে আর তৈরি হবে।
এই সর্বগ্রাসী ও দমবন্ধ করা মনস্তত্ত্বই আজ আমাদের গোটা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই আইনি নোটিশ কোনো আকাশ থেকে পড়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একের পর এক বাধার যে হিংস্র মহড়া চলছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা মাত্র।
যদি আমরা খুব সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করি, তবে দেখবো কীভাবে বাংলার মাটি থেকে ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক সব ধরনের শিল্পচর্চাকে ধাপে ধাপে সংকুচিত ও পণ্ড করা হচ্ছে।
প্রথমত, সিনেমা দেখার মতো একটি স্বাভাবিক বিনোদনকেও আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে। চলতি বছর মে মাসের শেষের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামের একটি চলচ্চিত্রের সাধারণ প্রদর্শনী বন্ধের দাবিতে একদল কট্টরপন্থী মানুষ মাঠপর্যায়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও তীব্র হট্টগোল সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন আয়োজকরা।
দ্বিতীয়ত, দেশের সংগীতাঙ্গন আজ নজিরবিহীন এক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছে। গত ১৯এ অগাস্ট কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘অ্যাশেস’ এবং শিল্পী নোবেলের একটি বড় কনসার্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর একটি গোষ্ঠীর আপত্তির মুখে জেলা প্রশাসন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠানটির অনুমতি বাতিল করে দেয়। হাজার হাজার সংগীতপ্রেমী দর্শক ও আয়োজকদের অপূরণীয় ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। ঠিক তার একদিন আগে, ১৮ই অগাস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশ আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও একদল লোক হামলা চালায় এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যেখানে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিরাপদে সম্পন্ন হতে পারে না, সেখানে সাধারণ শিল্পীদের নিরাপত্তা যে কতটা ভঙ্গুর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তৃতীয়ত, আমাদের শত বছরের আবহমান গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি, যা এই ভূখণ্ডের আত্মার সাথে মিশে আছে সেটিও আজ আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সিলেটের বিশ্বনাথে ঐতিহ্যবাহী ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে একদল উগ্রপন্থী হামলা চালিয়ে শিল্পীদের বাদ্যযন্ত্র, সাউন্ড সিস্টেম ও চেয়ার ভেঙে তছনছ করে এবং অনুষ্ঠানটি পণ্ড করে দেয়। একইভাবে নেত্রকোনার মদন উপজেলায় বাউলগানের একটি পূর্বনির্ধারিত লোকজ আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
শুধু গান-বাজনাই নয়, গ্রামবাংলার লোকজ আনন্দ উৎসব ‘নৌকা বাইচ’ নিয়েও সম্প্রতি নানা স্থানে নানা বিধিনিষেধ চাপানো হচ্ছে।
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীতে দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক নৌকাবাইচ বন্ধের জন্য ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একদল লোক দাবি জানিয়েছিলো। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো ছাড়াও মসজিদে সভা করে তারা এই লোকজ উৎসব আয়োজনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো। খবরটি চাউর হলে ইউএনও’র হস্তক্ষেপে শুক্রবার উৎসব আয়োজনটি সম্পন্ন হয়।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই বছর পর শর্তসাপেক্ষে নৌকা বাইচের অনুমতি দেওয়া হলেও প্রশাসন আগে থেকেই কঠোর অনুশাসন জারি করে জানিয়ে দেয়, নৌকায় কোনো সাউন্ড সিস্টেম চালানো যাবে না, কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো, নাচানাচি বা আনন্দ-উল্লাস করা যাবে না।
এছাড়াও গতবছর উত্তরায় বাধার মুখে বসন্ত উৎসব বন্ধ, মহিলা সমিতি মিলনায়তনে 'ঢাকা মহানগর নাট্য উৎসব' বন্ধ, চট্টগ্রামে আবৃত্তি সংগঠন প্রমা'র উৎসব বন্ধ, এমনকি হেফাজতে ইসলাম ও কওমী ওলামা পরিষদের নেতাকর্মীদের আপত্তির মুখে স্থগিত হওয়া টাঙ্গাইলের মধুপুরে লালন স্মরণোৎসবের তারিখ সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছিলো।
এই যে একের পর এক সিনেমা বন্ধ, কনসার্ট বাতিল, বাউলগানের মঞ্চ ভাঙচুর আর এখন আদালতের কাঠগড়ায় ‘প্রেম-ভালোবাসা’র নাটককে নিষিদ্ধ করার দাবি- এই সবকটি ঘটনাই একটি সুনির্দিষ্ট সুতোর মালায় গাঁথা। এগুলো প্রমাণ করে যে, সমাজে এক অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্রমাগত ভয় দেখানোর মাধ্যমেই আয়োজক ও শিল্পীদের মনস্তাত্ত্বিক আত্মসংকোচনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু এই ধারার শেষ কোথায়? আমাদের ভবিষ্যৎ আসলে কোন নির্জন ও ভয়াল অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে?
আজ যদি আদালতের মাধ্যম সিনেমা-নাটকে প্রেম ও রোমান্সের উপস্থাপন বন্ধের দাবি ওঠে, তবে কাল কি দাবি উঠবে নাটক-সিনেমায় নারীদের উপস্থিতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার? কাল কি দাবি উঠবে গল্প-উপন্যাসে প্রেম থাকবে না? আধুনিক কিংবা লোকজ কোনো সুর বা গানই বাজানো যাবে না? পরশু দিন কি তবে সব ধরনের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, এমনকি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠবে?
শিল্পের আলো যদি এভাবেই নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে থাকে ক্রমাগত, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কোন গহ্বরে গিয়ে পড়বে? আমাদের সমাজ কি তবে কেবল এক যান্ত্রিক, অনুভূতিহীন, রুক্ষ ও হিংস্র বিষাদের মরুভূমিতে পরিণত হবে? যেখানে থাকবে না কোনো গান, থাকবে না কোনো প্রেম, থাকবে না কোনো কবিতা; শুধু থাকবে সর্বব্যাপী এক নিস্তব্ধ ভয় এবং হতাশার বিভীষিকা! এই ভয়াল সাংস্কৃতিক ধসের শেষ আসলে কোথায়?
মানবজাতির সৃষ্টিলগ্ন থেকেই প্রেম, ভালোবাসা ও যৌনতা মানুষের অতীব স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। আর আদিম কাল থেকেই বিশ্বজুড়ে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক কিংবা সিনেমার অন্যতম প্রধান ও সার্বজনীন বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে এই মানবীয় আবেগ ও প্রেম।
বাংলাদেশের সাহিত্য ও শিল্পচর্চার ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। যেখানে আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ঐতিহ্য দাঁড়িয়ে আছে স্বাভাবিক মানবসম্পর্কের মেলবন্ধনের ওপর, সেখানে সেই মৌলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে প্রেম-ভালোবাসার উপস্থাপনকে অপরাধের অনুঘটক বানিয়ে দেওয়ার এই চিন্তা কেবল ভয়াবহ নয় হাস্যকরও বটে।
লেখক: সাংবাদিক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)