ব্র্যান্ড রবীন্দ্রনাথ: ঘৃণা, বিরোধিতা ও শব্দের রাজনীতি

ডানপন্থী জুলাই ভাষ্যকার মোহাম্মদ ইশরাক লিখছেন, “বাংলাদেশে রঠাবিরোধিতার উৎস রঠা নিজে না। বরং রঠাবিরোধিতার কারণ রঠাপ্রেমীরা। যেহেতু রঠা এদেশের এলিট এস্টাবলিশমেন্টের প্রতীক সেহেতু এদেশের মুক্তিকামী জনতা - উইথ অল দেয়ার ফ্লজ এন্ড আগলিনেস - রঠার বিরোধিতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে রঠাকে ঘৃণা করে।…. অতীত এখানে মুখ্য না। রঠা নিজেও মুখ্য না।“

অন্যান্য লক্ষণ ও প্রবণতার বাইরেও, এই কথার খানিকটা সারবত্তা আছে। যেমন ধরেন, গত ৯ই মে কলকাতা ব্রিগেড সমাবেশে ছিল নবনির্বাচিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। ঘটনাচক্রে দিনটি ২৫শে বৈশাখ। নতুন শাসকদল বিজেপি একইসাথে রবীন্দ্রজয়ন্তীর উপলক্ষ্যটিকেও বেছে নিয়েছে উদযাপনের অংশ হিসেবে। মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের এক বিশাল পোর্টেটে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ছবিটি দেখে শুধু ভাবলাম, এক রামে রক্ষা নাই— সুগ্রীব দোসর!!!

বাংলাদেশ তো বটেই ইন্ডিয়াতেও বর্তমানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মুখ্য নাম রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। বন্যা আবার ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপ্ত। পাঠক মনে করতে পারবেন, বন্যার জন্মদিনে চ্যানেল আইয়ের লাইভ অনুষ্ঠানে তাঁকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা নিজে রবীন্দ্রসঙ্গীত পছন্দ করেন বলেও জনশ্রুতি আছে। বিশেষ করে বন্যার গান। শেখ হাসিনার শাসনামলে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এছাড়া আরও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে আওয়ামী সরকারের কমবেশি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। কাজেই জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় রবীন্দ্রবিদ্বেষের দাবানলে আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধিতাও অনুকূল জ্বালানি।

কিন্তু শতাব্দী প্রাচীন এই বিদ্বেষ ও বিতর্কে এই ফ্যাক্টরগুলো জাস্ট নবতর সংযোজন। এর নানান লেয়ারে আছে নানান ইকুয়েশন। আর সবথেকে বড় কারণ হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। কেননা রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক ভেনমের অ্যান্টিডোট। আপনি স্বীকার করেন আর নাই করেন, বাংলার সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক জগতের বৃহত্তম 'সিগনেচার' বা 'ব্র্যান্ড' রবীন্দ্রনাথ। যেহেতু সবথেকে বড় ব্র্যান্ড তাই তাঁর অহর্নিশ আক্রান্ত হবার শঙ্কাও সব থেকে বেশি। আগে সংক্ষেপে বুঝে নেয়া যেতে পারে ‘ব্র্যান্ড রবীন্দ্রনাথ’ বিষয়টা আসলে কী?

ব্র্যান্ড রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের কাজ, চিন্তা, দর্শন, আন্দোলন, অভিব্যক্তি, জীবন ও তৎপরতা নিয়ে অন্যদের লিখিত, সম্পাদিত বা সংকলিত এবং ছাপা হওয়া প্রবন্ধ, নিবন্ধ, অভিসন্দর্ভ, গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যা লক্ষাধিক। পিএইচডি হয়েছে হাজারে হাজার। আর তাঁর নিজের কাজ, পর্বত সমান!!! অনূদিত হয়েছে অন্তত ৪০টি ভাষায়।

