একজন গ্রামীণ জীবনের বাউল দার্শনিক, অন্যজন আধুনিকতার কণ্ঠস্বর। কিন্তু সময় ও ভাবনার সীমা পেরিয়ে যেন এক অদ্ভুত বন্ধনে জড়িয়ে আছেন দুজনই। বাংলা সংস্কৃতির এই দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁই।
রবী ঠাকুরের জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে হলেও শিলাইদহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অবিচ্ছেদ্যভাবে। সেখানকার কুঠিবাড়ি হয়ে উঠেছিলো তার সাহিত্য সৃষ্টি, জমিদারী পরিচালনা এবং আত্মিক বিকাশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
শিলাইদহের পদ্মা নদীর তীরে বসে 'সোনার তরী', 'চিত্রা', 'চৈতালি'সহ কালজয়ী অনেক সাহিত্য রচনা করেন এবং গীতাঞ্জলির অনুবাদ শুরু করেন।
কিন্তু এর পাশাপাশি আরও এক ঘটনা নিয়ে এখনো চলছে তুমুল আলোচনা।
ইতিহাস বলে, লালনের মৃত্যুর পর ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে তার গানের খাতা নিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমনকি শিলাইদহের ঠাকুর এস্টেটের এক কর্মচারীকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন লালনের গান শুনে তা লিখে রাখার জন্য।
লালনের গানের খাতা কেন নিয়েছিলেন বিশ্বকবি? কী খুঁজছিলেন তিনি সেই খাতার পাতাগুলোর মধ্যে? আর সেই খাতার ঠিকানা শেষ পর্যন্ত কোথায় হয়েছিল?
লালনের গানের খাতা ঘিরে এই প্রশ্নগুলো আজও রহস্যময়। কারও মতে, সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রেরণার উৎস। কারও মতে, এক হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক দলিল।
এই রহস্য, অনুসন্ধান ও সম্ভাবনার জালই আমাদের নিয়ে যায় বাংলা ভাবচিন্তার এক অনাবিষ্কৃত অধ্যায়ে- লালন ও রবীন্দ্রনাথের অদৃশ্য সংলাপের গল্পে।
লালন আর রবীন্দ্রনাথ- দুই মহাস্রষ্টার সম্পর্ক নিয়ে যত আলোচনা, ততই রহস্য ঘনীভূত হয়। যেমন একটা আলোচনা আছে, কুষ্টিয়াতে জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা হয়েছিল বাউল সম্রাট লালনের। আসলেই কি দেখা হয়েছিল তাদের?
লালনের বিখ্যাত দুই ছবির নেপথ্যে
খ্যাতিমান বাঙালি চিত্রশিল্পী নন্দনাল বসু। তিনি শুধু আঁকতেনই না, লিখতেনও। নন্দনতত্ত্ব নিয়ে তার লেখা বইগুলো বাংলা ভাষার মূল্যবান সম্পদ বলে মনে করা হয়। এসব বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দৃষ্টি ও সৃষ্টি, রূপাবলী এবং শিল্প চর্চা।
শান্তিনিকেতনে দেয়ালচিত্র এঁকে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন নন্দলাল বসু। ভারতীয় সংবিধানের সচিত্র সংস্করণও তার আঁকা।
তাকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ-এ পুরস্কৃত করা হয়েছে। লালনের ঝুটি বাঁধা লম্বা চুল দাড়ি, গোঁফওয়ালা বিখ্যাত চিত্রকর্মটির স্রষ্টা নন্দলাল বসু।
লেখক শচীন্দ্রনাথ অধিকারী ছিলেন শিলাইদহে ঠাকুরদের কাছারি বাড়ির খাজাঞ্চীর সহকারী। জন্মও কুষ্টিয়াতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহচর্য পেয়েছিলেন তিনি।
সহজ মানুষ রবীন্দ্রনাথ, পল্লীর মানুষ রবীন্দ্রনাথ, কবিতীর্থের পাঁচালী, সেকালের রবীন্দ্রতীর্থ, রবীন্দ্রমানসের উৎস-সন্ধানে- এই বইগুলো লিখেছেন তিনি। বইগুলোতে রয়েছে লালন ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক তথ্য।
নন্দলাল বসুকে দিয়ে লালনের ছবি আঁকার উদ্যোক্তা ছিলেন শচীন্দ্রনাথ অধিকারী। ১৯১৬ সালে লালনের প্রতিকৃতি আঁকেন নন্দলাল বসু। তখন তিনি থাকতেন শান্তিনিকেতনে।
লালনের একটি প্রতিকৃতি এঁকে দেওয়ার জন্য নন্দলাল বসুকে অনুরোধ করেন শচীন্দ্রনাথ। স্মৃতি হাতড়ে ছবিটি এঁকে দেন তিনি। কেন লালনের ছবি আঁকার প্রয়োজন কেন পড়ল? এখানেই জড়িয়ে আছে ঠাকুর পরিবারের সম্পর্ক।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা লালন
লালনের জীবৎকালে তার একমাত্র স্কেচ এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির সংগ্রহশালা থেকে চিত্রকর্মটি হারিয়ে যায়। এরপরই নন্দলাল বসুকে দিয়ে আরেকটি চিত্রকর্ম আঁকানো হয়।
১৮৮৯ সালে জমিদারি দেখাশোনার জন্য শিলাইদহে আসেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। লালন তখন জীবন সায়াহ্নে। তবে ঠিক কত বয়স, তা কেউ সঠিক বলতে পারেন না।
কারণ, লালনের জন্মসাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ১৭৭২, ১৭৭৪, ১৭৭৫- নানা রকম জন্ম সাল পাওয়া যায় ইতিহাস ঘেঁটে।
একইভাবে রয়েছে বিতর্ক রয়েছে লালন সাঁইয়ের জন্মস্থান নিয়েও। কেউ বলেন, তিনি কুষ্টিয়ায় জন্মেছিলেন। কেউ বলেন ঝিনাইদহে।
এর মানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন লালনের ছবি আঁকেন, তখন তার সময় ঠিক কত, তা বলা না গেলেও, লালন যে শতায়ু ছিলেন সেটা নিশ্চিত।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনের ছবি আঁকার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার গানের বিস্তৃতি ও প্রভাবের কারণে।
শিলাইদহের কাছারি বাড়ি থেকে ছেঁউড়িয়ার দূরত্ব সড়কপথে ১২ কিলোমিটারের মতো। নৌপথে আরও কম।
এই ছেঁউড়িয়াতেই লালন গড়ে তোলেন আখড়া- একটি মুক্ত আশ্রম, যেখানে সবাই সমান। সেখানে নারীরা গাইতেন। পুরুষরা সাধনা করতেন। কেউ জন্মসূত্রে মুসলমান। কেউ হিন্দু। কিন্তু সবার পরিচয় ছিল একটাই- তারা মানুষ।
বাংলার মাটিতে জন্ম নেয়া বিরল মানুষদের একজন ছিলেন লালন, যিনি দেয়াল ভেঙে বলেছিলেন- ধর্ম নয়, মানুষ বড়। যার গানের বিষয় ছিল মানুষের ভেতরকে জানার, বাহ্যিক আচার নয়।
লালন ছিলেন একাধারে বাউল সম্রাট, সাধক, মানবতাবাদী দার্শনিক আর এক নিঃশব্দ পরিবর্তনের সূচনাকারী।
লোকসংস্কৃতির গবেষক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী তার সম্পাদিত লালনসমগ্রতে লিখেছেন, “প্রধানত বৌদ্ধ সহজিয়া মত, ইসলামি সুফিবাদ ও বৈঞ্চব সহজিয়া দর্শনের সংমিশ্রণ ও সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাউলধর্ম। বাউলের তত্ত্ব-দর্শন সাধনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও উপলব্ধিতে লালনের গানই প্রধান অবলম্বন হিসেবে বিবেচিত। লালনকে তাই বাউল গানের জনক ও বাউল সাধনার শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।”
আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, “লালনের কালোত্তীর্ণ অসাধারণ শিল্পপ্রতিভা তার জীবদ্দশাতেই লোকপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেছিল। মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সমাজমনস্কতা ও মানব-মহিমাবোধ তার বাউল চরিত্রে একটি দুর্লভ ও অভিনব মাত্রা যুক্ত করে। বৃহত্তর বাংলার জীবনে তিনি একটি জাগরণ এনেছিলেন- জনচিত্তে জাগিয়েছিলেন ব্যাপক সাড়া।”
বাংলার আর কোনো মরমীসাধক বা লোককবিই লালনের মতো এমন বিপুল পরিচিতি, ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা ও অসামান্য প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারেননি বলেও মনে করেন এই গবেষক।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহে যান, তখন ছেঁউড়িয়ার আখড়া জমজমাট। লালনের ভক্তের সংখ্যাও বহু। তার জীবদ্দশাতেই ১০ হাজার ছাড়িয়েছিল বলে গবেষকদের ধারণা। তার গানের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ লোকালয়জুড়ে। বাড়ির পাশেরই শিলাইদহের ঠাকুরদের কাছারি বাদ পড়ার কারণ নেই।