স্মরণকালের ইতিহাসে বাংলার সবথেকে বড় পলিম্যাথ রবীন্দ্রনাথ। তাঁর রচিত কবিতা ও ছড়া ৩,০০০-এর বেশি। গান ২,২৩২টি (স্বরবিতান অনুযায়ী)। ছোটগল্প ৯৫টি (গল্পগুচ্ছের অন্তর্ভুক্ত)। উপন্যাস ও বড় গল্প ১২টি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস এবং কিছু দীর্ঘ গল্প বা বড় গল্প (যেমন 'চতুরঙ্গ')। নাটক ৩৮টি (এর মধ্যে কাব্যনাট্য ও প্রহসন অন্তর্ভুক্ত)। গীতি নাট্য ৩টি (বাল্মীকি-প্রতিভা, কালমৃগয়া, মায়ার খেলা)। নৃত্য নাট্য ৩টি (চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, শ্যামা)। প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০। পরবর্তীতে মুদ্রিত চিঠিপত্র ৫,০০০-এর বেশি (যা ছিন্নপত্র, চিঠিপত্র সহ বিভিন্ন খণ্ডে সংকলিত)। শিশুতোষ রচনা প্রায় ২০টির মতো স্বতন্ত্র গ্রন্থ (যেমন সহজ পাঠ, ছড়া, শিশু ভোলানাথ ইত্যাদি)। এ শুধু তাঁর মৌলিক লেখা, এর বাইরে দান্তে, গ্যেটে, ভিক্টর হুগো, শেলী, ব্রাউনিং এবং হাইনের বেশ কিছু কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। নিজের লেখা গোটা দশেক গল্প, উপন্যাস নাটক ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন। সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন। ৭০ বছর বয়সে ছবি আঁকতে শুরু করে হাজার দেড়েক ছবি এঁকেছেন। প্যারিসে, বার্লিনে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। গানে পাশ্চাত্য ও ধ্রুপদী সুরের মিশেলে এক নতুন ধারা (রবীন্দ্রসংগীত) তৈরি করেছেন। এছাড়া মণিপুরী ও কত্থক নৃত্যের সমন্বয়ে তিনি 'রবীন্দ্রনৃত্য' নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ঘরানা শান্তিনিকেতনে প্রবর্তন করেছেন। একটি আস্ত বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন। ধর্মীয় কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লিখেছেন, অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। কৃষির উন্নয়নে, সমবায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মাত্র ৩% সরল সুদে ঋণ দিতে কৃষকের জন্য তৈরি করেছেন কৃষি ব্যাংক। একটা সিনেমা নির্মাণে বেশ খানিকটা এগিয়ে বয়সের কারণে ক্ষান্ত দিয়েছেন।

বিশ শতকের যেসব নোবেল লরিয়েট সাহিত্যিকদের নামে বাংলার রবীন্দ্রবিদ্বেষী বুদ্ধিজীবীরা আছাড় খায়, যেমন, ডাব্লিউ বি ইয়েটস বা এজরা পাউন্ড রবীন্দ্রনাথের বিশ্বব্যাপী পরিচিতির পেছনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফরাসি মনীষী ও নোবেল বিজয়ী রোমাঁ রোলাঁ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের আত্মার আত্মীয়। জর্জ বার্নার্ড শ, আলবেয়ার কামু, আঁদ্রে জিদ ছিলেন রবীন্দ্র প্রতিভার গভীর গুণমুগ্ধ। কবি পাবলো নেরুদা তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'Twenty Love Poems and a Song of Despair'-এর ১৬ নম্বর কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের 'গার্ডেনার' (ক্ষণিকা) কাব্যের ৩০ নম্বর কবিতার ভাবানুসরণে লিখেছিলেন, এবং তিনি প্রকাশ্যেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন। কবি ওক্তাবিও পাস তাঁর 'In Light of India' বইতে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এর সবগুলোই ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ওঠাবসা। পাশ্চাত্য তাঁকে গ্রহণ করেছে সুফি-সন্ত-মরমী কবি হিসেবে। পৃথিবীর অন্তত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে তাঁর নামে সড়ক, প্রতিকৃতি বা প্রাঙ্গণ আছে।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ‘প্রফেশনাল বেস্টসেলার’ শরৎচন্দ্র, যিনি রয়্যালটির টাকায় আমেরিকান ব্র্যান্ডের দামি স্টুডিবেকার গাড়ি চালাতেন, সাউথ ক্যালকাটায় বাড়ি বানিয়েছিলেন, ১৯৩১ সালে তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে (যা পরে তাঁর ‘স্বদেশ ও সাহিত্য’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে) লিখছেন:

"রবীন্দ্রনাথের দান শুধু যে আমাদের বাংলা ভাষা সাহিত্যের সম্পদ বাড়িয়ে দিয়েছে তা নয়, তিনি আমাদের দৃষ্টিকেও প্রসারিত করেছেন। আমরা যারা সাধারণ লেখক, তারা সাধারণ পাঠকের মনের কথা লিখি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যা লেখেন তা আমাদের মতো লেখকদের কাছেও বিস্ময় এবং শিক্ষার বিষয়।"

একই সময়ে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীনতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নজরুল লিখছেন:

"রবীন্দ্রনাথকে যাঁহারা কেবল হিন্দু কবি বা ব্রাহ্ম কবি মনে করেন, তাঁহারা তাঁহার প্রতিভাকে অপমান করেন। তিনি বিশ্বকবি। তাঁহার আত্মার আত্মীয় ছিলেন পারস্যের বুলবুল হাফিজ, তাঁহার পূর্বসূরী ছিলেন মহর্ষি বাল্মীকি।"

১৯২৬ সালের ১৯এ জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজ এবং তাদের মুখপত্র শিখা ছিল বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্তের এক বৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, যার মূল সুর ছিল “বুদ্ধির মুক্তি”। তাদের মূলমন্ত্র ছিল: “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।” কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন, কাজী মোতাহের হোসেন, আবুল ফজল, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীদের মতো প্রগতিশীল মুসলিম চিন্তাবিদরা সরাসরি ঘোষণা করেছিলেন—রবীন্দ্রনাথ কেবল হিন্দুদের নন, তিনি সকল বাঙালির। যখন রক্ষণশীল সমাজ রবীন্দ্রনাথকে ‘বিজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে বর্জনের ডাক দিচ্ছিল, তখন শিখা গোষ্ঠী বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, উদারতা ও নিরাকার ভাবনা ইসলামের শাশ্বত উদার চেতনার পরিপন্থী নয়। এই ঘোষণার সাথে পরবর্তীতে কলকাতা থেকে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, সওগাত সম্পাদক মো. নাসিরুদ্দীন, মোজাফফর আহম্মদ, আবু সাঈদ আইয়ুব প্রমুখ। প্যারিস থেকে চিঠি লিখে, নিবন্ধ লিখে সমর্থন করেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।

গত একশ বছরে শোকে-তাপে-সংগ্রামে-আনন্দে মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনের আবেগ প্রকাশের ভাষা তৈরি হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়ে। সব মিলিয়ে এই সাস্টেইনেবল ‘ব্র্যান্ড রবীন্দ্রনাথ’ শেখায় কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে শোক সইতে হয় কিংবা কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে হয়।

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে যারা ভালোবাসেন, তাদের ভালোবাসার কারণও বহুস্তরীয়। কারো কাছে তিনি গান; কারো কাছে ভাষার সৌন্দর্য; কারো কাছে ব্যক্তিগত বেদনার আশ্রয়; কারো কাছে বাঙালিত্বের নন্দনতত্ত্ব; কারো কাছে আবার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ। দুঃসময়ে কেউ তাঁর গানে বাঁচেন, কেউ তাঁর কবিতায় শান্তি খোঁজেন, কেউ তাঁর গল্পে মানুষের জটিলতা দেখেন। রবীন্দ্রনাথ তাদের কাছে আলো, দিশা, নির্জনতার সঙ্গী।

কারো কাছে রবীন্দ্রানাথ ভাষার সৌন্দর্য; কারো কাছে ব্যক্তিগত বেদনার আশ্রয়; কারো কাছে বাঙালিত্বের নন্দনতত্ত্ব; কারো কাছে আবার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ।

রবীন্দ্র-গুজবের অভিধান

 শৈশব থেকে আমি যা যা শুনে বড় হয়েছি, যার মধ্যে কয়েকটাতে প্রাথমিকভাবে বিভ্রান্তও হয়েছি। কোনোটার একাধিক ভার্সনও আছে। আর সেইসব ইতিহাস নাকি আমাদের জানতে দেয়া হয় নাই।

  • নজরুলকে ধুতুরার বিষ খাইয়ে পাগল বানিয়েছিলেন।
    • ভার্সন ২: পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিজের নাতির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, তাকে দিয়ে পাগল বানিয়েছেন; নজরুল দীর্ঘ জীবন পেলে তাকেও ছাড়িয়ে যেতেন, এই ভয়ে।
  • নজরুলের নোবেল পাওয়ার কথা ছিল, রবীন্দ্রনাথ নাকি সেটা কেড়ে নিয়েছেন।
    • ভার্সন ২: প্রথমে নজরুল নোবেল পেয়েছিলেন, কিন্তু ডাক বিভাগকে হাত করে সেই চিঠি নজরুলের হাতে পৌঁছাতে দেন নাই। তারপর নিজেই জাহাজের টিকিট কেটে সুইডেন চলে যান, সেখানে ঘুষ দিয়ে নোবেল বাগিয়ে নেন। যেহেতু জমিদার ছিলেন, টাকার অভাব ছিল না।
  • তিনি তাঁর বৌদি কাদম্বরী দেবীকে অন্তঃসত্ত্বা করেছিলেন। লোক জানাজানি হলে কাদম্বরীকে খুন করা হয়।
    • ভার্সন ২: বৌদি কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে তাঁর পরকীয়া চলছিল। তিনি বিয়ে করায় কাদম্বরী আত্মহত্যা করেন।
  • তিনি ইসলামবিদ্বেষী ছিলেন।
    • ভার্সন ২: তিনি জমিদারি কাছারিতে ডেকে মোল্লা-মৌলভিদের অপমান করতেন।
  • শিলাইদহে তিনি সাড়ম্বরে কালীপূজা দিতেন। আর সেই ব্যয় মেটাতে মুসলিম প্রজাদের কাছ থেকে পূজার চাঁদা বাবদ অতিরিক্ত খাজনা তুলতেন।
  • কলকাতায় গড়ের মাঠে বসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘মূর্খের দেশে কিসের বিশ্ববিদ্যালয়’?
  • জমিদারির কাজে পূর্ববঙ্গে এলে তাঁর বোটে মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম থেকে তরুণীদের তুলে নিয়ে যেতেন।
  • গ্রামবার্তা প্রকাশিকা সম্পাদক কাঙাল হরিনাথকে মারতে লাঠিয়াল পাঠান, পরে ব্রিটিশদের হাত করে জেলে পাঠান।
  • তিনি লালনের খাতা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। গীতাঞ্জলির গানগুলো মূলত লালনের রচনা।
  • তিনি গগন হরকরার খাতা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সুরও চুরি করেছিলেন।
  • তিনি তাঁর কাছারি বাড়িতে বাউল, কীর্তনীয়া, বৈষ্ণবীদের ডেকে গান শুনতেন। এরপর সেগুলো টুকে রেখে পরে নিজের নামে চালিয়ে দিতেন।
  • তিনি পতিতালয়ের মালিক ছিলেন।
  • তাঁর দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর সোনাগাছি পতিতালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
  • তিনি মুসলমানদের নিয়ে কিছু লেখেননি।
  • তাঁর সাহিত্যে মুসলমান চরিত্র নেই।
  • তিনি প্রজাপীড়ক জমিদার ছিলেন, কৃষকদের জন্য কিছু করেননি।
  • তিনি কেবল ভাববাদী, বাস্তবতা বা সমাজ-রাজনীতি নিয়ে তাঁর কোনো কাজ নেই।
  • তাঁর সাহিত্য মৌলিক নয়, পশ্চিমা বা সংস্কৃত সাহিত্য থেকে চুরি করা।
  • তিনি ব্রিটিশ সরকারের দালাল ছিলেন।
  • তিনি বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি বুঝতেন না, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমান সমাজকে উপেক্ষা করেছেন।