লালনের ছবিটি আঁকা হয় নৌকার ওপর। লালন ও জ্যোতিরিন্দ্রের সাক্ষাতের প্রমাণ হিসেবে রয়েছে এই ছবি। শিলাইদহে পদ্মায় ভাসমান নৌকায় লালনকে তুলে নিয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র। সেখানেই আঁকা হয় পেন্সিল স্কেচ।
হাতাওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসা বাউল সম্রাট। বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। হাতে একটি ছড়ি। ছবির নিচে এক পাশে শিল্পী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাক্ষর। আরেক পাশের মাঝখানটায় লেখা ‘লালন ফকীর’।
বাংলা তারিখ- ২৩শে বৈশাখ ১২৯৬। আর স্বাক্ষরের নিচে ইংরেজিতে পাঁচই মে, ১৮৮৯। একদম নিচে লেখা- শিলাইদহ, বোটের ওপর।
লালন ও রবীন্দ্রনাথের কি দেখা হয়েছিল?
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর স্কেচ আঁকার একবছর পর- অর্থাৎ ১৮৯০ সালে মারা যান লালন। ওই ছবি আঁকার সময় শিলাইদহে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই, প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে লালনের সঙ্গে রবী ঠাকুরের দেখা হয়েছিল কি?
লালন মারা যাওয়ার পরের বছর ১৮৯১ সালে আবার শিলাইদহে আসেন রবী ঠাকুর। আর তখন থেকেই লালনের গানের খাতা ও গান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন তিনি।
কেউ কেউ দাবি করেন যে, বাংলা ভাষার এই দুই মহাপুরুষের সরাসরি দেখা হয়েছিল। কিন্তু এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।
রবীন্দ্রনাথের আলোচিত উপন্যাস গোরা’র সূচনার কয়েক লাইনে লিখেছেন, “আলখাল্লা-পরা একটা বাউল নিকটে দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া গান গাহিতে লাগিল- খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, কমনে আসে যায়/ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়।”
১৯০৩ সালে প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় রাজনৈতিক এই উপন্যাসটি।
এই উপন্যাস পড়ে অনেকের হয়তোবা ধারণা হতে পারে বাংলা ভাষার দুই হিতৈষীর দেখা হয়েছিল।
তবে লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সরাসরি দেখা হওয়া, না হওয়ার বিষয়টি জানতে আমরা আবার ফিরে যাই আবুল আহসান চৌধুরীর লালনসমগ্র বইয়ে।
সেখানে লেখা হয়েছে, “শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল গগন হরকরা, গোঁসাই গোপাল, সর্পক্ষেপী বোষ্টমী প্রমুখের দেখা ও আলোচনা হলেও লালন সাঁইজীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনও যোগাযোগ হয়নি।”
অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী হলেন একাধারে লেখক, গবেষক ও লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ। বাংলার লোকগান, লোকভাষাকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বদুয়ারে। লালন, বাউল, বাংলার গান, লোকসংস্কৃতি নিয়ে মৌলিক লেখা রয়েছে তার।
লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে দেখা হয়নি- সুধীর চক্রবর্তীর একটি লেখায় তা স্পষ্ট।
লালনসমগ্র বইয়ের একটি নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখে গেছেন, বাউলদের গান শিলাইদহে খাঁটি বাউলদের মুখে শুনেছি ও তাদের পুরাতন খাতা দেখেছি। সম্ভবত এই খাতা লালন ফকিরের গানের খাতা"- এমন মন্তব্য করেছেন সুধীর চক্রবর্তী।
লালনের প্রভাব ও আমার সোনার বাংলা