সাহিত্য নয় রাজনীতিই সত্য

এঁড়ে তর্কপ্রিয় বাঙালির এক বিভৎস আমোদের বিষয় রবীন্দ্রনাথ। তিনি কী লিখেছেন, কেন লিখেছেন, কোন বাস্তবতায় বা ঐতিহাসিক মুহূর্তে লিখেছেন—এসবের চেয়ে আমাদের বেশি আগ্রহ তিনি কী লিখেননি তা নিয়ে। যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে আসেননি, এসেছেন আমাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, শ্রেণিগত ও সাংস্কৃতিক চাহিদার মুচলেকা দিয়ে।

তাই রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে বিতর্ক, তা যতটা না সাহিত্যের, তার চেয়ে অনেক বেশি 'শব্দের রাজনীতি' এবং 'সাংস্কৃতিক আধিপত্যের' লড়াই। জনমানসে তাঁকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়, তার পেছনে কাজ করে দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং শিক্ষার সীমাবদ্ধতা।

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে একটি পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হয় যে, রবীন্দ্রনাথ একজন 'হিন্দু কবি'। এখানে 'ব্রাহ্ম' বা 'একেশ্বরবাদী' পরিচয়কে ছাপিয়ে 'হিন্দু' শব্দটিকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শক্তি বুঝতে পারে ‘ব্র্যান্ড রবীন্দ্রনাথ’ দ্বিজাতি তত্ত্বের জন্য কত বড় থ্রেট। সাধারণ মানুষের অশিক্ষা ও ধর্মভীরুতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা চালায়—রবীন্দ্রসংস্কৃতি মানেই ইসলামি ঐতিহ্যের বিসর্জন। এই 'শব্দের রাজনীতি'ই আজও একদল উগ্রপন্থীর কাছে প্রধান হাতিয়ার। যার সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘দিল্লীর রবীন্দ্রনাথ’। অশিক্ষা এখানে বড় ফ্যাক্টর।

শিক্ষার দুর্গতি

সার্বিক শিক্ষার মানের ক্রমাবনতির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রপাঠ খানিকটা দুরূহই হয়ে উঠছে। আর বর্তমান সময়টিও দ্রুত গোগ্রাসে গিলে ফেলার সময়; যেখানে সাহিত্য মানেই হচ্ছে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা, লঘু বিনোদন অথবা ভায়োলেন্স। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কোনো সস্তা চমক নেই। তাই রবীন্দ্রপাঠের জন্য প্রয়োজন হয় এক ধরণের মানসিক নির্জনতা, অধ্যবসায় এবং প্রস্তুতির।

বাংলাদেশের জনতার বড় অংশ রবীন্দ্রনাথকে কখনো গভীরভাবে পড়েনি—এটা সত্য। কিন্তু সেই না পড়ার দায় কেবল জনতার না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া—সবাই মিলে রবীন্দ্রনাথকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন তিনি জীবন্ত মানুষ না, বরং পরীক্ষার খাতা কিংবা সরকারি অনুষ্ঠানের বাধ্যতামূলক অনুষঙ্গ। এবং পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই রাষ্ট্র অনুমোদিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশেষত যখন রাষ্ট্র নিজেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। আর ক্ষমতা সবসময় বড় প্রতীকগুলোকে ব্যবহার করতে চায়। গান্ধী, নজরুল, লালন, বঙ্গবন্ধু, নেতাজি—কেউই এই অপব্যবহার থেকে রেহাই পাননি। রবীন্দ্রনাথও পাননি।

ফলে একদিকে ‘রবীন্দ্ররক্ষক’রা রবীন্দ্রনাথকে এমনভাবে পাহারা দেন যেন তিনি কোনো ধর্মীয় পবিত্রতা; অন্যদিকে ‘রবীন্দ্রভক্ষক’রা তাঁকে এমনভাবে কামড়ে ধরেন যেন ‘ব্র্যান্ড রবীন্দ্রনাথ’ ধ্বংস করলেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মুক্তি হবে।

প্রথমে দেখা যাক পাঁড় রবীন্দ্রভক্ত গোষ্ঠী কীভাবে এই বিদ্বেষ উস্কে দেয়।

রবি মাজারের খাদেমগণ

একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে যে সাংস্কৃতিক দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছে, সেটার ভেতরে বহুদিন ধরেই এক ধরনের শ্রেণিগত অহংকার কাজ করে। প্রায় বিশ বছরের সংস্কৃতি বিষয়ক সাংবাদিকতার সুবাদে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো, এই অহংকারের ভাষা সবসময় সরাসরি উচ্চকিত হয় না; সেটা প্রকাশ পায় দৃষ্টিতে, উচ্চারণে, সাংস্কৃতিক ভঙ্গিমায়, কিংবা ‘আপনি বুঝবেন না’ ধরনের ‘অপর’ সুলভ অবজ্ঞায়। রবীন্দ্রচর্চা যেন কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির একচেটিয়া সম্পত্তি।

রবীন্দ্রসংগীতের আসর, রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান, কিংবা তথাকথিত ‘রুচিশীল’ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বহু সাধারণ মানুষ নিজেদের বহিরাগত মনে করেন। কারণ সেখানে রবীন্দ্রনাথকে একধরনের সাংস্কৃতিক পাসপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেন রবীন্দ্রনাথ ভালো লাগা মানেই আপনি উন্নত; আর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অস্বস্তি মানেই আপনি অশিক্ষিত, অমার্জিত, পশ্চাৎপদ। আপনি রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন না, মানে আপনি মানুষই নন।

আমাদের রবীন্দ্রভক্তের বৃহদাংশই রবীন্দ্রনাথকে এমন এক ‘হাইকালচার’-এর কারাগারে বন্দি করতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে ঢোকার আগে আলাদা উচ্চারণ, আলাদা পোশাক, আলাদা সামাজিক ব্যাকরণ লাগে। এমনকি এভারেজ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বা সংগঠকের শারীরী ভাষা, ভঙ্গি—সবকিছু মিলিয়ে বহু মানুষের মনে হয়, ‘এই জগৎ আমার না’। একই কথা খাটবে উচ্চাঙ্গ সংগীত নিয়েও।

আমার ভাবতে অবাক লাগে, রবীন্দ্রনাথের মতো এমন স্মার্ট, বোল্ড অ্যান্ড হ্যান্ডসাম এবং অতি অবশ্যই স্টাইলিস্ট সুপুরুষ, যিনি কিনা নানা ধরনের ট্রেন্ডি পোশাকে নিজেকে উদযাপন করে গেলেন; তাঁর মাজারের খাদেমরা কেন বছরের পর বছর ধরে পোশাকে ও অভিব্যক্তিতে ‘এই গরু সর, নইলে ফুল ছুঁড়ে মারব’ এক্সপ্রেশন দিয়ে গেল? কিংবা যেই মানুষটা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’, এমনকি ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ এর গণ্ডি ভেঙে বিশ্বমানবতার জয়গানে আন্তর্জাতিকতাবাদে পৌঁছে গেলেন, তাঁর ভক্ত দাবি করা অনুসারীরা মানুষকে ‘অপর’ করার কূপমণ্ডূকতা কোত্থেকে শিখল?

যার অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া হিসেবে মানুষ তখন রবীন্দ্রনাথকে যতটা নয়, বরং ‘রবীন্দ্র-এস্টাবলিশমেন্ট’-কে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে। আর সাধারণের ধর্মভীরুতাকে পাথেয় করে সাম্প্রদায়িক কুশীলবরা ঢেলেছে ঘৃণার জ্বালানি। কিন্তু সেই ঘৃণার আঘাত গিয়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথের গায়েই। সেখানে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন ‘অন্যপক্ষের সাংস্কৃতিক পতাকা’।

‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’-কে লিখেছেন—এই তথ্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় কারা গাইছে। ‘তুমি রবে নীরবে’-র নন্দনতত্ত্বের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় সেটি কোন রাজনৈতিক সরকারের অনুষ্ঠানে বাজছে। অর্থাৎ শিল্পের পাঠকে সরিয়ে দিয়ে প্রতীকের পাঠ শুরু হয়। আর প্রতীক একবার রাজনীতির হাতে চলে গেলে তাকে আর সাহিত্য দিয়ে বিচার করা হয় না। এই জায়গা থেকে রবীন্দ্রবিরোধিতা ক্রমশ একধরনের সাংস্কৃতিক পপুলিজমে রূপ নেয়।