বাংলার মাটিতে বাউল সম্প্রদায়ের সাধনা, দর্শন আর সুর- কতটা গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল, তার এক অনন্য সাক্ষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই। বাংলার বাউলদের অন্তর্জগত-নিঃসৃত গানের সুরে, কথায় ও তত্ত্বে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক বিশুদ্ধ মানবধর্ম, যা তার নিজের সৃষ্টির ভীতকেও নাড়া দিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু মুগ্ধই হননি, তিনি যেন একান্তভাবে আত্মস্থ করেছিলেন সেই ভাবধারা। তার অন্তরাত্মার মন্দিরে যখন সৃষ্টি-প্রদীপ জ্বলে উঠত, তখন অনেক সময়ই তার আলোয় দেখা যেত লালন, গগন হরকরাদের সুরের ছায়া।
কতটা গভীর ছিল এই প্রভাব? তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের রূপ ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ডিভাইড এন্ড রুল- ভাগ করো এবং শাসন করো, এরই এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ।
এই বিভাজনের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট- হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ফাটল ধরানো। এতে ঐক্যবদ্ধ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করা যাবে।
কিন্তু ব্রিটিশ শাসকের সেই আশায় জল ঢেলে দিল সমগ্র বাংলার এক অদ্বিতীয় সাংস্কৃতিক জাগরণ। এই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেবল কবি হিসেবে নয়- একজন চিন্তানায়ক ও জাতীয় নেতার ভূমিকায় এগিয়ে এলেন। সৃষ্টি করলেন “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”। একটি গান- যা কালক্রমে হয়ে উঠল বাংলার জাতীয় চেতনার এক অমলিন প্রতীক।
আমার সোনার বাংলা- গানটি সেই যুগের প্রতিবাদে যেমন এক ব্যতিক্রমী প্রতিক্রিয়া ছিল, তেমনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল এক অবিনাশী প্রেরণা। আর স্বাধীনতা অর্জনের পর এই গানই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেন, তখন তার অন্তরে বাজছিল বাংলার মাটির গন্ধ, বাউলদের ভাবসংগীত, আর এক গভীর আত্মিক সুর।
গগন হরকরাকে আপনারা নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন। একজন বাউল শিল্পী ও ডাক হরকরা। ডাকপিয়নকে সে যুগে হরকরাই বলা হত।
গগন হরকরা ছিলেন লালনের গানের ভক্ত। তার দ্বারা ছিলেন ভীষণভাবে প্রভাবিত। গগন হরকরার বিখ্যাত গান- “আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে”।
এই গানটির সুর ছিল সহজ, আত্মার গভীর থেকে উৎসারিত- যা বাংলার লোকসংগীতের নিজস্ব ঢঙে বেজে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সুরের সারল্য ও আবেগে এতটাই মুগ্ধ হন যে দেশপ্রেমের গান রচনায় তিনি তা অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেন।
‘আমার সোনার বাংলা’ গানে গগন হরকরার সুর হুবহু বসিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ। লালনের প্রভাব দেখা গেছে রবী ঠাকুরের আরও অনেক গানে। তিনি নিজেও দেশে-বিদেশে বক্তৃতা ও বিভিন্ন লেখায় লালনের প্রসঙ্গ টেনেছেন বারবার।
কেন লালনের গানের খাতা সংগ্রহ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গবেষকরা বলছেন, লালন নিজে কখনো গান লিখতেন না। তিনি মুখে বলার পর ভক্তরা খাতায় তুলে রাখতেন। দীর্ঘজীবী লালন প্রায় ৮০ বছর ধরে গান রচনা করেছেন।
কত গান তিনি রচনা করেছিলেন, তার সঠিক হিসেব গবেষকদের কাছে নেই। তবে অনুমান করা হয়, লালনের গানের সংখ্যা হাজারের বেশি হবে।
লালনসমগ্র বইয়ে আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, “ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় লালনের জীবৎকালে লিপিবদ্ধ কয়েকটি গানের খাতা ছিল। কিন্তু সেগুলো নানাভাবে বেহাত হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ দু’খানা খাতা নিয়ে যান, যা এখন বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত আছে। প্রথম খাতায় ১২৬টি ও দ্বিতীয় খাতায় ১৭২টি গান লিপিবদ্ধ ছিল।”