পপুলিজমের ভূত : রবীন্দ্র-মুক্তি বনাম রবীন্দ্র-বিরোধিতা

বিশ ও ত্রিশের দশকে ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে তরুণ সাহিত্যিক গোষ্ঠীর উত্থান, তাঁদের বিদ্রোহ ছিল মূলত নান্দনিক। বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র কিংবা পরোক্ষভাবে নজরুলেরাও রবীন্দ্রনাথকে ঘৃণা করেননি; তাঁরা বিদ্রোহ করেছিলেন রবীন্দ্র-সাহিত্যের সর্বগ্রাসী প্রভাবের বিরুদ্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর দারিদ্র্য, যৌনতা, নগরজীবনের কয়লা-ধোঁয়া, ফ্রয়েডীয় অবচেতন ও মার্কসীয় সমাজচেতনা তাঁদের সাহিত্যে এনে দিল এক কঠোর বাস্তববাদ, যা রবীন্দ্রীয় আধ্যাত্মিকতা ও রোমান্টিকতার বিপরীত মেরুতে দাঁড়ায়। তরুণ লেখকরা বুঝেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ছায়ার ভেতরে দাঁড়িয়ে লিখতে থাকলে তাঁরা শেষ পর্যন্ত কবি নয়, কেবল অনুকারক হিসেবেই থেকে যাবেন। এই বিদ্রোহ ছিল আসলে ‘রবীন্দ্র-বিরোধিতা’র ছদ্মবেশে একধরনের ‘রবীন্দ্র-মুক্তি’র আকাঙ্ক্ষা। কল্লোলীয়দের বিরোধিতার ভিত্তি ছিল গভীর পাঠ ও নন্দনতত্ত্ব; কোনো রাজনৈতিক ক্ষোভ, সাম্প্রদায়িকতা ও না-পড়া মানুষের প্রচারণা নির্ভর ঘৃণার চাষবাস নয়।

রবীন্দ্রনাথ কেবল উত্তরকালেই আক্রান্ত হননি, তাঁর তরুণ বয়সেও তথাকথিত পন্ডিত সমাজ তাঁকে ‘অর্বাচীন’ ও ‘বিজাতীয়’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করতে চেয়েছিল। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি তাঁর ‘সাহিত্য’ পত্রিকার পাতায় রবীন্দ্র-ভাষার খুঁত ধরতেন নিয়মিত; তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলা ভাষার ‘পবিত্রতা’ নষ্টকারী। প্রখ্যাত নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (ডি. এল. রায়) তো ‘আনন্দ বিদায়’ নামক প্রহসন লিখে রবীন্দ্রনাথের মরমী কাব্যধারাকে স্রেফ ভাঁড়ামিতে পর্যবসিত করেছিলেন। রক্ষণশীল সমাজপতি চন্দ্রনাথ বসু রবীন্দ্রনাথের উদারপন্থী ব্রাহ্ম চেতনার বিরুদ্ধে ছিলেন খড়্গহস্ত। অন্যদিকে, অক্ষয়চন্দ্র সরকার বা যোগেশচন্দ্র রায়ের মতো পুরাতনপন্থীদের কাছে রবীন্দ্র-কাব্য ছিল ‘পৌরুষহীন’ ও ‘কুহেলিকাপূর্ণ’ এক তরল আবেগ। কল্লোলীয়রা তাঁকে ছেড়েছিলেন ‘পুরনো’ হয়ে গেছেন বলে, আর এই আদি বিরোধীরা তাঁকে গ্রহণ করতে পারেননি তিনি ‘অত্যধিক আধুনিক’ ছিলেন বলে। আসলে রবীন্দ্রনাথ এতই সুবিপুল যে, ওর সামনে যে কেউই ইনফিরিয়র হয়ে যায়।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উগ্র ঝাণ্ডা উড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে ‘বিজাতীয়’ বলে খারিজ করতে চেয়েছিল।

বিরোধিতার এই দীর্ঘ মিছিলে একসময় অগ্রভাগে ছিলেন তৎকালীন কট্টর বামপন্থীরাও। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) এবং তাদের সাংস্কৃতিক শাখা প্রগতি লেখক সংঘ-এর একাংশ রবীন্দ্রনাথকে ‘বুর্জোয়া’, ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, এমনকি ‘জনবিচ্ছিন্ন’ আখ্যা দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে তাঁর সাহিত্য সামন্ততন্ত্রের ধামাধরা মাত্র। যান্ত্রিক মার্কসবাদের প্রভাবে তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন—জমিদার পরিবারের সন্তান হয়ে গণমানুষের সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব না। রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতাকে তাঁরা বলেছিলেন ‘বুর্জোয়া বিলাস’, তাঁর ‘জীবনদেবতা’ বা ‘অরূপ রতন’-এর সন্ধানকে দেখেছিলেন বিপ্লববিরোধী আফিম হিসেবে। পঞ্চাশের দশকে এসে কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীদের একাংশ স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, তাঁদের পূর্ববর্তী রবীন্দ্র-বিরোধিতা ছিল অন্ধ ও যান্ত্রিক। কিন্তু ততদিনে সেই বিরোধিতার বিষবীজ বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে ছড়িয়ে গেছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথকে ‘রঠা’ বলে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার রাজনৈতিক সংস্কৃতিটিও এই বামপন্থী পরিসরেরই অবদান।

উত্তরাধিকারের সংকট: বাম লেবাস ও মুসলিম লীগের ভূত

বাংলাদেশের বাম তাত্ত্বিক ও নেতৃত্বের একাংশকে দেখলে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। তাঁদের অনেকের পারিবারিক বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল সেই মুসলিম লীগ ঘরানার সঙ্গে, যারা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উগ্র ঝাণ্ডা উড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে ‘বিজাতীয়’ বলে খারিজ করতে চেয়েছিল। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার মধ্য দিয়ে এই ধারার রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটে। স্বাধীন বাংলাদেশে এই গোষ্ঠীর পক্ষে পুরনো পরিচয়ে রাজনীতি করা সম্ভব ছিল না বলেই তাঁদের একাংশ ধীরে ধীরে ‘গুপ্ত’ আশ্রয় নেয় বাম রাজনীতির ভেতরে।

ফলে আজ জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় যখন একদল বামপন্থীকেও রবীন্দ্রবিরোধিতায় উগ্রপন্থীদের সঙ্গে সুর মেলাতে দেখা যায়, তখন আসলে এই ঐতিহাসিক ‘ডিএনএ’-টাই স্পষ্ট হয়। বোঝা যায়—এই বিরুদ্ধাচরণ পুরোপুরি মার্কসীয় নয়; এর গভীরে কাজ করছে পুরনো মুসলিম জাতীয়তাবাদী মানসিকতার দীর্ঘ ছায়া। তাঁরা ভাষায় বামপন্থী, কিন্তু অবচেতনে এখনো বহন করছেন সেই পুরনো চশমা। আগে যেখানে আপত্তির ভাষা ছিল ধর্মীয়, পরে তা হয়ে উঠল শ্রেণিগত। মুসলিম লীগপন্থীরা রবীন্দ্রনাথকে বাতিল করেছিল ‘হিন্দু’ বলে; তাঁদের উত্তরসূরী একাংশ বামপন্থী তাঁকে বাতিল করতে চাইলেন ‘জমিদার’, ‘বুর্জোয়া’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ তকমা দিয়ে। আগে যা ছিল ‘ইসলামি সংস্কৃতি রক্ষা’, নতুন বয়ানে সেটাই হয়ে গেল ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব’ কিংবা ‘দিল্লীর আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’। এই বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা রবীন্দ্রবিরোধিতাকে আধুনিক ‘এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করে, অথচ ভেতরে বহন করে বহু পুরনো সেই বিদ্বেষেরই পুনরুত্থান।

ঘৃণার ইকো-সিস্টেম: ওয়াজ থেকে ডিজিটাল রণাঙ্গন

রবীন্দ্রবিরোধিতার সবথেকে সংক্রামক এবং তৃণমূল সংস্করণটি তৈরি হয় এদেশের মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বলয়ে। এখানে রবীন্দ্র-বিদ্বেষ স্রেফ সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি ‘ধর্মীয় বিধান’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের একটি বড় অংশের কাছে জাতীয় সঙ্গীত ‘হারাম’, তার ওপর এটি একজন ‘কাফেরের’ লেখা। যুক্তি বা নন্দনতত্ত্বের ধার না ধেরে সরাসরি ফতোয়া ও ঘৃণার যে ইকো-সিস্টেম শ্রেণিকক্ষে, ছাত্রাবাসে, ওয়াজ মাহফিলগুলোতে তৈরি হয়, তার উদ্যোক্তা ও ভোক্তা—উভয়ই থাকে এই একই ছাঁচে গড়া। আর বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শিশু স্বাভাবিক বুদ্ধি বিকাশের আগেই বন্দি হয়ে যায় ঘৃণা আর সাম্প্রদায়িকতার বদ্ধ প্রকোষ্ঠে।

এরপর অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে ডিজিটাল দুনিয়ায়। ওয়াজ মাহফিলের সেই উগ্র ক্লিপিংসগুলো যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার প্রধান ভোক্তা হয়ে ওঠে বৃহত্তর মাদ্রাসা পরিবারের দুই কোটি মানুষ। সাথে স্বল্পশিক্ষিত প্রবাসী শ্রমিকেরা। নিজ দেশ, পরিবার ও সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা এই মানুষগুলো এক ধরণের অস্তিত্বের সংকটে ভোগেন, আর সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই ‘প্যাকেজড ঘৃণা’ তাঁদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়। ফলে যুক্তি বা ভালোবাসা যেখানে ধীর লয়ে কাজ করে, ঘৃণা ও উগ্রতা সেখানে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইকো-সিস্টেমে। রবীন্দ্রনাথ আজ কোনো কবির নাম নয়, বরং এই বলয়ে তিনি একটি সহজ ‘ধর্মীয় টার্গেট’।