আবুল আহসান লিখেছেন, লালনের গানের খাতা সংগ্রহের পর রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি ক্ষেত্রে নিজের হাতে সংশোধন করেন। শুধু খাতা সংগ্রহ নয়, লালনের গান শুনে লেখার জন্য শিলাইদহের ঠাকুর এস্টেটের কর্মচারী বামাচরণ ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেন।
লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও লেখক ড. সনৎকুমার মিত্র লিখেছেন, ১৯০৭ সালের মধ্যেই লালনের সব বা অধিকাংশ গানই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগ্রহ করেন।
কিন্তু লালনের খাতা সংগ্রহ করে কী করেছিলেন তিনি? এ নিয়ে শুরুতেই লালন ভক্তদের মধ্যে নানা ধারণা ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ১৯২৫ সালে ছেঁউরিয়া গিয়েছিলেন লালনের গান সংগ্রহের কাজে। আশ্রমের কর্তৃপক্ষরা তখন তাকে অভিযোগ করে বলেন, “সাঁইজীর আসল খাতা শিলাইদহের রবি বাবুমশায় লইয়া গিয়াছেন।”
তারা উপেন্দ্রনাথকে আরও বলেন, “সাঁইজির সেই গানের খাতা পাইয়াই রবীন্দ্রনাথ অত বড় কবি হইয়া সকলের প্রশংসা লাভ করিয়াছেন।” এই অভিযোগ শুনে একটু অবাক হয়েছিলেন উপেন্দ্রনাথ।
তবে লালনের গানের খাতা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে যাওয়ায় তার ভক্তরা অখুশী ছিলেন এবং খাতা উদ্ধারের জন্য তৎপরতাও চালিয়েছিলেন তারা।
বাংলা ভাষার অন্যতম প্রভাবশালী লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা। তখন কুষ্টিয়ার মহকুমা প্রশাসক। অন্নদাশঙ্কর রায়ের কাছে লালনের খাতা উদ্ধারের জন্য অনুরোধ যায়। আর এই অনুরোধ করেন কাঙাল হরিনাথের ভাতিজা।
কাঙাল হরিনাথ ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বাউল ও সমাজসংস্কারক। গণমানুষের কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে সংবাদপত্র প্রকাশ করতেন।
সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, অন্নদাশঙ্কর রায় ছেঁউড়িয়া আখরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কাঙাল হরিনাথের ভাতিজা তাকে অনুরোধ করেন যে, লালনগীতির আসল পুঁথি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ফিরে পেতে তিনি যেন সাহায্য করেন।
এদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খাতা সংগ্রহের পর লালনের গান পত্রিকায় প্রকাশের উদ্যোগ নেন। কিন্তু অজানা কোনো কারণে সামান্যই প্রকাশিত হয়েছিল।
লালনের গান প্রথম প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, ১৩২২ সালের আশ্বিন থেকে মাঘ পর্যন্ত চার কিস্তিতে লালনের মোট কুড়িটি গান প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে আটটি গান রবীন্দ্রভবনের খাতা থেকে নেয়া।
“এ থেকে ধারণা করা হয়, রবীন্দ্রনাথ অন্য সূত্র অর্থাৎ ভিন্ন খাতা, লালনশিষ্য কিংবা শিলাইদহের বাউলদের কাছ থেকেও লালনের গান সংগ্রহ করেছিলেন,” লিখেছেন তিনি।
লালনের গানের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের হাতে সেটা সম্পাদনা করেন। কিন্তু মূল খাতার লিখনশৈলিও ছিল সুন্দর। এ কারণেই গবেষক সুধীর চক্রবর্তী প্রশ্ন তুলেছেন, ”ওই খাতার মূল হাতের লেখাটি কার?
তিনি লিখেছেন, “লালনগীতি, লালনগীতির খাতা, রবীন্দ্রনাথের সে প্রসঙ্গে ভূমিকা, নিরুদ্দেশ একটি পুঁথি- এইসব নিয়ে যে বিতর্ক জমে উঠেছে বা আপাত সমাধান হয়েছে, সে সম্পর্কে সুধীজন প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, লালন ফকির বিষয়ে এতসব বিতর্কের ধরতাইয়ে আমাদের যাওয়া কেন?”
তিনি আরও লিখেছেন, “লালন ফকির বিষয়ে যথাযথ মূল্য নির্ধারণে আমাদের পেরোতে হবে আরও অনেক বিতর্কের পর্যায়।”