রবীন্দ্রনাথ আজ কোনো কবির নাম নয়, বরং এই বলয়ে তিনি একটি সহজ ‘ধর্মীয় টার্গেট’।

নির্জলা সাম্প্রদায়িকতা ও শব্দের রাজনীতি

রবীন্দ্রবিরোধিতার সবচেয়ে শক্ত ভিত দাঁড়িয়ে আছে সাম্প্রদায়িকতা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষার ওপর। আর এর হাতিয়ার হলো ঈর্ষা, মিথ্যাচার ও ঘৃণা। মোটা দাগে এর তিন ভাগ ; নির্জলা কাঁচা মিথ্যা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যুক্ত করে কায়দা করে বলা মিথ্যা যা খানিকটা সংশয় তৈরি করতে সক্ষম আর তৃতীয় ভাগে কিছু সত্যের সংগে এমনভাবে অপতথ্য মিশিয়ে দেয়া যা তলিয়ে না দেখলে সত্য বলেই ভ্রম হয়। শ্রেণি, সামর্থ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই ঘৃণার সৌধটি নির্মিত। যার সব থেকে তলায় আছে ফুট সোলজারের মতো বিশাল বাহিনী। যেই লেয়ারে ছড়ানো হয়, ‘নজরুলকে ধুতুরা ফুল’ বা ‘রবীন্দ্রনাথের কালীপূজা’ ধরনের কাঁচা ও আজগুবি মিথ্যা। মিথ্যা বিপজ্জনক, কিন্তু যখন খানিকটা সত্যের সংগে মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়, তখন ভয়ংকর। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক, কাঙাল হরিনাথ বিতর্ক, গগন হরকরা বিতর্ক, সাহিত্যে মুসলমান চরিত্রে অনুপস্থিত বিতর্ক, সর্বোপরি ইসলাম বিদ্বেষী বিতর্ক।

সমকালে যারা ‘দিল্লীর রবীন্দ্রনাথ’ এই ভাষা ব্যবহার করেন, তারা সচেতনভাবে ভারত রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার এবং বাংলাদেশের অর্গানিক রবীন্দ্রচর্চাকে গুলিয়ে দেন। আর রবীন্দ্রনাথ শব্দ সন্ত্রাস ও প্রতীকায়নের সহজ শিকার। কারণ তিনি একই সাথে হিন্দু আবহে জন্মেছেন, জমিদার ছিলেন, ব্রাহ্ম ছিলেন, আবার বাংলা ভাষার সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক শক্তিও ছিলেন। এই চারটি পরিচয় মিলেই তিনি গান পয়েন্টে।

‘হিন্দু’, ‘জমিদার’, ‘ব্রাহ্ম’, ‘ঠাকুর’, ‘পূজা’— এই শব্দগুলোকে বারবার সাম্প্রদায়িক চশমা দিয়েই ব্যবহার করা হয়। ‘ঠাকুর’ মানেই হিন্দু আধিপত্য, ‘পূজা’ মানেই মূর্তিপূজা, আর ‘জমিদার’ মানেই অবধারিতভাবে হিন্দু ও প্রজাপীড়ক—এমন সরলীকরণ সাধারণ মানুষের কানে সহজে ঢোকে। অথচ নজরুল যখন রবীন্দ্রনাথকে ‘পারস্যের হাফিজ’ বা ‘নব বাল্মীকি’র সাথে তুলনা করেন, তখন তিনি সেই সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার ডাক দেন। নজরুল বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথের শিকড় কেবল একটি ধর্মে নয়, বরং তা বিস্তৃত উপনিষদ থেকে শুরু করে হাফিজের সুফিয়ানা প্রেম পর্যন্ত।

একইভাবে ‘জমিদার’ শব্দটিও ব্যবহৃত হয় একধরনের সাংস্কৃতিক শর্টকাট হিসেবে। যেন জমিদার হলেই মানুষটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রজাপীড়ক। অথচ পতিসর, শিলাইদহ কিংবা শাহজাদপুরে কৃষক সমাজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক, নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে সমবায় ব্যাংক গঠন, পল্লী উন্নয়ন ও কৃষি সংস্কারে তাঁর পরীক্ষাগুলো সচেতনভাবেই চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হয়।

অধিকাংশ মানুষ পড়েন না; তাঁরা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে শোনেন। আর এই সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এটিই—আমরা পাঠের বদলে প্রচারণা দিয়ে মত গঠন করি। কখনো ধর্মের কারণে, কখনো শ্রেণির কারণে, কখনো রাজনীতির কারণে, কখনো ভূ-রাজনীতির কারণে।

অথচ সত্যি বলতে, বাংলার সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বে রবীন্দ্রনাথ এত গভীরে মিশে আছেন যে তাঁকে বাদ দিয়ে বাঙালিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। আপনি তাঁকে পছন্দ করেন বা না করেন, তিনি আপনার ভাষার ভেতরে আছেন। আপনার প্রেমের ভাষায়, শোকের ভাষায়, বিরহের ভাষায়, বর্ষার ভাষায়, মা – মাটি- জনপদের অনুভবের ভাষায়, বিদায়ের ভাষায়, এমনকি আপনার অনেক রাজনৈতিক কল্পনাতেও তিনি আছেন।

এই কারণেই তাঁকে ঘিরে বিতর্ক কখনো থামে না। কারণ রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন কবি বা সংগীতকার না—বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের যুদ্ধক্ষেত্র।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কিউরেটর

মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

(লেখকের বানানরীতি অবিকৃত)